Alexa সাকিবের বীরত্বের সামনে নতজানু গেইল-রাসেলরা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৮ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৩ ১৪২৬,   ১৪ জ্বিলকদ ১৪৪০

সাকিবের বীরত্বের সামনে নতজানু গেইল-রাসেলরা

রুশাদ রাসেল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৩:২৫ ১৮ জুন ২০১৯   আপডেট: ০৩:৪৭ ১৮ জুন ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ইএসপিএন ক্রিকইনফোর বিশ্বকাপ বিষয়ক টক শোর উপস্থাপক রওনক কাপুর এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘তর্কহীনভাবে বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানটার কাছেই হেরেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।’ বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা হবেন কি না সাকিব সেটা হয়তো সময়ই বলে দিবে তবে বিশ্বকাপের এখন পর্যন্ত যে তিনিই সেরা ব্যাটসম্যান সেটা আরেকবার প্রমাণ করলেন উইন্ডিজদের বিপক্ষে। কি বোলিং! কি ব্যাটিং! সব খানেই গেইল-রাসেলদের কুপোকাত করেছে বাংলাদেশ। আর সেই লড়াই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ওয়ানডেতে বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। বল হাতে দুই উইকেট নেয়ার পাশাপাশি উইন্ডিজ পেস বোলারদের শক্ত হাতে শাসন করে তুলে নিয়েছেন টুর্নামেন্টে নিজের দ্বিতীয় শতক। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে এক বিশ্বকাপে টানা দুই শতক হাঁকালেন সাকিব। ৩২২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৫১ বল হাতে রেখে দাপটের সঙ্গে ফেবারিটের মতই উইন্ডিজদের হারালো বাংলাদেশ।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর আগে ৩২০ রান টপকে মাত্র একটি দলই জিততে পেরেছিল সেটা হল আয়ারল্যান্ড। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তারা ৩২৮ রান টপকে জিতেছিল। উইন্ডিজদের দেয়া ৩২২ রানের লক্ষ্যে জয়ের মানে হল বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান টপকে জিততে হবে। এর আগেও ২০১৫ বিশ্বকাপে স্কটিশদের বিপক্ষে ২১৯ রান তাড়া করে জিতেছিল বাংলাদেশ যেটা আজকের দিনের আগ পর্যন্ত দুই নম্বরেই ছিল।  

লক্ষ্যে তাড়া করতে নেমে শুরুতে দারুণ সূচনা পায় বাংলাদেশ। ৮.১ ওভারে দলীয় ৫০ পার করেন দুই ওপেনার তামিম ও সৌম্য। রাসেলকে ছক্কা হাঁকানোর পরের বলেই সৌম্য আপার কাট করতে গিয়ে স্লিপে ক্রিস গেইলের হাতে ক্যাচ দিয়ে বাড়ি ফেরেন। ৫২ রানের ওপেনিং জুটির পর তামিমের সঙ্গে জুটি বাঁধেন সাকিব। এই বিশ্বকাপে এর আগের তিন ইনিংসেই ৫০+ ইনিংস খেলা সাকিব এই ম্যাচেও নিজের সামর্থ্যের ছাপ রাখা শুরু করেন প্রথম থেকেই। দশম ওভারে হোল্ডারকে ৪ মেরে চারের খাতা খোলেন সাকিব।

আগের তিন ম্যাচে কিছুটা নড়বড়ে হওয়া তামিম এই ম্যাচে যেন ফিরে পেতে থাকেন নিজের সেই আগের ফর্ম। দারুণ সব কভার ড্রাইভ এবং সিঙ্গেল নিয়ে উইন্ডিজ বোলারদের ব্যতিব্যস্ত রাখতে থাকেন তামিম ও সাকিব। প্রথম ১০ ওভারে আসে ৭১ রান। ১৪তম ওভারেই ১০০ পার করে বাংলাদেশ এই দুই ব্যাটসম্যানদের কল্যাণে। কিন্তু বড় ইনিংসের ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন তামিম ঠিক তখনই আঘাত হানেন শেল্ডন কটরেল। অর্ধশতক থেকে মাত্র ২ রান দূরে থেকে কটরেলের বুদ্ধিদীপ্ত রান আউটে প্যাভিলিয়নে ফেরেন তামিম। স্ট্রেইট ব্যাকে সোজা শট করলে কটরেল সেটি দ্রুত ধরে সঙ্গে সঙ্গে উইকেটে ছুড়ে মারলে তামিম ক্রিজে ব্যাট দেয়ার আগেই সেটি উইকেটে আঘাত হানে। ১৮তম ওভারে ১২৭ রানে দুই উইকেট হারায় বাংলাদেশ। তখন সাকিব ব্যাট করছিলেন ২৯ বলে ৩৪ রান নিয়ে।

তামিমের আউটের পর ক্রিজে আসেন মুশফিক কিন্তু তিনি বেশিক্ষণ ছিলেন না। থমাসের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে মাত্র ১ রানেই ফিরেন তিনি। এরপরেই চতুর্থ উইকেট জুটিতে তাণ্ডব শুরু করে বাংলাদেশ। ১৯ ওভার শেষে ১৩৩ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর বাংলাদেশ যেন পূর্ণ উদ্যম নিয়ে ম্যাচটিকে নিজেদের করে নেয়ার নেশায় মেতে ওঠে। ২১তম ওভারের প্রথম বলে সিঙ্গেল নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে টানা ৪টি ম্যাচে অর্ধশতক করেন সাকিব। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি এবারের বিশ্বকাপে এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।

মিথুনের পরিবর্তে এদিন খেলতে নামা লিটন বুঝিয়ে দিয়েছেন কেন তাকে বাংলাদেশ দলে অতীব জরুরি। প্রথমবারের মত কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলতে নেমে যেন বুঝতেই দিলেন না তিনি প্রথম খেলতে নেমেছেন। অসাধারণ সব শট এবং দর্শনীয় ছক্কায় পুরো স্টেডিয়াম একাই মাতিয়ে রেখেছিলেন লিটন।

বাংলাদেশের রানরেটকে কখনোই ৬ এর নিচে নামতে দেননি এই দুই ব্যাটসম্যান। সাকিব যাকেই পাচ্ছিলেন তাকেই চার হাকাচ্ছিলেন। ভালো বলকে সম্মান দেখিয়ে ছেড়ে দিচ্ছিলেন কিংবা সিঙ্গেল নিচ্ছিলেন আর খারাপ বলকে বাউন্ডারিতে পরিণত করছিলেন। ২৮তম ওভারে গ্যাব্রিয়েলকে তিনটি চার হাকান সাকিব। পৌছে যান ৮১ রানে। সেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে থেকেই সাকিব ছিল অনড়। ৯৬ রানে থাকাকালীন চার মেরে বিশ্বকাপে নিজের দ্বিতীয় শতক পূরণ করেন তিনি। মাত্র ৮৩ বল থেকে করা এই সেঞ্চুরি করে সাদামাটা উদযাপনই করলেন তিনি, যেন এই সেঞ্চুরিটা তার প্রাপ্যই ছিল। ব্যাপারটা অনেকটা, ‘এ আর এমন কি’ টাইপের মত সাকিবের কাছে।

সাকিবের শতরানের পর পুরো হাত খুলে খেলতে থাকেন লিটন দাস। মাত্র ৪৩ বলে বিশ্বকাপের অভিষেক ম্যাচে অর্ধশতক পূরণ করেন লিটন। সাকিব যখন ১০১ রানে ব্যাটিং করছিলেন তখন লিটনের রান ছিল ৫১। যখন বাংলাদেশ ৫১ বল হাতে থাকতে জয় নিশ্চিত করে তখন লিটনের নামের পাশে ৯৪* এবং সাকিবের নামের পাশে ১২৪*। বোঝাই যাচ্ছে কতটা মেরে খেলেছেন লিটন।

গ্যাব্রিয়েলের করা ৩৮ ওভারে লিটন দাস প্রথম তিন বলে তিনটি ছক্কা হাকান। পুরো গ্যালারি তখন লিটনের নামে গর্জন শুরু করে। ওই ওভারে আরেকটি সিঙ্গেল নেন লিটন। বাকি দুই বলে একটি চার ও একটি সিঙ্গেল নেন সাকিব। গ্যাব্রিয়েলের ওই ওভার থেকে আসে ২৪ রান, যা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ওভার।

৯৯ বলে ১৬টি চার মেরে ১২৪ রানে অপরাজিত থাকেন সাকিব। আর অন্যদিকে লিটন দাস ৬৯ বলে ৯টি চার ও ৪টি বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে অপরাজিত থাকেন ৯৪ রানে। হয়তো উইন্ডিজ আর কিছু রান করলে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিটাই পেয়ে যেতেন তিনি। তবে সে যাই হউক এদিন রেকর্ডের পসরা সাজিয়েছেন সাকিব আল হাসান। তামিমের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশী হিসেবে টানা পাঁচ ম্যাচে ৫০+ ইনিংস খেলেছেন সাকিব। মাত্র ২০২তম ওয়ানডে ম্যাচে ৬ হাজার রান ও ২০০+ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন সাকিব। যেখানে তার ধারাকাছেও কেউ নেই। ১৯০তম ইনিংসে তিনি ৬ হাজার রান পেরিয়েছেন যা কিনা সাঙ্গাকারা, যুবরাজ সিংও পারেননি। ৪র্থ উইকেটে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জুটি লিটন ও সাকিবের করা ১৮৯ রানের জুটিটি। এছাড়া এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের জুটিও এটি।

বল হাতেও সাকিব ছিলেন অনন্য। দলের দরকারের সময় প্রয়োজনীয় দুটি উইকেট নিয়ে উইন্ডিজদের রান ৩৫০ এর নিচে রাখতে ভূমিকা রাখেন। বিধ্বংসী হয়ে ওঠা এভিন লুইসকে ৭০ রানে এবং আগের ম্যাচের হাফ সেঞ্চুরিয়ান নিকোলাস পুরানকে তিনি ফেরান ২৫ রানে। সাকিব ছাড়াও এদিন সব বাংলাদেশি বোলার দারুণ বল করেছেন। বিশেষ করে অধিনায়ক মাশরাফি। ৮ ওভার বল করে কোনো উইকেট না নিলেও মাত্র ৪.৬২ গড়ে ৩৭ রান দিয়েছেন ম্যাশ। পিচের সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যবহারটি তার সঙ্গে করেছেন সাইফুদ্দিন। ক্রিস গেইলের মত ব্যাটসম্যানকে ১৩ বল খেলিয়ে মাত্র শূন্য রানে আউট করেন তিনি। বিধ্বংসী আন্দ্রে রাসেলও এদিন শূন্য রানে আউট হন মুস্তাফিজের বলে। সব মিলিয়ে শাই হোপের ৯৬ রানের সুবাদে ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে তারা ৩২১ রান করে।

ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়া সাকিব বলেন, ‘খুব ভালো লাগছে। ম্যাচের শেষ পর্যন্ত থেকে এসে জয় নিয়ে আসাটা সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক ব্যাপার। আমি গত দেড় মাসে ব্যাটিং নিয়ে অনেক কাজ করেছি যার মূল্য পাচ্ছি এখন। প্রথম ইনিংসে আমাদের বিশ্বাস ছিল আমরা ভালো খেলতে পারলে আমরা জিতব। এটা স্বাভাবিক একটি সংগ্রহ ছিল যা ওয়েস্ট ইন্ডিজ আমাদের দেয়। আমি জানি না কেন আমি তিন নম্বরে ব্যাটিং করাটাকে আমার  জন্য ভালো বলছি, কিন্তু আমার মনে হয় যদি এখানে ব্যাট করতে পারি তাহলে মাঝের সময়টাতে আমি আরো বেশি সময় কাটাতে পারবো ক্রিজে। আমি যদি ৫ নম্বরে নামি তাহলে দেখা যায় ৩০ ওভারের দিকে নামতে হচ্ছে, আমার কাছে সেটা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। মেহেদি বোলিংয়ে ভালো সহযোগিতা করেছে। আশা করছি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও আমরা এই ফর্ম ধরে রাখতে পারবো, আর সমর্থকরা আমাদেরকে এভাবেই সমর্থন দিয়ে যাবে এবং তারা পুরো বিশ্বকাপ জুড়েই অসাধারণভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।’

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএ