.ঢাকা, বুধবার   ২০ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ৫ ১৪২৫,   ১৩ রজব ১৪৪০

স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্ক (পর্ব-১)

হাবীবুল্লাহ সিরাজ

 প্রকাশিত: ১৯:৩০ ১৩ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৯:৩০ ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

পৃথিবীর গভীরতম সম্পর্কগুলোর একটি হলো স্বামী-স্ত্রী। এই সম্পর্ক যদি গভীর ও গাঢ় হয় তাহলে এই নশ্বর পৃথিবীও মনে হবে স্বর্গরাজ্য। সুখ বইবে জীবনের সর্বময়। 

স্বপ্নময় দিন গত হবে অতিসহজে। জীবন কখনো তৃষ্ণাতুর হবে না। জীবন কখনো কষ্টকর মনে হবে না।

স্বামী-স্ত্রী দুজন দুজনার হলেই শান্তির বাতাস বহে জীবনের আকাশে। অর্থবিত্ত আর ঐশ্বর্য কিন্তু সাংসারিক জীবনের মূল চাবিকাঠি নয়। চাবিকাঠি হলো দুজনের বনিবনা প্রেম-প্রিতি ভালোবাসা। একজন আরেকজনের পৃথিবী হওয়া। স্বামীর ভেতর স্ত্রী তার নিজের পৃথিবী খুঁজে নেয়া, স্ত্রীর ভেতর স্বামী তার নিজের পৃথিবী খুঁজে নেয়া। একজন ছাড়া অন্যজন দিশাহারা হওয়া। 

হাজার বছরের জীবনযাত্রায় পৃথিবী এর প্রমাণ দেখেছে বহুবার; লক্ষকোটি টাকার সংসারও দুজনের অনলে পুড়ে ছাই হয়েছে, আবার শূন্যপাতার পথের ধারের সংসারও হয়েছে স্বর্গময়।  এই সবকিছুর মূলে ও গোড়ে দুজনার সৌজন্য আচার আচরণ। আমাদের সমাজে যার উপস্থিতি শূন্যের কোঠায়। 

আমাদের সমাজে যত উপদেশ সব স্ত্রীকে। আপনি খেয়াল করে দেখবেন স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর কেমন আচরণ করতে হবে’ এই সম্পর্কে দশ বইয়ে দশটা উপদেশ অনায়সেই পেয়ে যাবেন; এর বিপরীতে স্ত্রীর সঙ্গে তার স্বামী কী আচরণ করবে সেই সম্পর্কে দশ বই বা উপদেশ পেতে আপনাকে বেগ পেতে হবে। হাজারটা বই ঘেঁটেও এমনটা পাবেন না, যেখানে স্বামীকে উদ্দেশ্যকে স্ত্রীর সঙ্গে তার আচরণের উপদেশ দেয়া হয়েছে। 

আমাদের দেশের সমাজে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছিন্নতার অধিকাংশ ঘটনা কিন্তু স্বামীর আচরণ থেকেই উদ্ভব। অথচ একটি সংসার টিকে থাকতে স্ত্রী যে ধরণের আচরণ করা জরুরি তার থেকে শতগুণে বেশি জরুরি স্বামীর আচরণ ঠিক করা। একজন স্ত্রী চাইলেই একটি সংসার ভেঙ্গে দিতে পারে না। এর বিপরীতে একজন স্বামী চাইলেই ভেঙ্গে দিতে পারে একটি সংসার, যদিও স্ত্রী থাকে নির্দোষ। আমাদের সমাজের তালাক ডিভোর্স বা বনিবনা অনুপস্থিতির ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখায় এর মূল দায়ভার আশি পার্সেন্ট পুরুষের ওপর। আর যত ওয়াজ নসিহত স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে। 

আমাদের মানিত ধর্ম ইসলাম এই বিষয়টার প্রতি সর্বাদিক গুরুত্ব দিয়েছে। কঠোর ভাষায় স্বামীকে হুশিয়ারি করা হয়েছে। সতর্ক করা হয়েছে স্ত্রীর প্রতি তার আচার-আচারণ ও ব্যবহাববিধিতে। আমাদের সমাজে একশ্রেণির লোক আছে যারা স্ত্রীকে ঘরের বুয়ার মতো ব্যবহার করতে চায়। আরেক শ্রেণির লোক আছে যারা মনে করে স্ত্রীকে ঘরে তুলে তার প্রতি অনুগ্রহ করেছে। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর অধিকারকে সমান করে দিয়েছে। 

আল কোরআনে ঘোষণা হচ্ছে- هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ তরজমা : নারীরা তোমাদের পোশাক স্বরূপ, তোমরাও নারীদের পোশাক স্বরূপ’ (সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৮৭) এই আয়াত থেকেই স্পষ্ট  বুঝা যায় নারী পুরুষের সমান অধিকার।

তাই, ইসলাম স্বামীকে খুবগুরুত্ব ও সতর্কতার সঙ্গে বলে দিয়েছে স্ত্রীর সঙ্গে কী ধরণের আচরণ করতে হবে। ইসলাম স্বামীকে এটা বলে দেয়নি যে, হে স্বামী তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে এটা করবে, ওটা করবে না, এইভাবে করবে, ওইভাবে করবে না’। এই টাইপের আদেশ দেননি, দিয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে অন্যকথায়। সেই কথা কী? 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

 عن عائشة قالت : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم خيركم خيركم لأهله وأنا خيركم لأهلي وإذا مات صاحبكم فدعوه 

তরজমা : আম্মাজান হজরত আয়েশা ছিদ্দিকা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম পুরুষ সে-ই যে, তার পরিবারের নিকট সর্বোত্তম। আমি আমার পরিবারের নিকট সর্বোত্তম পুরুষ। (তিরমিযি ৩৬৯৫) 

পুরুষের ভালোমন্দের ভার হলো তার পরিবার। যে পরিবারের সঙ্গে ভালো সে-ই উত্তম পুরুষ। সমাজে এমন অনেক মানুষ পাবেন যারা অন্যকে উপদেশ দেয় এই মর্মে স্ত্রীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। আর নিজে ঘরে ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। 

ইসলাম এটাকে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করলো কেন? যুদ্ধের ময়দানে লড়ায়ে উত্তীর্ণ হলো সে ভালো বীর হয়, ভালো বা উত্তম পুরুষ হয় না। আর পরিবারের সঙ্গে সদাচরণ করলে ভালো পুরুষ হয়? কারণ কী? নারী যখন বউ হয়ে শ্বশুড়বাড়ীতে এসে; এখানে তার আপন বলতে একমাত্র স্বামীই। দুর্বল মুহূর্তে সবাই-ই আঘাত করতে পারে, কিন্তু ওই মুহূর্তেও কেউ পাশে থাকে না। আপনি স্বামী যদি ওই দুর্বল মুহূর্তে সদাচারণ করতে পারেন তাহলেই আপনি সর্বোত্তম পুরুষ। 

পবিত্র কোরআন হাদিসের আলোকে স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে কী আরচণ করবে-
 
(১) সদাচরণ: স্বামীর আচরণ সম্পর্কে ইসলাম খুবই সতর্ক। জাহেলি যুগে স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে দাস-দাসির মতো আচরণ করতো। কোনো কারণ ছাড়াই শুধুমাত্র মনের ইচ্ছেতেই স্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন করে দিত। শুধু তাই নয়, বিচ্ছিন্নতার সময় স্বামীরা চাইতো যে, যেসব অলঙ্কার বা অন্যান্য পরিধেয় বস্ত্রসমূহ স্বামী দিয়েছে এগুলোও ফিরিয়ে দিক। আর জন্য তারা নির্যাতনও করতো প্রচুর। সেই কুসংস্কারকে সমাজ থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য আল্লাহ তায়ালা আদেশ দেন-

 وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ 

তরজমা : তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সদাচরণ করো (সূরা নিসা আয়াত ১৯)। 

এই অংশটুকুর ব্যাখ্যাতে ইবনে কাসির (রহ.) বলেন- وعاشروهن بالمعروف ) أي : طيبوا أقوالكم لهن ، وحسنوا أفعالكم وهيئاتكم بحسب قدرتكم ، كما تحب ذلك منها ، فافعل أنت بها مثله  স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণের অর্থ হলো স্ত্রীদের সঙ্গে তোমরা উত্তম কথা-বার্তা সুন্দর আচার-আচরণ এবং তোমাদের বেশভুষাও সাধ্যানুযায়ী সুন্দর রাখবে। এমন সুন্দর যেমনটা তোমরা তাদের থেকে আশা করো। 

এই আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাফসিরে মারেফুর কোরআনে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তাফসিরে মারেফুর কোরআন থেকে তুলে ধরছি- জাহিলিয়াত আমলে নারীদের ওপর স্বামীর পক্ষ থেকে উৎপীড়ন হতো এবং ওয়ারিসদের পক্ষ থেকেও। কোনো স্ত্রীলোকের স্বামী মারা গেলে ওয়ারিসরা তার সঙ্গে যদৃচ্ছা ব্যবহার করতো। মন চাইলে নিজেই বিয়ে করে নিতো কিংবা অন্য কারো বিবাহে আবদ্ধ করে দিতো। মন না চাইলে কারো কাছে বিয়ে দিতো না, বিয়ে বসতেও দিতো না। এমন কী তাদেরকে বন্দি করে রাখতো। যাতে অর্থ উপার্জনের পথ প্রশস্ত হয় এমন অবস্থায় স্ত্রীলোকটি হয়তো স্বামীর দেয়া ধন-সম্পদ তাদেরকে দিয়ে মুক্ত হতো না হয় ওই অবস্থায় তাদের মৃত্যু হতো। 

নারীর প্রতি সেই দুরবস্থা দূর করার জন্য আল্লাহ বলেন وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ। এই নাতিদীর্ঘ আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করবে যেমন ব্যবহার সে স্ত্রী থেকে আশা করে। ইমাম গাজাযী (রহ.) ইয়াহইয়াউ উলুমুদ্দিনে লিখেন ‘সকলের জেনে রাখা আবশ্যক যে, স্ত্রীদের নানান হক থেকে এটিও একটি হক যে, তার সঙ্গে স্বামী উত্তম ব্যবহার দেখাবে, উন্নত চরিত্রের পরিচয় দিবে। স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণের অর্থ এই নয় যে, শুধু তাকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা। বরং স্ত্রী থেকে কষ্ট পেলে সেই কষ্ট সহ্য করে নেয়া। তাফসিরে কুরতুবিতে এই আয়াতের ব্যাখ্যাতে বলা হয়েছে, এই আয়াতে শুধু স্বামীকে নয়, স্বামী, স্বামীর অভিভাবক, বড়ভাই, শ্বশুড় শাশুড়ীসহ সকলকে স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণের আদেশ দেয়া হয়েছে। 

সদাচরণে বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই সতর্ক থাকতেন। এক হাদিসে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " إِنَّ مِنْ أَكْمَلِ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَأَلْطَفُهُمْ بِأَهْلِهِ 

হজরত আয়েশা রাযিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন- সর্বাপেক্ষা পূর্ণাঙ্গ মুমিন ওই ব্যক্তি যে আচারণে সর্বোত্তম এবং পরিবারের সঙ্গে সদয় আচরণকারী ও বিনয় বন্ধুসুলভ’ (তিরমিযি, হাদিস নং ২৬১৫) 

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবনের শেষ ভাষণ তথা বিদায় হজের ভাষণেও স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের নসিহত করে দিয়েছে। ঘোষণা দিলেন  استوصوا بالنساء خيراً তোমরা নারীদের সঙ্গে সদয় আচরণের উপদশ গ্রহণ করো। স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর সুন্দর আচরণ বা স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর সুন্দর আচরণ শুধুমাত্র সংসার সুখি হওয়া জন্য নয়, প্রতিজন স্বামীকে তার স্ত্রীর সঙ্গে কেমন আচরণ করেছ এর জবাবদিহিতা করতে হবে কাল কিয়ামতের দিন, এমনভাবে স্ত্রীকেও তার স্বামীর সঙ্গে কেমন আচরণ করেছে এর জবাবদিহিতা করতে কাল কিয়ামতের দিন। 

একথা আমরা জানতে পারি তিবরানির হাদিস থেকে ‘হজরত আবু আইয়ুব আনসারী রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে বিরোধ মীমাংসা করা হবে তাহলো এক স্বামী ও তার স্ত্রীর বিরোধ। আল্লাহর শপথ! (সে সময়) স্ত্রীর জিহ্বা কথা বলবে না, বরং তার হাত-পা সাক্ষ্য দিবে, পৃথিবীতে সে তার স্বামীর সঙ্গে এই এই আচরণ করেছে! আর স্বামীর হাত-পাও সাক্ষ্য দিবে যে, সে তার স্ত্রীর সঙ্গে এই এই ভালো আচরণ বা এই এই খারাপ আচরণ করেছে। অতঃপর আল্লাহর এজলাসে মনিব ও কর্মচারীসংক্রান্ত মামলা উঠবে। সেদিন কোনো আর্থিক জরিমানা করে বিরোধ মেটানো হবে না। বরং মজলুমকে জালিমের নেক আমলগুলো দিয়ে দেয়া হবে এবং মজলুমের বদ আমলসমূহ জালিমের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে। অবশেষে প্রতাপশালী অহংকারী অত্যাচারীদের লোহার জিঞ্জিরে পেঁচিয়ে হাজির করা হবে। অনন্তর বলা হবে তাদের দাবড়িয়ে জাহান্নামে নিয়ে যাও।’

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে