Alexa ‘স্টার সানডে’র টাকার জন্য গারো মা-মেয়ে হত্যা

ঢাকা, বুধবার   ১৭ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ২ ১৪২৬,   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪০

‘স্টার সানডে’র টাকার জন্য গারো মা-মেয়ে হত্যা

 প্রকাশিত: ১৯:০৪ ২২ মার্চ ২০১৮   আপডেট: ১৯:৩০ ২২ মার্চ ২০১৮

রাজধানীর গুলশানের কালাচাঁদপুরে তুচ্ছ কারণে গারো মা-মেয়েকে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করেছে মূল হোতা সঞ্জিব চিরান।

নিহত সুজাতের বোনের ছেলে সঞ্জিব চিরান (২১) ও তার সহযোগি তিন বন্ধু রাজু সাংমা ওরফে রাসেল (২৪), প্রবীন সাংমা (১৯) এবং শুভ চিসিম ওরফে শান্তকে বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শেরপুরের নালিতাবাড়ি থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১।

গ্রেফতারের পর র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে স্টার সানডে উদযাপনের টাকার জন্যই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে স্বীকার করেছে তারা। কিভাবে মা-মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে সে বর্ণনাও দিয়েছে সঞ্জিব চিরানসহ চারজন। হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ২০ মার্চ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গুলশানের কালাচাঁদপুরের শিশু মালঞ্চ স্কুল রোডের ক-৫৮/২ নম্বর বাড়িতে গারো মা বেছেথ চিরান (৬৫) ও তার মেয়ে সুজাতা চিরানকে (৪০) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

র‌্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-১ এর অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল সারওয়ার-বনি-কাশেম ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডের পর র‌্যাব-১ ছায়া তদন্তে নামে। বুধবার গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, জড়িতরা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তারা শেরপুরের নালিতাবাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করে আছে। সূত্রের তথ্য ধরে তাৎক্ষনিক বিশেষ অভিযান চালিয়ে নালিতাবাড়ি থেকে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার হওয়া আসামীরা স্বীকার করেছে কেন ও কিভাবে তার নির্মম হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। মূলত ‘স্টার সানডে’ উদযাপনের টাকার জন্যই সঞ্জিব তার বন্ধুদের নিয়ে নানী ও খালাকে হত্যা করে।

র‌্যাব অধিনায়ক বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামীরা জানায় ঘটনার এক মাস আগে শেরপুরের ঝিনাইগাতিতে বসে সঞ্জিব, শান্ত ও প্রবীন মিলে পরিকল্পনা করে, সঞ্জিবের খালা সুজাতার বাসা থেকে টাকা চুরি করে ‘স্টার সানডে’ উদযাপন করবে। তাদের ধারণা ছিল যেহেতু ওই বাসার সবাই চাকরি করে, সে কারণে সুজাতার কাছে নিশ্চয়ই ৫/৬ লাখ টাকা জমানো আছে। আর বাসায় যেহেতেু সঞ্জিবের বৃদ্ধ নানী বেছেথ চিরান একা থাকেন, সেহেতু তাকে ম্যানেজ করা কঠিন হবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯ মার্চ (সোমবার) তারা ঢাকায় এসে, কুড়িলে বন্ধু রাজুর কাছে আসে। রাজুর সেদিন রাতে ডিউটি থাকায়, তারা রাজুর এক বন্ধুর বাসায় রাত কাটান।

র‌্যাব জানায় পরদিন সকালে তারা রাজুর সঙ্গে দেখা করে,পরিকল্পনার কথা জানায়। তারা জানত রাজুর কাছে একটি ধারালো ছোরা আছে। ওই সময় সঞ্জিব রাজুর ছোরাটি চেয়ে নেয়। তারপর সকাল ৯টার দিকে রাজুসহ তারা সবাই সঞ্জিবের খালা নিহত সুজাতা চিরানের বাসায় যায়। কিন্তু ওই বাসায় তখন বৃদ্ধ বেছেথ চিরান ও সুজাতার মেয়ে মায়াবী থাকায়, কিছুক্ষন অপেক্ষা করে চলে যায়। কারণ বাসায় তিনজনকে সামলে রেখে চুরি সম্ভব নয়।

সেদিন ৫/৬ ঘণ্টা কালাচাঁদপুরে ঘোরাঘুরি করে তারা ফেরত যায়। পরে ঘটনার দিন (২০ মার্চ, মঙ্গলবার) বিকেল তিনটার দিকে তারা ৮ জন আবারো সুজাতে বাসায় যায়। কিন্তু তখন সুজাতের মেয়ে মায়াবী তার এক বছরের মেয়েসহ বাসায় থাকায়, আবারো ব্যর্থ হয় তারা। সুজাতা তাদের চা-নাস্তা দেন। এ সময় সঞ্জিব খালা সুজাতাকে দু’শ টাকা দিয়ে দেশী ‘চু’ আনার জন্য বলে। সুজাতা মদ নিয়ে আসলে, তারা সবাই মদ পান করতে থাকে। এরইমধ্যে এক সময় মায়াবী তার কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য বের হয়ে যায়।

পরিকল্পনামতে সুজাতাকে তারা বেশী মদ পান করায়। তিনি নেশাগ্রস্ত হলে, কাজে নামবে। কিন্তু আবার বাঁধা! সঞ্জিবের নানী বেছেথ বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বাসায় আসেন। তাদের পরিকল্পনা বাঁধাগ্রস্থ হওয়ায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। এমনিতে সবাই নেশাগ্রস্ত। এক পর্যায়ে রাজু ও শান্ত খাটের ওপর বসে থাকা বৃদ্ধা বেছেথের পা ঝাপটে ধরে আর শান্ত তার মুখ বালিশ চেপে ধরে। তখন সঞ্জিব ওড়না দিয়ে তার নানী বেছেথের গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে।

পরে তারা সুজাতাকেও হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রবীনকে নিচে পাঠায় বাড়ির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করতে। সুজাতা বেশী নেশাগ্রস্ত হয়ে খাটে শুয়ে ছিলেন। প্রথম রাজু সুজাতার মুখের ওপর বালিশ চাপা দেয়। সঞ্জিব তখন সুজাতার দু’পায়ের ওপর চেপে বসে ছুরি দিয়ে সুজাতার পাজরে আঘাত করে। এ সময় শান্ত ওই বাসার রান্না ঘর থেকে একটি ছোরা নিয়ে সুজাতার গলায় আঘাতের চেষ্টা করে। কিন্তু ওই ছুরি কম ধারালো হওয়ায় সঞ্জিব তার হাতে থাকা ছুরি দিয়েই সুজাতার গলায় আঘাত করতে থাকে।

পরে আসাসিরা ওই বাসায় অনেক খোঁজাখুজি করে কোনো টাকা-পয়সা পায়নি। পরে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে হত্যাকারীরা ওই বাসা ছেড়ে চলে যায়। যাওয়ার আগে বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দরজার বন্ধ করে পালিয়ে যায়।

নিচে এসে প্রবীণকে নিয়ে শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড হয়ে বাসে চড়ে আব্দুল্লাহপুর যায়। পরে আবুদল্লাহপুর থেকে বাসে করে শেরপুরের নালিতাবাড়ি চলে যায়। ঢাকা ছাড়ার সময় আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডে কাউন্টারের পেছনে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি ফেলে দেয়। 

ওই বাসায় নিহতরা ছাড়াও সুজাতার স্বামী হাশিষ মানচিন, তার দুই মেয়ে মায়াবী, সুরভী ও মায়াবীর ১ বছরের মেয়ে থাকত। আর মেয়ে মায়াবীর স্বামী পেলেস্তা সপ্তাহে দু’একদিন কর্মস্থল থেকে এসে থাকতেন। কিন্তু ঘটনার সময় বাসার সবাই বাইরে নিজ নিজ কর্মস্থলে ছিল। সন্ধ্যায় মায়াবীর স্বামী এসে বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগানো দেখে বাসায় ঢুকে খাটে বেছেথ চিরান ও খাটের নিচে সুজাতার রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান। তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়া ঘাটে।

এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানান র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল সারওয়ার-বনি-কাশেম।

ডেইলি বাংলাদেশ/এলকে/এমআরকে