স্বর্গরাজ্য নাইক্ষ্যাং

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

স্বর্গরাজ্য নাইক্ষ্যাং

সিদরাতুল সাফায়াত ড্যানিয়েল

 প্রকাশিত: ১২:৫৭ ১১ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১১:৩৮ ১২ জানুয়ারি ২০১৯

স্বপ্নের নাক্ষিয়ং খুম। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

স্বপ্নের নাক্ষিয়ং খুম। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বান্দরবান জেলা পুরোটাই পাহাড়ী অঞ্চল। দেশের ৩ পার্বত্য জেলার একটি এই জেলা। থানচি হলো এই জেলার মায়ানমার সীমান্তঘেঁষা একটি উপজেলা। মারমা শব্দ ‘থাইন চৈ’ বা ‘বিশ্রামের স্থান’ থেকে থানচি নামের উৎপত্তি। বান্দরবানের থানচি উপজেলার অন্তর্গত নাইক্ষ্যাং এমন একটা জায়গার নাম যেখানে খুম দেখতেই মানুষ ছুটে যায়। পাড়ি দেয় পাহাড়ের পর পাহাড়। দিনের পর দিন দুর্গম পাহাড়ে ট্রেক করে সেই খুমে পৌঁছায়। এতো ভয়ঙ্কর পথ পাড়ি দেয়ার কথা শুনলেই অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, খুমগুলো কতটা সুন্দর? উত্তরটা বলে বা লিখে দেয়া সম্ভব না। সঠিক উত্তর মিলবে তখনই, যখন স্বশরিরে সেখানে উপস্থিত থাকা যাবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্গম ট্রেইল বলা হয় থানচির নাইক্ষ্যাং ট্রেইলকে। বহুকাল ধরে অসংখ্য প্রকৃতিপ্রেমী দুর্গম পাহাড় পেরিয়ে ছুটে এসেছে নাইক্ষ্যাং খুম দেখতে। থমকে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়েছে সবাই! মুগ্ধ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই যে কেউ হতে পারে!তবে নিজ চোখে না দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না, আমাদের দেশের এক কোনে পড়ে আছে  প্রকৃতির এমন রূপ!

একের পর একটা আদিবাসী পাড়া পার হয়ে চলেছি

গহীন অরণ্যে ঘেরা নাইক্ষ্যাং ট্রেইলে ট্রেক করা আর আমিয়াখুম, ভেলাখুম, সাতভাইখুম, নাফাখুম দর্শন করার ইচ্ছে আমার অনেকদিনের। বেশ কয়েকমাস ধরে খুলনায় অবস্থান করার কারণে দেশের অপর প্রান্তে থাকা এই ট্রেকিং আয়োজন বার বার ব্যর্থ হচ্ছিলো। এই ট্রেকিং-এ গ্রুপ দরকার হয়। তাই যখন সময় হয় তখন গ্রুপ পাই না। যখন গ্রুপ উদ্যোগ নেয় তখন ‘সময় থাকে না’ রকমের বিপত্তি পার হতে হতে গত ডিসেম্বরে সুযোগ এসেই যায়। চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন পর্যটকের উদ্যোগেই এই যাত্রা। পর পর ২ বছর তাদের সাথে নাইক্ষ্যাং ট্রেকিং প্ল্যান ভেস্তে গিয়েছিলো। তাই এবার তারাও পরিকল্পনাটা আমার জন্যই স্থির রেখেছিলো, যেন দূর থেকে যোগ দিতে আমার কোনো সমস্যা না হয়।

তিন দিনের একটি মডারেট ট্রেকিং পরিকল্পনা করা হলো, যেটা শুরু হবে ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে থেকে। গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ৯ জন। চট্টগ্রামের টিপু ভাই তার গ্রুপ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করে সব খোঁজখবর তথা জিপ, গাইড ইত্যাদি ব্যবস্থা করলেন।  যেহেতু আমি খুলনা থেকে যাচ্ছি, আমার ভ্রমন পরিকল্পনা বাকিদের থেকে ২ দিন বেশি। আমি ১৬ তারিখ বিকালে রওনা করলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। ১৭ তারিখ সকালে চট্রগ্রামে নেমে গ্রুপমেট সাজুদার আথিত্যে পুরোদিন বিশ্রাম করে সন্ধ্যায় বান্দরবানগামী বাসে উঠে পড়লাম। বাসে উঠেই পরিচয় হলো বাকি গ্রুপমেটদের সাথে। এরমধ্যে একমাত্র সাজু দা’র সঙ্গে দুবার সুন্দরবণ ভ্রমনের অভিজ্ঞতা আছে। বাকিরা এখন পর্যন্ত অপরিচিত!

পাহাড়ে কুয়াশা

পরিচিত হতে আর কত সময়! তারপর আড্ডা, গল্প, গান সেল্ফি, আর কিছুটা ঘুম সাথে নিয়ে ৮/৯ টার দিকে পৌঁছে গেলাম পার্বত্য জেলা শহর বান্দরবান। হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে আবার বেরিয়ে পড়া, কারণটা পেট-পুজো। ডিনার শেষ করে শহরের মার্কেট ঘুরে-ফিরে দেখা আর সাঙ্গুর ব্রিজে আড্ডা দিতে দিতে তখনও বুঝে উঠতে পারিনি, কি দারুণ মুগ্ধতার সাথে কাটতে যাচ্ছে সামনের দিনগুলো! হোটেলে ফিরতে জিপের ড্রাইভার এসে বলে গেলো, ভোর ৫ টায় রওনা। ট্রেকিং শুরু করার আগেই ১৮ ঘন্টার বাস জার্নি হয়ে গেছে আমার। এটা ভাবতেই যেন ঘুম পেয়ে গেল বালিশে মাথা দেবার সাথে সাথে!

ভোর ৫ টা বললে সাড়ে ৫ টা হবে। না হলে আর বাঙালী! জিপ হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে। আমরা প্রস্তুত না। তড়িঘড়ি করে প্রস্তুত হয়ে জিপে উঠে পড়লাম। জিপ সাই সাই করে এগোতে লাগলো থানচির উদ্দেশ্যে। ইচ্ছে ছিলো নীলগিরি গিয়ে সূর্যোদয় দেখা। সূর্য্য মামার গতিতে দৌড়াতে না পেরে চিম্বুক পাহাড়ের ভিউপয়েন্টে জিপ থামানো হলো। নিস্তব্ধ রাত শেষে কুয়াশায় ঢাকা সারি সারি পাহাড়গুলো সবে ভোরের আলো পেয়ে ঘুম ভেঙে উঠছে। থমকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকলাম কতক্ষণ জানি না। চোখ তার জন্য এমন সুখাদ্য পেয়ে পলক ফেলতেই ভুলে গেল যেন!

কুয়াশার চাদরে মোড়া ভোরের পাহাড়

চিম্বুকের পালা শেষ করে আবার রওনা। নীলগিরির কাছে এক রেস্টুরেন্টে থেমে নাস্তা সেরে নিলাম। নাস্তা সেরে ঢুঁ মারলাম নীলগিরিতে। পাহাড়ের চূড়া থেকে পুরো জেলাটা এক ঝলক দেখতে কার না ইচ্ছে করে! যদিও এর আগে দুবার আসা হয়েছে জায়গাটিতে। নীলগিরি যেন প্রকৃতির এক অনন্য দান। নীলগিরির চূড়া থেকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় কেওক্রাডং, প্রাকৃতিক আশ্চর্য বগালেক, কক্সবাজারের সমুদ্র, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের আলো-আঁধারি বাতি এবং চোখ জুড়ানো পাহাড়ের সারিও দেখা যায়। নীলগিরির রাতের সৌন্দর্য আরো হতবাক করে। চারিদিকের হরিণ, শিয়ালসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর ডাক আর পাহাড়গুলোর আলো-আঁধারির খেলা দেখে আপনার জীবনকেই যেন রহস্যময় বলে মনে হবে। যারা এডভেঞ্চার পছন্দ করেন তাদের জন্য রাতের নীলগিরি হতে পারে উৎকৃষ্ট স্থান।

যারা শুধু নীলগিরি ভ্রমণে আসবেন তাদের জেনে রাখা ভালো, নীলগিরির কাছাকাছি রয়েছে বেশ কয়েকটি ম্রো উপজাতীয় গ্রাম। নীলগিরির একদম কাছে কাপ্রু পাড়া, আপনি সহজেই পরিদর্শন করে ম্রো আদিবাসী সম্পর্কে জানতে পারবেন। নীলগিরিতে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প। ফলে এখানে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই। আপনার যে কোনো প্রয়োজনে সেনা সদস্যরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে।

নীলগিরির একাংশ

নীলিগিরি দর্শনের পর আমাদের যাত্রা আবারো শুরু হলো। এক অসাধারণ সৌন্দর্যের নাম হলো বান্দরবান টু থানচি রোড। এঁকেবেঁকে উঁচু-নিচু হয়ে সাই সাই করে এগোতে থাকে আমাদের জিপ। সবুজ পাহাড়ের সারির বুক চিরে সাপের মতো এগিয়ে গেছে পিচ ঢালা রোড। একেকটা বাঁক দেখে আমরা যতো শিহরিত হই না কেন, ড্রাইভার তার ‘বা হাতের খেল’ ঠিক করেই গতিতে টানতে থাকে গাড়ি। পথে বিজিবি চেকপোস্টে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে চারপাশে পাহাড়ের সারি দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম সীমান্ত উপজেলা থানচি।

পৌঁছে দেখা হলো আমাদের গাইড হাসানের সাথে। ফ্রেশ হয়ে চা পর্ব সারতে সারতে আরেকদফা ট্রেকিং-এর অনুমতি নেয়ার কাগজপত্র প্রস্তুত করা হলো। বিজিবির অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সাঙ্গু নদীর দিকে যেখানে অপেক্ষা করছে বোট, যা আমাদের নিয়ে যাবে পদ্মমুখ। এরমাঝে সবাই প্রিয়জনদের সাাথে ফোনালাপ সেরে নিচ্ছে। কারণ কিছুক্ষণ পরেই হারিয়ে যেতে হবে সেলুলার নেটওয়ার্কের ঝঞ্ঝাটহীন এক বিস্ময়কর জগতে।

রেমাক্রির পথে

শীতকাল হবার কারণে সাঙ্গু নদীতে পানি অনেক কম ছিলো। মনে হলো পানি কম থাকলেই সাঙ্গুর সৌন্দর্য ঠিকঠাক ফুটে ওঠে। ৫ জন করে ২ টা নৌকাতে চেপে বসতেই দেখলাম থানচির বড় ব্রীজটা দূরে সরে যাচ্ছে দ্রুত। আধঘন্টা পর আমরা হাজির হলাম পদ্মমুখ। বোট ছেড়ে শুরু হলো আমাদের নৌ-যাত্রা। বেলা তখন ১২ টা আর সেই যে চলা শুরু হলো আর থামেনি আগামী তিন দিনে!

ধীরে ধীরে জঙ্গলে ঢুকছি আর অনুভব করতে পারছি-এ জগৎ আমার না। আমি এখানে অনুপ্রবেশকারী। এই জগৎ অনেক বেশি বাস্তব, অনেক বেশি নিবিড়। এই প্রকৃতি অনেক বেশি প্রাকৃতিক। এটা ইট-কাঠের মিথ্যে জগৎ না। এটা পাহাড়, ঝিরি আর সবুজ অরণ্যে ঘেরা একটা সত্যি জগৎ। মুগ্ধ হয়ে গায়ে মেখে নিচ্ছি বন্য নিস্তব্ধতা আর এগিয়ে চলেছি আমাদের আগামী ২ রাতের ঠিকানা থুইসাপাড়ার দিকে। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর প্রথম যে পাড়াটা, সেটার নাম রেনাজুন পাড়া। এখানে প্রায় প্রতি পাড়াতেই রয়েছে ছোট-খাটো দোকান। দোকান থেকে ডিম, পাহাড়ী কলা আর চা খেয়ে কিছুটা চাঙ্গা হয়ে আবার চলা শুরু। একের পর এক ঝিরিপথ আর পাহাড় পেরিয়ে বেলা ৩ টার দিকে আমরা পৌঁছলাম হরিশ্চন্দ্র পাড়া।

অনুষ্ঠান জাতীয় কিছু একটা হচ্ছে দেখে এগিয়ে গিয়ে বুঝলাম, একজন ব্যক্তির শেষকৃত্যের উদ্দেশ্যে এই লোকসমাগম। পাহাড়ী আদীবাসীদের নিজস্ব রীতির এই অনুষ্ঠানের সাক্ষী হয়ে আর হাল্কা নাস্তা করে আবারো বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যা হবার আগে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে যে! ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে চলেছি, কিন্তু পথ শেষ হয় না।

পাহাড়ী পথে

বিকেল ৫ টার সময় আমরা যেখানে এসে পৌঁছলাম সেটার নাম নতুন পাড়া। ততক্ষণে পা আর কথা শুনছে না। গিয়ে বসে পড়লাম একটা দোকানে। তখনও একটা পাহাড় ডিঙানো বাকি। কিন্তু যেন শরীর থেকে সব কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছি। এদিকে আকাশে মেঘ জমেছে। যদি বৃষ্টি হয় তাহলে পাহাড়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে উঠবে। আশঙ্কা সত্যি করতে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো! তড়িঘড়ি করে কিছু নাস্তা করে আবারো বেরিয়ে পড়লাম, তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। দূরে আবছা থুইসা পাড়া দেখা যাচ্ছে। বুঝলাম রাতেও ট্রেক করা কপালে লেখা আছে!

শীতের দিনে অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে দেরি হলো না। ব্যাগ থেকে টর্চ বের করে নিতে হলো। পিঠে ৬-৭ কেজির ব্যাগপ্যাক। এক হাতে সারাদিনের সঙ্গী লাঠি আরেক হাতে টর্চ নিয়ে পাথরের ভেতরে পথ খুঁজে পা ফেলে ফেলে লাইন ধরে এগিয়ে চলাটা কেমন তা শুধু সেই মুহুর্তেই বোঝা সম্ভব। সেই সঙ্গে বৃষ্টি তো আছেই। ভয়টা হলো বৃষ্টি যদি বেশি হয় তবে এই অন্ধকারে পাহাড়ে ওঠা কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না। হয় পাড়ার লোক এসে কোমরে দড়ি বেঁধে টেনে তুলবে নয়তো ওখানে নিচে দাঁড়িয়ে ভিজতে হবে সারারাত।

থুইসাপাড়ায় ভোর

কিন্তু বৃষ্টি বাঁধ সাধলো না তেমন। দীর্ঘ সাড়ে ৬ ঘন্টায় প্রায় ১৪ কিলোমিটার পথ ঝিরিপথ আর পাহাড় বেয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম থুইসা পাড়ায়। কিছু একটা জয় করে ফেলেছি মতো মনের ভাব হলো। পাড়ার লোকজন, সোলার লাইটের আলো এসব দেখে মনে হলো যেন এ যাত্রা বেঁচে গেছি। আমাদের জন্য বরাদ্দ করা টং ঘর দেখিয়ে দিলো আমাদের গাইড।

আমাদের ৯ জনের জন্য যথেষ্ট বড় একটা ঘর আর অনেকগুলো বালিশ আর কম্বল রাখা আছে আগে থেকেই। এরপর আর কি! সবাই ফ্রেশ হয়ে নিয়ে খাওয়া পর্ব। এমন একটা দিন শেষে যাই খাওয়া হোক না কেন, অমৃতই লাগে।  রাতে বেশ বৃষ্টি শুরু হলো। পরদিন আমাদের কাঙ্খিত নাইক্ষ্যাং ট্রেইলে ট্রেকিং। মাঝে পড়বে দেবতার পাহাড় যা এমনিতেই পাড়ি দেয়া দুঃসাধ্য, আর যদি বৃষ্টি হয় তবে অসম্ভব প্রায়। গাইড বললো, যদি ভোর রাত্রে বৃষ্টি হয় তবে ভুলে যান নাক্ষিয়ং! সারাদিন এখানে বসেই কাটাতে হবে। তারমধ্যে আরো যোগ করে বললো, ‘বৃষ্টির মধ্যে দেবতার পাহাড় পাড়ি দিতে চাইলে গ্রুপের ২-১ জনের না ফেরারও সম্ভাবনা রয়েছে!’ এসব আশঙ্কা মাথায় নিয়ে শুতে গেলাম। এবং সঙ্গে সঙ্গেই তলিয়ে গেলাম ঘুমের রাজ্যে। (বাকী অংশ আগামীকাল)

ডেইলিবাংলাদেশ/এনকে