স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের আহাজারিতে চাপা পড়ছে সমুদ্রের গর্জন

ঢাকা, রোববার   ৩১ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪২৭,   ০৭ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের আহাজারিতে চাপা পড়ছে সমুদ্রের গর্জন

 প্রকাশিত: ০৯:১৫ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭   আপডেট: ০৯:১৫ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

প্রাণ বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে ছোট নৌকায় করে পরিবারের ৭ সদস্যের সঙ্গে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছিলেন রোহিঙ্গা নারী রহিমা বেগম। মোট ৩৫ জন শরণার্থী ছিলেন ওই ছোট নৌকায়। যাদের সকলের বাড়ি মিয়ানমারের মংডু শহরের হাসুরাতা গ্রামে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস পুরো পরিবারকে নিয়ে আর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে পারেননি রহিমা বেগম। নৌকা ডুবিতে তার সঙ্গে সাঁতারিয়ে কূলে উঠতে পেরেছেন মেঝ ছেলে বশির উলাহ। অন্য সদস্যরা নৌকা ডুবিতে নিখোঁজ রয়েছেন। তার সঙ্গে ছিলেন-স্বামী রবি আলম, মেয়ে হামিদা, রুবিনা বেগম, ছোট ছেলে রশিদ উলাহ, তার মা নুর জাহান এবং মেঝ ছেলে বশির উলাহ। তিনি ও মেঝ ছেলে ছাড়া তার পরিবারের ৫ জনের এখন পর্যন্ত কারও মৃত দেহ পাওয়া যায়নি।

পরিবারের ৫ জন সদস্যকে হারিয়ে রহিমা বেগম আহাজারিতে শুধু স্বামী, ছেলে-মেয়ে ও মা হারানোর কথা বার বার বলছেন। এখন কার আশায় বাংলাদেশে থাকবেন বলে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

সরেজমিনে শাহপরীর দ্বীপ ঘোলার চরে গিয়ে দেখা যায়, সমুদ্রসৈকতে জোয়ারের গর্জনের সঙ্গে দূর থেকে একনারীর বিলাপের ধ্বনি ভেসে আসছে। একটু সামনে যেতেই দেখা গেল ভেজা কাপড়ে ও কোলে আনুমানিক ৫ বছর বয়সের এক শিশুকে কোলে নিয়ে সৈকতে হেঁটে হেঁটে বিলাপ করছেন রহিমা বেগম। আর বলছেন, ‘এ রকম হবে আগে জানলে সবাইকে নিয়ে গ্রামে থেকে যেতাম। এ কষ্ট আমি এখন রাখব কোথায়?’

নৌকা ডুবির ঘটনায় স্বজন হারানোর বেদনায় মিয়ানমারের বিভিন্ন গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা জীবিত উদ্ধার লোকজনের আহাজারি থামছে না কিছুতেই। চোখের কান্না যেন থামছে না। শুধু সৈকতে ছোটাছুটি করছেন নিখোঁজদের পাওয়ার আশায়।

একই এলাকা থেকে পালিয়ে আসা নারী মোহছেনা বেগমের কোলে ৬ বছরের শিশু নুর হোসেন। নৌকা ডুবিতে তার ৩ বছরের মেয়ে সাহারা খাতুন নিখোঁজ রয়েছে। মেয়ের খোঁজে শাহপরীর দ্বীপ ঘোলারচরের সৈকতে ছেলেকে কোলে নিয়ে পাগলের মতো আহাজারি করছেন তিনি। কিছুতেই থামছে না তার কান্না। মোহছেনা বেগম বিলাপ করে বলছেন, ‘এখন কোথায় যাবো, মা বলে ডাকবে কে।’

তিনি বলেন, ‘গত বছরের অক্টোবর মাসে সেনাবাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর থেকে অদ্যবধি স্বামী কাদের হোসেন নিখোঁজ রয়েছেন। এরপর এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কোনওভাবে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সহিংসতা থেকে বাঁচতে গত মঙ্গলবার রাতে গ্রামের লোকজনের সঙ্গে পালিয়ে আসার সময় নৌকায় উঠি। কিন্তু সেই নৌকাটি ডুবে গেলে মেয়ে সাহারা খাতুন নিখোঁজ হয়।’

মিয়ানমারের মংনিপাড়া থেকে আসা আরেকটি পরিবারের ৩ বোন ও এক ভাই। বোন জুলেখা বেগম, জমিলা বেগম, আয়েশা বেগম ও সাইফুল ইসলামকে দেখা গেল আহাজারি করতে। তাদের মা ছেনুয়ারা বেগম নৌকা ডুবিতে নিখোঁজ রয়েছেন। ৩ বোন ও এক ভাইয়ের আহাজারিতে সৈকত এলাকার আকাশ-বাতাসও কান্নাকাটি করছে। তাদের বাবা কবির আহমদ ২বছর আগে অসুস্থ হয়ে মারা যান।

তারা বলেন, ‘যুবতী ২ বোন থাকায় সবসময় সেনা ও নাডালা বাহিনীর আতঙ্কে ছিলাম।’

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাইন উদ্দিন খান বলেন, ‘গত ৩০ আগস্ট থেকে ছোট ছোট নৌকায় ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী নিয়ে আসায় নাফনদী ও সাগরে নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটছে। এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক লাশ উদ্ধার হয়েছে।’

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ