সাবধান, করোনা এসেছে দ্বারে

ঢাকা, শনিবার   ২৮ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৫ ১৪২৭,   ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

সাবধান, করোনা এসেছে দ্বারে

 প্রকাশিত: ১৬:৩৮ ২১ মার্চ ২০২০  

অমিত গোস্বামী
পরিচিতি ও কাব্যচর্চা দুই বাংলায়। মূলতঃ কবি হলেও উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও পাঠকমহলে জনপ্রিয়। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই কলকাতায়। কর্পোরেটের চাকরি ছেড়ে সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ বেশ দেরিতেই। কিন্তু অগ্রগমন দ্রুত। এরইমধ্যে ১০ টি গদ্য ও উপন্যাস এবং ৪ টি কবিতা সংকলন প্রকাশিত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলতাফ, হুমায়ূন ও বঙ্গবন্ধুর কলকাতার জীবন অবলম্বনে লেখা উপন্যাস ‘মহানির্মাণ’।

দুর্বার গতিতে আগাচ্ছে করোনা। বিশ্ব জুড়ে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেল দশ হাজার। একই সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।

আমেরিকায় মৃতের সংখ্যা এখনো ২১৮। আক্রান্ত ১৫,৫০০ জন। ইটালিতে আরো পাঁচজন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ফের মৃত্যুর নয়া রেকর্ড— ৬২৭। ব্রিটেনে করোনা-মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৪। ফ্রান্সে মৃত্যু ৪৫০ ছুঁয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গিয়েছেন ৭৮ জন। চিন, ইটালি এবং ইরানের পরে স্পেনেও মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। লকডাউন আর্জেন্টিনাতেও। পাকিস্তানে আজ করোনায় তৃতীয় মৃত্যু হয়েছে। সেখানে এখন ৪৫৩ জন কোভিড-১৯ পজিটিভ। এই মুহূর্তে ভারতে করোনা আক্রান্ত বেড়ে ২৩৭। আক্রান্তদের মধ্যে ২০৫ ভারতীয়, ৩২ বিদেশি। ভারতে এখনো পর্যন্ত করোনায় মৃতের সংখ্যা ৫। আমেরিকার ক্যালিফর্নিয়া প্রদেশ পুরোপুরি তালাবন্দি করে ফেলার কথা ঘোষণা করেছেন সেখানকার গভর্নর। বাংলাদেশের খবর এখনো মোটামুটি স্বস্তিদায়ক বলা যায়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক শনিবার জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ২৪জন। মারা গেছেন ২জন।

 আগামী দু’তিন সপ্তাহে চিকিৎসা সরঞ্জামে টান পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে নিউ ইয়র্কে। সেখানে জরুরি-পরিষেবার সঙ্গে জড়িত কর্মীদের ছাড়া বাকি সব পেশার মানুষকে বাড়িতে থাকতে বলছেন গভর্নর। জনগণ চাইছেন গোটা মহাদেশেই লকডাউন করা হোক। অজস্র কর্মকাণ্ডের যজ্ঞস্থল আমেরিকা আজ স্তব্ধ, শূন্য প্রান্তরের মতো। এ রকম কত দিন চলবে? কেউ জানেন না। আশাবাদীরা বলছেন তিন-চার মাস। আবার এমন ভীতিপ্রদ হিসেবও পড়েছি, যা বলছে অন্তত দেড় বছর। ভাইরাসরা বাঘ-সিংহের মতো নীতিতেই শিকার ধরে: সমস্ত মানুষকে সমান ভাবে বেকায়দা করতে পারে না, যারা একটু বুড়ো-টুড়ো, শরীরের ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা যাদের কম, তাদেরই ভালো করে কব্জা করে। ফলে সাবধান না হলে বয়স্ক মানুষদের পক্ষে এই বসন্তই ‘রোদনভরা’ হয়ে উঠতে পারে। অনবরত প্রচারমাধ্যমে বলা হচ্ছে এই ভাইরাসের সঠিক মোকাবিলা করতে হলে ‘আমাদের’ গৃহবন্দি হয়ে থাকা আবশ্যক। কিন্তু কেন এই তালাবন্দি হওয়ার আহ্বান?

ঠিক এই মুহূর্তে আমরা দাঁড়িয়ে আছি স্টেজ টু-এ, এগিয়ে চলেছি স্টেজ থ্রি-র দিকে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর মতে, আমাদের দেশে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ এখনো পর্যন্ত স্টেজ টু-এ আটকে আছে। এখনই সতর্ক না হলে আগামী সপ্তাহে তৃতীয় পর্যায়ে, অর্থাৎ স্টেজ থ্রি-তে পৌঁছে যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। আর এই কারণেই সবাইকে বাড়ি থেকে না বেরনোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। মনে রাখবেন, কোভিড-১৯ ভাইরাস মানুষের শরীর ছাড়া বাঁচতে পারে না। এই মুহূর্তে আক্রান্ত এবং সন্দেহজনক মানুষজন-সহ কেউ কারো সংস্পর্শে না এলে ভাইরাস আর ছড়িয়ে পড়তে পারবে না।

বিদেশ থেকে অসুখ নিয়ে দেশে ফিরেছেন এমন কোনো মানুষের সংস্পর্শ ছাড়া অথবা কোনো আক্রান্ত মানুষের কাছাকাছি না এসেও যদি কারুর শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় তাকে বলে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন। সেটা স্টেজ থ্রি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত আমাদের দেশে আক্রান্তের সংস্পর্শ থেকেই ড্রপলেট ইনফেকশনের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াচ্ছে। অর্থাৎ, আমরা স্টেজ টু-তে আছি। বিদেশে যেখানে রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, সেই দেশ থেকে লোকজনের আসা বন্ধ করা হয়েছে। তবে এখনো এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে কমিউনিটি  ট্রান্সমিশন বা সম্প্রদায়ের সংক্রমণ হবে না। সেটাকে এড়িয়ে যেতে হলে গৃহবন্দি থাকতে হবে। গৃহবন্দি থাকলে ভাইরাসের বাড়বাড়ন্ত কমানো যাবে বলে আশা করা যায়। তবে এর থেকেও মারাত্মক হলো স্টেজ ফোর। যখন কোভিড-১৯ ভাইরাস কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই মহামারীর আকার ধারণ করে। চিনে ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছে। বেশি বয়সের মানুষ ও ধূমপায়ীদের রিস্ক ফ্যাক্টর তুলনামূলকভাবে বেশি। এ ছাড়া অ্যাজমা বা হাঁপানি, সিওপিডি, আইএলডি সমেত ফুসফুসের অসুখ আছে কিংবা ক্রনিক কিডনির অসুখ আছে, তাদের জন্যও কোভিড-১৯ মারাত্মক হতে পারে। অন্য দিকে আর্থ্রাইটিস, আলসারেটিভ কোলাইটিস সমেত অন্যান্য কারণে নানান ওষুধ খেতে হয়, বা যাদের প্রেশার, সুগার কিংবা হার্টের অসুখ আছে, কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ হলে তাদের প্রাণ বাঁচানো মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশে কোভিড-১৯ স্টেজ থ্রি-তে পৌঁছলে তা ভয়ানক হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। এর মূলে আছে পুওর নিউট্রিশনাল স্ট্যাটাস। অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারেও ডায়েট নিয়ে ভুল ধারণা থাকায় সঠিক পুষ্টির অভাব থেকে যায়। এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম।

এবারে প্রশ্ন পরিসেবার ডাক্তাররা কীভাবে চিকিৎসা করবেন! হাসপাতালের বহির্বিভাগের ভিড়ে জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্টের উপসর্গযুক্ত রোগীদের আলাদা করার বিষয়টি এখনও শুরু হয়নি। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর প্রথম শর্তই হল, লাইনে দাঁড়ানো। টিকিটের জন্য লাইন। ওষুধ, কোনো পরীক্ষা করানো বা রিপোর্ট নেয়া— লাইন বিনা গতি নেই। সে সব লাইনে তো নয়ই, বহির্বিভাগে চিকিৎসকদের ঘরেও ১-৫ মিটার দূরত্বের সতর্কবাণী মেনে চলা কার্যত অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে রক্ষাকবচই ভরসা। কিন্তু ‘পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট’ (পিপিই) তো দূর অস্ত্, মাস্ক সরবরাহ করতে গিয়েই নাভিশ্বাস উঠছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। বর্তমান অবস্থায় চিকিৎসকেরা কর্তব্য থেকে বিরত হতে পারেন না। কিন্তু মাস্ক ছাড়া তারা করবেন কী? বহির্বিভাগের ভিড়ে অবিলম্বে ফ্লু-এর উপসর্গযুক্ত রোগীদের আলাদা করা না হলে চিকিৎসকেরাও ভয় পাবেন। ডাক্তারদেরও তো অনেকের বয়স ষাটের বেশি। তারা কি বলেছেন ডিউটি করব না, কেউ বলছেন না। কিন্তু খালি হাতে কিভাবে লড়াই করবেন তারা? জেলার হাসপাতালের ছবি আরও করুণ। আর বিদেশ থেকে আগতদের অনেকেই জেলার বাসিন্দা। এরপরে ডাক্তারদের সাথে যদি আমজনগনের সংঘাত হয় দায়ী কে হবে?

সতর্কতার মাত্রা না বাড়ালে নোভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হতে পারে আমেরিকায়। এবং এই সংখ্যাটা ব্রিটেনের ক্ষেত্রে ৫ লক্ষ। এমনটাই দাবি করেছেন ব্রিটেনের গবেষকরা। ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকার ইতিমধ্যেই এই ভাইরাসের মোকাবিলায় আমেরিকায় প্রবেশে ইউরোপীয়দের উপর এক মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।  ব্রিটেনের করোনা-পরিস্থিতি ইটালি বা ইরানের মতো ভয়াবহ না হলেও ইতিমধ্যেই নড়েচড়ে বসেছে সে দেশের সরকার। সোমবার থেকেই করোনা মোকাবিলায় আরো কড়া পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে বরিস জনসন সরকার। মূলত, ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পর্যবেক্ষণের পরই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটেন। ইটালিতে। ইতিমধ্যেই আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে সে দেশে। আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৩১ হাজারেরও উপরে। সেই ইটালি থেকেই করোনা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে ওই পর্যবেক্ষণ করেছে ইম্পিরিয়াল কলেজের গবেষকরা। ১৯১৮ সালে বিশ্ব জুড়ে ফ্লু-এর কারণে যে অতিমারি হয়েছিল, তার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে করোনাকে। গোটা বিশ্বে ৫ কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কেবলমাত্র ব্রিটেনেই তাতে মৃত্যু হয়েছিল ২ লক্ষ ২৮ হাজার মানুষের। গবেষকদের দাবি, এখনই সতর্ক না হলে মৃত্যুর হারে সে সংখ্যাকেও ছাপিয়ে যাবে ব্রিটেন। হোম আইসোলেশনের মতো পদক্ষেপ করলেও এই সংখ্যায় বেশি হেরফের হবে না বলেও মত বিশেষজ্ঞদের। তাঁদের মতে, এই ভাইরাসের মোকাবিলায় সমাজের বৃহত্তর অংশকে পাব, থিয়েটার বা ক্লাবে জমায়েত থেকে বিরত থাকার মতো কড়া দাওয়াই দিতে হবে। তবেই ওই মৃত্যুহার কমানো যাবে। এই পর্যবেক্ষণের দাবিকেই কার্যত স্বীকৃতি দিয়ে সে নির্দেশ জারি করেছে ব্রিটিশ সরকার। অধ্যাপক নিল ফার্গুসনের পাশাপাশি ওই পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ছিলেন ইম্পিরিয়াল কলেজের ইনফেকশাস ডিজিজ এপিডেমিয়োলজির অধ্যাপক আজরা ঘনি। তার মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ব্রিটেনের সামাজিক তথা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবল চাপ তৈরি হবে। তিনি বলেন, ‘‘সামাজিক ভাবে এবং আমাদের অর্থনীতিতেও এই ব্যবস্থা বেশ চাপ তৈরি করবে।‘  

তাহলে ভারতে বা বাংলাদেশে কি হবে? সাবধানতা অবলম্বন না করলে নিশ্চিত মহামারী।  নবাগত এবং আপাতত অ-নিবার্য ভাইরাসটির সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরিসীম। কিন্তু তার পাশাপাশি ব্যক্তি-নাগরিকের দায়ও অনেক। সমস্ত দেশে। সেই দায়ের মূল কথাটি অতি সংক্ষিপ্ত। এক, নিজের শরীরকে, বিশেষত হাত দুটিকে যথাসম্ভব পরিস্কার ও মুখমণ্ডল থেকে বিযুক্ত রাখা; এবং দুই, সামাজিক মেলামেশা যথাসাধ্য কমানো বা সামাজিক  দূরত্ব যথাসাধ্য বাড়ানো, যাহার পারিভাষিক নাম: সোশ্যাল ডিস্টান্সিং। এই দ্বিতীয় লক্ষ্যটি পূরণের জন্যই স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়েছে। এর সাথে বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার এবং অফিস-কাছারি-সহ সমস্ত পরিসরে জনসমাগম যত দূর সম্ভব কমানোর আয়োজন অবিলম্বে করা  প্রয়োজন। ভারত বা বাংলাদেশের পক্ষে এই মুহূর্তে এই সামাজিক দূরত্ব লালন করবার  প্রয়োজন  অস্বাভাবিক রকমের বেশি, কারণ আগামী দুই থেকে চার সপ্তাহ সংক্রমণের গতি রোধ করে রাখতে পারলে বড় বিপদ এড়াবার সম্ভাবনা অনেকটা বাড়বে। গ্যারান্টি নয়, সম্ভাবনা। গ্যারান্টি আপাতত অলীক স্বপ্ন, সম্ভাবনা যথাশক্তি বাড়াবার চেষ্টাই একমাত্র করণীয়। কিছু সংখ্যক মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন - এত কড়াকড়ি কেন? জনসংখ্যা এবং সংক্রমণের অনুপাত হিসাব দেখিয়ে অনেকেই বলছেন, এখনই এমন বাড়াবাড়ির প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু এখন তর্কের সময় নয়। অন্তত কয়েক সপ্তাহ তো নয়ই। এখন প্রয়োজন শতকরা একশো ভাগ সতর্ক থাকা। এককথায় বলাই যায় যুদ্ধকালীন সতর্কতা। প্রশ্ন আবার কিছু পণ্ডিত করতেই পারেন - এর ফলে মানুষ অনর্থক আতঙ্কিত হয়ে পড়বে না তো? তার উত্তর: আতঙ্ক দূরে রাখার জন্যই চূড়ান্ত সতর্কতার  প্রয়োজন। যাতে বাধ্য হয়ে জনজীবন অচল করতে না হয়, সেই কারণেই জনসমাগম ও  সামাজিক মেলামেশা যথাসম্ভব কমানো জরুরি। এখনও পর্যন্ত পরিস্থিতি মোটের উপর নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু নির্দেশ না মানার যে প্রবণতা আমরা দেখাচ্ছি তাতে ভবিষ্যতে কী দাঁড়াবে কে জানে!

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর