Alexa সিটি নির্বাচন: দুই হাজার মণ পলিথিন বর্জ্য তৈরির শঙ্কা

ঢাকা, সোমবার   ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ১১ ১৪২৬,   ২৯ জমাদিউস সানি ১৪৪১

Akash

সিটি নির্বাচন: দুই হাজার মণ পলিথিন বর্জ্য তৈরির শঙ্কা

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩৬ ২৭ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৪:৪৫ ২৭ জানুয়ারি ২০২০

সংগৃহীত

সংগৃহীত

পলিথিনের ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় হলেও সিটি নির্বাচনে প্রায় প্রত্যেক প্রার্থীই পলিথিনে মোড়ানো পোস্টার ব্যবহার করছেন। পরিবেশবাদী সংগঠন পবার হিসাব অনুযায়ী রাজধানীর আকাশে ভাসছে নিষিদ্ধ পলিথিনে মোড়া প্রায় তিন কোটি ১৭ লাখ ৯০ হাজার লেমিনেটেড পোস্টার। যা পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

রাজধানীর ফকিরাপুলে একাধিক লেমিনেটিং প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক হাজার পিস নির্বাচনী পোস্টার (৬০ সেন্টিমিটার বাই ৪৫ সেন্টিমিটার) লেমিনেটিং করতে প্রায় আড়াই কেজি পলিথিন প্রয়োজন হয়। এই হিসাবে তিন কোটি ১৭ লাখ ৯০ হাজার পিস পোস্টার তৈরি করতে কমপক্ষে ৭৯ হাজার ৪৭৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরে ৭৯ হাজার ৪৭৫ কেজি পলিথিন বর্জ্য তৈরি হবে। প্রায় দুই হাজার মণ এই পলিথিন বর্জ্য পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, বিপুল পরিমাণ এই পলিথিন বর্জ্য কখনোই মাটির সঙ্গে পুরোপুরি মিশে যাবে না। এগুলো একসময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হয়ে পানির সঙ্গে মিশে যাবে। যা মাছের মতো জলজ প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করবে।

সম্প্রতি উচ্চ আদালত পলিথিনে মোড়ানো পোস্টারের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। তবে এরইমধ্যে রাজধানীর অলিগলিসহ রাজপথ ছেয়ে গেছে লেমিনেটেড পোস্টারে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে মোট ওয়ার্ড সংখ্যা ১২৯টি। দুটি সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন মোট ১৩ জন প্রার্থী। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থী ৪ জন (২জন আওয়ামী লীগ ও ২জন বিএনপি মনোনীত)। উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৫৪টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী ২৫১ জন। আর সংরক্ষিত ওয়ার্ডে নারী কাউন্সিলর প্রার্থী ১৮ জন।

অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে মোট প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা ৩২৬ জন। আর সংরক্ষিত ওয়ার্ডে নারী কাউন্সিলর প্রার্থী ২৫ জন। অর্থাৎ দুই সিটিতে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী মোট ৭৪৯ জন। তারা প্রায় সবাই নির্বাচনী প্রচারে পলিথিনে মোড়ানো লেমিনেটেড পোস্টার টানিয়েছেন।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক সচিব ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহান ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, ঢাকার আকাশে এখন তিন কোটির বেশি লেমিনেটেড পোস্টার ঝুলছে। তিনি জানান, একজন মেয়র প্রার্থী যদি গড়ে প্রতি ওয়ার্ডে ন্যূনতম ৩০ হাজার পোস্টার ব্যবহার করেন, তাহলে দুই সিটি কর্পোরেশনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৪ মেয়র প্রার্থী ১২৯ টি ওয়ার্ডে ব্যবহার করছেন এক কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার পোস্টার। একই ভাবে ১২৯ টি ওয়ার্ডে ৫৭৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থী গড়ে ন্যূনতম ২০ হাজার করে পোস্টার ব্যবহার করছেন। এই হিসাবে মোট পোস্টারের সংখ্যা এক কোটি ১৫ লাখ ৪০ হাজার।

আর দুই সিটিতে ৪৩ টি সংরক্ষিত আসনে ১৫৯ জন নারী কাউন্সিলর প্রার্থী গড়ে ৩০ হাজার পিস পোষ্টার ব্যবহার করলে এর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭ লাখ ৭০ হাজার পিস। অর্থাৎ মোট তিন কোটি ১৭ লাখ ৯০ হাজার পিস পোস্টার এখন ঝুলছে রাজধানীতে।

ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহান আরো বলেন, নির্বাচন কমিশন চাইলেই লেমিনেটেড পোস্টারের বিরুদ্ধে শুরুতেই ব্যবস্থা নিতে পারতো। এজন্য নির্বাচনী আচরণ বিধিও পরিবর্তনের প্রয়োজন হতো না। কারণ আইনে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু আইনটা প্রয়োগ করাই যথেষ্ট ছিল।

তিনি আরো বলেন, যে পলিথিনের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করেছি, হবু জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেদারছে সেই নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবহার করছেন, যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

পরিবেশের উপর পলিথিনের নেতিবাচক প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিপুল পরিমাণ এই পলিথিন বর্জ্য কখনোই মাটির সঙ্গে পুরোপুরি মিশে যাবে না। এগুলো একসময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হয়ে পানির সঙ্গে মিশবে। যা মাছের মতো জলজ প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগের সৃষ্টি করবে।

এদিকে আদালতের নির্দেশনার পর নতুন করে লেমিনেটেড পোস্টার ছাপা হচ্ছে কিনা এ নিয়ে মুখ খুলতে চাননি কোনো প্রেস মালিক। তবে কয়েকজন প্রার্থী জানান, তারা আদালতের নির্দেশ মেনে আর কোনো লেমিনেটেড পোস্টার তৈরির অর্ডার করেননি।

টিকাটুলি কেএমদাস লেনের করিম প্রিন্টিং এর ব্যবস্থাপক নাইম জানান, যাদের পোস্টার ছাপানো দরকার তারা আদালতের নিষেধাজ্ঞার আগেই অর্থাৎ ২২ জানুয়ারির আগেই ছাপিয়ে নিয়ে গেছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী রোকন উদ্দিন আহমেদ বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর তিনি আর কোনো লেমিনেটেড পোস্টার টানাননি।

পলিথিনে মোড়া এ বিপুল সংখ্যক পোস্টার অপসারণ করা নিয়েও বিড়ম্বনায় আছে সিটি কর্পোরেশন। এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের পরদিনই এসব পোস্টার অপসারণ করা হবে। পরে তা মাতুয়াইল ল্যান্ড ফিল্ডের মাটিতে পুতে ফেলা হবে।

তিনি আরো বলেন, এসব লেমিনেটেড পোস্টার পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বর্ষা মৌসুমে এসব পলিথিন ড্রেনেজ ব্যবস্থা অচল করে দেবে। এমনকি শুষ্ক মৌসুমেও এগুলো ড্রেনেজ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। যার ফলে শুষ্ক মৌসুমেও ড্রেনের পানি রাস্তায় উপচে পড়বে।

দুই সিটির নির্বাচনে পলিথিনের এরকম ব্যবহারের বিষয়ে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় উচ্চ আদালতের। গত ২২ জানুয়ারি হাইকোর্ট ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের নতুন করে লেমিনেটেড পোস্টার লাগানোর উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। নতুন করে লেমিনেটেড পোস্টার উৎপাদন, ছাপানো ও প্রদর্শনের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সিটি কর্পোরেশন ও নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেন আদালত।

জানা যায়, দেশে পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয় ২০০২ সালে। আইন অনুযায়ী পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রি কিংবা বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুত, বাণিজ্যিক উদ্দেশে পরিবহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ।

এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনী আচরণ বিধিতে লেমিনেটেড পোস্টার ব্যবহারের উপর কোনো বিধিনিষেধ নেই। তবে এটা পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে স্বীকার করেন তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসসি/এস