Alexa সীতাকুণ্ড: প্রকৃতির এক স্বর্গরাজ্য

ঢাকা, রোববার   ১৭ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২ ১৪২৬,   ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

সীতাকুণ্ড: প্রকৃতির এক স্বর্গরাজ্য

 প্রকাশিত: ১৯:১৯ ২৮ এপ্রিল ২০১৮   আপডেট: ১৯:২২ ২৮ এপ্রিল ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

কবি জীবনান্দ দাস, মাইকেল মধুসূদন দত্ত আর কবি আব্দুল হাকিমের এই বঙ্গ দেশে কত রুপের পসরা সাজিয়ে রেখেছে প্রকৃতি, তা ঘর হতে না বেরুলে আন্দাজই করা যাবে না।

তবে এখানেও কথা রয়েছে, প্রকৃতির রুপ-লাবণ্য দেখার অন্তর দৃষ্টিও থাকা চাই। যে দৃষ্টি দিয়ে শুধুই প্রকৃতির অকৃত্রিম নির্জাসও নেয়া যাবে।

‘দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের’ বন্ধুরাও সেরকম অপার্থীব মায়াবি প্রকৃতির সন্ধানে একদিন রাতে হুট করেই বের হয়ে যায় সীতাকুণ্ডের পথে।

রাত ১২টার দিকে আদি ঢাকা থেকে মাইক্রো ছাড়ে। সদস্য সংখ্যা ৬ জন। তাও আবার সব ভ্রমণে পরীক্ষিত বন্ধু!

চেংড়া বয়সের ড্রাইভার ৪র্থ লেনের ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক ফাঁকা পেয়ে গাড়ির গতি দিল প্রায় ১১৫ কি.মি. উঠিয়ে। সবাই মজা পেলেও মাঝে মধ্যে ফ্যাকরা বাজালো, এখনো কপালে বউ না জোটা এম এ কালাম।

গাড়ি চলছে ধুমছে! সড়কে অন্যসব গাড়ি পিছনে ফেলে। হিসেব ছিলো ফযরের সময় পৌছাবো। কিন্তু যখন টি ব্রেক দিলাম, দোকানের সাইনবোর্ড দেখে চোখ কপালে। রাত তখন ২টা ৪০মিনিট। আরমাত্র ছয় কিলোমিটার পরেই সীতাকুন্ড, ভাবছি কি করি?

দোকানি জানালো এখানে মাঝে মধ্যে ডাকাতি হয়। আসলে, ওসব ডাকাত-ফাকাতের বেইল নাই আমাদের কাছে, যেহেতু নাদুস-নুদুস দেহের আরাফাত বন-জঙ্গলের পরম বন্ধু হিসেবে সাথে বড় একখানা ছোড়া রাখে।

যাই হোক ছোকড়া বয়সের মত হুজ্জতি না করে আর পাহাড়ি মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য ছুটি পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের দিকে। গাড়ি এবার কিছুটা ধীরগতি।

চলতি পথে রাত পোহালো, ফযরের আযান পড়লো চট্রগ্রাম নগরে। ব্রেক দিয়ে নামাজ আদায় করলাম হালি শহরের খুব সুন্দর একটি মসজিদে।

যখন পতেঙ্গা পৌছি তখন পুরাই জোয়ার। ভোরের হাওয়া লাখ টাকার দাওয়া, তাও আবার সমুদ্রের।

বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে চলে যায় নেভাল একাডেমি। ঘাটে সারি সারি নোঙর করা লাইটারেজ জাহাজ গুলোর স্হির থাকার দৃশ্য, দেখতে বেশ ভালোই লাগছে। একসময় পেটে টান পড়লো সবার।

নাশতা সারবো বিধায় ঢুকলাম কোস্টগার্ড পরিচালিত মান সম্পন্ন এক রেস্টুরেন্টে। দু:খের বিষয় খাবারের মান ফুটপাতের হোটেলের চাইতেও নিম্ন। অর্ধেক নাশতা করেই গ্যাসট্রিক এর ট্যাবলেট চুষে ভোঁ দৌড়!

পুরো নাশতা সাবাড় করলে হয়তো- জাগায় খায় জাগায় ব্রেকের মতো অবস্থা হতো কিনা কে জানে! হাতে সময় ঢেড়, তাই ছুটলাম নয়দুয়ারি হাটের পথে।

গাইড নিজাম আগেই সেখানে অপেক্ষমান ছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই নয় দুয়ারী পৌছাই। এবার নাপিত্তা ছড়া ট্রেইলে যাবো, তাই গাড়ি থামিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু শুকনো খাবার ক্রয় করলাম।

রেললাইন পর্যন্ত যাওয়ার পর গাড়ি রেখে শুরু হলো পায়ে হাঁটা। 

আমাদের মতো অনেকেই হাঁটছেন। ক্ষেতের আইল ধরে, ঝিলের পানি কেটে এগিয়ে যাচ্ছি। ঝোপ-ঝাড়, জঙ্গল, পাহাড়, টিলার মাঝ দিয়ে ট্রেক করে প্রথমেই দেখা পাই টিপড়া খুমের এরপর কুপিকাটা খুম।

উজিলা পাহাড়ের উপর গিয়ে দেখি চিপসের খালি প্যাকেটের অভাব নাই। হায় খোদ ১০৫ কেজির দেহটা নিয়ে কী এই বাজে চিত্র দেখতে এসেছি!

দোকানি পসরা সাজিয়ে রেখেছে আর আমরা অসচেতন প্রকৃতি দরদীরা সেখান থেকে কিনে উদরপূর্তি করে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলছি। আহ! প্রকৃতির প্রতি কতটা জাগ্রত প্রেম।

কিছুটা দূর হেঁটে বান্দরখুমে যাই। টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্যেও পানি প্রবাহ কম থাকায় কিছুটা হতাশ হই। তারপর চলে যাই বাঘ বিয়ানী ঝর্ণায়। যাবার ট্রেইলটা বেশ রোমাঞ্চকর।

জসিম প্রথমে অমত করেছিলো, না যাওয়ার জন্য। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পরপর সে পুরোই মুগ্ধ। আসলে ট্রেইলে গেলে হতাশ হবার কিছু নেই।

কোন জায়গার প্রকৃতি যে কী রকম তা বুঝা বড় দায়। বাঘ বিয়ানীর যে ষ্ট্রাকচার তা ভাষায় বা লেখায় বুঝানোর সক্ষমতা নেই আমার, যতটুকু পারছি তা লিখছি।

তিন পাশ থেকে পাহাড় প্রাচীর হয়ে ওপর দিকে উঠে গেছে। মাঝ বরাবর অবিরাম ঝর্ণা ধারা। কোথাও কোথাও পাহাড়ের নিচ থেকে সরে গেছে মাটি। কোনো কারণে প্রকৃতি হিংস্র্র হলে সবার হবে সলিল সমাধি।

বুঝতেই পারছেন কতটা রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি। বাঘবিয়নীতে পানির প্রবাহ বেশ। রিমঝিম ছন্দ তোলা শব্দ মনটাকে বেশ উৎফুল্ল করে দেয়।

বেশ কিছুটা সময় সেখানে কাটিয়ে এবার যাই সীতাকুণ্ড। মাঝে দুপুরের আহার আর জুমা’র নামাজের বিরতি।

খাবারের মান নিয়ে যদি লিখতে যাই তাহলে তিনশ’ শব্দের মধ্যেও শেষ করা যাবে না। তাই ভ্রমণ পিপাসুরা সাবধান। এবার গাড়ি কুমিরা সন্ধিপ ঘাটের দিকে টার্ণ নিল। খুব অল্প সময়েই চলে গেলাম।

গাড়ি রেখে এগিয়ে যাই। আরে এই দেখি আরেক জগৎ!

সোজা সমুদ্রের বুকে পায়ে হাঁটা ব্রীজ চলে গেছে। এখান থেকেই সন্ধিপ যাবার ট্রলার ছাড়ে। যাত্রীদের সুবিধার্থেই এই ব্রীজ করা। কিন্তু এখন তা ভ্রমণ পিপাসুদের মিলন মেলার আদর্শতম স্থানে রুপ নিয়েছে।

আছড়ে পড়া ঢেউয়ের দোল আর মাছ শিকারিদের বর্শিতে বিধা নানা রকম মাছ বাড়তি আনন্দের যোগান দেয়।

এই ঘাটেই বিশ্বের নানান সমুদ্রে বীরদর্পে চলা জাহাজের ইতি ঘটে অর্থাৎ স্ক্রাব করা হয়। স্ক্রাব করার আগের মুহূর্তের নোঙর করার দৃশ্য সে আরেক অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ হবার মতো কাহিনী।

ঠিক বিকেল বেলা কুমিরা ঘাটে ঘোরার সুবর্ণ সময়। সেখানে কাটানো মাত্র একটি বিকেল, স্মৃতির পাতায় থাকবে বহুকাল জ্বলজ্বলে হয়ে।

যাই এবার গুলিয়াখালী। সীতাকুণ্ড বাজার হতে গুলিয়াখালী বাজারের দিকে ছুটছি। যাচ্ছি মুরাদপুর সমুদ্র সৈকতে।

এখনো এই সৈকত অনেকের নিকটই অচেনা-অজানা। ছোট্ট একটা বাজারে গাড়ি রেখে খানিকটা কাদা পানি মাড়িয়ে পৌছে যাই সৈকতের ধারে! ওয়াও ! ওয়াও ! প্রথম দর্শনেই চোখ জুড়িয়ে যায়।

অপরুপ সব দৃশ্য, ছলাৎ ছলাৎ আছড়ে পড়া ঢেউ আর ঝিরঝির বাতাস মন ছুয়ে যাবে প্রেয়সীর পানে। আহ্ সেই মুহূর্তে যদি গার্লফ্রেন্ড থাকতো সঙ্গে তাহলেত পুরাই মাখামাখি! থুক্কু ভালোবাসার ষোলকণা পূর্ণতার হাসি হাসতাম দুজনে।

পুরো মুরাদপুর সৈকত জুড়ে কচি ঘাসের বিস্তৃর্ণ মাঠ, অবারিত জলরাশি, দৃষ্টির সিমানায় সবুজ পাহাড়, আহ! সে এক অন্যরকম ভালোলাগার অনুভূতি। প্রকৃতি যেনো সব উজাড় করে মেলে ধরেছে এই মুরাদপুর সৈকতে।

ইচ্ছে করলে নামমাত্র খরচে বোট দিয়ে ঘুরা যাবে সমুদ্রের অথৈ জলে। চমৎকার সূর্যাস্ত! ঢেউয়ে গড়িয়ে আসা নোনা জলে যখন ভিজবে পা তখন মনে হবে, কি দেখি নাই আমি এতটা বছর। অথচ এর পাশ দিয়েই গিয়েছি কত শতবার।

উচ্ছ্বাস যখন চরমে তখনি - সূর্য মামা সেদিনের মত লাল আভা ছড়িয়ে টুপ করে ডুব দিল।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো আমরাও ফিরতি পথ ধরি তবে হেঁটে নয় বোট দিয়ে। সত্যি বলতে কি যদি বোটে না ফিরতাম, তাহলে ভ্রমণের অপূর্ণতাই রয়ে যেতো।

সৈকত থেকে যখন তীরে ফিরছি তখন মনে হলো যেন সোয়াম্প ফরেষ্টের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য ভিন্ন রকম শিহরণ।

জলমগ্ন গাছের ফাঁক গলে অর্ধ চন্দ্রের আলোতে বোট যতই এগিয়ে যায় ততোই যেন মনে হয় এই বাংলার রূপ আমিত এখনো কিছুই দেখি নাই!

গলা ছেড়ে তখন গাইতে ইচ্ছে করবে ‘আরো কিছুক্ষণ কী রবে বন্ধু/ আরো কিছু কথা কী হবে / বলবে কী শুধু ভালোবাসি তোমায়।’ হ্যাঁ, ভালোবাসি বলেইতো বারেবার তোমার পরশ খুঁজে বেড়াই।

যাবেন কী ভাবে:
বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে ঢাকা থেকে চট্টগাম। ভাড়া পরিবহনের মান বুঝে ৪৮০ টাকা হতে ১২৫০ টাকা পর্যন্ত। সব চাইতে সুবিধা হবে নিজস্ব গাড়ি বা রেন্ট-এ কার রিজার্ভ নিয়ে গেলে।

মাইক্রো গাড়ির বডি ভাড়া ৩৫০০ টাকা হতে ৪৫০০ টাকা। গ্যাস ও গাড়ি বাবদ রাস্তা খরচ নিজেদের। এছাড়া সিএনজি, অটো সর্বক্ষণ মিলবে। ঢাকার কমলাপুর হতে ট্রেনেও যাওয়া যাবে। সোনারবাংলায় ৭০০/= ও সুবর্ণ এক্সপ্রেসে ৬০০/= টাকা জনপ্রতি মাত্র। আরো কম ভাড়ায়ও ট্রেনে যাওয়া যাবে।

থাকবেন কোথায়:
যারা ছোট ছোট বাচ্চাসহ পরিবারের বিভিন্ন বয়সের সদস্য নিয়ে যাবেন তারা দুই দিনের সময় নিয়ে আগেই চট্টগাম শহরের কোনো হেটেলে রুম বুকিং দিয়ে যাবেন কারণ মিরসরাই বা সিতাকুণ্ডে ভালোমানের কোনো আবাসিক হোটেল নেই।

রুম ভাড়া মান ভেদে ১০০০ টাকা হতে ১০/১২০০০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর যারা শুধুই বন্ধুমহল যাবেন তারা আগের দিন রাতে রওনা দিয়ে পরের দিন ঘুরে,সন্ধার পরেই ফিরতে পারবেন।

ঘুরার সহজ তথ্য:
প্রথমেই পতেঙ্গা, দ্বিতীয় নেভাল একাডেমি, তৃতীয় নওদুয়ারি হতে নাপিত্তাছড়া ট্রেইল, চতুর্থ কুমিরা সন্ধীপ ঘাট, পঞ্চম ফকিরহাট হতে গুলিয়াখালী মুরাদপুর সমুদ্র সৈকত। যদি কোনো কারণে ঢাকা থেকে মিরসরাই/সীতাকুণ্ড পৌছতে সকাল হয়ে যায় তাহলে প্রথমেই নয়দুয়ারী বা কুমিরা হতে দেখা শুরু করলে সুবিধা হবে।

আরো কী কী দেখবেন:
সময় সুযোগ থাকলে মহামায়া কৃত্রিম লেক, খৈয়াছড়া ঝর্ণা, সহস্রধারা ও ইকোপার্কসহ আরো অনেক কিছুই। বর্তমানে চট্রগামের মিরসরাই এবং সীতাকুণ্ড প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়কর `স্বর্গরাজ্য`।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম/আরএজে