সাংবাদিক গান্ধীজি ও সত্যাগ্রহ আন্দোলন
SELECT bn_content.*, bn_bas_category.*, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeInserted, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeInserted, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeUpdated, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeUpdated, bn_totalhit.TotalHit FROM bn_content INNER JOIN bn_bas_category ON bn_bas_category.CategoryID=bn_content.CategoryID INNER JOIN bn_totalhit ON bn_totalhit.ContentID=bn_content.ContentID WHERE bn_content.Deletable=1 AND bn_content.ShowContent=1 AND bn_content.ContentID=135958 LIMIT 1

ঢাকা, সোমবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ৬ ১৪২৭,   ০৩ সফর ১৪৪২

সাংবাদিক গান্ধীজি ও সত্যাগ্রহ আন্দোলন

 প্রকাশিত: ১৪:২৫ ২ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৪:৩৩ ২ অক্টোবর ২০১৯

অমিত গোস্বামী
পরিচিতি ও কাব্যচর্চা দুই বাংলায়। মূলতঃ কবি হলেও উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও পাঠকমহলে জনপ্রিয়। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই কলকাতায়। কর্পোরেটের চাকরি ছেড়ে সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ বেশ দেরিতেই। কিন্তু অগ্রগমন দ্রুত। এরইমধ্যে ১০ টি গদ্য ও উপন্যাস এবং ৪ টি কবিতা সংকলন প্রকাশিত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলতাফ, হুমায়ূন ও বঙ্গবন্ধুর কলকাতার জীবন অবলম্বনে লেখা উপন্যাস ‘মহানির্মাণ’।

ভারতের সংবাদমাধ্যমে ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে যা কিছু লেখালেখি হয়েছে তা তার কর্মজীবন নিয়ে। আজ বরং আলোচনা করা যাক তার সাংবাদিক জীবন নিয়ে এবং তা কিভাবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রভাব ফেলেছিল। 

গান্ধীজির সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি দক্ষিণ আফ্রিকায়। ১৯০৩-০৪ সালে তিনি যোগ দেন একটি ইংরাজি সাপ্তাহিক ‘ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন’ পত্রিকায়। নিতান্তই প্রতিবাদী মনন থেকে তার এই সংবাদপত্রে যোগ দেয়া। তিনি সহজেই উপলব্ধি করেছিলেন যে মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে দেয় সংবাদপত্র। যোগাযোগের সহজ মাধ্যম। তাই তিনি শুরু করলেন নিবন্ধ লেখা। তার লেখনীর মধ্যমে তার চিন্তা-ভাবনা, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, জনগণের আবেগ প্রতিবাদ প্রকাশ করতেন। এই শিক্ষা থেকে তার মনন থেকে জন্ম নিয়েছিল সত্যাগ্রহ আন্দোলন।
গান্ধীজি বুঝেছিলেন আন্দোলন করতে হলে সাধারণ মানুষকে সহজ করে বোঝাতে হবে। এই সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখায় দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন সরকারের টনক নড়ে যায় এবং তার ফলে বেশ কিছু আইনেরও রদবদল করা হয়। যদিও সেটা কতটা মহাত্মা গান্ধীর কলমের কারণে তা স্বীকৃতি না পেলেও তার কলম যে বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিল তার স্বীকৃতি ইতিহাসবিদরাই দিয়েছেন।  

১৯১৪ সালে গান্ধীজি ফিরে এলেন ভারতে। যোগ দিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেন। তিনি মনে করতেন জনগণের কাছে সঠিক খবর পৌঁছে দেয়াই একজন দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের কাজ। হোমরুল লীগ মুম্বাইয়ে প্রতিষ্ঠা করল ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকা। ১৯১৯ সাল নাগাদ গান্ধীজি এই পত্রিকার সম্পাদক হন। এই সময়ে তিনি ‘নাজীবন’ নামক একটি গুজরাতি মাসিক পত্রিকার সম্পাদকেরও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই পত্রিকাটি ১৯৩২ সাল অবধি চলেছিল। এই পত্রিকাটি মূলত গান্ধীজির ঐকান্তিক চেষ্টায় সাপ্তাহিক পত্রিকায় পরিণত হয়। বিখ্যাত সাংবাদিক কে রামরাও গান্ধীজি সম্পর্কে বলেছেলিন, গান্ধীজি সংবাদপত্র জগতের জন্য পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করতেন। সংবাদপত্র জগতের সঙ্গে তার ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল। তিনি তার বক্তব্য, অনুপ্রেরণা ইত্যাদি জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যবহার করতেন সংবাদপত্রকে। শুধুমাত্র ইংরেজ সরকারের দৌলতে তার জেলে থাকার সময়টুকু বাদ দিলে তিনি ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকা দক্ষতার সঙ্গে অনেকগুলি বছর সম্পাদনা করেছিলেন। ভারতীয় সাংবাদিকতায় তার অসামান্য ভূমিকা এখান থেকেই উপলব্ধি করা যায়। তিনি তার আত্মকথায় বলেছিলেন সংবাদপত্রের উদ্দেশ্যে হলো জনগণের মনোভাব জানা এবং তা প্রকাশ করা। তিনি আরো বলেছিলেন জনগণের আবেগকে জাগ্রত করাও সংবাদপত্রের প্রধান উদ্দেশ্যে। গান্ধীজি মনে করতেন জনপ্রিয় সত্যি ঘটনাগুলিকে নির্ভীকভাবে প্রকাশ করা উচিত একটি সংবাদপত্রের।

বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাবার পর গান্ধীজি শুরু করেন ‘হরিজন’ নামক একটি ইংরাজি পত্রিকা। হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য তার সংগ্রাম চিরঃস্মরণীয়। এর জন্য হরিজন পত্রিকাটি ছাড়াও গুজরাতি ভাষায় ‘হরিজন বন্ধু’ এবং হিন্দী ভাষায় ‘হরিজন সেবক’ নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি নিজে হরিজন পত্রিকার সম্পাদক না হয়েও এই পত্রিকার উন্নতির জন্য প্রভূত চেষ্টা করেছিলেন এবং পত্রিকাটিকে আন্দোলনের একটি অস্ত্রে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সংবাদপত্র সম্পর্কে তার নিজস্ব কিছু চিন্তা ভাবনা ছিলো। সম্পাদক হিসাবে তিনি অন্যরকম ভাবধারায় চলতেন। তিনি বিজ্ঞাপন বিরোধী ছিলেন। তার পত্রিকায় কোনো বিজ্ঞাপন ছাপা হতো না। কিন্তু তিনি এটাও চাইতেন না যে পত্রিকা লোকসানে চলুক। সেইকারণে প্রচার বাড়াতে সচেষ্ট ছিলেন। সংবাদপত্র চলতে যে অর্থের প্রয়োজন তা তিনি সংগ্রহ করতেন গ্রাহকদের কাছ থেকে। পত্রিকা চালানোর পর যে অর্থ অবশিষ্ট থাকতো তা তিনি পুনরায় গ্রাহকদের ফেরত দিয়ে দিতেন নতুবা অন্য কোনো ভালো কাজে ব্যবহার করতেন। তিনি নিজে সংবাদপত্র থেকে কোনো অর্থ নিজের জন্য নিতেন না। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবকরূপে নিজের দায়িত্ব পালন করতেন। সরকার কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া কোনো নির্দেশ তিনি মানতে চাইতেন না। তবে এ ব্যপারে সরকারের সঙ্গে সরাসরি কোনো সংঘর্ষ হয়নি।

গান্ধীজি ইংরাজি সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা মন থেকে পছন্দ করতেন না। তিনি মনে করতেন আঞ্চলিক ভাষায় সংবাদপত্র অনেক বেশি করে প্রকাশিত হওয়া উচিত। কারণ এটি অনেক বেশি সাধারণ মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেয়। তথ্য বলছে ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ছিল মাত্র ১২০০, কিন্তু নবজীবন পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ছিলো ১২০০০। আর এই কারণে তিনি পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা কমকরে ২৫০০ না হলে সেই পত্রিকার সম্পাদনা করতে চাইতেন না। পরে দেখা গেল ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে হল ৪৫০০০।

গান্ধীজির লেখনী শৈলী ছিলো সোজা-সাপটা, সহজ-সরল এবং বলিষ্ঠ। তিনি বলতেন পত্রিকা একপাতার হোক, তবু তাতে যেন সুন্দর ভাষায় লেখা থাকে। গান্ধীজি গুজরাতি ভাষার সাংবাদিকতায় এক নতুন জোয়ার নিয়ে এনে ছিলেন। তার সময় থেকেই গুজরাতি ভাষার সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা উন্নত হতে শুরু করে এবং অন্য আঞ্চলিক ভাষার সংবাদপত্রের সঙ্গে তাল মেলাতে শুরু করে শুধুমাত্র তার লিখন শৈলীর জন্য। তার চিন্তা-ভাবনা, স্বাধীনতা সংগ্রামের বক্তব্য, জনগণের মধ্যে যারা দুর্বল শ্রেণি তাদের কথা তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকও দূরবস্থার চিত্র প্রতিফলিত হতো তার লেখায়। আর সেই লেখা সপ্তাহের শেষে পৌঁছে যেত গ্রাহকদের কাছে। তার সাংবাদিকতার ভাষা অন্য সমকালীন সাংবাদিকদের প্রভাবিত করেছিলো। তিনি শুধু নিজের পত্রিকাগুলো নিয়ে ভাবতেন না। তিনি সাংবাদিকতায় এতটাই সম্পৃক্ত ছিলেন, এবং সদাই তার উন্নতির কথা ভাবতেন সেটাও স্মরণযোগ্য। একবার মি. জায়কার গান্ধীজিকে খাদি শিল্পের উন্নতির জন্য ২৫০০ টাকা দান করেছিলেন। কিন্তু গান্ধীজি পুরো টাকাটা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স’ পত্রিকার টিঁকে থাকার লড়াইয়ে দান করে দেন। মতিলাল নেহেরু ছিলেন সেই সময়ে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স’ পত্রিকার মালিক এবং পত্রিকাটির অবস্থা তখন একদমই ভালো ছিলো না। এই ঘটনা প্রমাণ করে ভারতীয় সংবাদপত্রের উন্নতির জন্য গান্ধীজি সদাই আন্তরিক সচেষ্ট ছিলেন। তিনি অন্য পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে মৌখিকভাবে অথবা লেখার মাধ্যমে যোগাযোগ রেখে চলতেন।

গণযোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। গান্ধীজির সংগ্রামী জীবনে এই ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলে দেখা যায় যে এই ভাষার মারপ্যাঁচে বিপক্ষীয় মতবাদীকে সহজেই নিজপক্ষে আনতে পারতেন মহাত্মা গান্ধী। বুঝতে পারতেন রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি। এ সবই সম্ভব হয়েছিল তার এই সাংবাদিক জীবনের জন্যে। কাজেই তিনি আমাদের পূর্বসুরী ছিলেন এই সত্য থেকে আমরা নিশ্চয়ই গর্ববোধ করতে পারি যেমন গর্ববোধ করি বঙ্গবন্ধুর ‘মিল্লাত’ ও ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে সংপৃক্ত থাকার কারণে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর