.ঢাকা, বুধবার   ২০ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ৫ ১৪২৫,   ১৩ রজব ১৪৪০

সব থেকে সস্তার আবাসিক হোটেল

ফাতিমাতুজ্জোহরা

 প্রকাশিত: ২০:২৬ ৭ আগস্ট ২০১৮   আপডেট: ২০:২৬ ৭ আগস্ট ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

যেকোনো জায়গায় বেড়াতে গেলে প্রথমে যে প্রশ্নটি মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় তাহলে সেখানে থাকার মতো হোটেল আছে তো? সে হোটেলের খরচ বাজেটে কুলাবে তো? 

স্বাভাবিকভাবে অধিকাংশ মানুষ থাকার জন্য সবথেকে সস্তার হোটেল খোঁজ করে থাকেন। মনে হতেই পারে, বিশ্বের সব থেকে সস্তার হোটেল কোনটি? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য দূরে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। কারণ পৃথিবীর বুকের সব থেকে সস্তা আবাসিক হোটেল হিসেবে যেটিকে ধারণা করা হয় তার অবস্থান বাংলাদেশে। তাও আবার ঢাকা শহরের পাশ থেকে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। 

হোটেলটির নাম ফরিদপুর মুসলিম হোটেল। যেখানে মাত্র ৩০ টাকা দিয়ে রাত্রি-যাপন করা যায়।

কিছুদিন আগে কয়েকটি গণমাধ্যমে এই হোটেলের সংবাদ প্রকাশিত হয়। তারপর থেকেই এটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি শুরু হয় যে, বিশ্বের কোথায় এর থেকে সস্তায় রাত কাটানো মতো কোনো হোটেল আছে কিনা? তবে এখন পর্যন্ত সেরকম কোন হোটেলের হদিস মেলেনি। তাই ধরে নেয়া যায় যে, ফরিদপুর মুসলিম হোটেল এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা হোটেল। 

এটি মূলত একটি ভাসমান হোটেল যেটি বুড়ি গঙ্গা নদীতে ৫টি পৃথক নৌকার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে। মাত্র ৩০ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে এই হোটেলে যেসব সুবিধা মেলে তাকে আশাতীতও বলা চলে। ঘরগুলো খুব ছোট হতে পারে। একটি কমিউনাল র‍্যাঙ্কের চেয়ে আকারে খুব বেশি বড় হবে না। পানি এবং টয়লেটের ব্যবস্থা ঠিকই আছে। তবে খাবার আলাদা করে কিনে খেতে হয়।

এই হোটেলটি পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। তবে শুধু পর্যাটকরাই যে এই হোটেলে রাত কাটায় তা কিন্তু নয়। স্থায়ী অনেক মানুষ যাদের স্থায়ী আবাসস্থল নাই, তারাও মাঝে মাঝে এই হোটেলে চলে আসে কয়েকটা রাত কম খরচে কাটিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রতিটি অতিথিকে একটি করে লকারের মতো দেওয়া হয়। যাতে তারা তাদের জিনিসপত্র সেখানে নিরাপদে গচ্ছিত রাখতে পারে।

এক সঙ্গে প্রায় ৪০ জনের মতো অতিথি একবারে ৩০ টাকার বিনিময়ে থাকতে পারে এই হোটেলে। আবার এমন অনেকেই আছেন, যারা একটানা ৩ মাসেরও অধিক সময় ধরে এই হোটেলে থেকে যায়। কমিউনাল ব্যাকগুলো ছাড়াও এ হোটেলে আরো ৪৮টি রুম রয়েছে। যেখানে আরো একটু বেশি ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকে। সে রুমগুলোকে বলা হয় কেবিন। এখানে রাত কাটানোর জন্য গুনতে হয় ১২০ টাকা করে।

গোলাম মোস্তফা মিয়া নামে এক ব্যক্তি বর্তমানে ভাসমান হোটেলটি চালায়। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এ কাজ করেন। প্রথমে কাজ শুরু করছিলেন কেবিন বয় হিসেবে। পরে বিয়েও করেন এই হোটেলের এক অতিথির মেয়েকে। ৭ বছর কাজ করে সে ম্যানেজার হয়। ১৯৯১ সালে এই হোটেলে তার বেতন ছিল ৭০০ টাকা। এর ১৭ বছর পর তিনি ৫৪০০ টাকা বেতন পান খাওয়া দাওয়া সহ। এখন বলতে গেলে তিনি নিজেই এই হোটেলের মালিক। 

ফরিদপুর মুসলিম হোটেল এই এ অঞ্চলের এক মাত্র ভাসমান হোটেল নয়, আরো অনেক ভাসমান হোটেল রয়েছে। এই ধরণের ভাসমান হোটেলের ঐতিহ্য এ অঞ্চলে চলে আসছে বহু বছর ধরে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাউসবোট থেকে নৌকায় ভাসমান হোটেলের চিন্তা ভাবনা আসে। ভাগ্যকূলের কুন্ড জমিদার ও ঢাকার নবাবদের একাধিক তরী বুড়িগঙ্গায় ভাসমান অবস্থায় থাকত। এসব প্রমোদতরী রাষ্ট্রীয় সফরে ব্যবহার করা হত। এর মধ্যে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৮ সালে ঢাকায় এসে কুন্ডুদের প্রমোদতরী ১৯২৬ সালে নবাবদের হাউস বোট ব্যবহার করেছিলেন। তাছাড়া ব্রিটিশদের প্রমোদতরী ম্যারী এন্ডুসনের পরে পাগলা ঘাটে ভাসমান রেস্তোরা হিসেবে ব্যবহৃত হত। 

কয়েক বছর আগে আগুনে এই ঐতিহাসিক প্রমোদতরীটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ১৬০৮ সালে মতান্তরে ১৬১০ সালে সম্রাট জাহাঙ্গির ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করে তার সুবেদার খাঁ চিস্তিকে সেখানে পাঠান। চাঁদনী নামের এক প্রমোদতরীতে করে তিনি দলবল সহ বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে নামেন। সে স্থানটি পরে ইসলাপুর নামে পরিচিতি লাভ করে। আর যেখানে চাঁদনী প্রমোদতরী রাখা হত, সেখানকার নামকরণ করা হয় চাঁদনী ঢাকা। এখনও চাঁদনী ঘাট রয়ে গেছে কিন্তু সেখানে কোনো প্রমোদতরী নেই।

বর্তমানে বুড়িগঙ্গায় ভাসমান হোটেলের সংখ্যা ৫টি। তবে এ ভাসমান হোটেলে যারা থাকেন তাদের জীবনের গল্পগুলোও মজার। ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরেও অনেক লোক এই হোটেলে থাকেন। আবার অনেকে আজ এসে কাল চলে যায় তাদের জন্য কেবিনের ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলোর ভাড়া ৭০ টাকা। এই হোটেল গুলো ৯০’এর দশকে সব থেকে বেশি জমজমাট ছিল। এখন যে খুব বেশি খারাপ চলছে তা কিন্তু নয়। 

এক সময় বুড়িগঙ্গায় ভাসত ৫০টিরও বেশি নৌ-হোটেল। এই হোটেলগুলোর অধিকাংশই ছিল মূলত হিন্দু হোটেল। দূর দূরান্ত থেকে আসা হিন্দু ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য এই হোটেলগুলো বানানো হয়েছিল। শুধু খাওয়ার টাকা দিলেই পাওয়া যেত একটা করে কেবিন। তবে এখন আর সে সুবিধা নেই। আছে শুধু থাকার সুব্যবস্থা। 

এক ব্যক্তি ঝুড়িতে ঝুড়িতে ফল বিক্রি করেন সদরঘাটে। প্রায় ষাটের দশক থেকে এই হোটেলে থাকছেন। এ রকম ক্ষুদ্র  অনেক ব্যবসায়ীরা আছেন যাদের বেশি টাকা খরচ করে হোটেলে রাত যাপন করার সামর্থ নাই তারা এ ধরণের হোটেলে কিছু দিনের জন্য থাকেন। যাদের কোন স্থায়ী দোকান বা ব্যবসা রয়েছে পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে তারাও অনেকে বছর ধরেও এই হোটেলে আছেন। 

ভাসমান হোটেলগুলো কম টাকায় থাকার জন্য খুবই ভালো এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও পাওয়া যায়। এমন কি এসব হোটেলে খুবই কম দামে খাবারও পাওয়া যায়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে