স্বামীর উৎসাহে যুদ্ধ করি

ঢাকা, সোমবার   ১৭ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৩ ১৪২৬,   ১২ শাওয়াল ১৪৪০

স্বামীর উৎসাহে যুদ্ধ করি

শরীফুল ইসলাম, চাঁদপুর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:২০ ১৪ মার্চ ২০১৯  

মুক্তিযোদ্ধা ডা. বদরুন নাহার চৌধুরী

মুক্তিযোদ্ধা ডা. বদরুন নাহার চৌধুরী

নারীরা যেই সময়ে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত-বঞ্চিত, ঠিক সেই সময়ে আমি বিবেকের তাড়নায় যুদ্ধের ময়দানে নেমে পড়ি। চারদিকে মৃত্যুর মিছিল, মা-বোনদের ধর্ষণ করে হত্যা করেছিলো পাকিস্তানিরা। তখন আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে। নারী হয়েও উদ্বেগ ছিলাম কখন যুদ্ধে যাবো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আর নতুন স্বামীর উৎসাহ নিয়ে চলে গেলাম যুদ্ধের মাঠে। 

বলছি স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত নারী মুক্তিযোদ্ধা ডা. সৈয়দা বদরুন নাহার চৌধুরী কথা। যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে আহত মুক্তিযুদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে এসেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চাঁদপুর ও নোয়াখালীর ১১টি অঞ্চলে নৌকায় করে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন ডেইলি বাংলাদেশে’র প্রতিবেদক।

মুক্তিযোদ্ধা ডা. সৈয়দা বদরুন নাহার বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। মনে সাহস আর চঞ্চলতা ছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা চারদিকে মা-বোনদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। যুদ্ধে গিয়ে অনেক ভাই শহীদ হন এবং গুরুতরভাবে আহত হন। আমার মনের তাড়না, আমি ডাক্তার হিসেবে যুদ্ধে আহতদের সেবা, মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা, স্বাধীন একটি পতাকা এবং একটি ভূখন্ডের অস্তিত্বের লড়াইয়ে নিজেকে সপে দিলাম।

তিনি বলেন, যুদ্ধে যাওয়ার আগে আমি বিবাহিত ছিলাম। আমাকে কোনো প্রকার বাধা দূরে থাক, আমার স্বামী এবং আমার পরিবার আমাকে যুদ্ধে যেতে উৎসাহ দিয়েছে।

কান্নায় ভেঙে পড়ে বদরুন নাহার বলেন, আমার স্বামী অ্যাডভোকেট তাফাজ্জল হায়দার নসু চৌধুরী আমাকে বলেছিল, যুদ্ধের মাঠে প্রয়োজনে নিজের জীবন দিবে, ইজ্জত নয়। স্বামীর সেই আদেশ নিয়েই যুদ্ধে নামি।

যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আমি এবং আমার স্বামী ২৫ মার্চ ঢাকা থেকে চলে আসি। আমরা চাঁদপুরে এসে সেখানে প্রথম গঠিত স্থানীয় সরকারে যোগ দেই। এছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১২০৪ সাব-সেক্টরের অধীনে জহিরুল হক পাঠানের নেতৃত্বাধীন মধুমতী কোম্পানিতে আমি মেডিকেল কর্মকর্তা হিসেবে কাজ শুরু করি। ওই অঞ্চলের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এটিএম হায়দার। মুক্তিযুদ্ধের সময় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ওলিপুর গ্রামের প্রশিক্ষণ শিবিরে আমি অস্ত্র চালনা এবং আত্মরক্ষা কৌশলের ওপর প্রশিক্ষণ নেই। মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় পুরো নয় মাস আমি বাইরে ছিলাম। এ সময় আমি অধিকাংশ সময় নৌকায় করে সাথী যোদ্ধাদের সেবা করেছি।

তিনি আরো বলেন, খুব মনে পড়ে নোয়াখালির চন্দ্রগঞ্জ এলাকায় যুদ্ধে খুব ভয়াবহ অবস্থায় একটি প্রসূতি মায়ের ডেলিভারি করি। শাহরাস্তির চৈতশি এলাকায় একটি স্কুল ঘর রয়েছে, যেখানে পাকিস্তানিরা সব ধরনের পৈচাশিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতো। আজও সেই স্কুলটি রয়েছে। এছাড়াও ফরিদগঞ্জের শাসিয়ালী, শাহরাস্তির চিতোষী, কোম্পানীগঞ্জ, রামগঞ্জ, নোয়াখালীর বিভিন্ন স্থানে যেখানে পাকিস্তানি হানাদাররা মুক্তিযুদ্ধাদের হামলা চালিয়েছে, ওইসব স্থানে আমি সেবা দিয়েছি।

যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা এবং আপনজনদের ফিরে পাওয়া নিয়ে বদরুন নাহার বলেন, নতুন বিয়ে, নতুন একটি স্বপ্ন পূরন হওয়ার পথে। সবচেয়ে কাছের আপনজন মা-বাবাকে রেখে যুদ্ধ চল যাওয়া একটু কষ্টেরই বিষয়। তবুও বিবেকের তাড়না একটি স্বাধীন পতাকার জন্য যুদ্ধে যেতেই হবে। আল্লাহর রহমতে যুদ্ধে স্বাধীন হয়ে মা-বাব-স্বামী সবাইকে ফিরে পেয়িছি। যুদ্ধে সবসময় দুজন ব্যাক্তি আমার সঙ্গে ছিল। যাদের কথা কখনো ভুলার নয়। একজন হলেন আমার পরিবারের কাজের লোক হান্নান আর অন্যজন নৌকার মাঝি এরশাদ। যারা আমার জন্যেও জীবন বাজি রেখে কাজ করেছে।

যুদ্ধে নৌকায় থাকা অবস্থায় স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন, আমরা তিনজন নৌকায় ছিলাম। হঠাৎ পাশদিয়ে পাকিস্তানিরা যাচ্ছিল। সবাই নৌকা থেকে নেমে নৌকার পাশে ডুবে থাকে। আমিও নেমে পড়ি নদীতে। শুধু নাকটুকু একটু ভাসিয়ে রেখে ডুবে ছিলাম। শুধু তাই নয়, খাবার হিসেবে চিড়া-মুড়ি-বিস্কুট খেয়ে দিন পার করেছি। আমার স্বামীর নিজস্ব অর্থায়নে যেসব ওষুধ ও সরঞ্জাম কিনে দিয়েছে, তা দিয়েই মক্তিযুদ্ধাদের চিকিৎসা চালিয়েছি। শুধু ফারুক ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। ফরিদগঞ্জের শাসিয়ালী নামক স্থানে তার পায়ে গুলি লাগে, তিনি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নৌকায় ছিলেন, তাকে আর বাঁচাতে পারিনি।

যুদ্ধ পরবর্তী সময় প্রসঙ্গে ডা. বদরুন নাহার বলেন, আমি ৭১ এ মক্তিযুদ্ধ করেছি। আমার চাওয়া-পাওয়া কিছু নেই। আমরা চাই এই দেশটা যেনো ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত একটি উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়। মুক্তিযুদ্ধাদের অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই বাংলাদেশ। আমার আকুল আবেদন থাকবে এই দেশে যেনো আর কারো ওপর অত্যাচার-নির্যাতন না করা হয়।

যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ, তা পূরণ হয়েছে কিনা এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের স্বপ্ন ছিলো আমরা একটি স্বাধীনতা পাবো। একটি লাশ-সবুজের পতাকার জন্য যুদ্ধে নেমে পড়ি। পূর্ণতা এসেছে, তবে পুরোপুরি পূর্ণতা এখনো হয়নি। আমরা চাই একটি উন্নত রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্র সারাবিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। বর্তমান সরকার শেখ হাসিনা মক্তিযুদ্ধের সেই সোনার বাংলা গড়ে তুলতে কাজ করছেন। আশা করি আমরা সেই সোনার বাংলা দেখে যেতে পারবো।

স্বাধীনতা পদক অর্জন নিয়ে ডা. বদরুন নাহার চৌধুরী বলেন, ২০১২ সালে স্বাধীনতা পদকটি শেখ হাসিনা আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, এর চাইতে আর বড় কোনো প্রাপ্তি হতে পারে না। এই পদকের মাধ্যমে যিনি সব মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করেছেন। আমার জীবনে আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। স্বাধীনতা পদক পাওয়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।

নতুন প্রজন্মদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমরা চিরকাল থাকব না। আমরা যা রেখে যাচ্ছি, তার সব দায়িত্ব নতুন প্রজন্মদের। তারা যেনো সঠিক ভাবে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। একটি উন্নত দেশ-জাতি গঠনে নতুন প্রজন্মদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। স্বাধীনতার পুরোপুরি পূর্ণতা তারা যেনো করে যেতে পারে, সেই প্রত্যাশা রেখে যেতে চাই।

ডা. বদরুন নাহার চৌধুরীর পরিচিতি

১৯৫০ সালের ১৫ জানুয়ারি ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দা বদরুন নাহার চৌধুরী। বাবা সৈয়দ দরবেশ আলী। মা সৈয়দা সামছুন নাহার বেগম। ১৯৬৯ সালে ঢাকা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে পড়ার সময় সমমনা রাজনৈতিক আদর্শের অন্যতম নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র তোফাজ্জল হায়দার নসু চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বদরুন নাহার। ফলে স্বামী-স্ত্রী দু'জনেই দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে একাত্ম ছিলেন। এছাড়া শ্বশুর বাড়ির এলাকা হিসেবে চাঁদপুরকে ঘিরেই কেটেছে ডা. বদরুন নাহারের বাকি জীবন ও কর্মকাণ্ড।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর