সিরাজকে হটানোর গোপন ষড়যন্ত্রে কারা গোলটেবিল বৈঠক করেন?

ঢাকা, বুধবার   ০১ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ১৮ ১৪২৬,   ০৭ শা'বান ১৪৪১

Akash

সিরাজকে হটানোর গোপন ষড়যন্ত্রে কারা গোলটেবিল বৈঠক করেন?

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:২১ ২৩ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৫:০২ ২৩ নভেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

গভীর রাত! চিন্তায় মগ্ন বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা। পলাশীর যুদ্ধ নিয়েই তার যত ভাবনা। অন্যদিকে, তারই বিরুদ্ধে সেসময় ষড়যন্ত্র চলছে। 

পলাশীর যুদ্ধের ঠিক সাত দিন আগের ঘটনা। ভাগীরথির তীরের বাংলো বাড়িতে দু’টি গোপন ষড়যন্ত্র হয়। নবাবের বিরূদ্ধে সেই ষড়যন্ত্রের গোপন সিদ্ধান্তে কি কি হয়েছিল? যার জন্য নবাব পরাজিত হলো পলাশীর যুদ্ধে। কে কে কষেছিলেন সেই ষড়যন্ত্রের ছক? কে কোন ছদ্মবেশে হাজির হয়েছিল সেখানে?    

বাংলার আকাশে দূর্যোগ ঘনিয়ে আনা সেই ষড়যন্ত্র ১৭৫৭ সালের জুন মাসের এক ঝড়বৃষ্টির রাতে কাঠগোলা বাগান বাড়িতে হয়েছিল। তার আগে মতিঝিল প্রাসাদে হওয়া ষড়যন্ত্র যদিও সিরাজ জেনে গিয়েছিল। এই প্রাসাদটি যেমন শহরের একপাশে নির্জন তেমনি এর পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ভাগীরথি নদী। প্রাসাদ থেকে পালানোর জন্য ছিল নদীর দিকে এক গোপন সুড়ঙ্গ পথ।  

ভাগীরথি নদী দিয়ে নৌকায় জাফরগঞ্জ থেকে পাগলের বেশে হাজির হলেন মীর জাফর। গায়ে ছেঁড়া ময়লা আলখেল্লা। লর্ড ক্লাইভের প্রতিনিধি ওয়ারেন হেস্তিন এলেন বাইজির বেশে। জগত শেঠ দরবেশের ছদ্ধবেশ ধারণ করেছিলেন। তার যে গালে সিরাজ থাপ্পড় দিয়েছিল সেগালে হাত বুলাতে বুলাতে। ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন মিরন। সমস্ত ষড়যন্ত্রকারীরাই এলেন বিভিন্ন ছদ্মবেশে। রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ সবাই তারা অনেক সাবধানতা অবলম্বন করছিলেন। 

কারণ তারা জানতেন সিরাজ তাদের কথা জানতে পারলে দেশদ্রোহীতার অপরাধে শিরচ্ছেদ করবেন। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, সিরাজ এই ষড়যন্ত্রের কথা আগেই জানতে পেরেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। সিরাজ মতিঝিল প্রাসাদে গিয়ে তার খালা ঘষেটি বেগমকে আটক করেন। গুপ্তচরদের পাঠানো হয় অন্যদের ধরার জন্য। গুপ্তচররা যদিও সুড়ঙ্গের কথা জানত না। তাই তাদের কাউকেই খুঁজে পায় নি। এদিকে অন্যরা সিরাজের প্রধান শত্রু ও ষড়যন্ত্রকারী ঘষেটি বেগমের অপেক্ষায় তখন। 

চুক্তি মতে, মীরজাফরের নিকট থেকে আরো পরামর্শ এবং অভিযান পরিচালনার কৌশল বিষয়ে জানার জন্য ১১ জুন সভার তারিখ ঠিক করে ষড়যন্ত্রকারীরা। তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয় ‘বর্তমান সন্ধিক্ষণে সর্বোত্তম সুবিধাজনক কাজ হবে মীরজাফরের পক্ষে বিপ্লব বাস্তবায়িত করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ,’। কেননা আরো বিলম্ব হলে নওয়াবের নিকট ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়ে যাবে এবং মীরজাফরকে সরিয়ে  দেয়া হবে, ফলে ‘আমাদের গোটা পরিকল্পনা’ ‘ভন্ডুল’ হবে এবং ব্রিটিশরা একা ‘সম্মিলিত দেশীয় শক্তির বিরুদ্ধে লড়ার জন্য মাঠে থাকবে’। তদানুসারে ১৩ জুন ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। 

১৯ জুন ক্লাইভ কাটোয়া পৌঁছায়। জায়গাটি আগের দিনই কর্ণেল দখল করে নেয়। ২১ জুন ক্লাইভ সমর পরিষদের সভা ডাকেন এবং তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ  না নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ক্লাইভ পরে সিদ্ধান্ত বদলান এবং পরদিন অগ্রসর হওয়ার জন্য মনস্থ করেন। ২২ জুন সকালে ব্রিটিশ বাহিনী ক্লাইভের নেতৃত্বে পলাশীর পথে যাত্রা করে। অবশ্য সেদিন দুপুরের পরপরই ক্লাইভ মীরজাফরের কাছ থেকে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বার্তা পান এবং পলাশীর পথে তার যাত্রা অব্যাহত রেখে দুপুর রাতের পর সেখানে পৌঁছান। 

এদিকে সিরাজও তার বাহিনী নিয়ে পলাশীর পথে অগ্রসর হন। ২৩ জুন সকাল ৮টার দিকে যুদ্ধ শুরু হয়। ইংরেজদের বাহিনীর তুলনায় নবাবের বাহিনীর আকার অনেক বড় হলেও মীরজাফর, ইয়ার লতিফ এবং রায় দুর্লভের অধীনস্থ প্রায় দুই তৃতীয়াংশ সৈন্য নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু মীর মর্দান, মোহনলাল, খাজা আব্দুল হাদী খান, নবে সিং হাজারীর নেতৃত্বাধীন কিছু সৈন্য এবং ফরাসী সৈনিকদের একটি দল যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ক্লাইভ যুদ্ধে ধারণার চেয়ে বেশি প্রতিরোধের সন্মুখীন হন। 

যুদ্ধ চলাকালীন সময় বৃষ্টিতে নবাব এবং ফরাসীদের কামানের গোলায় ব্যবহৃত গানপাউডার ভিজে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তবে ইংরেজরা তাদের গান পাউডার সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়। জানা যায়, দিনে যুদ্ধ চালিয়ে ক্লাইভ রাতের অন্ধকারে কলকাতা পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে বেলা তিনটার দিকে কামানের গোলার আঘাতে মীরমদন নিহত হলে নবাব ভেঙে পড়েন। তিনিমীর জাফরের কাছে পরামর্শ চান। মীরজাফর নবাবকে যুদ্ধ বন্ধ করে পরবর্তী দিনে নতুন উদ্যমে যুদ্ধ করার পরামর্শ দেন।

মোহনলালের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও নবাব যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দেন। নবাবের সৈন্যরা পিছু হটে আসে। মীরজাফরের বার্তা পেয়ে ইংরেজরা নবাবের অপ্রস্তুত বাহিনীর ওপর হামলা চালায় এবং যুদ্ধে জয়লাভ করে। এতে নওয়াবের সেনানায়কেরা পিছুতে থাকে এবং বিশৃঙ্খলভাবে যত্রতত্র পালিয়ে যায়। বিকেল ৫টার দিকে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। বিজয়ী ক্লাইভ বীরদর্পে তখনই মুর্শিদাবাদ যাত্রা করেন। ফলে প্রায় ২০০ বছরের জন্য বাংলা স্বাধীনতা হারায়। 

ঘৃণিত কলঙ্কজনক এই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অধ্যায় সৃষ্টির পেছনে জড়িত ছিল বিশ্বাসঘাতক জগৎশেঠ, মাহতাব চাঁদ, উমিচাঁদ, মহারাজা স্বরূপচাঁদ, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রায়দুর্লভ, মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, রাজা রাজবল্লভ, নন্দকুমার প্রমুখ কৌশলী চক্র। এই স্বার্থান্বেষী ষড়যন্ত্রীদের প্রথম শিকার ছিল স্বাধীন ভারতের শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং তার বিশ্বস্ত সেনাপতি মীরমদন ও প্রধান আমাত্য মোহনলাল কাশ্মিরী। ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা ও লর্ড ক্লাইভের মধ্যে এক যুদ্ধ নাটক মঞ্চায়িত হয়। 

এতে নবাব বাহিনীর পক্ষে সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৬৫ হাজার এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে ছিল মাত্র ৩ হাজার। তবে যুদ্ধের ময়দানে নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীরজাফর ও তার অনুসারী প্রায় ৪৫ হাজার সৈন্য নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। ফলে যুদ্ধে স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির পরাজয় অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সেবাদাসদের সাহায্যে এভাবেই বাংলায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এরপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দীর্ঘ ১৯০ বছর এদেশে শাসন শোষণ করে। কোটি কোটি টাকার অর্থ সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার করে। 

বাংলাদেশ থেকে লুটকৃত পুঁজির সাহায্যে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ঘটে। আর এককালের প্রাচ্যের স্বর্গ সোনার বাংলা পরিণত হয় শ্মশান বাংলায়, স্থান পায় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশে। এ যুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক ও সুদূরপ্রসারী। এ যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাংলা ব্রিটিশদের অধিকারে চলে আসে। বাংলা অধিকারের পর ক্রমান্বয়ে ব্রিটিশরা পুরো ভারতবর্ষ এমনকি এশিয়ার অন্যান্য অংশও নিজেদের দখলে নিয়ে আসে। 

পলাশীর যুদ্ধের এই নৃশংস ও কলঙ্কজনক ঘটনার মাধ্যমে কলকাতা কেন্দ্রিক একটি নতুন উঠতি পুঁজিপতি শ্রেণী ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে। ইংরেজ ও তাদের এ দেশীয় দালালগোষ্ঠী দেশবাসীর ওপর একের পর এক আগ্রাসন চালায়। ফলে দেশীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে। অবশেষে ইংরেজরা সিরাজউদ্দৌলাকে আটক করে কারাগারে প্রেরণ করে এবং পালিত ভাই মোহাম্মাদী বেগের হাতেই সিরাজউদ্দৌলার নির্মম মৃত্যু হয়।   

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস