Alexa সামাজিক পচনের ফলই ভোগ করছে মানুষ

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ২ ১৪২৬,   ১৭ মুহররম ১৪৪১

Akash

সামাজিক পচনের ফলই ভোগ করছে মানুষ

 প্রকাশিত: ১৬:৪৫ ৯ জুলাই ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

‘সৃষ্টির সেরা জীব’ মানুষ। অথচ সমাজের মানুষের বর্তমান অবস্থা দেখে মানুষকে আদৌ সৃষ্টির সেবা জীব অভিধায় অভিহিত করা যায় কিনা, তা নিয়ে ধন্ধে পড়তে হয় বৈকি। 

মানুষ তার মানবিকতা হারিয়ে যেভাবে নানান অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তাতে মানুষকে কী অভিধায় অভিহিত করা যেতে পারে? কতটা নিষ্ঠুর-নির্দয় হলে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে পুড়িয়ে কিংবা প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করতে পারে- সেটা ভেবে বিস্ময়ের অন্ত থাকে না। এ কোন সমাজে আমরা বাস করছি? এমন অপরাধপ্রবণ, অসহিষ্ণু ও অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজই কী আমাদের প্রত্যাশিত ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাতকে পুড়িয়ে মারা হলো। প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো বিশ্বজিৎ, রিফাতকে। সামান্য একটি ভ্যানের লোভে আবু শাহিন নামের এক কিশোর যেভাবে প্রকাশ্যে কুপিয়ে রক্তাক্ত-জখম করা হলো, তা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে কি? দেশে এমন লোমহর্ষক নৃশংস ঘটনা দিনদিন বেড়েই চলেছে, যা একটি ক্রমক্ষয়িষ্ণু, পচনশীল সমাজের ইঙ্গিত করে বললে অত্যুক্তি হয় না। বোধ করি সামাজিক এই পচনের ফলই ভোগ করতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে। 

অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, সামাজিক অবক্ষয় দিনদিন চরম আকার ধারণ করছে। এমন কোনো অপরাধ নেই, যা আমাদের সমাজে সংঘটিত হচ্ছে না। স্ত্রী স্বামীকে, স্বামী স্ত্রীকে, মা-বাবা নিজ সন্তানকে, ভাই ভাইকে, সন্তান পিতা-মাতাকে অবলীলায় হত্যা করছে। প্রেমের কারণে, অর্থ সম্পত্তির লোভে সমাজে নানান অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অন্যদিকে হতাশা-নিঃসঙ্গতা-বঞ্চনা-অবিশ্বাস আর অপ্রাপ্তিতে সমাজে আত্মহননের ঘটনাও বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে মাদকাসক্তের হার। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে না পেরে ছেলে খুন করছে বাবা-মাকে, স্বামী খুন করছে স্ত্রীকে কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে। অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য কিংবা কাউকে ফাঁসিয়ে দেয়ার নিমিত্তে নিজের সন্তানকে হত্যা পর্যন্ত করছে। পারিবারিক বন্ধন, স্নেহ ভালোবাসা মায়া-মমতা, আত্মার টান সবই যেন স্বার্থ আর লোভের কাছে তুচ্ছ হয়ে উঠেছে এখন। কিন্তু কেন এই অসহনীয় অবস্থা? এর জন্য কারাই বা দায়ী? 

যে সমাজে আমরা বাস করছি সে সমাজ কেন দিনদিন অনিরাপদ হয়ে উঠেছে- এ প্রশ্নের মিমাংসাই বা কে করবে! কেন আমরা নানান সামাজিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছি। সমাজের একজন সুস্থ এবং বিবেকবান মানুষ হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ব্যক্তিক- প্রতিটি স্থানেই যেন অবক্ষয় জেঁকে বসেছে। মানুষের নৈতিকতা যেন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সামাজিক মূল্যবোধ যেমন ধৈর্য, উদারতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃষ্টিশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ, পারস্পরিক মমতাবোধ ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলি লোপ পেলেই একটি সমাজে সামাজিক অবক্ষয় দেখা দেয়। যা বর্তমান সমাজে প্রকট। সামাজিক নিরাপত্তা আজ ভ‚লুণ্ঠিত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, দেশের সামগ্রিক যে অবক্ষয়ের চিত্র এর থেকে পরিত্রাণের কোনো পথই কি আমাদের খোলা নেই? আমাদের অতীত বিস্মৃতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত, বর্তমান অনিশ্চিত এবং নিরাপত্তাহীনতার দোলাচলে দুলছে এবং ভবিষ্যৎ মনে হচ্ছে যেন পুরোপুরি অন্ধকার। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আলোর দিশা আমরা কীভাবে পাবো- এমন প্রশ্নও অযৌক্তিক হতে পারে না। 

আমরা নানান সময়ে সামাজিক পরিবর্তনের কথা ভাবি। দেশের বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজের পক্ষ থেকেও সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। কেননা, একটি বিশৃঙ্খল, অপরাধপ্রবণ, অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজে বসবাস করে উন্নত রুচি ও সংস্কৃতির অধিকারী হওয়া যায় না। আর সমাজ পরিবর্তন মানে সামাজিক কাঠামো ও সমাজের মানুষের কার্যাবলী ও আচরণের পরিবর্তন। তাদের মানসিকতার পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত ও বিন্যস্ত ভাবনা। নীতিবোধ ও চারিত্রিক মূল্যবোধ সমাজ গঠনের প্রধান শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের কী এখনো সেই নীতিবোধ এবং মূল্যবোধ অবশিষ্ঠ আছে? বলাই বাহুল্য, সামাজিক জীবন ব্যক্তির কাছে এক আশীর্বাদ, এর পূর্ণতা লাভ করে সামাজিক বন্ধনের মাধ্যমে। ফলে সমাজব্যবস্থাও এমন হওয়া উচিত, যাতে ব্যক্তির স্বপ্ন ভঙ্গ না হয়। কিন্তু আমরা কী দেখতে পাচ্ছি। সমাজে অপরাধ এতটাই বেড়েছে যে একদিকে ব্যক্তি নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ অন্যদিকে সমাজও ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। এটা প্রতিরোধে প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা। এই দায়িত্ব নিতে হবে পরিবার ও সমাজকেই। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও যথেষ্ট করণীয় রয়েছে। সমাজের একশ্রেণির বর্বর পাষণ্ড মানুষের হাতে অনেকের জীবনই বিপন্ন হয়ে পড়ছে, অবলীলায় জীবন চলে যাচ্ছে। এমনকি শিশুর জীবনও চলে যাচ্ছে আপনজনের হাতে। এই ধরনের আত্মঘাতী প্রবণতা রোধ করতে না পারলে একদিকে যেমন সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে অন্যদিকে পরিবারের সদস্যরাও থাকবে নিরাপত্তাহীন। পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনবে। সুতরাং সময় থাকতেই সাবধান হওয়া জরুরি। 

বলার অবকাশ নেই যে, চারিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে যেকোনো বিবেকবান মানুষের রক্ত হিম হয়ে যাওয়ারই কথা। সুতরাং সামাজিক শৃঙ্খলা কেন এভাবে ভেঙে পড়ছে, কেন সামাজিক পচন তীব্রতর হয়েছে- তার কারণ অনুসন্ধান করেই প্রতিকারে নিতে হবে কার্যকর উদ্যোগ। লক্ষ্যণীয় যে, নানান ছলে, প্রতারণায় এমনকি প্রকাশ্যে পরিবারের ভেতর ঢুকে পড়ছে দুর্বৃত্তরা। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা করছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের ভয়াবহ চিত্র ভয়ঙ্করভাবে উদ্বেগজনক। মানুষ অতিমাত্রায় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় যান্ত্রিক হয়ে গেছে। ফলে মানবিক মূল্যবোধ লোপ পেয়েছে। অন্যায়টাকেই তারা স্বাভাবিক মনে করছে। সামাজিক সুস্থতা আনয়নের পাশাপাশি নতুন সমাজ নির্মাণের জন্য এ ধরনের অবক্ষয়কে প্রতিরোধ করতে হবে এবং যে কোনো মূল্যে। এ জন্য ব্যাপকভাবে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন এবং এর কোনো বিকল্প নেই।

আমি মনে করি, প্রতিনিয়ত যারা সমাজকে, রাষ্ট্রকে পদে পদে কলুষিত করছে, সমাজকে ভারসাম্যহীন ও দূষিত করে তুলছে, সমাজের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষুণœ করছে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে যেমন রুখে দাঁড়াতে হবে, তেমনইভাবে এগিয়ে আসতে হবে জনগণকে। সামাজিক হতাশার কারণগুলো চিহ্নিত করে রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে তা নিসরসনের। এর পাশাপাশি বহুল উচ্চারিত ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দখল ও দলীয়করণের ব্যাপারগুলো রোধে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের নিতে হবে কার্যকর উদ্যোগ। যেহেতু নৈতিক শিক্ষার প্রথম ও প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিবারকে বিবেচনা করা হয়, সেহেতু নৈতিকতার শিক্ষা পরিবার থেকেই দিতে হবে। সমাজের স্বাভাবিক ও সুস্থ গতিপ্রবাহ রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত তাদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ারও বিকল্প থাকা উচিত নয়।   

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর