Alexa সম্মাননা সমন্ধে একজন লেখকের কথা 

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২২ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৬ ১৪২৬,   ২২ সফর ১৪৪১

Akash

সম্মাননা সমন্ধে একজন লেখকের কথা 

রহিমা আক্তার মৌ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১২ ২১ জুলাই ২০১৯  

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

জীবনের তিনটা 'স'(সংসার, স্বামী, সন্তান) নিয়েই কেটে যায় আমার বেলা-অবেলা। গত ১৯ জুলাই ২০১৯ রোজ শুক্রবার ছিলো একটু আলাদা। সারাদিনের ব্যস্ততা শরীর পুরোই ক্লান্ত।

এশার নামাজ পড়তে গিয়ে ভাবছি শুধু ফরজটুকু পড়েই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বো। তখনি মাথায় আরেকটা কথা আজ তো একটু বেশিই পড়া দরকার। বেশি না হয় নিজের জন্যে সুন্নত নামাজ তো পড়া উচিত। নামাজ শেষ করতে গিয়েই চোখ ভরে যায় পানিতে। আজ আমি (রহিমা আক্তার মৌ) লেখালেখি জীবনের একটা সম্মাননা পেয়েছি। বাসায় ফিরেছি রাত পৌনে নয়টায়। দুপুর তিনটে বের হয়েছি আমি আর রৌদ্র। রৌদ্র আমার বড় সন্তান। 

১৯ জুলাই ২০১৯ রোজ শুক্রবার ঢাকার কাঁটাবনস্থ দীপনপুরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল 'সাহিত্য দিগন্ত কবিতা উৎসব-২০১৯' এবং দৈনিক বাঙালির কণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮-১৯' এর একটি জমজমাট অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত রেজিস্ট্রেশনকৃত ২৩৪ জন কবি-লেখক এবং সাহিত্যানুরাগী উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। 

অনুষ্ঠানে আগত কবিরা কবি বা লেখক হয়ে উঠার গল্প করেন, কবিতাপাঠ করেন এবং আড্ডার বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের উপহারস্বরূপ দেয়া হয় সম্মাননা সনদ, আইডি কার্ড, পলো শার্ট, লাভ ক্যান্ডি এবং ফুল। সবার জন্য ছিলো নাস্তা পানির ব্যবস্থা। 

পুরস্কারপ্রাপ্ত সম্মানিত লেখকদের দেয়া হয় ক্রেস্ট, সম্মাননা সনদ। কবিতাপাঠ ছাড়াও আয়োজন করা হয়েছিলো দুই কবির জন্মদিনের অনুষ্ঠান এবং এক কবি দম্পতির বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে আরো ছিলো গান এবং আলোচন, বক্তৃতা। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী।    

আরো উপস্থিত ছিলেন- কাজী রোজী (সাবেক এমপি এবং বাংলা একাডেমি পুরাস্কারপ্রাপ্ত কবি), আসলাম সানী (বাংলা একাডেমি পুরাস্কারপ্রাপ্ত কবি), গোলাম কিবরিয়া পিনু (কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক-জাতীয় কবিতা পরিষদ), শ্যামসুন্দর শিকদার (কবি, সচিব-বাংলাদেশ সরকার), রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন (বাংলা একাডেমি পুরাস্কারপ্রাপ্ত বরেণ্য কবি), ড. শোয়াইব জিবরান (কবি, লেখক, গবেষক, শিক্ষাবিদ), ড. শাহাদাৎ হোসেন নিপু (কবি, আবৃত্তিকার, উপ-পরিচালক-বাংলা একাডেমি), কানাই সরকার (গ্রুপ পরিচালক, মডেল গ্রুপ অব কোম্পানিজ) সভাপতিত্ব করেন- ফরিদুজ্জামান (কবি, প্রাবন্ধিক, প্রধান সম্পাদক-ত্রৈমাসিক সাহিত্য দিগন্ত, জেনারেল ম্যানেজার (প্ল্যানিং, পেট্রো বাংলা)  

দৈনিক বাঙালির কণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮ পেলেন- তামান্না সেতু (গ্রন্থের নাম, সে রাতে আমিও মেঘ হয়েছিলাম), ড. আশরাফ পিন্টু (গ্রন্থের নাম, বাংলাদেশের প্রবাদে সমাজজীবন), ড. বাকী বল্লিাহ বিকুল (গ্রন্থের নাম, বাংলা উপন্যাসে নদী সমাজ ও শ্রমজীবী মানুষ), রহিমা আক্তার মৌ (গ্রন্থের নাম, গল্পের আয়নায় মানুষের মুখ), আশরাফুল মোসাদ্দেক (গ্রন্থের নাম, নয় দরজা), অর্ণব আশিক (গ্রন্থের নাম, চুম্বনে ভাসা আমার এ শহর), মাহবুবা ফারুক (গ্রন্থের নাম, টুকরো করলে নেবোনা আকাশ), প্রত্যয় হামিদ (গ্রন্থের নাম, স্পর্শ ও প্রেমের পদাবলী), রাফিউদ্দিন রাফি (গ্রন্থের নাম, নিঃশব্দ শব্দাবলী), হাসনাত আমজাদ (গ্রন্থের নাম, একটি লিচু ও অন্যান্য গল্প)

দৈনিক বাঙালির কণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৯ সালে পেলেন- মোস্তফা মনন (গ্রন্থের নাম, অক্ষর), জিয়াউল হক (গ্রন্থের নাম, শত মুক্তিযোদ্ধার বিজয়গাথা), শাহমুব জুয়েল (গ্রন্থের নাম, কথাসাহিত্যে রাজনৈতিক দর্শন ও বিবিধ প্রবন্ধ), ড. গাজী রহমান (গ্রন্থের নাম, শিক্ষাবিদ), ফজলুল হক সিদ্দিকী (গ্রন্থের নাম, গীতিকার), শাহীন রেজা (গ্রন্থের নাম, বৃষ্টি আকাশ এবং একটি দুপুরের গল্প), পরিতোষ হালদার (গ্রন্থের নাম, নৈঃশব্দ্যের জলতৃষ্ণা), হাবিবা বেগম (গ্রন্থের নাম, রোদের চোখ), তৌফিক জহুর (গ্রন্থের নাম, পাখি বিক্রি কাহিনি), অরবিন্দ চক্রবর্তী (গ্রন্থের নাম, রাত্রির রঙ ববিাহ), রহমান মুজিব (গ্রন্থের নাম, বুকের বামে সোনার গাঁ), তাহমিনা বেগম (গ্রন্থের নাম, তুমি আসবে বলে), মাসুমা টফি একা (গ্রন্থের নাম, শুভ্রর বন্ধু পুটয়িা কুমার), রহীম শাহ (গ্রন্থের নাম, মজার ছড়া) 

জাহাঙ্গীর হোসেন কবির এবং কালাচাঁদ চক্রবর্তীর পরিকল্পনায় অনুষ্ঠানটির সমন্বয়কারী ছিলেন কবি নুরুন নাহার শ্রাবনী এবং ফারহানা সোনালী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালক ছিলেন, ড. শামস আলদীন, মুনমুন খান, ফারজানা ইসলাম, হাবিবা মুসতারিন, নাহিদা পাঠান তুহিন এবং জায়েদ হোসাইন লাকী।  

'সাহিত্য দিগন্ত কবিতা উৎসব-২০১৯' এবং বাঙালির কণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮-১৯' এর আয়োজক ছিলেন- জায়েদ হোসাইন লাকী (কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, চিত্রপরিচালক, প্রযোজক, সংবাদ উপস্থাপক, সম্পাদক-ত্রৈমাসিক সাহিত্য দিগন্ত, উপদেষ্টা সম্পাদক-দৈনিক বাঙালির কণ্ঠ), শফিউল আজম (প্রধান সম্পাদক-দৈনিক বাঙালির কণ্ঠ, সম্পাদক-সাপ্তাহিক অপরাধ সূত্র),

নামাজ থেকে উঠে যেতেই অভ্র'র সামনে পড়ি। অভ্র আমার ছোট সন্তান। চোখ দেখে বুঝেছে, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পায়নি ও। দুই সন্তানকে ডেকে নিয়ে সম্মাননার ক্রেস্টটি বের করি।

এমন ক্রেস্ট শুধু লেখালেখিতেই প্রথম নয়। আমার এই ৪৩ বছর বয়সেই প্রথম। লেখাপড়ায় ছিলাম খুব ফাঁকিবাজ, জীবনের তাগিদে পড়তে হবে ক্লাস পাশ করতে হবে। তাই ক্লাসগুলো পার করেছি। সার্টিফিকেট আছে যা তা বলাম মতো নয়। যার বলার মতো সার্টিফিকেট নেই সে আবার ক্রেস্ট পাবে। আমি ছাড়া বাবা মায়ের আরো তিন সন্তান, ওরা সবাই সম্মানিত জায়গায় চাকরি করে। পরিবারের দুই বউ চাকরিজীবী, অন্যদিকে দেবরের বউও। শুধু আমিই নামের পাশে গৃহিনী। গত দশ বছর থেকে লেখালেখি করি। লেখার সঙ্গে সাহিত্যিক, কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক লিখলেও পারিবারিকভাবে কোথাও পেশা লিখতে হলে গৃহিনীই লিখি। আমার সন্তানদের আপত্তি কেন আমি গৃহিনী লিখি। আমার ভাই বোনেরা অনেক বড় বড় পাশ দিয়েছে, প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রেস্ট পেয়েছে। আমি ক্রেস্টের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার গর্ব হয়। আমি ক্রেস্ট নেড়ে চেড়ে দেখি। খোদাই করা নাম ওদের। আমার দুই সন্তান এখনো পড়ালেখায়। রৌদ্র পহেলা জুলাই ২০১৯ চাকরি জীবনে প্রবেশ করেছে। অভ্র নবম শ্রেনীতে পড়ে। ওদের যে কোন প্রতিযোগিতা বা পাশের সার্টিফিকেট আর ক্রেস্ট আমি যত্ন করে রাখি। আমার কাছে ওদের এক একটা ক্রেস্ট অনেক অনেক মুল্যবান। এই তো সেদিন রৌদ্র সি সি (সিএ কোর্স) শেষ করে বড় একটা ক্রেস্ট নিয়ে ফিরেছে। আমি অনেকবার ছুঁয়ে দেখেছি। আমি প্রায় আমার সন্তানদের বলি- "আমি যা পারিনি তোমরা তা পারবে। আমার যা হয়নি তোমাদের তা হবে। আমি যা অর্জন করিনি তোমরা তা করবে। আমার হয়নি তাতে কি তোমাদের হতেই হবে।"

'সাহিত্য দিগন্ত কবিতা উৎসব-২০১৯' এবং দৈনিক বাঙালির কণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮-১৯' এর একটি জমজমাট অনুষ্ঠান আমাকে ও কবিতা পড়ার আর কবি হয়ে উঠার গল্প বলার সুযোগ দিয়েছেন। আমি কবি নই, আমি গদ্য লেখক, তাই লেখক হয়ে উঠার গল্পটাই বলেছি। আসলে লেখক হব বলে লেখালেখি শুরু করিনি। নিজেকে ব্যস্ত রাখতেই একটা পথ খুঁজেছি। একটা সুন্দরের পথ সত্যের পথ। আমি সেই পথ খুঁজে পেয়েছি। স্রোতের অনুকূলে বা প্রতিকূলে নিজেকে ভাসিয়ে দিই নি। নিজের সততাকেই পুঁজি করে কলম চালিয়েছি। সত্যিই আমি আজ খুবই আনন্দিত। সামনের দিকে ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী'র হাত থেকে সম্মাননা পেয়ে গর্বিত বোধ করছি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর