সেই প্রাণবন্ত চুয়েট আজ যেন নীরব

ঢাকা, রোববার   ০৭ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪২৭,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

সেই প্রাণবন্ত চুয়েট আজ যেন নীরব

সাঈদ চৌধুরী,চুয়েট ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৫৪ ৮ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৭:০৪ ৮ এপ্রিল ২০২০

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

শহীদ মিনার প্রাঙ্গণটা ফাঁকা পড়ে আছে, নেই কোনো আড্ডা। গোল চত্বরে বসার মতো নেই কেউ। ক্যান্টিনগুলোতে ঝুলছে তালা। কাশেম মামা কিংবা সাদ্দাম মামার দোকানে চায়ের কাপে ঝড় তোলার দৃশ্যটাও যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছে আজ।

বলছিলাম পাহাড়ের কোলঘেষে অবস্থিত চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কথা। গাছের ডালের সেই পাখিদের কলতানই যেনো রাজত্ব করছে এই ক্যাম্পাসে।

চৈত্রের শেষের সময়টায়  শিক্ষার্থীদের হৈ-হুল্লোড় কিংবা নানা আয়োজনে মেতে থাকে চুয়েট ক্যাম্পাস। ক্লাস, ল্যাব, পরীক্ষা, অ্যাসাইনম্যান্ট,  প্রজেক্টের কাজের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত থাকে নানা কাজে। কিন্তু সেই দৃশ্য হঠাৎই যেনো ম্লান করে দিয়েছে একটি মরণঘাতি ভাইরাস।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ছুটি ঘোষণা করায় ক্যাম্পাস এখন ফাঁকা। সেই সুযোগে প্রকৃতি যেন নিজের মতো সাজার চেষ্টা করেছে।

আজ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে গল্প-আড্ডায় জমে উঠা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন চত্বর আর আবাসিক হলগুলো। এখন আর নেই ক্লাস করা কিংবা লাইব্রেরিতে পড়ার তাড়া। নেই হৈ-চৈ কিংবা কোলাহল। পরিচিত চত্বরগুলো শিক্ষার্থীদের শূন্যতায় যেন যৌবন হারিয়েছে। পুরো ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে বইছে সুনশান নীরবতা। ক্যাম্পাসে প্রবেশেও নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এমন নীরব ক্যাম্পাস ও হল এর আগে কেউ দেখেনি। করোনাভাইরাসের আতঙ্কে পুরো ক্যাম্পাস এখন কোলাহলমুক্ত।

হতাশার চত্বরটা আজ নিজেই যেন হতাশ। সেখানে আর কাউকে হাটতে কিংবা সাইকেল নিয়ে চক্কর দিতে দেখা যায় না। দেখা যায় না কাউকে সেলফি তুলতে। 

চুয়েট কেন্দ্রীয় খেলার মাঠটা খা খা করছে। নেই সেখানে কোনো ফুটবল, ক্রিকেট খেলার সেই চিরচেনা দৃশ্য। 

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চুয়েট ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে। এই কয়েকদিনে ক্যাম্পাসটা কী সুন্দরই না হয়েছে! গাছে গাছে কচিপাতা। চারদিকে কেবল পাখিদের কিচিরমিচির শব্দই শোনা যায়।

আবাসিক হলগুলোর সামনে গাদা, সূর্যমুখীসহ নানা ফুল ফুটে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সৃষ্টি করলেও তা উপভোগ করার মত কেউ নেই। বঙ্গবন্ধু হল ও শহীদ মোহাম্মদ শাহ হল সংলগ্ন পুকুরের চারিদিকটা আজ নীরবে পরে আছে।

রুটিনমাফিক চলা নিত্যদিনের সঙ্গী পদ্মা, ইছামতি, রুপসা, গোমতি, হালদা, মেঘনা, মাতামুহুরি, সাঙ্গু, বুড়িগঙ্গা, তিস্তা, যমুনা কিংবা সুরমা নামের সেই বাসগুলোকে মিস করছে চুয়েটের প্রত্যেক শিক্ষার্থী। গোলচত্বরে সেই চুয়েট বাসের সারির দৃশ্য আজ আর চোখে পড়ে না। 

ছোটাছুটি, উড়োউড়ি, খুনসুটি আর মনের সুখে পাখিগুলো সাঁতারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে চুয়েট লেকে। লেকের ধারে বসার জায়গাগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। নেই আর সেখানকার আড্ডা।

শহীদ মিনারের পাশে পদ্মপুকুরে পদ্মফুল ফুটে তার সৌন্দর্য প্রদর্শন করছে। পদ্মপুকুরের ধারে বসে সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করছে যেন প্রকৃতি নিজেই।

অডিটোরিয়াম, গোলচত্বর, নবনির্মিত ক্যাফেটেরিয়া প্রাঙ্গণ কিংবা শহীদ মিনারে আর নেই জয়ধ্বনি। নেই সংগঠনগুলোর কোনো সমাবেশ।

ক্যাম্পাসের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের ভূমিকায় নানান ফুলের গাছগুলো সবার নজর কাড়ে এ সময়। প্রতিবছর এই সময়েই চাষ করা হয় সূর্যমুখী, গাঁদা, গোলাপসহ নানা ফুল। সূর্যমুখীগুলো মাথা উঁকি দিয়ে দাঁড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে সৌন্দর্য উপভোগ করার কেউ নেই। কেউ আজ বাগানের পাশ দিয়ে হেটে যায়নি।

শাহরিয়ার নিলয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের '১৭ আবর্তের শিক্ষার্থী। অনুভূতি প্রকাশ করে ডেইলি বাংলাদেশকে জানালেন, সকালে তড়িঘড়ি করে ঘুম থেকে উঠেই ক্লাস, তারপর সেই ফাঁকে গিয়ে এককাপ চা, আবার ক্লাস করেই সেই চিরচেনা মুখগুলোর সঙ্গে একসাথে দুপুরে খাওয়া। একি মায়া! ল্যাব করে কখনো কখনো আবার সবাই মিলে কাশেম ভাইয়ের দোকানের সামনে কিংবা বন্ধুদের নিয়ে ছোট মামা হোটেলের স্মৃতিগুলো এখন বেশ নাড়া দেয়। বন্ধু, আড্ডা, গান দিয়ে আবার ৫টার বাসে শহরপানে ছুটে চলা। আবার সেই চিরচেনা মুখগুলো নিয়ে ক্লান্ত হয়ে হলে ফেরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তাড়িৎ ও দূরযোগাযোগ প্রকৌশল বিভাগের মেহজাবিন সেজুতি বলেন, খুব অপ্রিয় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫ টার জীবনটাও মনে হয় সুন্দর ছিলো। খুব সম্ভবত জায়গাটা চুয়েট বলেই। এই ক্যাম্পাসের প্রতিটা ছোট ছোট স্মৃতি আমার এই সময়টাকে আবেগপ্রবণ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। অবশ্যই প্রচণ্ড সুন্দর কোনো মুহূর্তে আমাদের আবার দেখা হবে। সিএনজিতে করে কাপ্তাই, তাপবিদ্যুৎ এর দইচিড়া, এক নং ক্যান্টিনের আড্ডা, কাশেম মামার চা, নতুন কোনো অনুষ্ঠানের জন্য ছক কাটা, বৃহস্পতিবারের চাঁদরাত আবার আসবে।

যন্ত্রকৌশল বিভাগের শেষ বর্ষের ফরহাদ শাহী আফিন্দী বলেন, স্মৃতির মায়ায় প্রায়শই ভিড় করে প্রিয় ক্যাম্পাসের আঙিনা আর বন্ধুত্বের গল্পগুলো। চুয়েটের সবুজ বৃক্ষরাজি, শহীদ মিনারে বসে আড্ডা কিংবা নর্থের ছাদে গলা ছেড়ে গান গাওয়ার সজীব-সুন্দর মুহূর্তগুলো প্রতিদিন ভেসে উঠে চোখে। অনেক বেশি মিস করি।

'১৯ আবর্তের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের ফারজিয়া আহমেদ রাফা বলেন, খুব মিস করছি চুয়েটকে। মার্চের মাঝামাঝি কোনো একদিনে হঠাৎ ক্লাস বন্ধের সংবাদে বাসায় চলে এসেছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি সেটা এতটা দীর্ঘ হয়ে যাবে। সেই থেকে আজ অবধি গৃহবন্দী। খুব খুব মনে পড়ছে ক্যাম্পাস এর দিনগুলোর কথা। নবীন শিক্ষার্থী হিসেবে এখনো বেশিদিন উপভোগ করতে পারিনি ক্যাম্পাস জীবনকে। সবচেয়ে বেশি মিস করছি আমার শামসেন্নাহার খান হল আর রুম-১১৫। 

চুয়েট ক্যাম্পাস যেনো এক ভালোবাসার নাম। দূরে থাকলে জিনিসটা আরও বেশি করে অনুভব হয়। তবুও পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের দূরে থাকতে হচ্ছে বলে জানালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী সিরাজুল ইসলাম হৃদয়। 

তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে বড়- ছোট ভাই, বন্ধুদের সঙ্গ আড্ডা যেনো আর অন্য কোথাও সম্ভব নয়। চুয়েট জীবনের নিয়মমাফিক সেই ব্যস্ততা অনেক মিস করছি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম