স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানো হবে কি?

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৪ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ২০ ১৪২৭,   ১৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানো হবে কি?

 প্রকাশিত: ১৫:৫৫ ২২ জুলাই ২০২০  

বীরেন মুখার্জী

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

দেশে করোনা সংক্রমণের রেখচিত্র ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। কিছুতেই পরিস্থিতি বাগে আনা যাচ্ছে না। করোনা সংক্রমণের ১ লাখ ছাড়ানোর এক মাস যেতে না যেতেই বিশ্বের ১৭তম দেশ হিসেবে ২ লাখ পার করল বাংলাদেশ। ২২ জুলাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হলো মোট ২,১৩,২৫৪ জন। আর এ সময় পর্যন্ত মারা গেছেন ২,৭৫১ জন, সুস্থ হয়েছেন ১, ১৭,২০২ জন। ১৮ জুন ১৭তম দেশ হিসেবে করোনাভাইরাসে শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১ লাখ পার করেছিল বাংলাদেশ।

বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনা পরিস্থিতিতে গোটা বিশ্ব ভয়ানক পরিস্থিতির মুখোমুখি। আমাদের দেশেও ক্রমাগত বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। চলতি বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্তের ঘোষণা এসেছিল সরকারিভাবে, আর ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্তের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো নমুনা পরীক্ষা শুরু হয় ২১ জানুয়ারি। সেই হিসেবে ১০,১৭,৬৭৪টি নমুনা পরীক্ষা করতে বাংলাদেশের প্রায় ছয় মাস সময় লাগলো। শুধু বাংলাদেশই নয়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণে কার্যত গোটা বিশ্বই থমকে গেছে। সংক্রমণ এড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে লকডাউন করা হয়েছে এবং শিথিলও করা হচ্ছে। অন্যদিকে নভেল করোনা ভাইরাসের উৎপত্তির সাতমাস অতিবাহিত হতে চললেও এটির বিস্তার কমার কোনো লক্ষণ তো নেই-ই, বরং দিনে দিনে আরো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী এই করোনাভাইরাস। স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতি কতটা ভয়ানক বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

এখন দেশে দেশে মানুষের শুধু একটাই চিন্তা যে, কবে যাবে প্রাণঘাতি এই ভাইরাস। মানুষ কবে আবার প্রাণ খুলে চলাচল করতে পারবে, চিন্তামুক্ত হবে। তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটেনে করোনাভাইরাস ছড়ানোর পিক টাইম প্রায় ৪২ দিন ধরে স্থায়ী ছিল। ইউরোপের আরেক দেশ ইতালিতে পিক টাইমের স্থায়ীত্ব ছিল আরো কম। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা যেমন দ্রুত গতিতে বেড়েছে, তেমনি দ্রুত গতিতে সেটা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে আবার বেশ দ্রুত নেমেও এসেছে। এ প্রক্রিয়ায় সময় লেগেছে দুই মাস। কিন্তু বাংলাদেশে প্রথম শনাক্তের পর তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখানে আক্রান্তের সংখ্যা এখনও উর্ধ্বমুখী। এ বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশে এর চাইতেও বেশি সময় ধরে এই পিক টাইম স্থায়ী হতে পারে। বাংলাদেশে আক্রান্তের হার কবে নাগাদ সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাবে, সেটা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে এই চ‚ড়ান্ত পর্যায় কখন আসবে এবং সেটা কতো সময় ধরে স্থায়ী হবে সেটা নির্ভর করবে, কতো টেস্ট করা হচ্ছে, মানুষ কতোটা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে, সরকার কতোটা কঠোরতা আরোপ করছে এবং নজরদারি করছে- এসবের ওপর।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের করোনা সংক্রমণ রোধের চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে দেশগুলো লকডাউনের কড়াকড়ি, যথাযথ আইসোলেশন এবং কোয়ারেন্টিন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার মাধ্যমে দ্রæত করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দমন করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ এই নীতি অনুসরণ করা গেলে সংক্রমণের মাত্রা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হতো বলে এখনো মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে এর উল্টোচিত্র। করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষ সচেতন নন। পুলিশ, আর্মি মাঠে নামিয়েও শতভাগ সচেতনতা নিশ্চিত করা যায়নি। সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে জনগণকে বাড়িতে থাকতে বলা হলেও তা কেউ মানেনি। এরই মাঝে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে। এছাড়া দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুরবস্থার যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা অত্যন্ত পরিতাপের। দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে শুভঙ্করের ফাঁকি এবং চিকিৎসার নামে নানামুখী প্রতারণার বিষয় মাঝেমধ্যেই উঠে আসছে পত্র-পত্রিকার সংবাদে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের স্বাস্থ্যখাতের দিকে সরকারকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।  

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের কার্ভ নিচের দিকেই ছিল। কিন্তু যখন থেকে সাধারণ ছুটি শিথিল করা হয়, গার্মেন্টস, দোকানপাট, অফিস আদালত খুলে দেয়ার পাশাপাশি টেস্টের সংখ্যাও বাড়ানো হয়, তখন থেকে সংক্রমণের উর্ধ্বমুখী চিত্র নজরে আসে। ঈদুল ফিতরে বিপুল সংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেছে। এ সবের নেতিবাচক প্রভাবই এখন দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যখন সারা বিশ্বেই কারোনভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে এবং সংক্রমণ বাড়ছে, তখন স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প থাকা উচিত নয়- বিশেষজ্ঞরা বার বার এমনটি বলে আসলেও দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, মানুষ কোনোটিই মানছেন না। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বের প্রত্যেকটি খাতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর আগে, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্ব ব্যাপক দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির মুখে আছে বলেও সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। একদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে পুরো বিশ্বই বিপর্যস্ত, অন্যদিকে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি; সঙ্গত কারণেই সামগ্রিকভাবে বিশ্ব এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। সামনে আসছে মুসলমানদের বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি ঈদুল আযহা। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ গ্রামমুখী হবে। সেক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানো যাবে না বলেই বিশেষজ্ঞদের মত। তাছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন বার্তায় ইতিমধ্যে বহু বার বলা হয়েছে, যার যার নিরাপত্তা তার তার। ফলে করোনা সংক্রমণ রোধে জনগণের ভ‚মিকা এখানে মুখ্য বলে প্রতীয়মান হয়। 

লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, বিশেষজ্ঞরা যেখানে দিন দিন নমুনা টেস্টের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলছেন, সেখানে দেশে পরীক্ষার হার কমে যাচ্ছে। টেস্ট ল্যাবের সংখ্যা বাড়লেও টেস্টের সংখ্যা কমে আসা অত্যন্ত পরিতাপের। যেহেতু উপসর্গবিহীন ভাইরাস বহনকারী রয়েছে, ফলে টেস্ট কমে আসার প্রবণতা জনগণকে আরো ঝুঁকিতে ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। করোনা নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিনযাপন করলেও এখন আর পরীক্ষা করাতে চাইছেন না। নমুনা পরীক্ষার ফি ধার্য এবং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র দেখেই করোনা উপসর্গ দেখা দিলেও পরীক্ষা করাতে ভয় পাচ্ছে মানুষ। এতে বাসায় থেকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনাও সামনে আসছে। বিষয়টি অতীব দুঃখের হলে সত্য। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, কখনো কখনো রেজাল্ট পেতে পেতে রোগীর অবস্থার অবনতি হয়ে মৃত্যুপথযাত্রী হয়ে যাচ্ছে, অথচ ফলাফল আসছে না। এমন পরিস্থিতির খবরও গণমাধ্যমে আসছে। পরীক্ষার জন্য তিনি নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজতর করার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, আপাতদৃষ্টিতে করোনার সংক্রমণ বিষয়ে মানুষের মাঝে ভয়-ভীতি কমে গেছে। তিনি এও স্বীকার করেযেন যে, নমুনার সংখ্যা কমলেও আক্রান্তের হার শতকরা হিসেবে বাড়ছে। এ পরিস্থিতি অত্যন্ত উৎকণ্ঠার। সরকারিভাবে জোনভিত্তিক লকডাউন কার্যকরভাবে সম্পাদন করা এবং সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধিগুলো মানতে দায়িত্বশীল করার উদ্যোগ নেওয়া গেলে করোনা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বস্তুত এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে আসলে কী করতে হবে, তা যেমন দেশের নীতি নির্ধারকদের ঠিক করতে হবে; তেমনিভাবে সরকারিভাবে কোনো ঘোষণা দেওয়া হলে তা যাতে শতভাগ প্রতিপালন করা যায় সে ব্যাপারে জনগণকেও সচেতন থাকতে হবে। 

সর্বোপরি বলতে চাই, দেশের স্বাস্থ্যখাতের ভগ্নদশার যে রূপ করোনা পরিস্থিতিতে সামনে এসেছে, এ পরিস্থিতি থেকে স্বাস্থ্যখাতকে উদ্ধার করতে হবে। প্রয়োজনে স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানোরও উদ্যোগ নিতে পারেন সরকার। এরইমধ্যে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সরকারের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট। তবে মনে রাখা জরুরি যে, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া জনগণের মৌলিক অধিকার। আর এ অধিকার নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছে, সরকারের কর্তব্য হওয়া উচিত তাদের শনাক্ত করে যথাযথ শাস্তির আওতায় আনা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর