Alexa স্মার্ট ফোনেই তছনছ জীবনের শান্তি-শৃঙ্খলা!

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২০ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৫ ১৪২৬,   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

স্মার্ট ফোনেই তছনছ জীবনের শান্তি-শৃঙ্খলা!

 প্রকাশিত: ১৫:০৭ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭   আপডেট: ১৫:৫৮ ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

স্মার্ট ফোন প্রযুক্তির আশীর্বাদ। মুহূর্তের মধ্যে তা দিচ্ছে বিশ্বের নানাপ্রান্তের খবর, হোক চাই নিউজ অ্যালার্ট এর মাধ্যমে, মুঠো বার্তায় বা সোশ্যাল সাইটসের নিউজ ফিডে। ভুলছেন না কারো জন্মদিন। চিনছেন লোকেশন। এমন কি স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রনেও রয়েছে আন্ড্রয়েড অ্যাপস। সবই তো প্রযুক্তির আশীর্বাদ। তবু সম্পর্ক বন্ধুত্বের, ভালোবাসার, আন্তরিকতার বলে ফিকে হয়ে আসছে ২৪/৭ মুঠোফোনে ব্যস্ত থাকায়। আসলে কি তা পৌঁছেছে নিয়ন্ত্রনের বাইরে?

স্মার্ট ফোনের হাতে কি আপনার জীবনের নিয়ন্ত্রন:
আপনার স্মার্ট ফোনটি দেওয়ালে ছুঁড়ে মারুন! অবাক হচ্ছেন? আচ্ছা তাহলে ছুঁড়ে মারার কথা কল্পনা করুন। ভাবুন তো আপনার মন ও দেহে কি অনুভব হচ্ছে? কিছু সময়ের জন্য মুঠো ফোন খুঁজে পাচ্ছেন না- মানসিক অবস্থার কথাটি একবার ভাবুন। আপনি আর সারাদিন কিছুই করতে পারবেন না। মুঠোফোনের প্রয়োজনীয়তা বলুন বা আসক্তি, এটাই বাস্তব সত্য যে মুঠোফোন ছাড়া আজ আমরা যেন এক মুহূর্ত বাঁচতে পারি না। বর্তমান বিশ্বে শুধুমাত্র আন্ড্রয়েড ফোন ব্যবহারকারী সংখ্যায় ২ বিলিয়নের বেশি।

আরেকটি সমীক্ষার কথাই শুনুন। গত বছর অস্ট্রেলিয়ায় স্মার্ট ফোন ক্রয়কারীর সংখ্যা ছিলো ৮৪% শতাংশ। কিন্তু স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারী হিসেবে যদি সমীক্ষা চালানো হয় তবে ব্যবহারকারীর ৯৪% শতাংশই হচ্ছে কিশোর ও যুব সম্প্রদায়।

স্মার্ট ফোনের উপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আমাদের কি ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করছে সেই প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন ইনফরমেশন স্কুল এর প্রফেসর ডঃ ডেভিড লেভি বলেছেন, ‘কাজের প্রতি অমনোযোগ, ধ্বংসাত্মক ভাবনা, সমস্যার ভারে জর্জরিত থাকা, কারো সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া, তাৎক্ষণিক বা পেশা ভিত্তিক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত না করা সহ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া হাজারো অপপ্রভাব হোক তা দৈহিক অথবা মানসিক, এসবই আমাদের অবচেতন মন অভ্যাসে পরিনত করে চলেছে যার প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে হাতের স্মার্ট ফোনটি। ক্ষণে ক্ষণে আমার সোশ্যাল সাইটটিতে কি নোটিফিকেশন এলো, কে মেসেজ দিলো, এই যে জানার অস্থিরতা তা প্রতি মুহূর্তে বাড়াচ্ছে স্মার্ট ফোনটিই।’

ডঃ লেভি তার বই, ‘Mindful Tech: How to Bring Balance to Our Digital Lives, এ উল্লেখ করেছেন সচেতনতার সাথে পর্যবেক্ষণ ও কাজের ধারায় তার প্রতিফলন যে কোন ধরনের ক্ষতিকর অভ্যাস কে প্রতিরোধ করতে পারে।’

তবু কোথাও যেন একটি প্রশ্ন থেকে যায় আসলে স্মার্ট ফোন ব্যবহার করা কি একটি নেশা। ধূমপান ও চিনি যেমন একটি নেশা। ‘মুঠো ফোন হাতের কাছে থাকা আজ এমন একটি নেশায় পরিণত হয়েছে যেন তা আমাদের কে মানসিক আনন্দ দিবে যেমনটা কোন মিষ্টি জাতীয় খাদ্য খেলে আপনি অনুভব করেন অথবা ধূমপান করলে যেমন আপনার মনে হয় চিন্তা থেকে খানিকটা মুক্তি পেলাম।’ - ডঃ জুডসন ব্রিউয়ার (ইউনিভার্সিটি অফ ম্যাসাচুসেটস মেডিকেল স্কুল সেন্টার)

ডঃ ব্রিউয়ার মানুষের মস্তিস্কের উদ্দীপনা বুঝাতে ব্যবহার করেন ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রিজনেন্স ইমেজিং সংক্ষেপে (এফএমআরআই)। তিনি বলেন, যখন আমরা ক্ষুধা অনুভব করি আমরা খেতে চলে যাই। এই যে ক্ষুধার মনোভাব তা কিন্তু মস্তিস্ক শরীরকে জানান দেয় ডোপামিন নামক এক কেমিক্যাল নিঃসরনের মাধ্যমে। এই কেমিক্যাল আমাদের জৈব প্রবৃত্তি ও মানসিক প্রশান্তির আহবায়ক।

স্মার্ট ফোনের সাথে আমাদের মস্তিস্কের যে উদ্দীপনা কাজ করে তাকে কিন্তু স্ট্রেস বলে। কারণ যখনি আমরা ক্লান্ত হই বা মনকে অন্য দিকে সরাতে চাই আমরা হয় মুঠোফোনে চ্যাট করি, নেট সার্ফ করি বা সোশ্যাল সাইটস ফিড দেখি। তা কিন্তু আমাদের স্ট্রেস লেভেল কে ছড়িয়ে দেয়, মস্তিস্ককে দেয় উত্তেজনার আভাস। আধুনিক ভাষায় বলে বোরিংনেস থেকে মুক্তি। কিন্তু ভাবার বিষয় এখানে মুঠোফোনে আমরা যা পাচ্ছি তা সাময়িক প্রশান্তি মাত্র।

আগেই বলা হয়েছে ডোপামিনের কথা। আমরা কোন ই-মেইলের, মেসেজের, কারো ছবির লাইক, কমেন্টস এর আশা যখনই করছি বা পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ছি তা কিন্তু আমাদের প্রাত্যহিক কাজে অমনোযোগী করে তুলছে। আরও ভাবার বিষয় হচ্ছে আপনি যদি প্রতি ৩০ সেকেন্ডে উত্তেজিত হতে থাকেন, অ্যাড্রেনালেইনের রাশ ভিন্ন কোন কাজ না করতে পারেন, তবে নিশ্চয়ই আপনি স্বাভাবিক নন।

তাই আজকেই নিজেকে প্রশ্ন করুন:

  • আপনি কখন সবচেয়ে বেশি স্মার্ট ফোনটি ব্যবহার করছেন?
  • কেন ব্যবহার করছেন?
  • আপনি বিরক্ত তাই ব্যবহার করছেন না কোন কাজে ব্যবহার করছেন?
  • ব্যবহারের পর কি অনুভব করছেন?

যখন আপনি মাল্টিটাস্কার, জানেন তো কি মূল্য পরিশোধ করছেন:
সব সময়য়ই তো বলা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত উত্তেজনা ডেকে আনতে পারে সামগ্রিক ক্ষতি। ঠিক তেমনি আপনি যখন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, কোন একটি কাজ সুসম্পন্ন করতে পারেন তো? প্রফেসর লেভির ভাষ্যমতে, যখন আপনি কোন কাজ করছেন কিন্তু প্রতি মুহূর্তে চেক করছেন আপনার ফোন, আপনার কাজের ফোকাস অবশ্যই নষ্ট হচ্ছে। আপনার মনোযোগের অভাব কাজে সৃষ্টি করছে অসংখ্য ভুল।

এই মনোযোগের অভাবের কারণ স্মার্ট ফোন কিনা তা জানতে প্রফেসর লেভি করেছেন এক অভাবনীয় রিসার্চ যা ছিলো হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজারদের কেন্দ্র করে। কিছু ব্যক্তিকে তিনি ২০ মিনিটে তালিকা অনুসারে কিছু কাজ সম্পাদনের নির্দেশ দেন। যার মাঝে ছিলো, কারো সাথে ফোনে কথা বলা, ই-মেইল, করা, মেসেজ করা, সরাসরি কথা বলা ইত্যাদি।

টানা ৮ সপ্তাহ পর তিনটি টিমে সবাইকে ভাগ করা হয়। একটি টিমকে শিখানো হয় মেডিটেশন, আরেকটি টিমকে বডি রিল্যাক্সেসন টেকনিক এবং শেষ টিমকে কিছুই শিখানো হয় না।

পরবর্তীতে ৩টি টিমকেই তাদের নির্ধারিত দায়িত্বে ফেরত পাঠানো হয়। ফলাফল ছিলো, প্রথম টিম যাদের মেডিটেশন শিখানো হয়েছিলো তারা কোন কিছুতেই অস্থিরতা অনুভব করছিলো না, বারে বারে এক কাজ থেকে অন্য কাজেও হাত দিচ্ছিলো না। যাদের কে বডি রিলাক্সেশন ট্রেনিং শিখানো হয়েছিলো তারা কাজে ক্লান্তি অনুভব করলেই খানিক বিশ্রাম নিয়ে আবার কাজ শুরু করছিলো তাতে তাদের কাজের গতি কিন্তু ব্যহত হচ্ছিল না। তাদের সামনে ইমেইল আসছিলো, নোটিফিকেশন আসছিলো তবু কেউ তাড়া অনুভব করেনি কাজের ফাঁকে কি হলো জানার। সর্বশেষ যে টিম যাদের কোন ট্রেনিং দেওয়া হয়নি তাদের অস্থিরতা বিন্দুমাত্র কমে নি। এ থেকে এটাই প্রমান হয়েছিলো যে অভ্যাস প্রতিরোধ করা সম্ভব।

পরবর্তীতে সবাই কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তই নিচ্ছিলো পুরনো অভ্যাস বা উত্তেজনা, আগ্রহ, ক্লান্তি সব কিছুর নিয়ন্ত্রন নিজের হাতেই ছিলো, মুঠোফোনের হাতে না।

আমরা কি স্মার্ট ফোন ব্যবহার করবো না:
প্রফেসর লেভি একবারও বলেন নি মুঠো ফোন ব্যবহার করবেন না অথবা বন্ধ রাখুন। খালি বলেছেন সারাক্ষন গেম, সোশ্যাল সাইট্‌ মিউজিক এর নেশা থেকে বের হয়ে আসুন।

করুন ফোন মেডিটেশন:
নিজের ফোন কে কেন্দ্র করে ভাবুন। আপনার শ্বাস প্রশ্বাসের ছন্দ মিলান। আপনার শরীরে কেমন প্রভাব পড়ছে? শোয়ার সময় আপনি কি বারে বারে দিক পরিবর্তন করছেন?
আপনার ফোনটি হাতে নিন। না লক খুলবেন না। খালি অনুভব করুন অস্থিরতা কি কেটেছে?
আপনার ফোনের লক খুলুন, ই-মেইল গুলোতে চোখ বুলান, কিন্তু কোন মেইল খুলবেন না। কেমন বোধ করছেন এখন?
আপনার ফোন বন্ধ করে দিন? খেয়াল করুন আপনার নিঃশ্বাসের গতি।

ডঃ লেভি বলেন, ‘উত্তেজনার সাথে সাথে সাথে আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়বে, বাড়বে আপনা হার্ট বিট, পালস রেট। কিন্তু একে নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসুন অনুভব করবেন প্রশান্তি। এটাই তো মেডিটেশন। খালি আমরা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছি মুঠোফোন। মাত্রাতিরিক্ত মুঠোফোনের প্রতি আকর্ষণ কে কিন্তু এভাবেই আমরা প্রতিরোধ করছি। নিয়ন্ত্রন ফিরে পাচ্ছি মনের।’

কি করছেন এক্সপার্টরা:
প্রফেসর লেভি দিনের সূচনা করছেন মেডিটেশন দিয়ে। কাজের ফাঁকে প্রযুক্তির ব্যবহারেও আনছেন নিয়ন্ত্রন, শুনলে অবাক হবেন এমনকি কোন ডকুমেন্ট প্রিন্ট করতেও অথবা প্রিন্টারের দিকে হাঁটার সময়ও তিনি নিজের নিঃশ্বাস এর উপর নিয়ন্ত্রন রাখেন। যে কোন প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে তার কার্যকারিতা নিয়ে ভাবেন বিনোদন নিয়ে নয়। সপ্তাহে ৭টি দিনের যে কোন একদিন তিনি প্রযুক্তি নির্ভর সব ধরনের ডিভাইস বন্ধ রাখেন তা মুঠোফোন হোক অথবা কম্পিউটার।

প্রযুক্তি বিজ্ঞানের আশীর্বাদ, মুঠোফোন তার মধ্যে একটি। কিন্তু তা যেন আমাদের জীবনবোধ ও বাঁচার বৈচিত্র্য কেড়ে না নেয় এটাই সবার চাওয়া।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ

Best Electronics
Best Electronics