Alexa স্বামীর ভুয়া ডিভোর্সের শিকার হয়ে জীবনযুদ্ধে শিউলি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৩ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৮ ১৪২৬,   ১৯ জ্বিলকদ ১৪৪০

স্বামীর ভুয়া ডিভোর্সের শিকার হয়ে জীবনযুদ্ধে শিউলি

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৩ ২০ জুন ২০১৯   আপডেট: ১৩:২৭ ২১ জুন ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ধৈর্যের শেষ লগ্নের পরীক্ষা দিতে গিয়ে চরম জালিয়াতির শিকার হয়েছেন শিউলি আক্তার কনা নামের এক নারী। ভুয়া ডিভোর্সনামা তৈরি করে স্বামী সোহেল মিয়ার প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি। 

আদালতেও প্রশ্নের শিকার হচ্ছেন- কেনো তিনি এতো দেরিতে স্বামীর বিরুদ্ধে বিচার চাইতে এলেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে চোখের পানি ছেড়ে দেয়া ছাড়া কিছুই যেনো বলার থাকে না তার। 

স্বামী সোহেল সম্পর্কে খালাতো ভাই হওয়ায় স্বজনরা এতোদিন কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা না নিতে পরমর্শ দেয়ায় কনা সেটা করেননি। এদিকে একাধিক ভুয়া কাগজ উপস্থাপন করে আদালতের কাছে বিভিন্ন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছেন স্বামী সোহেল মিয়ার আইনজীবীরা।

জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হওয়া এ অসহায় নারীর চাহিদায় স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে সুখে সংসার করা ছাড়া বেশি কিছু চাওয়া ছিলো না। যে কারণে ২০০৮ সালের পর তিনি অপেক্ষা করেছেন এক এক করে ১০টি বছর। সপ্তম শ্রেণিতে পড়া সন্তান নিশাত শাহরিয়ার নিঝুমকে নিয়ে তিনি এখন রয়েছেন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে।

স্বামীর প্রতিশ্রুতিতে ১০টি বছর কাটিয়ে দেয়া ভুক্তভোগী নারী শিউলি আক্তার কনা এখন সঠিক বিচারের আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন দ্বারে দ্বারে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ছোটো চাকরি করে কোনোভাবে ছেলেকে নিয়ে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে আসছিলেন তিনি।

ভুক্তভোগী নারী শিউলি আক্তার কনার দেয়া তথ্যমতে, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে স্ত্রী শিউলি আক্তার কনা চলতি বছরের ৪ জুন মঙ্গলবার দুপুরে স্বামী সোহেল মিয়ার কাছে নিজের ও সন্তানের পোশাক, এছাড়াও সন্তানের শিক্ষকের বেতন বোনাস চাইলে সে তা দিতে পারবে না বলে জানায়। একই সঙ্গে বলে উঠে, তোমার সঙ্গেতো আমার ডিভোর্স হয়েছে, তুমি কেমন করে আমার কাছে এসব চাচ্ছো?

এমন কথা শুনেই হতভম্ব হয়ে যান শিউলি! তিনি উল্টো সোহেল মিয়াকে প্রশ্ন করলেন কি করে ডিভোর্স হলো? কি বলছো তুমি উল্টাপাল্টা? কে কাকে ডিভোর্স দিলো?

জবাবে স্বামী সোহেল বলেন, তুমিই আমাকে ডিভোর্স দিয়েছো। আমার কাছে প্রমাণ আছে। চাইলে তোমাকে দেখাতে পারি। এমন কথা শুনেই শিউলি রাজধানীর কদমতলী থানার দনিয়া এলাকা থেকে যাত্রাবাড়ী থানার স্বামী সোহেলের মালিকানাধীন কারখানায় উপস্থিত হন।

ওই সময়ে সোহেল বলেন, তুমি দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সামনে যাও আমি আসতেছি, তোমার সঙ্গে কথা বলবো। এরপরেই তিনি স্ত্রী শিউলি আক্তার কনাকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে তর্কবিতর্ক করতে করতে দনিয়া কলেজ সংলগ্ন গলি দিয়ে কদমতলী থানার বর্ণমালা আদর্শ বিদ্যালয়ের সামনের সড়কের মসজিদের সংলগ্ন গলিতে গিয়ে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। যা কনাকে বাবা-মা’র কাছ থেকে এনে দিতে বলেন। ভুয়া ডিভোর্সনামা শিউলির হাতে দিয়ে সোহেল বলেন- এই দেখো তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়েছো। যৌতুক না দিলে এটার বাস্তবায়ন হবে। ওই সময়ে স্ত্রী কনা জালিয়াতির শিকার হচ্ছেন এমন ইঙ্গিত পেয়ে ওই ভুয়া ডিভোর্সনামা সোহেলের হাত থেকে নিজের হাতে নিয়ে নেয়। 

একইসঙ্গে তিনি স্বামীকে বলেন, আর ধৈর্য্য ধরবো না, এবার আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো, একই সঙ্গে তিনি তার স্বামীকে যৌতুক দিতে অস্বীকৃতি জানালে এক পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে স্বামী সোহেল মিয়া তাকে মারধর করে শারীরিকভাবে নির্যাতন চালান। 

পরে ভুক্তভোগী শিউলি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেন। কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করে স্বামী সোহেলের বিরুদ্ধে কদমদলী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১ (গ) ধারায় মামলা (মামলা নং-১২) দায়ের করেন। যেটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। সোহেল ওই মামলায় কারাগারে বন্দি রয়েছেন।

এদিকে ভুক্তভোগী নারী খবর পাচ্ছেন- স্বামী সোহেলের পরিবার একাধিক উচ্চ পদস্থ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে সোহেলের জামিনের জন্য তদবির করাতে দৌড়ঝাঁপ দিচ্ছেন।

ভুক্তভোগী কনা বলেন, আমি একজন মহিলা মানুষ। মাত্র ১৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে আমার সন্তান নিঝুমকে নিয়ে জীবনযুদ্ধ করে চলছি। এই টাকার মধ্যেই আমার আর আমার ছেলের ভরণপোষণসহ স্কুল ও প্রাইভেট টিচারের কাছে পড়াশোনার খরচ দিতে হয়। জালিম, প্রতারক স্বামীর বিরুদ্ধে এই মামলা লড়তে একজন আইনজীবী নিয়োগ করতেও আমাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। 

তিনি বলেন, গত ১৬ জুন রোববার ছিলো এই মামলার দ্বিতীয় শুনানি সেইদিন আমার স্বামীর পক্ষে কাজী নজিবুল্লাহ হিরুর মতো প্রভাবশালী আইনজীবী দাঁড় করিয়েছেন। ওই আইনজীবীর সঙ্গে তার প্যানেলের আরো কয়েকজন আইনজীবী দাঁড়িয়েছেন। আমি ভুক্তভোগী হলেও এমন অবস্থায় আমি আইনি সহায়তা পেতে হীমশিম খাচ্ছি। আব্দুল আলিম নামের এক আইনজীবী আমার পক্ষে লড়াই করছেন। গত শুনানির দিন আসামি পক্ষ জামিন চাইলে তা নামঞ্জুর করা হয়। আগামী শুনানিতে কি হবে জানিনা। এদিকে মামলার দ্বিতীয় শুনানির দিন ১৬ জুন আমারা কোর্ট থেকে বের হলে, আমার দেবর বাদলসহ আরো কয়েকজন আমাকে ও আমার সঙ্গে থাকা সন্তান নিঝুমকে অপহরণ ও গুম করার হুমকি দিয়েছে। যে কারণে আমি পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে ১৭ জুন সোমবার কোতোয়ালি থানায় একটি জিডি (নং-৬১৯) করেছি। জিডিটি তদন্ত করছেন কোতোয়ালি থানার এসআই মাইনুল হক খাঁন।

এ বিষয়ে কদমতলী থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেন, ভুক্তভোগীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা মামলা নিয়েছি। মামলাটি তদন্ত করছেন এসআই ইমরুল হাসান। নির্যাতনের শিকার নারী শিউলি আক্তার কনা ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিয়েছেন। সেই প্রমাণপত্র আমরা পেয়েছি। ইতোমধ্যে আসামি সোহেল মিয়াকে গ্রেফতার করে কোর্টে প্রেরণের পর তিনি এখন কারাগারে বন্দি রয়েছে। ভুক্তভোগী নারী যদি কোনো হুমকি বা ঝুঁকির মধ্যে থাকেন সেই বিষয়গুলোও আমরা দেখবো বলে জানান তিনি। 

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ইমরুল হাসান বলেন, নারী নির্যাতন দমন আইনের ১১ (গ) ধারায় দায়ের হওয়া মামলার প্রেক্ষিতে আমি এরই মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। মারধর ও নির্যাতনের প্রমাণ মিলেছে। সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছি। মামলা তদন্ত শেষে এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত বলা যাবে।

আদালতে যেই কাগজ দেখিয়ে বলা হয়েছে শিউলি আক্তার কনা তার নিজ এলাকার কাজীর মাধ্যমে তার স্বামী সোহেল মিয়াকে তালাক দিয়েছেন, ওই কাগজ সংগ্রহ করে দনিয়া এলাকার (ওয়ার্ড-৬০) সহকারী কাজী হযরত আলীর কাছে গেলে তিনি বলেন, আমি একাধিকবার আমার সংগ্রহে থাকা ভলিউম বই ঘেঁটে দেখেছি যেখানে এই কাগজের তারিখ ও সাল অনুযায়ী কোনো রেকর্ড নেই। এটি একটি ভুয়া ডিভোর্সনামা। যা ওই নারীর স্বামী সোহেল মিয়া নিজেই মনগড়াভাবে তৈরি করেছেন জালিয়াতির উদ্দেশ্যে।

ভুক্তভোগী নারী শিউলি আক্তার কনার ছেলে ১৫ বছর বয়সী নিঝুম জানায়, সে স্থানীয় একটি স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। তার মা তাকে অনেক কষ্ট করে লালন পালন করছে। তার বাবা তার কোনো খোঁজ খবর নেয় না। বরং তার বাবা সোহেল মিয়া অন্য এক নারীকে বিয়ে করে তার কথা ভুলে গেছে। কোনো খরচ চাইলে বাবা সোহেল উল্টো তার মা শিউলি আক্তার কনাকে মারধর করে। যা তার সহ্য হয় না। মায়ের উপর বাবার এমন অমানবিক নির্যাতন দেখে সে অনেক কষ্ট পায়। মামলার পর সে মায়ের সঙ্গে আদালতেও উপস্থিত হচ্ছে। এর মধ্যে আদালতে বাবার পক্ষের আইনজীবীরা তা মাকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন অগ্রহণযোগ্য শব্দ ব্যবহার করে, যার ফলে তার কষ্ট আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/ইএ/টিআরএইচ