সৌদি আরবের নিষিদ্ধ-অবৈধ সংগীতের দোকান

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৩ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ৯ ১৪২৬,   ১৮ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

সৌদি আরবের নিষিদ্ধ-অবৈধ সংগীতের দোকান

 প্রকাশিত: ১২:৪০ ৭ জুন ২০১৮   আপডেট: ১২:৪১ ৭ জুন ২০১৮

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

আরওয়া হায়দার সৌদিতে পাড়ি জমান যখন তার বয়স ছিল মাত্র তেরো বছর। আসলে যেখানে “সঙ্গীত’ শব্দটা শুনলেই মানুষ ভ্রূ কুঁচকে ফেলে সেখানে একজন কিশোরের পপ সঙ্গীতের ভক্ত হওয়াটা যে কেমন ছিল তারই স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন তিনি। সৌদির পুরোনো এই দোকানগুলো থেকে নিদারুন যদি কিছু হারিয়ে যেতে থাকে তবে তা হলো অপ্রতিরোধ্য আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করা দুর্ধর্ষ সেই সংগীতের সম্মোহনীর চোরাই কারবারীরা। আর সৌদী আরবের পাইরেটেড ওই ক্যাসেটগুলো প্রমান করে যে, সংগীত কে অনুমানের সীমারেখায় বেধে দেয়া যায়না। এবং সঙ্গীত তথা মিউজিক হচ্ছে অদম্য জীবনীশক্তি, যে জীবনীশক্তির সুধা পান করে সবাই অমৃতের মতোই। অতীব বৈচিত্র্যময়, এমনকি সবথেকে কঠিন পরিস্থিতিতেও।

২০১৭ সালের শেষ দিকে, মার্কিন হিপ হপ তারকা নেলি সৌদি আরবের জেদ্দায় শুধুমাত্র পুরুষদের জন্যই একটা কনসার্ট করে গিয়েছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই আরেক কান্ট্রি সিঙ্গার ঠিক একই বছরে একই রকমের একটা শিরোনামে এসেছিলেন। উপসাগরীয় অঞ্চলেরই কঠোর বিধিমালা অনুসরণ করে এমন কোনো দেশে যেখানে সংগীত শব্দটাকেই হারাম বলে অভিহিত করা হয়েছিল সেখানে এই শো, কনসার্ট গুলোকেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমন কিছু সত্যিকার অর্থেই অবাস্তব যে, যেখানে নেলির মতো একজন শিল্পী কনসার্ট জমিয়ে তুলছেন, দর্শকদের মাতিয়ে তুলছেন সেখানে নারীরাই পুরোপুরি নিষিদ্ধ। সত্যি বলতে পপ সংস্কৃতি মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরেই রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল এবং বিংশ শতাব্দীর নব্বই এর দশকে পাওয়ার হাউজে নিষিদ্ধ (বলতে গেলে সঙ্গীত নামটাই তো ওখানে নিষিদ্ধ ছিল) সঙ্গীতের ক্যাসেটের বেশ কিছু দোকান ছিল, যা তখনকার আমলে খুজে পাওয়া একটু কষ্টসাধ্যই ছিল বটে।

১৯৮৮ সাল, শরৎকাল, আমার মা, আমার সাত বছর বয়সী বোন, আর আমি (১৩ বছ বয়সী একজন সঙ্গীত এর পাগল ভক্ত)  লন্ডন থেকে সৌদি আরবের পূর্ব প্রদেশের আল খোবারে পাড়ি জমিয়েছিলাম। আমরা আসলে বাবার কাছে গিয়েছিলাম। বাবা ওখানে স্থানীয় হাসপাতালে চাকরী করতো। আমরা তিনজন যে কি প্রত্যাশা করছিলাম সে সময় তা এক রকমের বলা মুশকিল। আমার ইরাকী বাবা-মা, দুজনেই ডাক্তার ছিলেন এবং তাদের মধ্যে কোনো ঝগড়া ঝাটি কিংবা বৈষম্যমূলক মনোভাব ছিল না, সবসময় একটা শান্তিপূর্ণ, সমান সমান আন্তরিকতা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই তা যেন মিলিয়ে গেলো বাতাসের সাথে। আমার এখনো মনে পড়ে, আমরা যেই রাতে এসে পৌছেছিলাম, অসহ্যকর তাপমাত্রা ছিল সেদিন, আসলে সৌদি আরবের গরম আর লন্ডনের তুষার বৃষ্টি, একটু অস্বস্তিতে তো পড়তেই হয়েছিল। তার উপরে আবার গনগনে ট্র্যাফিক যেন মরার উপরে খড়ার ঘা। আবার নতুন ওই মানুষগুলোর অদ্ভুত চাহুনি, মনে হচ্ছিল যেন তারা আমার পা থেকে মাথা পরখ করে নিচ্ছিল, আর অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছিল। এর সব কিছুই আমার মনে আছে। কিন্তু একটু শান্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম তখনি, যখন বাবা আমাকে কিং খালিদ স্ট্রিট এর কোন একটা ক্যাসেটের দোকানে নিয়ে যায়। আর সঙ্গীতের এই দোকানই আমার কাছে মনে হয়েছিল অভয়ারণ্য, যেন এক টুকরো স্বর্গ।

এই দোকানটা স্বভাবতই অন্য সব দোকানগুলোর মতো ছিলনা। তবে সৌদিতে থাকাকালীন সময়ে ওই দোকানে আমার ঘন ঘনই যাওয়া আসা ছিল। জালের মতো ছোট ছোট কয়েকটা ইউনিট এর সমন্বয়েই গড়ে উঠেছিল এই দোকান। একটি নামহীন দোকান। যেখানে শুধু ক্যাসেট আর ক্যাসেট, অ্যালবাম আর অ্যালবাম দিয়ে দোকানের প্রত্যেকটা তাক সাজানো ছিল।

দোকান বৈধ ছিল তবে এখানে সব রকমের আনলাইসেন্সড, অথবা নিষিদ্ধ/চোরাই সংগীতের সমাহার ছিল। রেকর্ডিংও পাওয়া যেতো।  শুধু এই দোকানই না, এ সারিতে এরকম আরো বেশ কিছু দোকানের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল এবং তারা সবথেকে সাম্প্রতিক রিলিজ হওয়া পশ্চিমা গানগুলোকে ক্যাটালগের মধ্যে অস্পষ্ট যতসব শিরোনাম বানিয়ে বিক্রি করতো। আমি আসলে পেট শপ বয়েজ ব্যান্ডের অ্যালবাম এর গানগুলো শোনার জন্য বলতে গেলে মরেই যাচ্ছিলাম। অন্তর্মুখী অর্থাৎ আপনাকে নিজেকে আত্ম বিশ্লেষণে সহায়তা করবে, কিছু ভাবনার উদ্রেক ঘটাবে, ওদের গানগুলো সচরাচর এরকমই ছিল। নতুন বাড়ি, নতুন স্কুল এবং নতুন নিয়ম। নতুন এলাকা তবে পুরোনো অভ্যেসতো আর ছাড়া যায়না। প্রথম যে টেপ তথা ক্যাসেট কিনেছিলাম, তা ছিল ইউরিথমিকস এবং ইতালো ডিস্কোর অ্যাক্টিং মেলোড্রামা।

সৌদির দোকানগুলো থেকে স্বতন্ত্র অর্থাৎ সবার থেকে আলাদা একটা গন্ধ পাওয়া যেতো। বিশেষ করে পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধ এবং মরুভূমির ধুলাবালির গন্ধ। আর ক্যাসেটগুলি উজ্জ্বল, চকচক করা তাপনিরোধী প্লাস্টিকের কেইসে মোড়ানো অবস্থায় বিক্রি হতোঃ একদম আদর্শ এক নমুনা, ভিনাইল সূর্যের তাপ শুষে নিবে এবং কম্প্যাক্ট ডিস্ক একদম ঠিক যেমন থাকার কথা তেমনি থাকবে। সৌদির নিষিদ্ধ ওসব পণ্য, একদম সুলভ মূল্যে খুবই সবস্তায় কিনতে পাওয়া যেতো। পণ্য প্রতি ১০ রিয়াল (প্রায় ১.৫০ ইউরোর মতো)  এবং যেহেতু সি ৯০ টেপে রেকর্ড করা হয়েছিল (গড় অ্যালবামের থেকে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে)। এমনকি ওই অ্যালবামগুলোর ভেতরে ওরা কিছু বোনাস ট্র্যাক ও ভরে দিত। যার ভেতরে কিছু থাকতো রিমিক্স। আর এতকিছু কোনো ব্রিটিশ দোকানে একসাথে পাওয়া আসলে কল্পনা করাও ভুল হবে।

সৌদির ওই দোকানগুলোতে কোনো কিছুরই রেকর্ড রাখা হতোনা। কতটুকু কি বিক্রি হলো না হলো এসব কিছুর জন্য ও কোনো চার্ট রাখা হতোনা। আর সঙ্গীত শিল্পীদের কোনো সম্মানি ও দেয়া হতো না। তবে একটা জিনিস ছিল চোখে পড়ার মতো, ওখানে প্রায় প্রত্যেকটা বাজার এলাকায় এবং শপিং মলগুলোতেও গড়ে উঠেছিল চোরাই এই অ্যালবামগুলোর দোকান। যেখানে কর্তৃপক্ষের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিলনা।

প্রতিদিন দোকানগুলো খোলা হতো এবং ঠিক নামাযের সময় বন্ধ করে দেয়া হতো। আযান কানে আসার সাথে সাথেই সব দোকানপাট হুর হুর করে বন্ধ হয়ে যেতো। আর ওইসব দোকানে স্বল্প ভাষী লোকগুলোকেই নিয়োগ দেয়া হতো। তবে এরা অধিকাংশ সময়েই পুরুষ গ্রাহকদের স্বাগত জানানোর জন্য যেন একটু বেশিই প্রস্তুত থাকতো এবং সচরাচর গ্রাহকেরাও নীরবতা পালন করতো। কারণ একে তো পাবলিক প্লেসে পপ মিউজিক চালানো রীতিমতো নিষিদ্ধ ছিল, তার উপরে আবার এগুলো ছিল চোরাই পথের। আসলে এসব কিছুই তাদেরকে পৌরাণিক অনুভূতি দিতে পেরেছিল। হাহাহা! তাদের লালিত অজ্ঞাত উদগ্র বাসনা। তারপরেও এই পপ সংস্কৃতি খুব দ্রুততার সাথেই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ইন্টারনেট পূর্ববর্তী যুগে, যতটা তাড়াতাড়ি না ওই মিউজিক টা পশ্চিমা বিশ্বকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

ব্রিটিশরা যে চার্ট তৈরি করতো সে অনুযায়ী বাহরাইনেও বাজানো হতো ওই গানগুলো। তবে আল খোবার যেহেতু উপকূলীয়, সেহেতু উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সবথেকে কম কঠোরতা মেনে বিধিমালা পরিচালিত হয় এই অঞ্চলে। আর এজন্যই হয়তো এখানকার মানুষ একটু বেশি সুবিধা পেতো সরাসরি সঙ্গীত পরিবেশনায় এবং সম্প্রচারে। আমি আমার লেবানন, ভারত, পাকিস্তান, সুদান ইত্যাদি দেশের ধর্ম ভীরু বান্ধবীদের সাথেঅ আলোচনা করেছিলাম।

তারা বলছে যে, ঠিক অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ওই একই ট্র্যাক পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতেও কপি হয়ে যেতো। চোরাই এই গানগুলোর জন্য থমসান নামের একটা বিখ্যাত লেবেল তৈরি হতো ইন্দোনেশিয়ায়। যা সৌদির ওই ক্যাসেট এর দোকান গুলোতে বিক্রি হতো এবং কিছু সময় অফ বিটের লিরিক্স শিট ছাড়াই।

আমি আমার ওয়াক ম্যানে  অথবা বাবার গাড়ির টেপটাতে এসিড হাউজ, হিপ হপ এসব শুনতে পেতাম। বিশ্বের অন্যদিকে কি ঘটছে না ঘটছে তাও। এমনকি আমার ছোট বোনেরও মনে হয়েছিল যে, সঙ্গীত আমাদের স্বাধীনতা নামক শব্দটির সাথে জুড়ে দিয়েছে খুব ভালোভাবেই , কিন্তু বাস্তবে আসলে আমাদের কাছে স্বাধীনতা নামক সোনার কাঠির বিন্দুমাত্র পরশ ও ছিলনা। বলা যায়, অনেকটা বদ্ধ খাচার  পাখির মতোই জীবনযাপন করেছি। যেখানে স্বাধীনতা ছিল একটা বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ। চক্রাকারে ঠিকই ঘুরেছি তবে একটা সীমার মধ্যে।

একজন প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে আমি খুবই সোভাগ্যবতী ছিলাম এজন্য যে, আমি পৃথিবীর প্রায় সব জায়গা থেকেই ক্যাসেট কিনেছি, তবে সৌদির নিষিদ্ধ ওই দোকানগুলো থেকে কেনার অভিজ্ঞতাটা একটু ভিন্নই বটে। ওখানে ক্যাসেটের জন্য আমার খুবই প্রিয় একটা দোকান ছিল (৭৪৭ লেবেল করনুকপিয়া) আল খোবার ক্রনিকের কাছাকাছিই ছিল দোকানটা। ওই দোকান থেকেই আমি সর্বপ্রথম নিউ অর্ডার টেকনিকের অ্যালবামের খোজ পেয়েছিলাম এবং রিয়াদের আউটলেটে হিজাব পড়া এই ১৩ বছরের মেয়ের দিকে মানুষের অদ্ভূত যে চাহুনি ছিল, সহজ শিকার হবার জন্য ওদিকে আর পা দেইনি।

সৌদির মেগাস্টোর, লাইসেন্সড সিডির দোকান থেকে যে কিছু কিনতাম না, এমন কিন্তু নয় বরং ওই জায়গাগুলো থেকে আরো বেশি কিনতাম। তবে আমাদের চলাফেরায় সীমা বেধে দেয়া ছিল। তবে সৌদিতে কাটানো  সময়ের শেষের দিকটাতে মেইন্সট্রিম অ্যারাবিক আর ট্রান্সআটলান্টিক অনেক শিল্পীও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে নিতে পেরেছিল। যেমন এড শেরেন।

সৌদির পুরোনো এই দোকানগুলো থেকে নিদারুন যদি কিছু হারিয়ে যেতে থাকে তবে তা হলো অপ্রতিরোধ্য আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করা দুর্ধর্ষ সেই সংগীতের সম্মোহনীর চোরাই কারবারীরা। আর সৌদী আরবের পাইরেটেড ওই ক্যাসেটগুলো প্রমান করে যে, সংগীত কে অনুমানের সীমারেখায় বেধে দেয়া যায়না এবং সঙ্গীত তথা মিউজিক হচ্ছে অদম্য জীবনীশক্তি, যে জীবনীশক্তির সুধা পান করে সবাই অমৃতের মতোই। অতীব বৈচিত্র্যময়, এমনকি সবথেকে কঠিন পরিস্থিতিতেও।

BBC অবলম্বনে

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ

 

Best Electronics