Alexa সালিসে জুতাপেটায় যুবকের আত্মহত্যা, গ্রেফতার ২

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৯ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৫ ১৪২৬,   ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

সালিসে জুতাপেটায় যুবকের আত্মহত্যা, গ্রেফতার ২

 প্রকাশিত: ২২:১০ ৩ জুলাই ২০১৭  

প্রতিবেশী এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ এনে সালিসে জুতাপেটা করা হয় নুরুল হক খান (৩৬) নামের এক যুবককে। ‘মিথ্যা’ অভিযোগে অপমান করায় ওই ঘটনার পর বিষপানে আত্মহত্যা করেন তিনি। গত শনিবার ঢাকার নবাবগঞ্জের আগলা ইউনিয়নের বেনুখালীতে এ ঘটনা ঘটে। নুরুল বেনুখালী গ্রামের কুব্বাত খানের ছেলে। পরিবারের ভাষ্য মতে, নুরুল মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। তাঁর আচরণে ভুল বুঝে প্রতিবেশী নারীর জা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশ সালিসকারী এক নারী ইউপি সদস্যসহ দুজনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। সালিসে জড়িত অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে নবাবগঞ্জ থানার পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানায়, নুরুল হক খানের সঙ্গে প্রতিবেশী এক নারীর সম্পর্ক রয়েছে বলে গ্রামে রটিয়ে দেন ওই নারীর জা ঝুনু বেগম। এ ঘটনায় গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নিজ বাড়ির উঠানেই সালিসের আয়োজন করেন তিনি। সালিসে উপস্থিত ছিলেন আগলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য রমজান খান, ওই ইউপির সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মহিলা সদস্য ফরিদা পারভীন, স্থানীয় বজলুর রহমান, শেখ কামরুল হোসেন, বেলায়েত হোসেন, ঝুনু বেগমের ভাই শেখ জুম্মন মিয়া, শেখ রফিকুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন। ওই সালিসে সভাপতিত্ব করেন রমজান খান। সালিসে নুরুল হকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো সাক্ষ্য দিতে পারেনি কেউ। এর পরও গ্রাম্য মাতবররা সিদ্ধান্ত দেন নুরুলকে জনসমক্ষে ১০ বার জুতাপেটা করার। তাৎক্ষণিক উপস্থিত নারী-পুরুষ-শিশুদের সামনে নুরুলকে জুটাপেটা করেন ঝুনুর ভাই জুম্মন মিয়া। নুরুলের পরিবারের সদস্যরা জানায়, জুটাপেটার পর অপমান ও লজ্জায় কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির একটি ঘরে গিয়ে মুখ লুকান নুরুল। বিকেল ৫টার দিকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘরে ঢুকে তাঁকে পড়ে থাকতে দেখে। দ্রুত তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসক জানিয়েছেন, বিষপানে মৃত্যু হয়েছে নুরুলের। নুরুলের ছোট ভাই নাঈম খান বলেন, তাঁর ভাই মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। তিনি প্রতিবেশী ওই নারীর বাড়িতে মাঝেমধ্যে আসা-যাওয়া করতেন। কিন্তু কখনো খারাপ কিছু শোনেনি কেউ। নাঈম বলেন, ‘ঈদের তিন দিন আগে হঠাৎ করেই অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ এনে ওই নারীর বাড়ির অন্যরা আমাদের বাড়িতে এসে দুই দফা ভাঙ্চুর চালায়। এরপর পরিকল্পিতভাবে বিচারের আয়োজন করে। আমার ভাই যদি দোষী হয় তাহলে উপযুক্ত প্রমাণসহ আইনের হাতে তুলে দিত—আমাদের দুঃখ ছিল না। কিন্তু গ্রামের নারী-পুরুষ ও শিশুদের সামনে জুটাপেটা করায় আমার ভাই অপমানে আত্মহত্যা করেছে। ’ নাঈম অভিযোগ করেন, তাদের সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে পরিকল্পিতভাবে মাতবরদের দিয়ে এ কাজ করেছে ওই পরিবারের লোকজন। তিনি এর উপযুক্ত বিচার দাবি করেন। ওই সালিসের সভাপতি ইউপি সদস্য রমজান খান গ্রাম্য সালিসে রায়ের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘সবাই মিলে নুরুলকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। তাই তাকে জুটাপেটা করা হয়েছে।’ তাঁর দাবি, নুরুল খারাপ ছিলেন। তাঁর নামে থানায় জিডিও করা হয়েছে। জিডি করা হলে কেন পুলিশে দেওয়া হলো না—এ প্রশ্নের জবাবে ইউপি সদস্য রমজান বলেন, ‘স্থানীয়দের উপস্থিতিতে সবার মতামত নিয়ে শাসন করা হয়েছে মাত্র।’ এদিকে অভিযোগকারী ঝুনু বেগমের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। নুরুলের আত্মহত্যার পর তিনি গাঢাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। নবাবগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জিন্নাৎ আলী আনসারী বলেন, এ ঘটনায় নিহতের মা বাদী হয়ে শনিবার রাতে নবাবগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেছেন। মামলায় নাম উল্লেখ করে ১৩জন এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও সাত-আটজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার ভিত্তিতে সালিসকারীদের অন্যতম বজলুর রহমান ও মহিলা ইউপি সদস্য ফরিদা পারভীনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ডেইলি বাংলাদেশ/আইজেকে