Alexa সর্বগ্রাসী দুর্নীতি রোধে করণীয়

ঢাকা, শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৭ ১৪২৬,   ২২ মুহররম ১৪৪১

Akash

সর্বগ্রাসী দুর্নীতি রোধে করণীয়

 প্রকাশিত: ১৪:৫১ ২৮ জুন ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করার পরও দেশ থেকে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না।

দেশে ঘুষ-দুর্নীতির এ চিত্র শুধু উদ্বেগেরই নয়, লজ্জারও। একটু পেছনে তাকালেই দেখতে পাই, ২০০১ সালে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) দুর্নীতির ধারণা সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করেছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও শিরোনাম হয়েছিল বিষয়টি। এমন খবর জাতি হিসেবে আমাদের ছোট করে দেয়। বিশ্ববাসীর সামনে লজ্জায় আমাদের মাথা হেঁট হওয়ার মতোই অবস্থা তৈরি হয়। একটি দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, শিল্প-বাণিজ্যসহ সর্বত্রই যখন দুর্নীতির মহোৎসব চলছে বলে তথ্য আসে, তখন সেই দেশের অগ্রগতিই বা কীভাবে নিশ্চিত হয়! পাশাপাশি এটাও সামনে আসে যে, দুর্নীতি প্রতিরোধে আমাদের প্রচেষ্টাগুলো জোরালো নয়। আর দুর্নীতিপরায়ণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেশের সাধারণ মানুষের চরিত্রও নষ্ট করে দিচ্ছেন।  

দুর্নীতির আভিধানিক অর্থ হলো নীতিবিরুদ্ধ, কুনীতি, অসদাচরণ, অসৎ উপায় অবলম্বন, অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন, নীতি-বিরুদ্ধ আচরণ ইত্যাদি। আর প্রতিরোধ অর্থ হচ্ছে-নিরোধ, নিবারণ, বাধাদান, প্রতিবন্ধকতা, আটক, ব্যাঘাত। আভিধানিক অর্থে শব্দটি অত্যন্ত ছোট হলেও এর অর্থ ব্যাপক। দুর্নীতিকে নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা যায় না। বিজ্ঞজনরা দুর্নীতিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। দুর্নীতির ধরন প্রকৃতি বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময়। তাই তা নির্দিষ্টকরণ জটিল কাজ। দুর্নীতি এমন এক ধরনের অপরাধ, যার সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার, সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার যুক্ত। সাধারণ কথায় দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ উৎকোচ গ্রহণ বা মহল বিশেষের অশুভ স্বার্থ হাসিল করাকে দুর্নীতি বোঝায়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের সমাজজীবনে অনৈক্য, হিংসা, দলাদলি, কোন্দল, স্বার্থপরতা, অবিশ্বাস এবং চরম দুর্নীতি বিরাজ করছে। দুর্নীতি আজ রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, সামাজিক, ধর্মীয় ও ব্যক্তি জীবনের সব ক্ষেত্রে বিরাজ করছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তা থেকে বাদ যায়নি। সুতরাং দুর্নীতি কেন আমাদের সমাজে সর্বগ্রাসী রূপে হাজির হয়েছে, সেটি খতিয়ে দেখেই তা প্রতিরোধে সচেষ্টা হওয়া দরকার। 
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কথা বলেছেন। কয়েকদিন আগেও তিনি বলেছেন, ‘দুর্নীতি করব না করতেও দেবো না।’ বর্তমান সরকারের বিগত শাসনামলে মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতির প্রমাণ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্নীতির কারণে বিব্রত হয়েই যে প্রধানমন্ত্রী এবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তা অনুমান করা যায়। দুর্নীতি সব ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে এবং জনগণের সম্পদকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা জাগায়। সেহেতু দেশের প্রতিটি মানুষ দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চায়। আর এ থেকে উত্তরণে অপরিহার্য হলো সরকারের আপসহীন নীতি। অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করেছে। দুর্নীতির তদন্ত, অনুসন্ধান, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুদক প্রয়োজনে মন্ত্রী, আমলাসহ যেকোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদের নজির স্থাপন করেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের উৎসমুখগুলো বন্ধ করার লক্ষ্যে অনলাইনে টেন্ডারসহ বিভিন্ন সেবা খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী প্রকোপ কিছুটা হলেও কমেছে। এরপরও রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি নির্মূল না হওয়া অত্যন্ত পরিতাপের। 

মানুষ কেন দুর্নীতি করে তার উত্তর খুঁজতে ব্যক্তির আর্থ-সামাজিক অবস্থা, মানসিকতা, শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ব্যক্তি ও সমাজ এ দুয়ের পারস্পরিক ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার মাঝেই দুর্নীতির উদ্ভব এবং বিস্তার হয়। তাই ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে কী কী উপাদান দুর্নীতির নিয়ামক হিসেবে কাজ করে তা উদঘাটন করে সেগুলোকে দুর্নীতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। যেমন- ১. ঐতিহাসিক কারণ, ২. অর্থের মূল্যস্তর বৃদ্ধি, ৩. অপর্যাপ্ত বেতন, ৪. রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ত্রæটি, ৫. অপরাধ দূরীকরণে বলিষ্ঠ পদক্ষেপের অভাব, ৬. আইন সম্পর্কে জনগণের সচেতনতার অভাব, ৭. অর্থের মাপকাঠিতে সামাজিক মর্যাদা নিরূপণ প্রবণতা, ৮. ব্যক্তিগত লোভ-লালসা ও ৯. ধর্মীয় শিক্ষার অভাব। এছাড়া দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে জনগণের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন কেউ কেউ। বস্তুুত দুর্নীতির প্রতিকার, প্রতিরোধ ও সংশোধনের জন্য কার্যকর সামাজিক নীতি-কর্মসূচি গ্রহণ, আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং জনমত গড়ে তোলা জরুরি হতে পারে। আর এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে- দুর্নীতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা তথা শিক্ষা কৌশল, বিভিন্ন প্রদর্শনমূলক অনুষ্ঠানমালা, সাহিত্য ও বিচিত্রানুষ্ঠান, স্লোগান, পথযাত্রা, রেডিও-টিভি, ছায়াছবি, দুর্নীতিবিরোধী পোস্টার এবং পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালপ্রণা যেতে পারে। এছাড়া দুর্নীতিবিরোধী চিন্তাচেতনার বিকাশ ও বিস্তার ঘটানো, আন্দোলন পরিচালনার জন্য সংগঠন গড়ে তোলা, নেতৃত্ব ও সংগঠনের প্রতি জনগণের সমর্থন ও আস্থা অর্জন করা,  দুর্নীতি মোকাবেলায় গঠিত সংগঠনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বিবেচনায় দুর্নীতি মোকাবিলায় অধিকতর ফলদায়ক উপায় ও পন্থা নির্বাচন, গৃহীত উপায় ও পন্থার প্রতি জনসর্থন যাচাই ও প্রয়োজনে সংশোধন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতি মোকাবিলায় কার্যকর পন্থা ও উপায় কার্যকরকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতিবাজদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান, দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ বা সামাজিকভাবে বয়কট করা ইত্যাদি। 

লক্ষ্যণীয় যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর আগে দুর্নীতি কমানোর লক্ষ্যে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা কর্মচারিদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করেছেন। এরপরও দুর্নীতি কমছে না। তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, দুর্নীতি কমাতে আমাদের মানসিকতারও বদল ঘটাতে হবে। প্রতিবেদন মতে, জনপ্রশাসনে ১১টি শুদ্ধাচার কৌশলের মাত্র পাঁচটির আংশিক বাস্তবায়িত হয়। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা সংস্থা, পাসপোর্ট ও বিআরটিএ, ভ‚মি অফিসে, সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস, পুলিশ ষ্টেশন, আদালত পাড়া থেকে শুরু করে সব সেবাখাতে অনেকটা প্রকাশ্যেই চলে ঘুষ গ্রহণ। অথচ সেবা প্রাপ্তি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার যারা হরণ করছে তারা কি অপরাধী নয়? দুর্নীতি যে বাড়ছে তা সাদা চোখেই তা দৃশ্যমান। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি কমিয়ে আনার প্রয়াস থেকে সরকারি কর্মচারিদের বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ করেছেন। এটা নিঃসন্দেহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা। তিনি বলেছেন, ‘পে-স্কেলে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন যেহারে বেড়েছে, তা বিশ্বে বিরল। তাই জনগণ যেন সেবা পায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। বেতন যেহেতু বেড়েছে তাই ঘুষ-দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।’ এরপরও দুর্নীতি না কমা হতাশার জন্ম দেয়। আর দুর্নীতির এই অসহনীয় চিত্রই টিআইবি’র চলতি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

পৃথিবীর সবদেশেই কম বেশি দুর্নীতি আছে, ঘুষের রেওয়াজ আছে। এই কথাটির আপেক্ষিক সত্যতা মেনে নিয়েও, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় দুর্নীতির ব্যাপকতাকে অস্বীকার করার কোনো অজুহাত নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, দুর্নীতি জনগণের মনে ব্যাপক হতাশাবোধের জন্ম দিয়েছে। এই হতাশাবোধের মূল কারণ হচ্ছে, দেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যকর ভূমিকা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। অথচ একটি গণতান্ত্রিক এবং স্বাধীন সমাজ ব্যবস্থার প্রধানতম ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল এসব প্রতিষ্ঠানের। সুতরাং দুর্নীতির এই সর্বগ্রাসী থাবা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। যেকোনো মূল্যে গড়তে হবে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। দুর্নীতি নির্মূলে আইনের কঠোরতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাজাও নিশ্চিত করতে হবে- যেহেতু ক্ষুধা এবং দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞ আলোচনায় বার বার উঠে আসছে। প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতি মুক্ত দেশ গড়ার নির্দেশনা যদি সরকার সংশ্লিষ্টরা মেনে চলেন, তাহলে দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা অসম্ভব নয় বলেই মনে করি।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর