সূর্যের আলোয় হাসছে গ্রাম 

ঢাকা, বুধবার   ২৭ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪২৭,   ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

সূর্যের আলোয় হাসছে গ্রাম 

সাবজাল হোসেন, কালীগঞ্জ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:০৩ ২০ মে ২০২০   আপডেট: ১৩:১৬ ২০ মে ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলার জামাল ইউপির গুটিয়ানী গ্রামটি এখন সূর্যের আলোয় হাসছে। গত ৫ বছরে সৌর বিদ্যুতের প্লান্টের মাধ্যমে ক্ষেতে পানি সেচের ব্যবস্থা হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় ও শ্রম অনেকটা কমাতে পেরেছেন ওই গ্রামের কৃষকেরা। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ অনেকটা ঝামেলামুক্ত। ফলে এলাকার অন্য গ্রামের কৃষকদের মাঝেও এখন সোলার ইরিগেশন পাম্পিং সিস্টেম এর চাহিদা বেড়েছে অনেকগুণ।

সরেজমিনে গুটিয়ানী গ্রামের মাঠে গেলে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি গ্রামের মাঝখানে দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ। বর্তমানে সারা মাঠে চাষ করা হয়েছে বোরো ধান। মাঠের ভেতরে দুর থেকেই নজরে আসে বড় টিনের ঘরের মত সৌর বিদ্যুতের প্লান্ট। যেখান থেকে বোরো ক্ষেতগুলো ছাড়াও পাম্পের নিকটবর্তী সব ফসলি ক্ষেতে পানি সেচের কাজ চলে। 

এরইমধ্যে মাঠের বেশ কিছু কৃষকের বোরো ধান ঘরে উঠিয়ে ফেলেছেন। তারা ফলনও পেয়েছেন বেশ। আর বাকি ক্ষেতগুলোর সোনালী রঙের পাকা ধান গাছ দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে এ সৌর প্লান্টের মাধ্যমে গ্রামটির প্রায় ৩৫ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করা হয়েছে। 

ওই গ্রামের কৃষক রিপন বিশ্বাস ও মনিরুল ইসলাম জানান, আগের দিনের মত ফসল চাষ এখন শুধুমাত্র বৃষ্টির পানির উপরই নির্ভরশীল নেই। সেচের প্রয়োজনে সারাদেশের ফসলি মাঠগুলোতে ব্যাঙের ছাতার মতো স্থাপন করা হয়েছে ডিজেল চালিত গভীর নলকূপ। কিন্ত এ পদ্ধতি ব্যয়বহুল ছাড়াও ঝামেলাও অনেক বেশি। 

স্যালোচালিত গভীর নলকূপে বোরো ক্ষেতে সেচকাজ চালাতে কৃষকদেরকে সারাদিন কাজ ফেলে সময় দিতে হয়। আবার প্রতিবিঘায় সেচ খরচ হয় সাড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। সেক্ষেত্রে সোলার পাম্পের খরচ অনেকটা কম। 

তারা জানান, কৃষকদের কৃষি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কম করতে এনজিও সংস্থা ঝিনাইদহের এইড ফাউন্ডেশনের বাস্তবায়নে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড -ইডকলের সহযোগীতায় তাদের গ্রামের মাঠে সোলারপ্লান্ট স্থাপন করে ক্ষেতে পানি সেচের ব্যবস্থা করেছে। যেখানে ৪৬ শতাংশের প্রতি বিঘা বোরো ক্ষেতে সেচ বাবদ দিতে হচ্ছে মাত্র ৫ হাজার টাকা। এ টাকাটাও দিতে হবে ৩ কিস্তিতে। 

অর্থাৎ প্রতি বিঘায় খরচ সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। আবার কৃষকদেরকে নিজেদের কাজ ফেলে সারাদিন সময় দিতে হচ্ছে না। পাম্পের দায়িত্ব দেয়া ম্যানেজার নিজ দায়িত্বে প্রয়োজন মত সেচ দিয়ে দেন। 

ওই গ্রামের আরেক কৃষক আব্দুল আলিম জানান, সৌর পাম্প পরিবেশ বান্ধব। তাদের গ্রামে স্থাপিত পাম্পে যুগল বিশ্বাস নামের এক কৃষককে ম্যানেজারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি পাম্পের আওতার ক্ষেতগুলোতে পানি সেচ দিয়ে দেন। ফলে ক্ষেতে সেচ দিতে কৃষকেরা হয়েছেন বেশ ঝামেলামুক্ত আবার খরচও কম। 

তিনি আরো বলেন, রবি শস্য উৎপাদনে সেচ খরচ অপেক্ষাকৃত আরো কম। সবজি বা রবি শস্যের প্রতিবিঘায় সেচবাবদ আড়াইশ টাকা নেয়া হয়। অন্যদিকে ডিজেলচালিত স্যালো ইঞ্জিনে যান্ত্রিকত্রুটি লেগেই থাকে। কোনো কোনো সময় যান্ত্রিকত্রুটি ব্যাপক আকার ধারণ করায় ক্ষেতে পানির অভাবে ভরা ক্ষেত নষ্টও হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে সৌরপাম্পের সার্ভিসটা ভালো। 

সূর্যের আলো উঠার সঙ্গে সঙ্গে পানি তোলা শুরু হয় আর যতক্ষণ আলো থাকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ভালোভাবে পানি তোলা সম্ভব হয়। তাছাড়াও সৌরপাম্প পরিবেশবান্ধব। ফলে কৃষকদের মাঝে এটা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তাদের দেখাদেখি আশপাশের গ্রামের কৃষকেরাও সৌর প্লান্টের পাম্প স্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। 

সেচ পাম্পটির দায়িত্বরত ওই গ্রামের কৃষক যুগল বিশ্বাস জানান, সূর্য উঠার আধা ঘণ্টা পর থেকে সূর্যাস্ত যাওয়ার আধা ঘণ্টা আগ পর্যন্ত সোলার পাম্পের সেচ কাজ চালানো সম্ভব হয়। বিশেষ করে বোরো ধান চাষের সময়টা তার নিজের খুব ব্যস্ততা থাকে। এই পাম্পের আওতার সব ক্ষেত নিজেকে ঘুরে ঘুরে দেখতে হয়। প্রয়োজনীয় সময়ে সেচের জন্য নিজেকেই সব ব্যবস্থা করতে হয়।  

জামাল ইউপি চেয়ারম্যান মোদাচ্ছের হোসেন মন্ডল জানান, ঝিনাইদহ এইডের দেয়া কালীগঞ্জ উপজেলার মোট ৮ টি প্লান্টের মধ্যে তার নিজের ইউপির গুটিয়ানী, কামারাইল ও হরদেবপুর গ্রামেই রয়েছে মোট ৬ টি। এ গ্রামগুলোর কৃষকেরা কম খরচে সোলার পাম্পের মাধ্যমে সেচকাজ চালিয়ে বেশ উপকৃত হচ্ছে। 
 
সোলার ইরিগেশন পাম্পিং সিস্টেম ঝিনাইদহ এইডের প্রকল্প প্রধান আলমগীর হোসেন বাবু জানান, তার এ প্রকল্পের অধিনে কালীগঞ্জ উপজেলাতে মোট ৮ টি  সৌর বিদ্যুতের প্লান্ট রয়েছে। তারমধ্যে গুটিয়ানী গ্রামে একটি। 

তিনি জানান, সোলার প্লান্টের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থায় কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমছে। সোলারের মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে সেচ কাজ কোনোভাবেই বাধাগ্রস্থ হচ্ছে না। এ ছাড়াও জাতীয়ভাবে বিদ্যুৎ ও আমদানীকৃত জ্বালানী তেল সাশ্রয় করতে ভূমিকা রাখছে। যে কারণে ওই এলাকার কৃষকেরা আরো প্লান্ট স্থাপন করতে চাচ্ছেন। বিষয়টি তাদের সংস্থা আমলে নিয়ে প্লান্ট আরো বাড়ানোর চিন্তা ভাবনা করছে।  
 
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল করিম জানান, তিনি গুটিয়ানী গ্রামের মাঠে নিজে গিয়ে দেখেছেন সৌর পাম্পের দ্বারা সেচ দিয়ে বোরো ধান খুব ভালো হয়েছে। এছাড়াও সৌর বিদ্যুৎ পরিবেশ বান্ধব। কৃষকদের ফসলের উৎপাদন ব্যয় কমছে। ফলে দিন যত যাচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী তেল সাশ্রয়ের জন্য সরকারি বেসরকারিভাবে সৌর প্লান্টের ব্যবস্থার জন্য উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে তিনি যোগ করেন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে