সেবার চেয়ে ‘অত্যাচার’ বেশি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

যশোর জেনারেল হাসপাতাল

সেবার চেয়ে ‘অত্যাচার’ বেশি

তবিবর রহমান, যশোর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:০২ ১২ জুন ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

২০০৬ সালে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে যাত্রা করে ‘করোনারি কেয়ার ইউনিট’ (সিসিইউ)। বহুল প্রত্যাশিত সিসিইউ এর বয়স এখন ১৩ বছর। কিন্তু গত এক যুগেও এ প্রতিষ্ঠানের কপালে ডাক্তার-নার্স ও কর্মচারী জোটেনি।সেই সঙ্গে চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকট তো রয়েছেই। তাই রোগীরা চাহিদামতো সেবা পাচ্ছেন না। বরং সেবা নিতে এসে নানা ধরণের অত্যাচারের মুখোমুখী হচ্ছেন তারা।

এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিষ্ঠান ঘিরে ছোঁ মেরে থাকে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি ও দালাল চক্র। সকাল থেকে রাত অবধি তাদের অত্যাচারে অতিষ্ট রোগী ও স্বজনরা।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিটের যাত্রা শুরু হয়। তবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছিল ২০০৯ সালে। ২৮ শয্যার করোনারিতে পুরুষ ১৫টি, নারী ৫টি, মুক্তিযোদ্ধা ২টি ও সিসিইউ ৬টি শয্যা রয়েছে।  এজন্য দুইজন সিনিয়র কনসালটেন্ট, চারজন জুনিয়র কনসালটেন্ট, আটজন জরুরি চিকিৎসা কর্মকর্তা থাকার কথা। কিন্তু সেখানে নিজস্ব কোনো চিকিৎসকই নেই। বিকল্প ব্যবস্থায় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল দিয়ে করোনারি কেয়ার ইউনিট চালু রাখা হয়েছে। বর্তমানে কর্মরত আছেন যশোর মেডিকেল কলেজের দুই জন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক, ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের দুই জন জুনিয়র কনসালটেন্ট ও পাঁচজন চিকিৎসা কর্মকর্তা। তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। করোনারি কেয়ার ইউনিটে প্রতিদিন কয়েকশ’ রোগী চিকিৎসা নেন। এরমধ্যে ভর্তিই থাকেন ৭০-৮০ জন। শুধু যশোর নয়, বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের ছয়টি জেলার রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে যা প্রয়োজন তা ভাগ্যে জোটেনি এ প্রতিষ্ঠানের। এ অবস্থায় এখানে যেনতেনভাবে সেবা দেয়া হচ্ছে। ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উজেলার অহিদুল ইসলাম ভর্তি হয়েছেন এক সপ্তাহ আগে। 

সঙ্গে থাকা মেয়ে রিনা খাতুন জানালেন, তার পিতা বেড পেয়েছেন। কিন্তু মাথার ওপর কোন ফ্যান নেই। তাই বিকল্প টেবিল ফ্যানই তাদের ভরসা। তিনি বললেন, করোনারি কেয়ার ইউনিটের যে অবস্থা যেন ইউনিটটি ‘লাইফ সাপোর্টে’ চলে গেছে! তিনি আরও বলেন, তার পিতাকে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দেয়া হয়েছিল। হাসপাতালে না থাকায় সেগুলো তারা বাইরে ক্লিনিক থেকে করিয়েছেন। 

পাশের বেডে ভর্তি যশোর শহরের আরএন রোড এলাকার শাহাজান আলী বলেন, বুকে ব্যাথা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। এখানে প্রচন্ড গরম। তার স্ত্রী আফরোজা জানান, গরমে এখানকার রোগীরা বাড়ি থেকে ফ্যান এনে ব্যবহার করছেন ঠিকই। কিন্তু টপ ফ্লোর হওয়ায় কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। তিনি বলছিলেন, ক্রিটিক্যাল রোগীর জন্য নেই কোন এসির ব্যবস্থা। গরমে সবাই হাঁসফাঁস করছে। 

শার্শার উপজেলার পাকশিয়া গ্রামের আজিজুল ইসলাম এখান থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। তিনি বলেন, এখানকার পরিবেশ মোটেও উপযোগী নয়। বাথরুম, বেসিন, বেড অপরিষ্কার থাকলেও দেখার কেউ নেই। এই অবস্থার উন্নতি দরকার।

এ ছিল ভর্তি রোগীদের কথা। আর আউট ডোরে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কষ্ট ও যন্ত্রণা আরও বেশি। বৃহস্পতিবার করোনারি কেয়ার ইউনিটের নিচতলায় কথা হচ্ছিল যশোর সদরের হাশিমপুর এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোজী সুলতানা। তিনি চিকিৎসা নিয়ে রুম থেকে বের না হতেই ঘিরে ধরে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। চিকিৎসক কী কী ওষুধ লিখেছে তা নিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তারা। অথচ ওই স্থানেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একটি নোটিশ টাঙানো রয়েছে। যাতে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের রোগীর প্রেসক্রিপশানের ছবি তুলতে নিষেধ করা হয়েছে। এদিকে, সদরের বাগেরহাট এলাকার আতিয়ার রহমান ইকো কার্ডিওগ্রাম করতে যাওয়ার জন্য বের হলে দালালরা পছন্দের ক্লিনিকে নিতে পিড়াপিড়ি করে। এক পর্যায়ে সাংবাদিকরা এগিয়ে এলে পিছু নেয় দালালরা।

সূত্রমতে, করোনারি কেয়ার ইউনিটের পূর্বশর্ত শীততাপ নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি) নষ্ট হয়ে আছে। চিকিৎসা সরঞ্জামের মধ্যে শুধু মাত্র দুটি ইসিজি মেশিন ও অক্সিজেন ছাড়া কিছু নেই। ইটিটি মেশিন, কার্ডিয়াক যন্ত্র, এনজিওগ্রাম মেশিনের মত অতিগুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন নষ্ট ও সরবরাহ না থাকায় রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। বাইরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হচ্ছে রোগীদের। করোনারিতে ৮০ টাকায় ইসিজি করা সম্ভব। সেই পরীক্ষা বাইরে ক্লিনিকে ১২০-২৫০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। ইটিটি পরীক্ষা ফি হাসপাতালে ২৫০-৭০০ টাকা পর্যন্ত। বাইরে ক্লিনিকে গুনতে হয় ১৫শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা পর্যন্ত। ইকো কার্ডিয়াক পরীক্ষা হাসপাতালে ফি ১২শ’ থেকে ১৫শ’ টাকা। বাইরে ক্লিনিকে সেই ফি ১৭শ’ থেকে ২২শ’ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। এখানে নেই কোন প্যাথলজি সুযোগ সুবিধা। অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষাও বাড়তি টাকা গুনতে হয় রোগীকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, জনবল ও যন্ত্রপাতি সঙ্কট ঠিকমেতা সেবা দিতে পারছি না। দায়িত্ব গ্রহণের পর করোনারি ইউনিটের জন্য ৭৯ পদ সৃষ্টির তালিকা পাঠিয়েছিলাম মন্ত্রণালয়ে। এরমধ্যে ৪৬টি পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সেটি আজও সৃজন হয়নি। তিনি আরও বলেন, আজ অবধি জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জনবল দিয়ে করোনারি ইউনিট চালু রাখা হয়েছে। ২৮ বেডের বিপরীতে প্রতিদিন ৭০-৮০জন রোগী ভর্তি থাকে। আর আউট ডোরে চিকিৎসা নেন প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক রোগী। এজন্য কিছু সমস্যা লেগেই রয়েছে। তবে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর