স্বাধীনতা এমনই ।। মনদীপ ঘরাই

ঢাকা, বুধবার   ০৩ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২০ ১৪২৭,   ১০ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

স্বাধীনতা এমনই ।। মনদীপ ঘরাই

গল্প ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩৩ ১১ ডিসেম্বর ২০১৯  

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

ছোট একটা খাঁচায় দুটো পাখি এনেছে জিসান। পুষবে। ওদের নাকি লাভ বার্ড বলে। বাংলা করলে দাঁড়ায় ভালোবাসার পাখি। হিমি শোনার সাথে সাথেই বলল- ভাইয়া আমাকে দে না! 

’এক চড় দেব। যা এখান থেকে। পড়তে বস গিয়ে।’

কী যেন বিড়বিড় করতে করতে বের হয়ে যায় হিমি।

জিসান ছোট বোনটাকে আদর যেমন করে, শাসনেও রাখে খুব। বাবা মারা যাওয়ার পর হিমির অলিখিত অভিভাবক তো সে-ই।

পাখি দুটোর জন্য প্যাকেট ভরা খাবারও কিনেছে জিসান। ছোট্ট একটা বাটি দিয়েছে খাঁচার সাথে। ওটাতে করে দানা দানা খাবারগুলো দেয় যতেœ। ভেবেছিল পাখিগুলো ভদ্র মানুষের মতো টুকটুক করে খাবার খাবে। চোখ উল্টে গেল ব্যাটারি সাইজের দুই পাখির কাণ্ডে। ঠুকরের পর ঠুকরে চারদিকে ছড়িয়ে ফেলছে খাবার। হিমি এসে বলেÑরাগ করো কেন ভাইয়া, ওরা এভাবেই খায়। আমি দেখেছি টিভিতে।

জিসান গর্জে ওঠে, পড়াশোনা বাদ দিয়ে সারাদিন টিভি টিভি করিস না হিম। মার খাবি কিন্তু।

হিমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে মেজাজ গরম করে ঠিকই, তবে ভাইয়াকে ওর দারুণ ভয়। কিছু বলতে পারে না।

জিসান ওদিকে চেষ্টা করছে খাবার না ছড়ানোর ট্রেনিং দিতে। সেই সাথে যোগ হয়েছে বিষ্ঠা পরিষ্কারের যন্ত্রণা। পাখি কি আর কথা শোনে? শেষমেশ রেগেমেগে জিসান বলে ওঠেÑ এর চেয়ে কুকুর পোষা ভালো ছিল।

বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা পাওয়া যায় না। মোড় পর্যন্ত হাঁটতে হয়। দুপুরের কড়া রোদে হেঁটে মেজাজটাও চড়ে গেল খানিকটা।

রিকশা একটা পেল। ভাবসাবে কিছুটা বেয়াদব। ভাড়া নিয়ে দর কষাকষি শেষে উঠল জিসান। ব্যাংকে যাওয়ার গন্তব্যটা শুরুতেই বলে উঠেছে সে। কিন্তু রিকশাওয়ালা আসলে কিছুটা না। মহা বেয়াদব। নিজের ইচ্ছেমতো পথে নিয়ে যাচ্ছে। এক কড়া ধমক দিল ব্যাটাকে।
রিকশাওয়ালাও রিকশা থামিয়ে বলেÑ আপনারে লইয়া যামু না। আমারে মাফ করেন।

কোনো কথা না বলে ধাম করে একটা চড় কষিয়ে দিল জিসান। বলল- তুই যাবি, তোর বাপে যাবে।

রিকশাওয়ালা কথা বাড়ানোর সাহস পায় না। অনিচ্ছা নিয়েই চালিয়ে যায়।

অফিসে জিসানের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায়। সবার সাথে আচরণ তেমন একটা ভালো করে না। এই তো সেদিন দুই পিয়ন দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কী যেন আলাপ করছিল। জিসান সেই আলাপের সবটুকু জোর করে শুনেই ছাড়ল। চলে আসার সময় বললÑ আমি জানি তোমরা আমাকে পছন্দ করো না; ভালো বসের এটাই বড় গুণ।

জিসান বিয়ে করেছে দেড় বছর। বাবা হবে আর মাস দুয়েক পরেই। নিজের পরিবারেও একই রূপে জিসান। ক্ষমতা, কর্তৃত্ব আর ছড়ি ঘোরানোর অভ্যাসটা এখানেও একই রকম। নিজের সন্তানের নাম ঠিক করার ক্ষেত্রেও বউয়ের কোনো কথা শোনেনি। অনাগত ছেলের নাম রাখতে চেয়েছে শৃঙ্খল।

পাড়ার সবাই যে জিসানকে খুব একটা পছন্দ করে, তা না। তবে, এ পাড়ায় জিসানই একমাত্র বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তাই স্বাধীনতা দিবসে প্রত্যেকবারই বিশেষ অতিথি হিসেবে ডাক পড়ে তার। এবারো পড়েছে ডাক। এবারের আলোচনার বিষয় ‘স্বাধীনতা রক্ষায় আমাদের ভ‚মিকা।
কেমন যেন অন্যবারের মতো সাবলীলভাবে কিছু বলতে পারল না জিসান। সত্যিই কি সে কিছু করেছে স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য? উত্তর খুঁজে না পেয়ে এলোমেলো কিছু কথা বলে দ্রুত নেমে আসে মঞ্চ থেকে।

আমাকে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কিছু করতেই হবে।

ফেরার পথে আনমনে বলে ওঠে জিসান।

বাসায় ফিরে খুঁজে পায় না কী করতে হবে! তার মতো ক্ষুদ্র মানুষ স্বাধীনতার মতো বিশাল সমুদ্র রক্ষায় কি-ই বা করবে? জবাব খুঁজে পায় না। খুঁজবেই বা কার কাছে। রাত গভীর। কেন জানি পাখি দুটো খুব ডাকছে। এমন তো ডাকে না কখনো!

আজ সকালটা অন্যরকম। এই গল্পের জন্য খুবই জরুরি সকাল। লাভ বার্ডের জোড়া ভেঙেছে আজ। একটা পাখি নিথর হয়ে পড়ে আছে খাঁচার মধ্যে। জিসানের এলোমেলো লাগে। এতদিন ভালোবাসার পাখিকে খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিল। কাল রাতে কি স্বাধীন হতে চেয়েছিল ওরা?

জিসান বেঁচে থাকা পাখিটাকে মুক্ত করে দিল। যেতে চাইছে না ও। পরাধীনতার অভ্যাস পেয়ে বসল নাকি ওকে? খানিক পরে উড়ে যায়। এই তো স্বাধীনতা রক্ষার শুরু। তবে, ভালোবাসার একটা পাখির মৃত্যু দিয়ে। স্বাধীনতা; অর্জন করা যায় ঠিকই, কখনো কখনো কেড়ে নেয় প্রাণ। জিসানের মনে পরে যায়- ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করেছিলাম আমরা। স্বাধীনতা এমনই।
পাখিটা উড়িয়েই চোখ পড়ে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা হিমির দিকে। কাঁদছে অঝরে। পাখি হারানোর শোক ঘিরে ধরেছে ওকে।
হিমির মাথার ওপর হাত রাখে জিসান। কেঁপে ওঠে হিমি। এটা ভাইয়া তো নাকি অন্য কেউ! 

শোন হিম, আজ থেকে তোকে আর জোর করে পড়তে বলব না। নিজে যখন বুঝবি পড়তে হবে, তখনই পড়িস।

স্বাধীনতা রক্ষা করছে জিসান। মন ভরে বিলিয়ে দিচ্ছে স্বাধীনতা। স্বাধীনতা বোনের চোখে ভাইয়ের ওপর প্রাণখোলা আস্থা। স্বাধীনতা এমনই।
মোড় পর্যন্ত হেঁটে এসে রিকশায় ওঠে জিসান। সেই রিকশাওয়ালাটা। আজ আগেভাগেই সে জিসানকে জিজ্ঞেস করে, স্যার, কোন রাস্তা দিয়া যামু কইয়া দেন। আইজ আর মাইরেন না।

লজ্জায় ফর্সা জিসানের মুখটা লাল হয়ে ওঠে। মাথাটা নিচু করে বলে, মারব কেন? তোমার যেদিক দিয়ে ইচ্ছে যাও।

সেদিনের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে চলছে রিকশা। যেন উড়ছে আকাশে। এই তো স্বাধীনতা। অবাধ ওড়ার আকাশ গড়ার যুদ্ধ। স্বাধীনতা এমনই।
অফিসে পৌঁছে কারো দিকে আর নজর দেয় না জিসান। আজ নিজেকেও সব সংকীর্ণতার পরাধীনতা থেকে মুক্ত করবে সে। সবটুকু। স্বাধীনতা এমনই।

বাসায় ফিরে মনটা অনেক অনেক হালকা লাগে জিসানের। বউকে কাছে টেনে জিজ্ঞেস করে, আমাদের ছেলের নামটা তোমার পছন্দ তো? বউ ভয়ে ভয়ে বলে, সত্যি বলব?

জিসান অবাক হয়। এতটাই দূরে ঠেলেছিল সে সবাইকে? চোখটা মুছে বলে, বলো, একেবারে সত্যি বলো তো।

-একদম পছন্দ হয়নি। স্বাধীন দেশে আমার ছেলের নাম কেন শৃঙ্খল হবে? ওর পায়ে কি তুমি জন্ম থেকে শেকল পড়াতে চাও? আমি চাই আমাদের ছেলে হবে স্বাধীনতার প্রতীক। 

জিসান আস্তে করে বলে, তবে ওর নামটা তুমিই রাখো না!

জিসানের বউ আকাশের দিকে চেয়ে বলেÑ আমার ছেলের নাম রাখব মুজিব।
স্বাধীনতা এমনই।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর