Alexa সম্ভাবনাময় নগর কৃষি

ঢাকা, বুধবার   ১৬ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ১ ১৪২৬,   ১৬ সফর ১৪৪১

Akash

সম্ভাবনাময় নগর কৃষি

 প্রকাশিত: ১৮:৫৯ ৬ এপ্রিল ২০১৯  

প্রথম পরিচয়ে শাওন মাহমুদকে শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদের কন্যা হিসেবেই সবাই চেনে। যদিও তিনি নিজেকে বাংলাদেশের কন্যা চাষি শাওন হিসেবে- পরিচয় দিতে স্বাচ্ছ¡ন্দ্যবোধ করেন। নগর কৃষি বা ছাদ বাগানে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া নিয়মিত লিখছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোতে

আমি পুরোদুস্তর ঘরকন্যা করা মানুষটি নগর চাষি হয়ে ওঠার পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। ছেলেবেলা থেকে প্রকৃতি আমার একান্ত ভালোবাসার বিষয়। অবাক বিস্ময়ে প্রকৃতির খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করা আমার নেশা। ভালোবাসা শুধু মানুষের সঙ্গেই ঘটে; তা নয়। প্রকৃতির সঙ্গেও ঘটে থাকে বলে আমি বিশ্বাস করি। 

ঘরে, উঠোনে, বারান্দায় বা ছাদে বাগান করবার জন্য সবচেয়ে আগে ভালোবাসা দরকার। একটি গাছ তার সম্পূর্ণ আয়ূটুকু আপনার সঙ্গে কাটাবে। তাই যে কোনো গাছকে ঘরে আনবার আগে আপনাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে যে আপনি তাকে সারা জীবনের জন্য তার দত্তক নিতে যাচ্ছেন। 

ইচ্ছা থাকলে উপায়গুলোও বের হয়ে আসে। ঠিক তেমনই আমার ছাদে বাগান করবার ইচ্ছাটা খুব প্রকট আকার ধারণ করেছিল গত ছয় বছর আগে। এর আগে অল্প কিছু টবে পাতাবাহার গাছ আমার ছিল। কিন্তু এক প্রিয় বন্ধুর একতলা বাসাটি ডেভেলোপারকে হস্তান্তর করবার সময়, বেশ কয়টি গাছ আমাকে উপহার দিয়েছিল। 
উপহার হিসেবে গাছগুলোকে আমি দত্তক নিতেই চেয়েছিলাম। নিজে সেধে গিয়ে ইচ্ছে জানিয়ে এসেছিলাম। তখন পর্যন্ত জানতাম সে আবার তাদেরকে ফেরত নিবে। কিন্তু প্রায় ছয় মাস যাওয়ার পর সে আমার চাষাবাদে মুগ্ধ হয়ে গাছগুলোকে সারাজীবনের জন্যই আমার চাষি পরিবারে দান করে দিয়েছিল।

গত ছয় বছরে আমি নিজে নিজে চাষাবাদের খুঁটিনাটি শিখেছি। তবে সহজ উপায়ে সঠিক চাষাবাদ করবার ইচ্ছেটা সবসময়ই প্রাধান্য পেয়েছে, আমার কাছে। চাষাবাদ সবসময়ই ঋতুভিত্তিক হয়ে থাকে এবং তা মাটি, মেঘ, ঝড়, বৃষ্টি, রোদ থেকে না শিখলে কিছুতেই তাতে সফলতা আসে না। আমার ছাদবাগানে অনেক রকমের গাছ আছে। প্রত্যেক গাছের একদম ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র। একেবারে মানুষের মতো তাদের জীবন-যাপন। গাছের অভিমান থাকে, ভালোবাসা আছে, আদর বুঝতে পারে। গাছের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে তারা প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হোক বা যুদ্ধ করে হলেও টিকে থাকবার আপ্রাণ চেষ্টা করে।  বাংলাদেশ। ষড়ঋতুর দেশ। বারো মাসে তেরো পার্বনের দেশ। লাল সবুজ পতাকায় ঢাকা দেশ। তিরিশ লাখ শহীদের রক্তে রাঙানো দেশ। মাটি আর ধূলিকণায় মিশে থাকা প্রতিটি বিন্দুতে সে রক্ত মিশে আছে। এই মাটি আমার পরিচয়, স্বজন আর পরিবারের আবাস। দেশের মাটির প্রতি অন্ধ আরেক ভালোবাসাও আমাকে ছাদবাগান করতে উৎসাহী করেছে। এগারো তলার ছাদে ড্রাম আর টবে যখন মাটি ভরছিলাম তখন মনে মনে ভেবেছিলাম, পুরো বাংলাদেশটাকেই ছাদে নিয়ে এসেছি। যখন মন চাইবে, তখনই দেশকে ছুঁয়ে দিতে পারবো পরম মমতায়, মাটিকে স্পর্শ করে। 

আপণ স্মৃতি থেকেই ষড়ঋতুকে মাথায় রেখে ছাদবাগানে চাষাবাদ করি আমি। বাংলাদেশের মাটি বারো মাসকে কেন্দ্র করে ফল ধরায়, ফুল ফোঁটায় এবং শষ্য ফলায়। চাষাবাদে নামতে হলে সবচেয়ে আগে তাই জেনে নিতে হয় ষড়ঋতুর আচার ব্যবহার। যদিও বা আজকাল আমাদের দেশে হাইব্রিড ফল, ফুল বা শষ্যের প্রচলণ বেশি, তারপরও এই সব কিছুই কোথাও গিয়ে ঋতুকে ভর করেই তাদের বেড়ে ওঠা অব্যাহত রাখে।

আমার ছাদবাগানের ফুলের চাষাবাদ একদম ফাগুণ মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত সাজানো। বাদ বাকি মাসগুলো শীতকালীন সল্প সময়ের ফুলের জন্য। তবে ফল গাছ বা শষ্য হলেও তাদের ফুল দেখার আগ্রহটাও কম নয় আমার। আবার কিছু ফুল বা ফলের গাছ মায়ের অনুরোধে দত্তক আনতে হয়েছে। তিনি হঠাৎ করে বলে ওঠেন, ওই ফুলটা দেখতে মন চায়। আমি নার্সারী ঘুরে ঘুরে তা আনার চেষ্টা করি। যতটা পারি আরকি খুঁজে আনতে।

বসন্তকে বলা হয় ঋতুরাজ। কারণও আছে। ফাগুণ আসবার আগ থেকেই বিøডিং হার্ট বা হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ফুল ফুঁটতে থাকে। সঙ্গে থাকে সারা বছর টুকটুক করে ফুঁটে থাকা অপরাজিতা, গ্রাউন্ড অর্কিড, নয়নতারা, কাটা মুঁকুট, কাটা মেহেদী, টগর, জবা। শরতের শিউলী ফোঁটা শেষ হয়ে আবারও নতুন ডাল পালা মেলা শুরু করে। ফাগুণ শেষ না হতেই থোঁকা থোঁকা লাল রঙ্গনের কুঁড়িতে ভরে ওঠে ছোট গাছটা। সঙ্গে শিউলী ফুঁটতে থাকে অবিরাম।

চৈত্র আসে, হলুদ আর গাঢ় গোলাপী বাগান বিলাস সবুজ পাতাকে ঢেকে নিজেদের রঙে ভরিয়ে রাখা শুরু করে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের প্রিয় ফুলগুলোর মাঝে এই বাগান বিলাস একটি। ঠিক তার পাশেই গাঢ় সোনালি রঙা থোঁকায় থোঁকায় স্বর্ণপ্রভা আমার ছাদবাগানের কোণাটিকে রাঙিয়ে তোলে। আরেকদিকে ফুঁটতে শুরু করে বিভিন্ন রঙা লিলি। সাদা, গোলাপী, লাল, কমলায় ভরে থাকে সেদিকটা। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এ সময়ে সারা বছর খটখটে কাটাময় ডাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কমলা মরু গোলাপ বা মোম গোলাপ অপরুপ কমলা রঙে পুরো গাছটা ভরিয়ে ফেলে। বাসর লতা আর নীলমনির প্রতিটি পাতার ভাজে লাল আর নীল ফুলের গুচ্ছ আরো রঙ যোগ করে।

সত্যি বলতে বছরের এসময়ে ছাদবাগানের শ্রেষ্ঠ সময় বলে মনে করি আমি। দেড় হাজার স্কয়ার ফুটের প্রায় প্রতিটি দিকে তাকালেই, কোনো না কোন ফুল ফুঁটে থাকতে দেখা যায়। 

বৈশাখ আসতে আসতে বেলী, টগর, হাস্নাহেনা, কুন্দ, মাধুরী লতা, স্পাইডার লিলি, টাইগার লিলি তাদের প্রত্যেকের সৌন্দর্য নিয়ে উপস্থিত হয় ছাদবাগানে। বৈশাখ শেষ না হতেই মে ফ্লাওয়ার বা বল লিলি উঁকি দিতে থাকে তাদের মাথা উঁচু করে। এ সময়ে খানিকটা বৃষ্টি শুরু হলে পুরো বর্ষা জুড়েই বিভিন্ন রঙের রেইনলিলি ফুলের আগমণ ঘটে। সঙ্গে প্রাণ ভরিয়ে দেয়া দোঁলনচাঁপা তো ফুঁটতেই থাকে একেবারে শীত না আসা পর্যন্ত। 

লাল আর হলুদ কলাবতী বর্ষা বেশি ফোঁটে। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি আরো একবার দেখা যায় তাদের। কাঠ গোলাপ আর থাই গোলাপ চৈত্র মাস থেকে একদম বর্ষা পর্যন্ত ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকে। 

ছাদবাগানের অ্যারোমেটিক জুঁই নামের লতানো ফুল গাছটি অদ্ভুত এক মায়াময় সবুজ পাতায় ভর করে করে শত শত সাদা জুঁই ফুঁটিয়ে থাকে, বছরে চারবার। ঠিক একই চরিত্রের আরো দুটো লতানো গাছ হচ্ছে ঝুঁমকো লতা এবং নীল চিতা। ঝুঁমকো লতা আমার দুই রঙের আছে। বেগুনী আর লাল। এর সাহেবী নাম 'শঙ্খ গদা চক্র পদ্ম'। কবি রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ফুল এই ঝুঁমকো এবং নীল চিতা। 

পৌষে আমি শীতের ফুল দত্তক আনি। গাঁদা, কসমস, ক্রিসেন্থিমাম, সূর্যমূখী, পিটুনিয়া। এরা তাদের স্বল্প সময়ের জীবনে মনের মাধুরী মিশিয়ে ছাদবাগানকে নানা রঙে এঁকে রাখে সেই শীতের দিনগুলোকে। তবে এই সময়ে ড্রেসিনিয়া এবং অগ্নিশ্বর নামের পাতাবাহারও অদ্ভুত সুন্দর ফুল ফোঁটায়। পাতা ঝরে যায়। বসন্তের জন্য অপেক্ষায় বসে থাকে, নতুন পাতার জন্য। 

ফলের মাঝে সবচেয়ে সুন্দর ফুল ফোঁটায় পেয়ারা, জামরুল, আলু বোখারা আর কামরাঙা। আর বেশির ভাগ শাকের ফুল হলুদ রঙা হয়ে থাকে। সবজির মাঝেও হলুদ ফুলের সংখ্যা বেশি। কুমড়া, স্কোয়াশ, ধুন্দল, শশা এর মাঝে পরে। লাউ, চিচিংগা, ঝিঙে, চাল কুমড়া ফুল সাদা হয়। শীমের ফুল বেগুনী আর ঢেরশ ফুল হলুদ খয়েরী রঙের সংমিশ্রনে ফুঁটে থাকে। 

ষড়ঋতুর বারো মাস ছাদবাগানে ফুলের বাহার দেখতে হলে একটুখানি আমার মতন চিন্তা করে গাছ দত্তক নিলেই বাগান রঙিন হয়ে থাকবে। ছয় বছর ধরে একটু একটু করে আমি আমার ভালোবাসার চাষাবাদ করে আসছি। এখন আমার বাগানে ফল, ফুল আর সবজি মিলিয়ে বিশ থেকে আঠাশ রকমের ফুল ফুঁটছে রোজ। বসন্ত রাজ তার অপার্থিব চমক দেখাচ্ছে। 

আমার এই চাষি পরিচয়ের নাম দিয়েছি আমি, ভালোবাসার চাষাবাদ। ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে বিষেশজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভালোবাসার চাষে কোনো ছক বাঁধা তালিকা নেই। আপনার যদি মনে হয় একটি সবুজ প্রাণ আপনার সঙ্গে বেড়ে উঠবে। সেই চাওয়াতে সবচেয়ে আগে ভালোবাসা প্রয়োজন। ভালোবাসবার উপায় বের করে ফেলা কারো জন্য কখনোই কোনো সমস্যাই বলে মনে হয় না আমার।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর