Alexa সাত হাতিও নড়াতে পারেনি পাথরটি, ১২০০ বছর ধরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে

ঢাকা, শনিবার   ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৩০ ১৪২৬,   ১৭ রবিউস সানি ১৪৪১

‘কৃষ্ণের মাখন নাড়ু’

সাত হাতিও নড়াতে পারেনি পাথরটি, ১২০০ বছর ধরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪২ ২ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৩:৫১ ২ ডিসেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

দৈত্যাকার একটি পাথর। এর ওজন ২৫০ টন। ঝুলন্ত একটি অসমান জায়গায় গড়িয়ে না পড়ে বরং ঠাঁই দাড়িয়ে আছে সেটি। তাও আবার ১২০০ বছর ধরে। অবাক হওয়ার মতই ঘটনা এটি। দৈত্যাকার এই পাথরটি ২০ ফুট উঁচু এবং ৫ মিটার প্রশস্ত। আর এতো বড় একটি পাথর কি-না বছরের পর বছর ধরে দাড়িয়ে আছে তাও আবার মাত্র ২ ফুট জায়গার উপর। 

এই বুঝি গড়িয়ে পড়বে পাথরটিপাথরটির নাম ‘কৃষ্ণাজ বাটার বল বা ‘কৃষ্ণের মাখন নাড়ু’। এর আরেক নাম বাণ ইরাই কল। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের ইতিহাস-প্রসিদ্ধ শহর মহাবলীপুরমে অবস্থিত বিশালাকার এই পাথরটি। এটি একটি গ্র্যানাইট প্রস্তরখণ্ড। পাথরটি দেখে মনে হবে এই বুঝি গড়িয়ে পড়বে! তবে না! পাথরটি তার ভারসাম্য ঠিকই বজার রেখেছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টি হলো- বড় সব প্রাকৃতিক দূর্যোগ সুনামি, ঘূর্ণিঝড় এমনকি ভূমিকম্পও নড়াতে পারেনি পাথরটিকে। প্রত্নত্বাত্তিকদের মতে, ১২০০ বছর ধরে দাড়িয়ে আছে ‘কৃষ্ণাজ বাটার বলটি। 

অবিশাস্যভাবে ভারসাম্য বজার রেখেছে পাথরটিগোলাকৃতি সুবিশাল এই ঝুলন্ত পাথরের নাম তাই লোকমুখে হয়ে দাঁড়িয়েছে, কৃষ্ণের ননীর তাল বা মাখন নাড়ু। তামিল ভাষায় এই পাথরকে ডাকা হয় ‘ভনিরাই কাল’ নামে। যার মানে আকাশ দেবতার পাথর। ঝুলন্ত পাথর পৃথিবীতে কম নেই। তবে এতটা গোলাকৃতি ঝুলন্ত পাথর সত্যিই বিরল। বিশেষজ্ঞরা বহুকাল ধরেই পাথরটিকে পরীক্ষা করে আসছেন। তাদের মতে, এমন আকৃতির পাথরই যেন একটি রহস্যের ব্যাপার। বিশ্বের অন্যত্র এই ধরণের যেসব পাথরগুলো রয়েছে, তার কোনোটিই এত বড় নয়।

রহস্যময় এক পাথরপ্রচলিত মিথ
বিজ্ঞানের যুক্তিকেও হার মানিয়েছে এটি। ৫ মিটার ব্যাসের এই পাথরকে ঘিরে স্থানীয়দের লোকগাঁথার শেষ নেই। এর পিছনে রয়েছে নানান গল্পও। ১৯০৮ সালে, মাদ্রাজের গভর্নর আর্থার ললি বলটিকে তার অবস্থান থেকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ এটি অত্যন্ত ভীতিকর পরিস্থিতিতে ছিলো (এমনকি এখনো রয়েছে)। তিনি পাহাড়ের জনপদের সুরক্ষায় এটি সরানোর সিদ্ধান্ত নেন। সাতটি হাতি আনেন পাথরটি সরানোর জন্য। তবে ব্যর্থ হয় হাতিরা। এক ইঞ্চিও সরানো যায়নি পাথরটি। সে বিজ্ঞান হোক বা অতিপ্রাকৃত শক্তি। এই মাখন বল মহাকর্ষকেও হার মানিয়েছে।

হাতি দিয়েও সরানো যায়নি পাথরটিআরেকটি পৌরাণিক কাহিনী হলো, পল্লব রাজা নরসিংহবর্মণ এই পাথরটিকে অপসারণের প্রথম প্রচেষ্টা চালান। তখন বিশ্বাস করা হত, এটি সম্ভবত ‘স্বর্গীয় শিলা’। আর তা সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে রাখা উচিত নয়। এরপর চেষ্টা করে পাথরটি সরাতে পারেননি রাজার বাহিনীরা। এরপর প্রকৃতির খেয়াল, নাকি এর পিছনে দেবতা তথা গ্রহান্তরের আগন্তুকদের কেরামতি বিদ্যমান, এই বিশ্লেষণেই কেটে যায় কয়েকশো বছর।

রহস্যময় পাথরটি দেখতে পর্যটকদের আনাগোনার শেষ নেই!আরেক তথ্যানুসারে, পাথরটি জনসমক্ষে আসে ১৯৬৯ সালে। এক ট্যুরিস্ট গাইড না-কি পাথরটিকে আবিষ্কার করেন। কথিত আছে, চোল বংশের প্রখ্যাত নৃপত রাজরাজ চোল ১০০০ খ্রিস্টাব্দে পাথরটিকে পরীক্ষা করান। তিনি এই পাথরের অনুকরণে এমন কিছু পুতুল বানান, যা ওই পাথরের মতো আশ্চর্য ব্যালান্সে অবস্থান করে। পুতুলটি একটি অর্ধ-গোলাকৃতি ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ সেটিকে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করলে সেটি পড়ে না গিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে।

বৈজ্ঞানিক যুক্তিকেও হার মানিয়েছে পাথরটিমধ্যাকর্ষণের যাবতীয় নিয়মকে কলা দেখিয়ে পাথরটি আজো অবিচল দাঁড়িয়ে আছে, গড়িয়ে পড়ছে না কিছুতেই। অথচ তাকে দেখলেই মনে হয়, এই বুঝি সে গড়িয়ে পড়ল। যদিও কালে কালে এর একাংশ ক্ষয়প্রাপ্ত। আর এজন্যই পাথরটিকে অর্ধ-গোলাকৃতির মনে হয়। অ্যাটলাস অবস্‌কুরার মতে, হিন্দু পুরাণে বালক কৃষ্ণের মাখন চুরির গল্প পাওয়া যায়। সম্ভবত সেই উপাখ্যানের পরিপ্রেক্ষিতেই এই পাথরটির বর্তমান নামটি রাখা হয়েছে। 

অসম্ভব সুন্দর এক দৃশ্য১৯৬৯ সালে প্রকাশিত একটি পর্যটন সাময়িকীতে উল্লেখিত তথ্য অনুসারে, মহাবলীপুরম সফরে এসে ভারতের প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই পাথরটির নাম রাখেন কৃষ্ণের মাখন নাড়ু। এই প্রস্তরখণ্ডটি পেরুর ওলানটাইটাম্বো ও মাচু পিচুর একশিলা স্তম্ভগুলোর চেয়েও বড়ো ও বেশি ভারী। কৃষ্ণের মাখন নাড়ু শহরের একটি জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস