সুগন্ধি দিয়েই হাতের জীবাণু দূর করছে তুর্কিরা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪২৭,   ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

সুগন্ধি দিয়েই হাতের জীবাণু দূর করছে তুর্কিরা

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৫৫ ৯ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৩:১৫ ৯ এপ্রিল ২০২০

ছবি: হাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কলোনিয়া নামক সুগন্ধী

ছবি: হাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কলোনিয়া নামক সুগন্ধী

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শে সারাবিশ্ব এখন করোনামুক্ত থাকতে সাবান পানিতে হাত ধুতে ব্যস্ত। করোনাভাইরাস প্রতিরোধের জন্য বক্তিগত সুরক্ষাই নাকি সবচেয়ে জরুরি। তবে তুর্কিবাসীরা এসময় হাতকে জীবাণুমুক্ত করতে কি ব্যবহার করছে জানলে আপনি অবাক হবেন বৈকি!

শুধু সাবান পানিই নয় বরং হ্যান্ড স্যানিটাইজারও ব্যবহার করছেন না তারা। সুরক্ষিত থাকতে তাদের ভরসা এক সুগন্ধিতে। যেটি তুরস্কের অতি জনপ্রিয় একটি পারফিউম। তাদের ঐতিহ্যবাহী এই সুগদ্ধি যুগের পর যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাদের ধারণা, শুধু সুগন্ধি হিসেবে নয় এটি যে কোনো জীবাণুও ধ্বংস করতে সক্ষম। এমনকি করোনাভাইরাস থেকেও সুরক্ষা দেয় এই পারফিউম। 

এর নাম কলোনিয়া। এই নামটি সেই অটোমান সাম্রাজ্য থেকেই চলে আসছে। এটি তুর্কির আতিথেয়তা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার এক মূল্যবান প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তুর্কির জাতীয় সুগন্ধি এটি। নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে এই সুগন্ধি কোন উপাদানে তৈরি যে করোনার মতো ভাইরাসও ধ্বংস হয়? ঐতিহ্যবাহী এই সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ডুমুরে ফুল, জুঁই, গোলাপসহ সাইট্রাসজাতীয় উপাদান, ইথানল প্রভৃতি। তবে এর বিশেষত্ত্ব হলো অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানের পাশাপাশি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল ব্যবহার করা হয় এতে। এ কারণেই কলোনিয়া জীবাণু ধ্বংস করতে পারে।
 
এর সুবাস এতোটাই মনোরম যে সবাই সতেজ থাকতে এই সুগন্ধি ব্যবহার করে। এমনকি ঘরবাড়ি, হোটেল এবং হাসপাতালে প্রবেশের সময়ও সবাই এটি হ্যান্ড স্যানিটাইজার হিসেবে ব্যবহার করে। এছাড়াও রেস্টুরেন্ট কিংবা মসজিদে যারা যান তারাও সুরক্ষিত থাকতে এটি ব্যবহার করেন। ১১ মার্চ তুরস্কের স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে কলোনিয়াল ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করেছেন। এরপর থেকে তুরস্কের মুদি দোকানে পর্যন্ত এই সুগন্ধি রাখা হচ্ছে। মার্চের মাঝামাঝিতে তুরস্কের প্রথম কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে। এরপর থেকে সেখানে কলোনিয়া সুগন্ধি বিক্রি অতীতের তুলনায় প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে।

ইস্তাম্বুলের এক চিকিৎসক ড. হাতিরা তোপাক্লি বলেছেন, বেশিরভাগ কলোনিয়ায় ৮০ শতাংশ অ্যালকোহল থাকে বলে এটি করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা করতে পারে। কারণ ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলেই করোনা ধ্বংস হয়ে যায়। তোপাক্লি আরো উল্লেখ করেন, বর্তমানে জীবাণুনাশক হিসেবে তুরস্কে এর চাহিদা অতীতের চেয়ে পাঁচগুণ বেড়েছে। কলোনিয়া উৎপাদনের জন্য প্রথমে খাঁটি ইথানল তৈরি করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বার্লি, আঙ্গুর, গুড় ও আলুর প্রাকৃতিক নির্যস ব্যবহার করা হয়। তারপরে ম্যাগনোলিয়া, লেবু বা রোজমেরির মতো প্রাকৃতিক উপাদান যুক্ত করা হয় এতে। বোতলজাত করার পূর্বে এই সুগন্ধি টানা তিন সপ্তাহ সংরক্ষিত অবস্থায় থাকে। 

কলোনিয়ার দোকানকলোনিয়ার ইতিহাস

অতীতে কলোনিয়া শুধু গোলাপ জল হিসেবেই উৎপাদিত হত। এতে তখনো অ্যালকোহল মিশ্রিত করা হত না। নবম শতাব্দীর শুরুতে, আরব উপদ্বীপে এর ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। এই গোলাপ জল তারা সুগন্ধি হিসেবে, রান্নায়, সৌন্দর্যচর্চায়, আতর এমনকি ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করত। পার্সিয়ান, মিশরীয় এবং অটোমানরা অতিথিদের স্বাগত জানাতে এই গোলাপজল ব্যবহার করত। উনিশ শতক নাগাদ ইও ডি কলোন (একটি প্রাকৃতিক সুগন্ধযুক্ত সুবাস যা বর্তমানে কোলোন বা কলোনিয়া নামে পরিচিত) জার্মানির কোলোন থেকে অটোমান সাম্রাজ্যের বাণিজ্য পথে যাত্রা শুরু করে। 

অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আবদুলহিত কলোনিয়ার গোলাপ জলের সঙ্গে অ্যালকোহল যোগ করে তা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। উপাদান অনুসারে, ইও ডি কলোন এবং তুর্কি কোলোনার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। ১৯২০ সালের গোড়ার দিকে ইজমির অটোমান সাম্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ রসায়নবিদ সলেমান ফেরিট বে ফ্রেঞ্চ সুগন্ধি তৈরির কৌশল শিখতে ফ্রান্স যান। তিনি সেখানে গোল্ডেন ড্রপ নামক আরো একটি বিখ্যাত কলোনিয়া তৈরি করেন। 

প্রায় একই সময়ে আঙ্কারায়, আইপ সাবরি টুনার নামে এক ব্যবসায়ী উপকূলীয় শহর ইয়েমেম থেকে লেবু ব্যবহার করে একটি কলোনিয়া তৈরি করেন। যা আজ তুরস্কের এক অন্যতম স্বীকৃত কলোনিয়ায় পরিণত হয়েছে। ইস্তাম্বুলে জাঁ সিজার রেবোল (বর্তমান মালিক কেরিমের দাদা) নামে এক তরুণ ফরাসি রসায়নবিদ ১৮৯৫ সালে তুরস্কে প্রথম এই সুগন্ধি একটি দোকান চালু করেছিলেন। 

পরবর্তীতে অ্যাটেইলার রেবুল নামক ওই দোকানটিই তুরস্কের অন্যতম কলোনিয়া বিপনন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জনসাধারণের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে কলোনিয়া বিক্রি শুরু হয়। বর্তমানে এই সুগন্ধি প্রায় প্রতিটি তুর্কি বাড়িতে পাওয়া যায়। তুরস্কে অ্যাটেইলার রেবুলের মোট ২২ টি দোকান রয়েছে। তারা আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিও অর্জন করেছে। এমনকি তারা বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্প্রসারণও শুরু করেছে ইউরোপ, মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। 

বর্তমানে তুরস্কে এই সুগন্ধির চাহিদা ব্যাপক। কলোনিয়া এখন ফ্রিজে থাকা প্রয়োজনীয় খাবারের মতোই হয়ে উঠেছে তুরস্কে। বর্তমানে তুর্কির প্রতিটি বাড়ির শয়নকক্ষ, বাথরুম এবং বসার ঘরে একটি করে হলেও কলোনিয়ার বোতল পেয়ে যাবেন আপনি। উপহার হিসেবেও এর চল ব্যাপক। 

জীবাণুনাশক কলোনিয়ার আরো কিছু স্বাস্থ্যগুণ রয়েছে। এটি বিভিন্ন রোগের দাওয়াই হিসেবেও তারা ব্যবহার করে। যেমন এর কয়েক ফোঁটা খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে বদহজম দূর হয়। এছাড়াও কারো মাথা ব্যথা হলে কপালে লাগালে তা সেরে যায়। সুগন্ধি হিসেবেই নয় বর্তমানে করোনা মোকাবিলা করছে কলোনিয়া।

সূত্র: বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস