Alexa সব সময়ই সুসময় ।। মেহেদী শামীম

ঢাকা, রোববার   ১৮ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৩ ১৪২৬,   ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

সব সময়ই সুসময় ।। মেহেদী শামীম

গল্প ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২৪ ৪ আগস্ট ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মনির খুব লাজুক স্বভাবের ছেলে। লজ্জা পেতে তার কখনোই ভালো লাগতো না। কিন্তু তাকে লজ্জা পেতে হতো। কারণ তার স্বভাবে লজ্জা প্রবলভাবে রয়েছে। 
অনেক চেষ্টা করেও সে লজ্জা ভাঙাতে পারেনি। তার মানে এই না সে লজ্জাহীন হতে চায়। সে আসলে একটা স্বাভাবিক তথ্য আদান-প্রদানের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে চায়। কিন্তু হয়ে ওঠে না। সাধারণত মনির অফিসে দুপুরে ভারি কোনো খাবার খায় না।

দুপুরে ভারি খাবার খেলে ঘুম চলে আসে। তখন তার আর অফিসে বেশিক্ষণ থাকতে ভালো লাগে না। অফিসের কাজের প্রয়োজনে সে দুপুরে না খেয়েই থাকে। আজকেও কিছু খায়নি সে দুপুরে। হাত-পা কাঁপছে খুদায়। খুদাকে দমন করার জন্য সে এক কাপ কফি খেয়েছে। কফি খাওয়ার পরে তার মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। আর যখন মনের মধ্যে চৈতন্য ফিরে এসেছে তখনই তার মনে পড়লো আজকে অফিসের বসের কাছে তার একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে হবে। অফিসের ক্যান্টিন থেকে সে সোজা হেঁটে বসের রুমের সামনে দাঁড়ালো। টোকা দেয়ার আগে ভেতর থেকে আলমগীর সাহেব বললো, ‘মনির ভেতরে চলে আসো। তুমি আমার অনেক প্রিয়। কারণ জানতে চাও কেন প্রিয়?’

আপনি বলেন স্যার শুনি।

আলমগীর স্যার একটু আয়েস করে বসে বললেন, ‘যখনই তোমাকে দরকার হয়। তোমাকে মনে মনে খুঁজি তখনই তোমাকে সামনে পাই। এইজন্য তুমি আমার প্রিয়।’
মনির সুযোগ পেয়ে গেছে। এমন সুযোগ খুব কম আসে জীবনে। আলমগীর সাহেবের মনটা আজকে খুব ভালো। এই সুযোগেই তাকে বলে ফেলতে হবে তার দাবির কথা। গলার স্বরটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বলা শুরু করলো, ‘স্যার, আমি বিয়ে করতে চাই আগামী মাসে। আমার কিছুদিন ছুটির দরকার। আপনি যদি অনুমতি দিতেন। তাহলে আমি বিয়ের জন্য একটা তারিখ ঠিক করবো। এবং আমার বেতন বৃদ্ধির জন্য একটা আবেদন করে রেখেছিলাম দীর্ঘদিন আগে। আপনি যদি বিষয়টি দেখতেন স্যার। আমার অনেক উপকার হতো। এরপরের মাস থেকে আপনি যেভাবে বলবেন আমি ঠিক সেইভাবেই কাজ করা শুরু করবো।’

কথাগুলো বলতে এক মিনিটের কম সময় নিয়েছে মনির। কারণ তার মধ্যে আলমগীর সাহেব সময়ের গুরুত্ব নিয়ে অনেক তত্ত্ব ঢুকিয়ে দিয়েছেন।

আলমগীর সাহেব শরীরটা শক্ত করে নিয়ে মনিরের সুঠাম বুকের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘দেখো মনির কোম্পানির অর্থনৈতিক অবস্থা যথেষ্ট খারাপ। তোমার দ্বিতীয় কথাটি আমার পক্ষে রাখা সম্ভব না। এইবার আসি প্রথম কথায়, আগামী মাসে আমরা দুটা প্রোডাক্ট বাজারে নিয়ে আসছি। আমি কিছুতেই তোমাকে বিয়ের জন্য ছুটি দিতে পারছি না। তোমার সময়-জ্ঞান কিছুটা কম। কোম্পানির ও নিজের ক্যারিয়ারের কথা না ভেবে তুমি এখন বিয়ে নিয়ে ভাবছো। একজন তরুণ কর্মীর কাছ থেকে এই কথা শুনতে আমার ভীষণ হতাশা অনুভব হচ্ছে। নিচে গিয়ে টঙের দোকানে এক কাপ চা খাও এবং তারপরে ডেস্কে ফিরে এসে একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা করো। আমার চাকরির অভিজ্ঞতা ১৩ বছর এবং বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা ১২ বছর। আমি তোমাকে বিবাহিত জীবনে জড়াতে না করছি। তার কারণ কী কী হতে পারে। এটা নিয়ে আমাকে একটা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিবে। আমি পড়শুদিন দেখবো। কালকে শুক্রবার তোমার হাতে একটা বেশিদিন রয়েছে। এই বার যাও। আমার হাতে অনেক কাজ।’

মনিরের ভেতরে এক ধরণের অস্থিরতা কাজ করছে। সে চোখে মুখে কিছু দেখতে পাচ্ছিলো না। তার তিনগুন বেশি খুদা লেগে গেছে। অফিসের নিচে এসে তিন প্লেট তেহারি খেয়ে, একটা বোরহানির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে তার মাকে ফোন করলো।

আজকে সে তার মা-বাবার সাথে দেখা করতে তার গ্রামের বাড়িতে যাবে। ওইটাই তাকে জানানোর জন্য ফোন করেছে। মনির মূলত ঢাকাতে থাকে। তার বাবা-মা শরীয়তপুরে থাকে। অফিসে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে এসেছে। অফিস শেষ করার সাথে সাথে শরীয়তপুরের দিকে রওনা হবে। মনির একা যাবে না, সাথে যাবে তার বন্ধু আবির।

তেহারির ঘর থেকে বেড়িয়ে দেখে আবির দাঁড়িয়ে আছে। অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো মনির, ‘তুই এতো তারাতারি কিভাবে আসলি।’

আবির ব্যাগ রেখে বললো, ‘দোস্ত অফিস ছুটি হয়ে গেছে। তাই তোর এখানে চলে আসলাম। ভাবলাম কিছুক্ষণ তোর সাথে কথা বলি। আর তুই কি জানি একটা বলতে চাইছিলি, বলে ফেল শুনি। কী নিয়ে আমার বন্ধু হতাশ এটা জানা দরকার আমার।’

মনির বললো, ‘দোস্ত আমি বিয়ে করতে চাই। আর এটা আগামী মাসেই। অনেক হয়েছে। আর না। এবং এই কথা বলার জন্যই আজকে যাচ্ছি আব্বু-আম্মুর সাথে দেখা করতে।’

আবিরের চোখে-মুখে এক ধরণের তামাশা। আর কণ্ঠে কাঁশি আর হাঁসির একটা সংমিশ্রণ দেখা গেছে। আবির বললো, ‘দোস্ত তোর মাথা নষ্ট। এখন কী বিয়ের সময়। সামনে কত কিছু পরে আছে। আগে তোর জীবনটাকে উপভোগ করতে হবে। এতো তারাতারি বন্দি হয়ে গেলে চলবে। ধূর বেটা। এখন আর আমার শরীয়তপুর যাওয়ার ইচ্ছা নাই। চল তার চেয়ে আমার বান্দরবন যাই। ওখানে বেশি মজা হবে।’

আবিরের কাছে বিয়ে মানে বন্দিদশা। এই দশাগ্রস্থতার মধ্যে আবির না যেতে চাইলেও মনিরের কিন্তু যেতেই হবে। কারণ মনির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে বিয়ে করবে।
তাছাড়া মনির বান্দরবন যেতে পারবে না। কারণ শনিবারে বিবাহ কেন করা উচিত না এটার উপরে একটা প্রেজেন্টেশন দিতে হবে। এটা নিয়ে কাজ করতে হবে তার। আলমগীর সাহেব যে জিনিস এই পর্যন্ত চেয়েছে। তা না পাওয়া অবধি কাউকে শান্তিতে থাকতে দেয় না সে। তার মানে মনির কে শরীয়তপুরে যেতে হবে আব্বু-আম্মুকে বিয়ে করার কথা বলার জন্য। আর ফিরে এসে কেন বিয়ে করা ঠিক হবে না। ওইটার উপরে প্রেজেন্টেশন দিতে হবে। মনিরের জীবনের এক ধরণের টারাপোড়েন যাচ্ছে। তাতে কারো কিছু আসে যায় না।

এর মধ্যে মনিরের কাছে একটা ফোন আসে। সে যার সাথে রুম শেয়ার করে থাকে। সে ফোন করেছে। মনির ফোন ধরেই প্রশ্ন করে, ‘কিরে ভাড়াটিয়া পাইলি?
ফোনের ওই পাশের ছেলেটির নাম নয়ন। উত্তরে নয়ন চুপচাপ। মনির ধমক দিয়ে বলে, ‘কি বেপার কথার উত্তর দিচ্ছিস না কেন?’

নয়ন বলে, ‘দোস্ত আমারে আর দুইটা মাস সময় দে। না হলে আমি বিপদে পড়ে যাবো। এই মুহূর্তে যদি তুই বাসা ছেড়ে দিস। আমি কোথায় গিয়ে থাকবো। কাউকে পাচ্ছি না তোর জায়গায় তোলার মতো। বিয়েটা দুইটা মাস পরে করলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে? বন্ধুর জন্য এইটুকু করতে পারবি না। দেখ আগামী মাসেই আমি চলে যাবো দেশে। একটা মাসই তো।’

নয়ন কথা বলেই যাচ্ছে। মনির চুপ হয়ে গেছে। কথা বলার শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। মনিরের প্রচন্ড ঘুম আসতেছে। তেহারি তাকে খুদা নিবারণ করতে গিয়ে, তার শরীর বেশি পরিমাণ দুর্বল করে দিচ্ছে। সে কখন জানি ফোন টা কেটে আনমনে তাকিয়ে আছে সাঁড়ি বাঁধা দালানের খেত এর দিকে। এই রকম অপলক তাকিয়ে থাকার স্বভাব তার প্রবলভাবে আছে।

আবির বিরক্ত হয়ে চলে গেছে বাস কাউন্টারে। বেশিক্ষণ মনিরের সাথে আবির জমাতে পারেনি। মনির কাজ শেষ করে বেড়িয়েছে কাউন্টারের দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। একটা রসিক রিক্সাওয়ালা পেয়েছে। কিছুক্ষণ যেতে যেতে এই লোকটার সাথে কথা বলে কাটিয়ে দেয়া যাবে এটা ভেবে মনিরের এক ধরণের ভালো অনুভূতির জন্ম নিয়েছে। যদি মনটা হালকা হয়। মানুষ চেষ্টা করে সব সময় তার থেকে একটু কম ক্ষমতাধর মানুষের কাছে নিজের অবস্থা বর্ণনা করতে। এবং বর্ণনা করে সে এক ধরণের শান্তি পায়। সেই শান্তি সংগ্রহে রিক্সার মামাকে মনির বলতে শুরু করলো, ‘মামা, বলেন তো কেমন মেয়ে বিয়ে করা উচিত?

রিক্সাচালক মামা উত্তরটি খুব বিরক্তির সাথে দিলো, পৃথিবীতে আর যাই করেন। বিয়ে টা কইরেন না। বিয়ে আপনার জীবনের সমস্ত শান্তি নষ্ট কইরা দিবো। এই তেলের লেহান শরীরটা আর ঠিক থাকবে না। না পারবেন ঘুমাতে। না পারবেন খাইতে। খালি দৌঁড়ের উপরে থাকতে হইবে।’

মনির রিক্সা চালক মামাকে ভাড়া পরিশোধ করে মাঝ রাস্তায় নেমে যায়। বাকিটা পথ সে হেঁটে হেঁটে চলে যায়। তার হাঁটার গতি বাড়তেই থাকে। তখন তার মনে হয় এই পৃথীবিটা যদি হেঁটে হেঁটে পার করে দেয়া যেতো। কিন্তু তা তো সম্ভব না। কারণ পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গাতো পানির নিচে। আর পানির উপর দিয়ে তো হাঁটা যায় না।
মনিরের বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দুটা। তার মা রান্না করে বসে আছে। ছেলে ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই খেতে দিলো। ক্লান্ত শরীর নিয়ে মনির খেতে বসছে। কারণ খাওয়ার সময়ে মা কে আগে আগে একটু জানিয়ে রাখলে সকালে বাবাকে রাজি করানো সহজ হবে।

মনির ভাতের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে শক্ত হাতে ভাতগুলো মাখছে আর বলছে, ‘মা আমি বিয়ে করতে চাই। এই মাসের মধ্যেই ব্যবস্থা করতে হবে। তুমি একটু বাবাকে রাজি করাও। আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না।’

মনিরের মা অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলো মনিরের দিকে। তারপরে বললো, ‘বাবা আমরাও তোরে বিয়ে করাতে চাই। দেখ তোর ছোট বোনটার বিয়ে না দিয়ে কিভাবে তোকে বিয়ে করাই। তার উপরে আমাদের ঘরের কাজটা তো ধরতে হবে। এই ভাড়া ঘরে থেকে ভালো ঘরের মেয়ে কি বিয়ে দিবে তোর সাথে। আমাদের কিছু দিন সময় দে। আমি সব ব্যবস্থা করবো। এই সময়ে তোর বাবার কাছে বিয়ে কথা বলতেই পারবো না।’

মনির না খেয়েই উঠে গেলো। এমন কাজ সে কোন দিনই করে নাই। মায়ের সামনে থেকে সে কোন দিন এইভাবে উঠে যায়নি। তার রুমের মধে ঢুকে দরজা বন্ধ করে সে ঘুমিয়ে পরে।

রাতে মনিরের মা তার বাবার কাছে সব কিছু খুলে বলে। এবং মনিরের বাবাকে রাজি করায় বিয়ের ব্যবস্থা করার জন্য। মনিরের বাবা মনিরের সাথে কথা বলার জন্য ঘরের মধ্যে অপেক্ষা করে যতক্ষণ না মনির ঘুম থেকে উঠে।

মনির ঘুম থেকে উঠে দেখে সব কিছু অনুকূলে। মনির কিছুটা ভয় পেয়েছিলো রাতের মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য তাকে আবার কথা শুনতে হবে কিনা। কিন্তু না, তাকে কোন কথা শুনতে হয় নি। মনিরের বাবা বিয়ে নিয়ে কথা বলার জন্য মনিরের জন্য অপেক্ষা করছে। এই তথ্য মনির পেয়ে যেন পৃথিবী হাতে পেছে। হাতমুখ ধুয়ে মনির তার বাবার মুখোমুখি। তার বাবা তাকে বলছিলো, ‘বাবা, আমি শুনলাম তুমি বিয়ে করতে চাও। আচ্ছা বাবা আমরা তোমার বিয়ের সমস্ত ব্যবস্থা করবো। সমস্যা নাই। আগামী মাসের পরের মাসে আমি ঘরের কাজটা ধরবো। ঘরের কাজ শেষ হতে হতে দেড় মাস লাগবে। তার মানে ঠিক তিন মাস পরেই আমাদের বিয়ের জন্য সমস্ত প্রস্তুতি হয়ে যাবে। তুমি চিন্তা করো না।’

মনিরে মুখে কোনো কথা নাই। সে বাবার সামনে থেকে উঠে ব্যাগটা কাধে নিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কারো সাথে কোন কথা নাই। পেছন থেকে তার বাবা চিৎকার করে বলতেছিলো। কি বেয়াদপ ছেলে এটা। এই বাড়ির ত্রিসিমানাতে যেন ওরে আর না দেখি। আর কি সব বলছিলো মনিরের কান অবধি আসতে পারিনি। মনিরের কাছে সবকিছু অস্পষ্ট লাগছিলো। মনির এগিয়ে যাচ্ছিলো সামনের দিকে। কখনো পুকুরপাড় ধরে আবার কখনো চিপা গলির মোড় থেকে বড় রাস্তা দিয়ে। আজকে কোন রিকশা না নিয়েই সোজা কাউন্টারে। কখন জানি ঢাকায় ফিরে এলো বাস।

গত ছয় মাস ধরে মনির প্রতি বৃহস্পতিবার অফিসের বসের কাছে এবং গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে তার বিয়ে কথা বলতে যায়। কিন্তু পারে না। কিন্তু আজ পেরেছে। এটা এক ধরণের জয়। মনির নিজের মধ্যে এক ধরণের সফল অনুভূতি নিয়ে বাসায় এসেছে। কোথাও গিয়ে এইবার সে ফিরে আসেনি। ফলাফল যাই আসুক। মনির বাসায় ফিরে ঘরের সমস্ত জামাকাপড় ধুয়ে ফেলেছে। জামা কাপড় ধোয়ার পরে সে এখন অনেক ক্লান্ত। চোখ বন্ধ করতেই তার চোখের ঘুমের আকাশ ভেঙে পরেছে।

রিপা কিছুদিন হলো পড়াশুনা শেষ করা একটা মেয়ে। তার দিকে যেই তাকায় সেই একই বাক্য বলে তাহলো, মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দেন অথবা তুমি বিয়ে করছো না কেন?

রিপার কাউকে উত্তর দেয় না। এবং কারো উত্তর শোনেও না। কিন্তু ইদানীং সে না শুনে পারে না। তাকে শুনতেই হয়। কারণ পৃথিবী অনেক নির্মম হয়ে উঠেছে তার জন্য। বাসায় বড় ভাইয়ের চাপ, আব্বু-আম্মুর চাপ। তোমাকে বিয়ে করতেই হবে। 

এই মুহূর্তে রিপার জন্য এক ডজনের উপরে ছেলে রেডি আছে। শুধু বিয়ের ডেট দেয়া বাকি। আর বাকি সব কাজ শেষ। রিপার বিয়ে এখন এক ফোটা সময়ের ঘটনা। রিপা প্রতিদিন গলার মধ্যে ঘোষণাপত্র ঝুলিয়ে ঘুম থেকে উঠে। তাতে লেখা, ‘আমি এতো তারাতারি বিয়ে করবো না।’ সেই কথার মূল্য দিনদিন কমতে থাকে। ঘরের মানুষ তাকে একদমই সুযোগ দেয় না এই কথা বলার জন্য। তাই মোটা মুটি সবার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয় রিপা।

এমনকি তার ছোট ভাইও তাকে বিয়ে করার জন্য পরামর্শ দেয়। 

আজকে রিপার স্কুলের বন্ধু লাভনি এসেছে রিপার সাথে দেখা করতে। রিপার মন অনেক ভালো। অনেক দিন পরে একটু মন খুলো কারো সাথে কথা বলা যাবে। কিন্তু লাভনি বাসায় ঢুকিয়ে তার স্বামির প্রসংশালাপ শুরু করে দেয়। কোথায় কোথায় ঘুরতে গেলো। কি কি কিনে দিয়েছে এই সব আলাপচারিতা শুরু করলে রিপা লাভনি কে বলে দোস্ত তুই যদি এখন আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাস আমার একটু সুবিধা হয়। তুই কি আমার কথাটা রাখবি? লাভনি ভাবে মনে হয় রিপা মজা করে বলছে। কিন্তু দ্বিতীয় বার বলার পরে লাভনি আর বেশিক্ষণ রিপার বাসায় থাকে না। সে বেড়িয়ে আসে। অবশ্য তাকে বেড়িয়ে আসতে হয়।

রিপার ঘরের মধ্যে নতুন উদাহরণের জন্ম দিয়ে যায় লাভনি। সেই উদাহরণ নিয়ে আজকে সারাদিনের টকশো চলতে থাকে। পৃথিবীটা তার কাছে নিউমার্কেটের ঠেলাঠিলির মতো মনে হতে থাকে।

দরজা বন্ধ করে সে রুমের মধ্যে বসে থাকে। রিপার কাছে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো বিষাক্ত মনে হয়। শনিবার আসলে তো সারাদিন অফিসে থাকতে পারবে। দিন শেষে অফিস থেকে ফিরে এসে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমাতে পারবে কেউ তাকে জ্বালাতে পারবে না। রিপা একটা এনজিও তে কাজ করে। সারাদিন ওখানেই থাকে। কিন্তু শুক্রবার তো ছুটি তাই বাসায় বসে সে সারাদিন, ‘বিয়ে কর, বিয়ে কর’ জিকির শুনতে শুনতে তার জীবন অতিষ্ঠ।

তার যে বিয়ে করতে ইচ্ছে করছে বিষয়টা একদম তা না। কিন্তু সারাক্ষণ তার পিছনে বিয়ের জপমালা নিয়ে পরে থাকা মানুষগুলো দিনে দিনে তার শত্রুর থেকে বেশি খারাপ মনে হতে থাকে।

কে যেন তার রুমে নক করছে। ভেতরে ঢোকার জন্য। সে কিছুতেই দরজা খুলবে না। যখন টের পেলো দরজার সামনে বুয়া। তখন খুলে দিলো। বুয়া কে ঢুকিয়ে সে আবার দরজা বন্ধ করে দিলো। বুয়া ঘর পরিস্কার করার জন্য ঢুকছে। ঘরের জিনিসপত্র পরিস্কার করছে আর বলছে, ‘খালা বিয়েটা করে ফেলেন। প্রেম-পিরিতের কোন দাম নাই। আমি বুঝি খালা আপনি কাউরে লাইক করেন। কারো জন্য ওয়েট করলে তো বুড়ি হয়ে যাইবেন গা। তহন যদি সে আর আপনারে না পাত্তা দেয়। তহন কি করবেন। কন তো?

বেশিক্ষণ এই আলাপ সহ্য করার ক্ষমতা রিপার নেই। ঘর থেকে বুয়াকে বের করে আবার দরজা বন্ধ করে দিলো রিপা। আর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রইলো। কখন শেষ হবে এই যন্ত্রণার দিন।

অনেক কষ্টে রিপার বন্ধের দিন শেষ হলো।

আর অন্য দিকে মনিরের কাজের দিন শুরু হলো। অফিসে অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করতে হবে। অফিস শেষ করে আবার মুখোমুখী হতে হবে আরেকটি সংগ্রামের।
মনির অফিসে ঢুকে নিয়মিত কাজ শুরু করলো। আর বসের কথা অনুযায়ী গুগল থেকে কিছু ডাটা নামিয়ে একটা পেজেন্টেশন তৈরি করে রেখেছিলো মনির। কিন্তু দেখানোর সুযোগ পায়নি। আলমগীর সাহেব হয়তো ভুলে গেছে। অথবা মনে রেখেও অত নির্মমতা দেখায়নি মনিরকে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে অফিস ছুটির দিকে। মনিরের আজকে খুব অফিসে থাকতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু অফিসে কিভাবে সে থাকবে। তার তো অফিসে থাকার সুযোগ থাকবে না। কিছুক্ষণ পরেই তাকে অফিস থেকে বের হতে হবে।

রিপা অপেক্ষা করছে কখন তার অফিস শেষ। যদিও মেয়েটি ঘরের চাইতে অফিসে বেশিক্ষণ থাকতে পছন্দ করেন। কারণ তার বাসার যন্ত্রণার চাইতে অফিসেই শান্তি। যদিও অফিসের একজন কলিগ সব সময়ই তার বিয়ের প্রস্তাব দিতেই থাকে। তাকে না করে দেয়া খুব সহজ রিপার জন্য। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগলেও বেশিক্ষণ বিরক্ত করার সুযোগ পায় না। কারণ রিপা সব সময় কাজের মধ্যে ঢুবে থাকে।

রিপা ঠিক সময় মতো অফিস থেকে বেরিয়ে একটা লোকাল বাসে চড়ে ধানমন্ডি লেকের দিকে যাচ্ছে। বাসের পাশে সিটে বসেছে একজন ভদ্র মহিলা। ওই মহিলা রিপাকে দেখে পছন্দ করে ফেলে। এবং প্রস্তাব দেয়, মা তুমি কি বিবাহিত? 

রিপা বুঝতে পারে এবং কথা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বুদ্ধি খাটিয়ে বলে দেয়, ‘হুমম আমি বিবাহিত। আমার একটা বাচ্চাও আছে।’
ভদ্রমহিলা অবাক হয়। একটা বাচ্চা নেয়ার পরেও কিভাবে একটা মেয়ে তার ফিগার এইভাবে ধরে রাখতে পারে। এইসব চিন্তা করতে করতে কখন জানি সে বাড়ি পৌঁছে যায়।

রিপা বাস থেকে নেমে আপন কফিশপে বসে। কফিতে চুমুক দিতে দিতে গান শুনতে থাকে।

‘সারাদিন তোমায় ভেবে, হলো না আমার কোন কাজ...’

কফি শপের দরজা দিয়ে পা টিপে টিপে ঢুকে রিপার মুখো মুখি এসে বসলো মনির। গলার স্বর হয়তো নেই এক ফোটাও। কথা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু শব্দ উৎপাদন হচ্ছে না।

রিপা প্রশ্ন করে, ‘তুমি কি কাউকে কিছু বলতে পেরেছো? তোমাকে গত ৩৬ ঘন্টায় আমি একটা কল ও করিনি। একটুও জ্বালাইনি। বিয়ের কথা বলে যন্ত্রণা দেইনি। তুমি সময় চেয়েছো আমি দিয়েছি। তুমি কি আমার কণ্ঠ না শুনে থাকতে পেরেছিলে? তুমি কি রাজি করাতে পেরেছো আমাদের বিয়ের বেপারটা।’

মনির চুপ-চাপ তাকিয়ে থাকে। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে। এইভাবে পানি পড়তে থাকলে হয়তো ঢাকা শহরের রাস্তায় এই শীত কালেও পানি জমে জলাশয় হয়ে যাবে। রিপা শক্ত করে মনিরের হাত ধরে। আবার প্রশ্ন করে, ‘তুমি পারো নাই কাউকে বলতে?’

মনিরের গাল-নাক চোখের পানিতে ভিজে যায়। রিপার হাত থেকে হাত ছুটাতে চায় মনির গাল থেকে পানি মুছার জন্য। কিন্তু রিপা কিছুতেই হাত ছাড়ে না।
মনির যখন বলে, ‘রিপা হাতটা একটু ছাড়ো, আমার নাক চুলকাচ্ছে।’

মনির টের পায় তার কথা বলার ক্ষমতা এখনো অকেজ হয়ে যায়নি। সে এখনো কথা বলতে পারে। আর তখন থেকেই সে কথা বলতে থাকে। রিপাকে খুলে বলে, কী কী ঘটেছে তার সাথে গত ৩৬ ঘণ্টা ।

রিপার চোখ দিয়েও পানি ঝড়তে থাকে।

পিছন থেকে ওয়েটার কফি অর্ডারের জন্য তাদের তাঁড়া দেয়।

রিপা-মনির কোন কিছু অর্ডার করে না।

কফিশপ থেকে বেড়িয়ে কাজি অফিসের ভেতরে ঢুকে যায়। তারা অপেক্ষা করে না, আগামী মাস ফেব্রুয়ারি মাস। আগামী মাস ভালোবাসার মাস। ওই মাসের ১৪ তারিখ ভালোবাসা দিবস। ওই দিনেই রিপার ইচ্ছা ছিলো মনির কে বিয়ে করবে।

কিন্তু রিপা ও মনির চিন্তা করলো ভালোবাসার কখনো একটা দিবস হতে পারেনা। ভালোবাসা প্রতিটি দিবসের জন্য।

টাকা দিয়ে উকিল বাবা জোগার করে তারা। স্বাক্ষি ভাড়া করে নিয়ে আসে। কোন পরিবার অথবা কোন বন্ধুদের কোনো খবর না জানিয়ে তারা দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বিবাহের ঠিক পর মুহূর্তে রিপা অনুভব করে তারপাশে শক্ত-সুঠাম একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে যার নাম মনির। কিছুক্ষণ আগেও এই ছেলেটি থরথর করে কাঁপছিলো। এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ রিপা টের পায় তার হাত পা কাঁপছে। দুজনের মধ্যে অনুভূতি বিনিময় পর্ব শুরু হয়ে গেছে ভেবে ঠোঁটে-ঠোঁট চেপে হেসে উঠে রিপা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

Best Electronics
Best Electronics