স্বামী ও শ্বশুর মিলে কেটে নেয় খনার জিহ্বা অতঃপর ঘটে মৃত্যু!     
SELECT bn_content.*, bn_bas_category.*, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeInserted, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeInserted, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeUpdated, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeUpdated, bn_totalhit.TotalHit FROM bn_content INNER JOIN bn_bas_category ON bn_bas_category.CategoryID=bn_content.CategoryID INNER JOIN bn_totalhit ON bn_totalhit.ContentID=bn_content.ContentID WHERE bn_content.Deletable=1 AND bn_content.ShowContent=1 AND bn_content.ContentID=188721 LIMIT 1

ঢাকা, বুধবার   ১২ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ২৮ ১৪২৭,   ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

স্বামী ও শ্বশুর মিলে কেটে নেয় খনার জিহ্বা অতঃপর ঘটে মৃত্যু!     

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৩৯ ১৯ জুন ২০২০  

ছবি: খনার বচন সিরিয়ালের দৃশ্য

ছবি: খনার বচন সিরিয়ালের দৃশ্য

ষোল চাষে মূলা, তার অর্ধেক তুলা; তার অর্ধেক ধান, বিনা চাষে পান। এর অর্থ ১৬ দিন চাষ করার পর সেই জমিতে মূলা চাষ করলে ভালো জাতের ফলন পাওয়া যায়। তুলা লাগানোর জমিতে আট দিন চাষ করতে হবে, ধানের জমিতে চার দিন চাষ করে ধান লাগালে ভালো ফলন পাওয়া যায়। পানের জমিতে চাষের প্রয়োজন হয় না। 

অথবা কোল পাতলা ডাগর গুছি, লক্ষ্মী বলেন ওইখানে আছি। অর্থাৎ ফাঁকা করে ধান বুনলে ধানের গুছি মোটা হয় এবং অনেক বেশি ফলন হয়। এরকম হাজারেরও বেশি খনার বচন রয়েছে। প্রাত্যহিক জীবন যাপন, আবহাওয়া, জ্যোতিষ, ঋতুভেদে শস্যের ক্ষয়ক্ষতি ও ফলন সম্পর্কে খনার বচন আজো মেনে চলেন অনেকে। এসব তথ্য বর্তমানে বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় সত্যতা খুঁজে পেয়েছেন। অবাকই হয়েছেন বটে! কেন না আজ থেকে শত শত বছর পূর্বে একজন সাধারণ নারী কীভাবে এত জ্ঞান লাভ করেছিলেন।

 অনেক ইতিহাসবিদের ধারণা, খনার বচনের সঙ্গে তার পরবর্তীতে যারা তথ্য দিয়েছেন সবাই খনার বচনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে এগুলো বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় এখনো মানা হয়। খনাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নাটক, সিনেমা, গল্প, উপন্যাস। সেখানে কারিগর বা লেখক নিজের মনের খোঁড়াক মেটাতে নানা কাল্পনিক তথ্য জুড়ে দিয়েছেন।

কে ছিলেন খনা? 

খনার জীবন-ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও ধারণা করা হয় তিনি সপ্তম খ্রিষ্টাব্দের আগে কোনো এক সময়ের ছিলেন। কারো কারো মতে, তিনি কালিদাস, বিক্রমাদিত্যের সমসাময়িক ছিলেন। খনার জন্ম, কর্ম ও জীবনী নিয়ে রয়েছে নানা কল্প-কাহিনী। কোথায় খনার পরিচয় বা বাস সম্পর্কে জানা যায়নি। সবই যুগে যুগে ইতিহাসবিদদের ইতিহাস ঘেঁটে বের করা অনুমান। 

সর্বদা খনা কৃষকদের কথা ভেবেছেএকটি ধারণা অনুসারে, তার জন্ম হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসতের দেউলি গ্রামে। তার বাবার নাম অটনাচার্য। অটনাচার্যই যে খনার বাবা এর শক্ত কোনো ভিত্তি নেই। তবে খনার একটি বচনে এই নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাই ধরে নেয়া হয় অটনাচার্যই ছিলেন খনার পিতা। বচনটি এরকম- আমি অটনাচার্যের বেটি, গণতে গাঁথতে কারে বা আঁটি। 

এটি যদি তার পরিচয় হয়ে থাকে তাহলে এই ধারণা অনুসারে খনা বেড়ে উঠেছিল রাজা ধর্মকেতুর আমলে। সে এলাকায় মাটি খনন করে বেশ কিছু প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয় এগুলো রাজা ধর্মকেতুর রাজ্যে চন্দ্রকেতুর ধ্বংসাবশেষ। স্থানীয় লোকেরা এখানে একটি পাকা সমাধি বা ঢিবির মতো অংশ খুঁজে পান। তাদের ধারণা এটিই খনার সমাধি। এ ধারণা থেকে তারা একে খনা-মিহির ঢিবি বলেও ডাকে। 

আরেকটি প্রচলিত কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, খনার পূর্ব পুরুষ বঙ্গদেশ থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে লঙ্কায় গিয়ে প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হন এবং তাদের সঙ্গে সিংহলীরাজের এক যুদ্ধে তার পরিবারের সবাই মারা যায়। সেই থেকে শিশু খনা সিংহলরাজ পরিবারে লালিত-পালিত হতে থাকেন। 

অপর এক কিংবদন্তি অনুসারে, উজ্জয়িনীর মহারাজ বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার প্রখ্যাত জ্যোতিষ পণ্ডিত বরাহ মিহির জ্যোতিষ গণনার মাধ্যমে জানতে পারেন তার শিশু পুত্র মিহির এক বছরের মধ্যেই মারা যাবে। নিশ্চিত মৃত্যু এড়াতে একটি তাম্র্রপাত্রে শিশু পুত্রকে ভাসিয়ে দেন সমুদ্রে, আর এই তাম্রপাত্রটি স্রোতে ভেসে চলে আসে সিংহলী। 

সিংহলরাজের গৃহে ঠাঁই হয় মিহিরের, সিংহল রাজ খনা ও মিহির এ দুটো শিশুকে একত্রে লালন পালন করতে থাকেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে বলা আছে, খনা সিংহলরাজারই কন্যা ছিল। খনার নাম ছিল লীলাবতী। তবে শুভক্ষণে জন্মলাভ করায় তাকে ডাকা হতো ক্ষণা বা খনা। তবে যাই-ই হোক খনা নামে যে কেউ ছিলেন তা স্পষ্ট। তবে তার পরিচয় নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। 

কৃষি বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল অসামান্যখনা তার বচনে কৃষি, আবহাওয়া, খাদ্য, জ্যোতিষবিদ্যা সম্বন্ধে অনেক তথ্য দিয়ে গেছেন। এখানে নিশ্চয় মনে প্রশ্ন জাগে, যে সে সময় কীভাবে একজন নারী একসঙ্গে এতো বিষয়ে জ্ঞানলাভ করেছিলেন। তবে খনা রাজ পরিবারে বেড়ে ওঠায় মিহিরের সঙ্গে জ্যোর্তিরবিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্রে পড়ালেখা করেন। কালক্রমে খনা জ্যোর্তিবিদ্যা, কৃষিশাস্ত্র, গণস্বাস্থ্য এবং প্রাত্যহিক জীবন সম্পর্কে প্রভুত জ্ঞানার্জনে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। 

হিংসার বলি হতে হয় খনাকে 

মিহিরের বাবা বরাহ কাজ করতেন বিক্রমাদিত্যের রাজ্যের রাজসভায়। খনার সঙ্গে বিয়ের পর মিহির তার বাবার কাছে ফিরে আসেন। তবে মিহিরকে পিতা বরাহ মেনে নেননি। এরপর খনা তার একটি গনণার বচন দিয়ে শ্বশুরের গণনা ভুল প্রতিপন্ন করেন- কিসের তিথি কিসের বার, জন্ম নক্ষত্র কর সার, কি করো শ্বশুর মতিহীন, পলকে আয়ু বারো দিন।

খনার প্রজ্ঞা ও মেধায় মুগ্ধ হয়ে পণ্ডিত বরাহমিহির খনা-মিহিরকে সাদরে গ্রহণ করেন। অন্যদিকে এই মুগ্ধতাই একসময় ঈর্ষায় পরিণত হয়। মিহির একসময় পিতার সঙ্গে রাজসভায় কাজে যোগ দেন এবং জ্যোতিষবিদ্যায় বুৎপত্তি লাভ করেন। একবার তারা একটি বিষয়ে গণনা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। কোনোভাবেই সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছিল না। এমতাবস্থায় এ সমস্যা সমাধান করে দেন লীলাবতী তথা খনা। 

সমাধান করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন রাজার। এতে সভার পদ হারানোর সম্ভাবনা দেখেন শ্বশুর। একপর্যায়ে সম্ভবত খনার সঙ্গে তার তর্কও হয়। একজন নারীর সঙ্গে তর্কে না পেরে এবং রাজ সভাসদের পদ হারানোর ভয়ে পুত্রকে আদেশ দেন তার জিহ্বা কেটে নিতে। যেন আর কোনোদিন কথা বলতে না পারে। স্বামী ও শ্বশুর মিলে তার জিহ্বা কেটে দিলে সেখান থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাতেই খনা মৃত্যুবরণ করেন। 

প্রচলিত আছে, জিহ্বা কেটে ফেলার আগে তিনি ফরিয়াদ জানিয়েছিলেন তার কিছু কথা বলার আছে। কারণ জিহ্বা কেটে ফেললে সেগুলো আর বলা সম্ভব হবে না। তাকে অনুমতি দেয়া হলো। একজন সে কথাগুলো লিখে রাখার চেষ্টা করলো কিংবা শ্রুতিতে ধরে রাখার চেষ্টা করলো। 

মৃত্যুর আগেও খনা কৃষকদেরকে মূল্যবান তথ্য জানিয়ে গেছেকথিত আছে, জিহ্বা কাটার আগে সাত দিন সাত রাত খনা টানা কথা বলেন কৃষকদের সঙ্গে। তিনি জল, জংলা আর ফসলের সূত্র দিয়ে যান তাদের। তাকে ঘিরে বসে সব প্রাণে গেঁথে নেন দেউলনগরের কৃষকেরা। সেগুলোই পরবর্তীতে খনার বচন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। 

অনেক ইতিহাসবিদদের মতে, খনা নামটি পরিচিত হয় জিহ্বা কাটার জন্য। খনা অর্থ বোবা। তাই লীলাবতী বোবা বা খন নামে পরিচিতি পায়। খনা জ্যোতিষশাস্ত্রে নিপুণা ও বচন রচয়িতা বিদুষী নারী। তার আবির্ভাবকাল অনুমান করা হয় ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। 

তবে তার শ্বশুর হিসেবে যদি রাজ জ্যোতিষবিদ বরাহকে মেনে নেয়া হয় তাহলে বাধে আরেক বিপত্তি। কারণ বরাহের জীবনকাল ৫০৫ থেকে ৫৮৭ খ্রিস্টাব্দ। তারা যদি পুত্রবধূ-শ্বশুর সম্পর্কের হয়ে থাকে তাহলে তাদের জীবনকালের মাঝে ৩০০ বছরের ব্যবধান থাকবে না কোনোক্রমেই। খনার বচনের ভাষা ছিল আধুনিকের প্রাচীন পর্ব। এতে করে খনা যে ৪০০ বছরের আগে ছিল তা মেনে নেয়া কঠিন। 

খানার বচন

‘সকাল শোয় সকাল ওঠে, তার কড়ি না বৈদ্য লুটে’

‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্যি রাজার পুণ্য দেশ।যদি বর্ষে ফাগুনে, রাজা যায় মাগুনে।’

‘আলো হাওয়া বেঁধো না রোগে ভোগে মরো না।’

‘যে চাষা খায় পেট ভরে গরুর পানে চায় না ফিরে গরু না পায় ঘাস পানি ফলন নাই তার হয়রানি’

‘খনা ডেকে বলে যান রোদে ধান ছায়ায় পান।’

‘হাত বিশ করি ফাঁক আম কাঁঠাল পুঁতে রাখ।’

‘যদি না হয় আগনে বৃষ্টি তবে না হয় কাঁঠালের সৃষ্টি।’

‘যত জ্বালে ব্যঞ্জন মিষ্ট তত জ্বালে ভাত নষ্ট।’

‘শোনরে বাপু চাষার পো সুপারী বাগে মান্দার রো৷ মান্দার পাতা পচলে গোড়ায় ফড়ফড়াইয়া ফল বাড়ায়৷’

‘চাষী আর চষা মাটি এ দু'য়ে হয় দেশ খাঁটি।’

খনা বাংলার লোকজীবন সম্পর্কে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যা খনার বচন নামে পরিচিত। বচনগুলোতে আবহাওয়া, জ্যোতিষ, ঋতুভেদে শস্যের ক্ষয়ক্ষতি ও ফলন সম্পর্কে যে ধারণা দেয়া হয়েছে, তার অনেকগুলোই বৈজ্ঞানিক সত্যের খুব কাছাকাছি। খনার উপদেশবাণী দীর্ঘকাল বাংলার আবহাওয়া ও কৃষিকাজের দিক দর্শন হিসেবে কাজ করেছে। সেগুলোর কোনো কোনোটির গুরুত্ব আজো অম্লান। অসংখ্য খনার বচন যুগ যুগ ধরে গ্রাম-বাংলার জনজীবনের সঙ্গে মিশে আছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস