Alexa স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতির আখড়া আশাশুনি সরকারি কলেজ

ঢাকা, রোববার   ২১ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৬ ১৪২৬,   ১৭ জ্বিলকদ ১৪৪০

স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতির আখড়া আশাশুনি সরকারি কলেজ

 প্রকাশিত: ২১:০৩ ২২ অক্টোবর ২০১৭  

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: স্বজনপ্রীতি, অনিয়োম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে সাতক্ষীরার আশাশুনি সরকারি কলেজ। কলেজটি জাতীয় করণ ঘোষণা করার পর অধ্যক্ষ মো. রুহুল আমিন নিজেই স্বজনপ্রীতি, অনিয়োম ও দুর্নীতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নিয়োমনীতির তোয়াক্কা না করে দিনে পর দিন অনিয়োম করে প্রায় ২ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন কলেজ অধ্যক্ষ মো. রুহুল আমিন। নিজের ১৫ জন আত্মীয়সহ নিয়োগ দিয়েছেন প্রায় ৬১ জন শিক্ষক-কর্মচারী। ৯ জন প্রভাষকই কর্মরত আছেন অন্যান্য সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। এ বিষয়ে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী জানায়, আশাশুনি ডিগ্রী কলেজের (বর্তমান সরকারি কলেজ) যোগদানের পর থেকে অধ্যক্ষ মো. রুহুল আমিন নিজের আত্মীয়-স্বজনসহ প্রায় ৬১ জন শিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। অধ্যক্ষ মো. রুহুল আমিনের নিয়োগপ্রাপ্ত আত্মীয়-স্বজনেরা হলেন- তার ছেলে ইংরাজী বিভাগের শিক্ষক মো. প্রিন্স, নিজের শ্যালক অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক তরিকুল ইসলাম, মামাতো ভাই বাংলা বিভাগের শাহাদাৎ হোসেন টিটল, শালীকা অফিস সহকারী তাছলিমা খাতুন, ভাগ্নে পিয়ন রবিউল ইসলাম, ভাগ্নি সমাজ বিজ্ঞানের সিরাতুন্নেছা, চাচাতো শ্যালক উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের মোকলেছুর রহমান, মামাতো বোন ব্যবস্থাপন বিভাগের তাহেরা নার্গিস, ফুফাতো শ্যালক অফিস সহকারী শফিকুল ইসলাম, মামাতো শ্যালক পিয়ন শফিকুল ইসলাম, নিজের বড় শ্যালকের শ্যালক ল্যাব সহকারী আবু মুছা পাড়, ছোট ভাইয়ের শালীকা ইসলামের ইতিহাসের শিরিন বাহার, নিকটতম আত্মীয় ইসলামের ইতিহাসের উম্মে হাবিবা নাসরিন, ধর্ম কণ্যা বাংলার ছন্দা রাণী ও ধর্ম ভাই নৈশপ্রহরী আব্দুল খালেক।

র্দীঘ দিন অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব থাকার সুযোগ নিয়ে কলেজ জাতীয় করণ হবে এমন ঘোষণা দিয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়ে নিয়োগ দিয়েছেন। পরবর্তিতে কলেজ জাতীয়করণ করা হলে জাতীয়করণে নাম পাঠানোর নাম করে আরও এক দফা টাকা নিয়েছেন অধ্যক্ষ মো. রুহুল আমিন। সব মিলিয়ে কলেজ অধ্যক্ষ মো. রুহুল আমিন প্রায় দুই কোটি টাকা নিয়েছেন এসব প্রার্থীদের কাছ থেকে।

অপরদিকে, আশাশুনি ডিগ্রী কলেজ জাতীয় করণ করা হয়েছে তাই সুযোগ টা হাতছাড়া করতে চাননি অনেকেই। তাই অনেকেই অন্যান্য সরকারি বে-সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকেও আশাশুনি সরকারি কলেজের প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সরকারি ও বে-সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন এমন ৯ জন ব্যক্তির চাকুরী জাতীয়করণ করতে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে নাম প্রেরণ করেছেন অধ্যক্ষ মো. রুহুল আমিন। এর মধ্যে একজন ইউপি সচিব, দুইজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কয়েকজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কয়েকজন কলেজের শিক্ষক রয়েছে।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকেও আশাশুনি সরকারি কলেজেও কর্মরত এসব ব্যক্তিরা হলেন- আশাশুনির বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব খায়রুল ইসলাম একই সাথে আশাশুনি সরকারি কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। আশাশুনির দয়ারঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত মানবিকা রায় আশাশুনি সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত উম্মে হাবিবা নাসরিন আশাশুনি সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। আশাশুনি বালিকা বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক বিদ্যুৎ বরণ মন্ডল আশাশুনি সরকারি কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। বড়দল কলেজিয়েট স্কুলে কর্মরত শিবপদ সরকার আশাশুনি সরকারি কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। আশাশুনি এপিএস কলেজে কর্মরত বিকাশ চন্দ্র আশাশুনি সরকারি কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। নলতা হাই স্কুলের বিকাশ চন্দ্র আশাশুনি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। গাভা কলেজের প্রবীর মন্ডল আশাশুনি সরকারি কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্তরত আছেন। সাতক্ষীরা নবজীবনে কর্মরত ছন্দা রাণী আশাশুনি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র উপেক্ষা করে এসব ব্যক্তিরা একই সাথে দুটি প্রতিষ্ঠানে হাজিরা দিয়ে যাচ্ছেন।

আশাশুনি সরকারি কলেজ সূত্রে জানা যায়, আশাশুনি সরকারি কলেজ ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সালের ৯ জানুয়ারি কলেজটি জাতীয় করণ করা হয়। এখানে শিক্ষক-কর্মচারী ১০৩ জন। বর্তমানে এখানে এইচএসসি, ডিগ্রি ও আটটি বিভাগে অনার্স কোর্স চালু আছে। সব মিলিয়ে এখানে দুই হাজারের অধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে। অনার্স বিষয় সমূহ- বাংলা, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, দর্শন, ব্যবস্থাপনা, ইসলামের ইতিহাস, ইসলাম শিক্ষা, অর্থনীতি ও সমাজ বিজ্ঞান। এসব বিভাগে সাত জন করে শিক্ষক কর্মরত রয়েছে।

এদিকে, কলেজ অধ্যক্ষ রুহুল আমিনের চাকুরী চলতি বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর শেষ হলেও আজও পর্যন্ত তিনি কর্মরত আছে। জাতীয় করণের সময় এক আদেশে তাকে পরবর্তি নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অফিস ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অফিস ইনচার্জের সুযোগ নিয়ে তিনি এসব প্রার্থীদের চাকুরী জাতীয় করণ করতে মন্ত্রণালয়ে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।

একাধিক স্থানে চাকুরী করার বিষয়ে আশাশুনির কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সাথে কথা বললে তারা বলেন, একই সাথে দুটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার কোন সুযোগ নাই। উভয় প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল সময় একই। অফিস সময়ে দুটি প্রতিষ্ঠানে একই সাথে হাজিরা দেওয়া যায় না। তাছাড়া এটি নীতিমালা বিরোধী। যদি কেউ সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকে তাহলে তদন্ত করলে তাদের দুই প্রতিষ্ঠানেরই চাকুরী চলে যাওয়ার কথা।

একই সাথে দুই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার কথা স্বীকার করে আশাশুনি সরকারি কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত থাকা বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব খায়রুল ইসলাম বলেন, আশাশুনি কলেজে আমার চাকুরী এখনো এমপিও হয় নাই। তাই দুই প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করলে কোন সমস্যা নাই।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত দুই শিক্ষকের বিষয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. অহিদুল আলাম বলেন, যদি কোন শিক্ষাক দুই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকে তাহলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে তার চাকুরী যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

আশাশুনি সরকারি কলেজের অফিস ইনচার্জ অধ্যক্ষ মো. রুহুল আমিন আর্থিক দেল-দেনের বিষয় অস্বীকার করলেও কলেজ ১৫ জনের মত আত্মীয়-স্বজন আছে বলে স্বীকার করেন। এছাড়াও তিনি দুই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা শিক্ষকদের কথা স্বীকার করে বলেন, কলেজের বিভাগ বাচাঁনোর স্বার্থে অনেকের নাম দিতে হয়, তাই দেওয়া হয়েছে। এদের এখনো এমপিও হয়নি। পরবর্তিতে এরা বাদ যাবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরকে/বিবি/এসআই