সাহিত্যে নতুন পথ খুঁজতে পূর্বপাঠের বিকল্প নেই

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৮ ১৪২৭,   ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

সাহিত্যে নতুন পথ খুঁজতে পূর্বপাঠের বিকল্প নেই

ড. তপন বাগচী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১১ ৬ মে ২০২০   আপডেট: ০৩:৫৪ ৪ জুন ২০২০

অলঙ্করণ: আশিস সরকারের প্রোট্রেইট অবলম্বনে আদিল হোসেন

অলঙ্করণ: আশিস সরকারের প্রোট্রেইট অবলম্বনে আদিল হোসেন

নব্বই দশকের শীর্ষস্থানীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. তপন বাগচী। জন্ম ১৯৬৮ সালের ২৩ অক্টোবর মাদারীপুরে। বাবা তুষ্টচরণ বাগচী ও মা জ্যোতির্ময়ী বাগচী। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় এমএ-পিএইচডি। বর্তমানে বাংলা একাডেমির উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। ‘আমার ভেতর বসত করে’, ‘কলঙ্ক অলঙ্কার হইল’, ‘দিয়েছি এই বুকের আসন’, ‘কূলের আশায় কূল হারাইছি’ এমন অনেক বিখ্যাত গানের রচয়িতা তিনি। তার উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ: শ্মশানেই শুনি শঙ্খধ্বনি, কেতকীর প্রতি পক্ষপাত, অন্তহীন ক্ষতের গভীরে, সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল। প্রবন্ধগ্রন্থ: সাহিত্যের এদিক-সেদিক, সাহিত্যের কাছে-দূরে, চলচ্চিত্রের গানে ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, লোকসংস্কৃতির কতিপয় পাঠ, বাংলাদেশের যাত্রাগান : জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত, মুক্তিযুদ্ধে গোপালগঞ্জ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ : চন্দ্রাহত অভিমান, নির্বাচন সাংবাদিকতা, নজরুলের কবিতায় শব্দালঙ্কার, তৃণমূল সাংবাদিকতার উন্মেষ ও বিকাশ। পুরস্কার ও স্বীকৃতি: তার সময়ের সবচেয়ে বেশি পুরস্কারে ধন্য হয়েছেন তিনি। গান লিখে তিনি ৪বার পেয়েছেন স্টান্ডার্ড চার্টার্ড দ্য ডেইলি স্টার সেলিব্রেটিং লাইফ গীতিকার পুরস্কার (২০১৯, ২০১৬, ২০১৪, ২০১৩)। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য পদক (২০২০), নজরুল পুরস্কার (চুরুলিয়া, ২০১৯), নজরুল অ্যাওয়ার্ড  (মেমারি, ২০১৯) অগ্রণী ব্যাংক বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১৮), কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার (২০১৭), সুফিসাধক আরকুম শাহ স্মৃতি পদক (২০১৭),  অনুভব বহুমুখি সমবায় সমিতি সাহিত্য পদক (২০১৩);  সাংস্কৃতিক খবর সম্মাননা (২০১২); নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার (কোলকাতা, ২০১১); ২ বার বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ফেলোশিপ (২০১২ ও ২০১০), মহাদিগন্ত সাহিত্য পুরস্কার (কোলকাতা, ২০০৮); মাইকেল মধুসূদন পদক (২০০৮), এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৮); জেমকন সাহিত্য পুরস্কার (২০০৮); নটসম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস স্মৃতি পদক (২০০৮); পাক্ষিক ‘মুকসুদপুর সংবাদ’ সম্মাননা (২০০৭); জসীমউদ্দীন গবেষণা পুরস্কার (১৯৯৬); (২৮) মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১)। এয়ড়া জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের আরও পদক-পুরস্কার রয়েছে তার সংগ্রহে।

তপন বাগচীকে নিয়ে সাহিত্য পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ এবং  গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। তার পঞ্চাশ বছরকে কেন্দ্র করে বীরেন মুখার্জীর ‘দৃষ্টি’, অনাদিরঞ্জন বিশ্বাসের ‘বাকপ্রতিমা’, নীলাদ্রিশেখর সরকারের ‘কথাকৃতি’ এবং রুবেল আনছারের ‘রিভিউ’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।  তার উপর রচিত হয়েছে পাঁচটি গ্রন্থ: শ্যামাপ্রসাদ ঘোষের ‘শিশুসাহিত্যে তপন বাগচী বর্ণময় আলোকদ্যুতি’, হরিদাস ঠাকুরের ‘কবি তপন বাগচীর মনন-দর্শন’, ড. অনুপম হীরা মণ্ডলের ‘সাহিত্যের তপন বাগচী- বিচিত্র বিভাকর’, মনীষা কর বাগচীর ‘মূলসন্ধির কবি তপন বাগচী- নিবিড় অনুধ্যান ও নরেশ মণ্ডলের ‘তপন বাগচীর সাহিত্য- চকিত বীক্ষণ’। তার উপর আরো কিছু গবেষণা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সমকালের আলোচিত এই সাহিত্যব্যক্তিত্বের সমৃদ্ধ ঝুলি থেকে সঞ্চয়ের প্রয়াসে মুখোমুখি হয়েছিলেন সাংবাদিক ও কথাশিল্পী রনি রেজা

ডেইলি বাংলাদেশ: করোনাকাল কীভাবে কাটছে?

তপন বাগচী: করোনাকালে আমাদের ভবন লকডাউনে আছে। যে নয়তলা ভবনের নয়তলায় আমরা থাকি, তার পাঁচতলায় একঘরে তিনজন করোনারোগী সনাক্ত হওয়ায় আমাদের ভবন সরকারিভাবে লকডাউন করা হয়েছে। এখন ঘরেই বাস করছি। পড়ছি, লিখছি, বউ-ছেলে-মেয়ের সঙ্গে ক্যারম-লুডু খেলে বেশ তো কাটাচ্ছি দিন। কষ্ট হয় দিনমজুরদের কথা ভেবে, কষ্ট হয় যাদের রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের কথা ভেবে। আমার এলাকার ২/৩টি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে কিছু করার চেষ্টা করছি এই ঘরবন্দি থেকেও। আমরা জানি, সরকারি ডাক্তারদের পিপিই দেয়া হয়েছে। কিন্তু যারা গ্রাম্য ডাক্তার? তাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা? গ্রামের মানুষ তো অসুখ হলে তাদের কাছেই যায়। এই বোধ থেকে কয়েকটি পিপিই কিনে মাদারীপুর জেলার রাজৈর থানার কদমবাড়ী ইউনিয়ন কল্যাণ পরিষদ থেকে গ্রাম্য ডাক্তারদের মাঝে বিতরণ করেছে। আমি তাদের সঙ্গে আছি। মাদারীপুর সদর থানার এবিসিকে কল্যাণ সমিতির ত্রাণবিতরণ কার্যক্রমে আমার সাধ্যমতো যুক্ত রয়েছি। এই তো এভাবে কেটে যাচ্ছে দিন। ‘ভয়েস অব আর্টিস্টস’ নামের একটি ফেসবুকভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে দুর্দশাগ্রস্ত শিল্পীদের জন্য কিছু করার কাজেও যুক্ত রয়েছি।

আমি বাংলায় লিখি বলে বিভাষী মানুষেরা আমার লেখা তো পড়তে পারে না। দিল্লি ও জয়পুরে কবিতা পড়তে গিয়ে বুঝেছি, অনুবাদ না হওয়ায় অন্য ভাষার পাঠকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিকূলতা তৈরি হচ্ছে। কয়েকবছর আগে আমার ৫০টি কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন বিশিষ্ট অনুবাদক সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান। নানান কারণে সেগুলো গ্রন্থিত হয়নি। সম্প্রতি বর্ধমানের মানকর কলেজে যাওয়ার কথা ছিল দেশভাগ নিয়ে আন্তর্জালিক সেমিনারে উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে। কিন্তু করোনার কারণে আর যাওয়া হয়নি। ওই কলেজের বাংলার অধ্যাপক ড. অরিজিৎ ভট্টাচার্যের মাধ্যমে ইংরেজির অধ্যাপক কল্লোল সেনের সঙ্গে পরিচয় হয়। তার ডাকেই যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। সবই আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। আমার ‘নির্বাচিত ২০০ কবিতা’ গ্রন্থ থেকে একই বিভাগের অধ্যাপক ড. স্বাতী রায় চৌধুরী ৪০টি কবিতার অনুবাদ করে পাঠান ‘light of ascension: forty poems by tapan bagchi’ নামে। ষাটের দশকের খ্যাতিমান কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার ভূমিকাধন্য হয়ে বইটি করোনার পরেই প্রকাশ করবে বিভাস প্রকাশনীর রামশংকর দেবনাথ। দ্বিভাষিক এ গ্রন্থের প্রুফ দেখা শেষ করলাম এই করোনাকালের অবকাশে।

ডেইলি বাংলাদেশ: এই করোনার মধ্যে ৪টি গান লিখেছেন, গণমাধ্যমের খবর থেকে জানি। আর কী কী লিখছেন?

তপন বাগচী: হ্যাঁ গান লিখেছি। ৪টি বেড়ে এখন ৬টি হয়েছে। `ব্যান্ড ঘুড়ি’র শিল্পী আকাশ ইসলাম ও সৌরভ ইসলাম গেয়েছে ২টি। প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর গেয়েছেনে ২টি। গানদুটি  তার অনুরোধেই রচিত। অন্য এক শিল্পী ২টি গান গাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর বেশি কিছু আধুনিক গান লিখেছি। বিশিষ্ট সুরকার ফয়সাল আহমেদ ও মোরশেদুল ইসলাম এগুলোর সুর করছেন। এই সময়ে পঠিত গ্রন্থ নিয়ে সমালোচনানিবন্ধ ‍লিখেছি গোটা পাঁচেক। আর করোনা-সচেতন বিষয়ক ছড়া লিখেছি ১০টি। যা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নরসিংদী অঞ্চলের দেওয়ালে লিখেছেন কবি ও চিত্রশিল্পী কাজী বর্ণাঢ্য, হবিগঞ্জের দেওয়ালে লিখেছেন প্লাবন চাষা বিন্দু নামের এক শিল্পী। মাদারীপুরে বিভিন্ন দেওয়ালে আমার ছড়া লেখা হয়েছে এবিসিকে কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে। দৈনিক ইত্তেফাকের জন্য ছড়া লিখেছি। এছাড়া তৃণমূলের একজন সমাজনেতার জীবনের আলেখ্য লিখছি। এটি না-জীবনী, না-গল্প ধরনের একটি গ্রন্থ হবে।

এই যে আপনার সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মিলিত হয়েছি এটিও কি সাহিত্যের কাজ নয়? আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু জ্যোতির্ময় সেন আমার চেয়েও ভালো ছড়া লেখেন, গান লেখেন। তার সঙ্গে আমার মেসেঞ্জোরে কাথাবার্তা হয় ছন্দে। তো এই অবকাশে তার সঙ্গে হয়ে গেল পদ্য-সাক্ষাৎকার। তিনি পদ্যে প্রশ্ন করেছেন, আমার জবাবও থাকে পদ্যে। দুই ফর্মার বেশি হয়ে গেছে কথাবার্তা। এখনো চলছে। এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, খ্যাতিমান সাহিত্য-সমালোচক, কবি ড. তরুণ মুখোপাধ্যায় তার একটি রচনার কাজে আমার সাক্ষাৎকারের জন্য  বেশ কিছু প্রশ্ন পাঠিয়েছেন। সেই জবাবগুলো লিখছি। কবি-সাংবাদিক মোহাম্মদ নূরুল হকের সঙ্গে অনেকটা সময় নিয়ে চলছে লেখালেখি-সংলাপ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবরিনা আফরিন সিলভী নামের এক গবেষক আমার শিশুসাহিত্য নিয়ে সাক্ষাৎকারের জন্য প্রশ্নমালা পাঠিয়েছেন। মূল রচনার চেয়ে সাক্ষাৎকার প্রদানের কাজটিও কম সৃজনশীল নয়! সাক্ষাৎকারকেও আমি সাহিত্যচর্চার অংশ বিবেচনা করি।

আরো একটি কাজ করছি এই করোনাকালে। অনেকদিন ধরেই ‘গোপালগঞ্জের কবিতা’ নামে একটি সংকলন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিশিষ্ট গবেষক ড. মোহাম্মদ আলী খান। সেই উদ্যোগের সঙ্গী হয়ে এখন গোপালগঞ্জের কবিতা সংগ্রহ করছি। কবির পরিচিতি ও নির্বাচিত কবিতার মূল্যায়ন লিখছি।

ডেইলি বাংলাদেশ: জীবনের কাছে কোনো চাওয়া আছে কি?

তপন বাগচী: যতদিন বাঁচি যেন লেখার ক্ষমতা নিয়ে বাঁচি। অসুস্থ অথর্ব হয়ে বাঁচতে চাই না। আর আমার সমাজটা যেন আরো অসুস্থ হয়ে না পড়ে। জীবনের কাছে এইটুকু চাওয়া আমার। 

ডেইলি বাংলাদেশ: তরুণদের লেখা পড়েন নিশ্চয়। আপনার দৃষ্টিতে সম্ভাবনাময় কারা? তাদের লেখার বিশেষ দিকগুলো জানতে চাই।

তপন বাগচী: আমি তো নিজেকে এখনো তরুণ মনে করি। তাই তরুণদের লেখা না পড়ে উপায় নেই। অনেক তরুণ ভালো লিখেছেন। অন্তত আমার চেয়ে ভালো লিখছেন এমন তরুণ আমার চারপাশেই আছেন। ফেসুবকের লাইক আর আহা-উহু কমেন্ট পেয়ে অনেকে নিজেকে সেরা লেখক হিসেবে প্রচার করেন। আমার এক অনুজ তরুণ কবির কথা বলি। খুব ভালো কবিতা লেখে বলে দেশে ও দেশের বাইরে তার সুনাম আছে। একদিন তার ওয়ালে এক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে দেখলাম প্রথম বাক্যটিই ভুল। আমি মন্তব্যের ঘরে লিখলাম যে প্রথম বাক্যটি আবার পড়ো। যেন সে পড়েই বুঝতে পারে এই ভুল। কিন্তু সে আমাকে সরাসরি ফোন করে গালাগাল শুরু করে দিল। আমাকে বানান ঠিক করার ইজারা দেয়া হয়নি বলেও জানিয়ে দিল। সুদর্শন এই তরুণের কাছে আমি এখনো টাকা পাবো। বিপদে পড়লেই টাকা ধার নিত সে অনেকের কাছ থেকেই। সেই টাকা যাতে না চাইতে পারি, সেই কারণে হয়তো আমার সঙ্গে অভব্য আচরণ করেছে। যাদের কাছ থেকে সে টাকা ধার নিয়েছে, তাদের সবার সঙ্গেই নাকি এমন আচরণ করেছে। কিন্তু এক লাইন গদ্য শুদ্ধ লিখতে না পেরে যে কবি হওয়ার সংগ্রামে টিকে থাকা যাবে না, সেই সত্য তাকে কে শেখাবে? তাই তরুণদের লেখা নিয়ে প্রকাশ্যে আর মন্তব্য লিখতে চাই না। সবাই ভালো লিখছেন, এটা ভেবেই সুখ পাবো। তবু সম্ভাবনাময় কিছু নামের কথা বলতেই পারি। ছড়াসাহিত্যে ব্রত রায় ও সুমন্ত রায়ের কথা বলি। কবিতায় মাসুদ পথিক, পিয়াস মজিদ; কথাসাহিত্যে স্বকৃত নোমান, মোজাফ্ফর হোসেন প্রমুখের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। ভালো লাগার দিক হলো, তারা জীবনকে পাঠ করতে পারছে। এদের নিজস্ব এক ভাষাভঙ্গি তৈরি হয়েছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ: যারা নতুন লিখতে এসেছে বা আসতে চাচ্ছে তাদের সম্পর্কে কোনো পরামর্শ?

তপন বাগচী: পরামর্শ দেয়ার পর্যায়ে এখনো উন্নীত হইনি, ভাই। নতুন যারা আসছেন, তাদের বলব পেছনের পথের দিকে একটু তাকানো দরকার। গদ্য-পদ্য যা-ই লিখুন, লালন-রবীন্দ্রনাথ-মধুসূদন-জীবনানন্দ-নজরুল-তারাশঙ্কর-মানিক-বিভূতি-জসীম-মশাররফ-রাহমান যেন তাদের পাঠের অন্তর্গত থাকে। নতুন পথ খুঁজতে গেলে পূর্বপাঠের বিকল্প নেই। তাই পড়ালেখা করেই মাঠে নামতে হবে। তারপর নিজের মতো করে চলতে শেখা যাবে। আর হ্যাঁ, রাজনীতিটা বুঝতে হবে। রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও রাজনীতির ধারণা রাখা যায়। রাজনীতিস্পৃহ ব্যক্তি সাহিত্যিক হলেও সমাজের কোনো কাজে আসে না। সাহিত্যে মানুষের কল্যাণকামনা থাকতে হয়। নইলে তাকে আমার সফল মনে হয় না।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনার ধর্মদর্শন জানতে চাই।

তপন বাগচী: ধর্ম মানে হচ্ছে ধারণ করা। ধৃ+মন= ধর্ম। আগুনের ধর্ম দাহিকা শক্তি। সে দহন করে ও তাপ উৎপন্ন করে। জলের ধর্ম যে পাত্রে রাখা হয় তার আকার ধারণ করে আর নিচু স্থানে গড়িয়ে পড়ে। এরকম প্রতিটি বস্তু ও শক্তির ধর্ম আছে। মানুষেরও ধর্ম আছে, যার নাম মানবিকতা। আমার ধর্ম মানবিকতা। এর বাইরে যেতে চাই না। সম্প্রদায়, বর্ণ ও গোত্রের বাইরে এসে আমি মানবিকতার সাধনা করতে চাই। 

ডেইলি বাংলাদেশ: রাজনীতিদর্শন?

তপন বাগচী: মানুষকে ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো রাজনীতি নেই। মানুষকে ভালবাসতে হলে দেশকে ভালোবাসতে হয়, ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসতে হয়। মা-মাটি-মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের কার্যক্রমই আমার কাছে বড় রাজনীতি। যারা এই দেশের স্বাধীনতার পক্ষে আছে, আমি তাদের পক্ষে। যারা এই দেশকে পিছিয়ে নিতে চায় আমি তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াই। যারা অপসংস্কৃতির লালন করে, আমি তাদের অবজ্ঞা করি। যারা সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা করে, আমি তাদের ঘৃণা করি। এই তো আমার রাজনীতি। এই রাজনীতির জন্য দল লাগে না, সংগঠনের পদ ধারণ করতে হয় না, কেবল দেশকে ভালোবাসলেই এই রাজনীতি করা যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ: ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান সময় খরচ করে আলাপচারিতায় অংশ নেয়ার জন্য।

তপন বাগচী: ধন্যবাদ ডেইলি বাংলাদেশকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/