সন্তানের জীবনের চেয়ে লেখাপড়া বড় নয়

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

সন্তানের জীবনের চেয়ে লেখাপড়া বড় নয়

 প্রকাশিত: ১৭:২২ ২৫ মে ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

আজকাল পড়াশোনা ছাত্র-ছাত্রী করে না। করে তাদের বাবা-মা। কঠিন পড়াশোনা করে তারা। পরীক্ষাও দেয়। 

কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তব। বন্ধুর মেয়ে ভিকারুননেসায় পড়ে, আমার মেয়ে কেন প্রিপারেটরিতে পড়বে! ভাইয়ের ছেলে নটরডেমে পড়ে, আমার ছেলে কেন সিটি কলেজে পড়বে! খালাতো বোনের মেয়ে হলিক্রসে পড়ে, আমার মেয়ে কেন আজিমপুর গার্লসে পড়বে! ওদের ছেলে মেয়ে যেখানে পড়বে আমার ছেলে মেয়েকেও সেখানে পড়তে হবে। সে তার পড়ার মেধা থাকুক বা না থাকুক। বন্ধুর ছেলে যদি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আমার ছেলেকেও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে হবে। বন্ধুর মেয়ে যদি ডাক্তারি পড়ে আমার মেয়েকে অবশ্যই ডাক্তার হতে হবে। তার জন্য যা করতে হয় করব। যেখানে যেতে হয় যাবো। টাকা খরচ করতে হলে করব। তোষামুদি করতে হলে তাও করব। আজকালের বাবা-মায়ের এটাই প্রতিজ্ঞা। আর যে ছেলেটা অর্থনীতি পড়তে চায়, যে মেয়েটা চারুকলায় পড়তে চায়, তাদের এই ইচ্ছে বাবা মায়ের প্রচণ্ড উচ্চাশার কাছে মার খায়। ছেলে অঙ্কে বড় কাঁচা। ও সায়েন্স পড়তে চায় না। কিন্তু ওকে পড়তে হবে। আত্মীয় স্বজন বন্ধু- বান্ধবের ছেলে পড়ছে। ও পারবে না কেন? মেয়েটা বাংলায় খুব ভালো।  ইচ্ছে বাংলায় অনার্স পড়ার।  না না ঠিক হবে না। ভালো সাবজেক্ট না পড়লে ভালো চাকরি হবে না। 

এই অশুভ আর অনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে। যাদের মেধায় ভালো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা ভালো সবজেক্টে চান্স হচ্ছে না, তাদের জন্য বাবা মা দৌড়াদৌড়ি করছেন।  বাবা মা ভুলে যাচ্ছেন ভালো স্কুল কলেজ বলে কিছু নেই। যেখানে লেখাপড়া ভালো হয়, শিক্ষকরা মানবিক, জ্ঞানের চর্চা করেন, ছাত্রদের মনে জ্ঞানের আলো বিতরণ করেন, সেটাই ভালো স্কুল। ভালো কলেজ। ভালো সাবজেক্ট বলে কিছু নেই। যে কোনো সাবজেক্টই ভালো। প্রয়োজন দক্ষতা অর্জন। একটা দুটো নয়, পাঁচ ছয়টা করে কোচিং করাচ্ছেন সন্তানদের। ওদের পিঠ বেঁকে যাচ্ছে, মন হাঁফিয়ে উঠছে। ও বিকেলে একটু খেলতে চায়। ও সন্ধ্যেয় একটু  খোলা আকাশ দেখতে চায়। ছাদে বসে একটু বাতাস খাবার জন্য মন আঁকুপাকু করে ওর। কিন্তু উপায় নেই। বাবা মা ছেলেবেলা থেকেই বুঝিয়ে চলেছেন, লেখাপড়ায় ভালো না হলে, জীবনে কিছু হবে না। চাকরি হবে না। টাকা হবে না। জীবনে প্রতিষ্ঠা হবে না। কাজেই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। পড়তে হবে।  কোচিং করতে হবে। বাবা-মা বোঝেন কোচিং, খাওয়া, পড়া আর স্কুল এটাই তার সন্তানের জীবন। যে জেীবনের ওপর সন্তানের কোনো হাত নেই। অথচ জীবনটা ওদের। 

ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য কোচিংই যথেষ্ট নয়। প্রভাবশালীদের কাছে দৌড়াদৌড়ি উপঢৌকন প্রদানসহ অনেক কিছু চলে। শিক্ষকরাও বেশ আছেন। কোচিং বাণিজ্য জমজমাট। বড় আর নামকরা স্কুল হলে তো পোয়াবারো। ভর্তির মওসুমে স্কুলের সভাপতি, ম্যানেজিং কমিটিসহ শিক্ষকদের এক একজন ভিআইপি । এই ভিআইপি বানিয়েছেআর কেউ না, গার্জিয়ানরা। 

এখনকার ছেলেমেয়েদের কোনো শৈশব কৈশোর নেই। ঢাকাতে তো নেই-ই, ছোট শহর এমনকি গ্রামেও নেই। গ্রামেও ইংরেজি স্কুলের ছড়াছড়ি।  সেখানকার ছেলেমেয়েদের পিঠেও ব্যাগের বোঝা।স্কুলের পর কোচিং আর কোচিং-এর পর পড়া এই তাদের জীবন। 

নিজের শৈশব কৈশোরের কথা মনে পড়ে। প্রতিবাড়িতেই অনেকগুলো করে ভাইবোন ছিল। সকালে গরম ভাত খেয়ে স্কুলে যেতাম। মাঝে টিফিনে এসে আবার ভাত খেতাম। আর বিকেলে স্কুল ছুটির পরই খেলার মাঠে।  বইপত্র মাঠের কিনারে স্তূপীকৃত। তখনো প্রত্যেকের কাঁধে একটা করে ব্যাগ ওঠেনি। বইপত্র আমরা বুকের সঙ্গে চেপে বা হাতে করেই নিতাম। বাবা মা জানতেনও না কখন স্কুলে গেলাম। কখন ফিরলাম। কখন খেলাম, কখন পড়তে বসলাম। কিন্তু এটুকু ওরা জানতেন আমরা ঠিকই স্কুলে যাচ্ছি। খেলছি। পড়ছি । সায়েন্স নেবার সময় হলে বড় ভাইবোন বা টিচাররাই রেজাল্টের অবস্থা দেখে ঠিক করে দিতেন কে সায়েন্স নেবে কে আর্টস। অভিভাবকদের অগাধ আস্থা আর বিশ্বাস ছিল শিক্ষকদের প্রতি। ওনারা যা করতেন তার ওপরে কেউ কথা বলত না। টিউশনি শব্দটা আমরা জানতাম। কোচিং শব্দটা ছিল অপরিচিত।

আমাদের চারপাশে খোলা আকাশ ছিল। মুক্ত বাতাস ছিল। গাছ গাছালির সবুজ ছিল। নদীর অঢেল ঢেউ ছিল। পাড়া-পড়শিরা ছিল আপনজন। কেউ নানা নানি। কেউ খালা।  কেউ চাচা।  কেউ ভাই। আপন ভাই বোন আর পাড়া পড়শির তফাৎ খুব বড় করে বুঝিনি আমরা। আমরা জানতাম শরীর গঠনের জন্য খাওয়া যেমন দরকার, খেলাও তেমন দরকার। জানতাম মনোজগত গঠনের জন্য নৈতিকতার শিক্ষা যেমন দরকার, সংস্কৃতি চর্চাও দরকার। নৈতিকতার শিক্ষা আর ধর্মীয় শিক্ষা আমরা পরিবার থেকে পেতাম। আর সারাবছর রবীন্দ্র নজরুলের জন্মদিন মৃত্যুদিন, যাত্রা, নাটক, পুতুলনাচ আমাদের মনন গঠনে সাহায্য করত। আমরা কবিতা পড়তাম। পড়তে পড়তে আবৃত্তি শিখতাম। জাতীয় সঙ্গীত গাইতে গাইতে গান আর নাটকে অভিনয় করতে করতে অভিনয় শিখতাম । আমাদের ওপরে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বা উকিল হবার চাপ ছিল না। চাপ ছিল না ভালো রেজাল্ট করা, জিপএ ফাইভ পাবার। হয়ত বাবা মায়ের আকাঙক্ষা ছিল, চাপিয়ে দেননি। পড়াশোনা করার জন্য, খাওয়ার জন্য জবরদস্তি ছিল না। আমরা স্বাধীন ছিলাম। পড়েছি আনন্দে। খেলেছি, সাঁতার কেটেছি, বেড়িয়েছি আনন্দে। 

আমাদের বাবা-মা পুরোনো দিনের মানুষ ছিলেন। আজকের এই নতুন দিনের বাবা মায়েরা কেন এত আগ্রাসী? আমি আগ্রাসী শব্দটা ব্যবহার করছি এ জন্য যে, তারা কেন ভাবেন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া, ভালো স্কুল কলেজে পড়া, জিপিএ ফাইভ পাওয়া ছাড়া জীবনে কিছু করার নেই! জীবন বৃথা! পৃথিবীতে যারা প্রাতঃস্মরণীয় তাদের অনেকেরই লেখাপড়ার ব্যাপারে আগ্রহ ছিলো না। ক্রিস্টোফার কলম্বাস, রবীন্দ্রনাথ, জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস এডিসন, হেনরি ফোর্ড, ওয়াল্ট ডিজনী, সেক্সপিয়র এরা কেউ ভালো ছাত্র ছিলেন না। অথচ এদের জীবনী পড়েই এই ছেলে মেয়েগুলো ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয়। জিপিএ ফাইভ পায়। এরা কখনো খেলে না। সাঁতার কাটে না। এরা হেমিংওয়ের নাম জানে না। সুকান্তের কবিতা পড়েনি। এরা ওমর খৈয়ামের নাম জিজ্ঞাসা করলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এদেরকে বিজয় দিবস কবে জিজ্ঞাসা করলে বলে ২৬ মার্চ আর স্বাধীনতা দিবস বলে একুশ ফেব্রুয়ারি। এরা জাতীয় সঙ্গীত কার লেখা বলতে পারে না। লালনগীতি বা শ্যামাসঙ্গীত বলে যে কিছু আছে এটা এদের নিতান্তই অজানা। এরা জিপিএ ফাইভ পায় কিছুই না জেনে। মুখস্থ কিছু পাতা পড়ে। জীবনের পাঠ না পড়েই। 

আর এদের যেদিন রেজাল্ট বের হবার কথা সেদিন সকাল থেকে স্কুলগুলোর চারপাশ আগলে থাকে সাংবাদিকরা। যারা জিপিএ ফাইভ পায় তারা ভি-চিহ্ন দেখায়। সেসব ছবি সংবাদপত্রের ফার্স্ট পেজে বড় করে ছাপা হয়। টেলিভিশনে এদের ছবি বার বার দেখানো হয়। আর তা দেখে যে ছেলে মেয়েরা জিপিএ পাইভ পায় না বা ফেল করে তারা মুষড়ে পড়ে। বাড়ি যেতে ভয় পায়। কারণ সাতদিন আগে থেকেই তো বাবা মা বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছে ছেলে মেয়ে কী রেজাল্ট করবে এই ভাবনায়। বাড়ি গেলে বাবা মাকে ফেস করতে পরবে না  ভেবে তারা অস্থির হয়ে পড়ে। বাড়ি যায় একসময়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবা মায়ের বকুনি খায়। চড় থাপ্পড়ও খায় ক্ষেত্রবিশেষে।

বকুনির বড় অংশটা হয় এমন, ‘ওমুকের ছেলে জিপিএ ফাইভপ্লাস পেলো, সেতো মাত্র চারটে টিচারের কাছে পড়েছে। তোকে পড়িয়েছি ছয়টা টিচারের কাছে। মাস মাস হাজার হাজার খরচ করেছি। দিনের পর দিন খাইনি, ঘুমাইনি। তোর পেছন পেছন ঘুরেছি। আর তুই এই করলি শেষাবধি।’ চেঁচাতে চেঁচাতে মা কাঁদতে থাকেন। আর ছেলে বা মেয়ে ঘরে ঢুকে ফুঁফিয়ে কাঁদে তারপর আস্তে আস্তে চুপ করে যায়। শুরু হয় তার অবদমন। অনেকে জিপিএ ফাইভ না পেয়ে, ফেল করে বাবা মায়ের ব্যবহার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে বসে। এবারও করেছে। আমি ঠিক বুঝি না, বাবা মায়ের কাছে সন্তানের জীবন বড় নাকি রেজাল্ট? 

মাঝে মাঝে ভাবি, আামরা সামনে এগোচ্ছি নাকি পেছনে? ছেলে মেয়ে সত্যিকার মানুষ হচ্ছে কিনা। তার মধ্যে মায়া মমতার বোধ জন্ম নিচ্ছে কিনা। দেশ আর দেশের মানুষকে ভালবাসতে শিখছে কিনা। সেদিকে বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই বাবা-মায়ের। ছেলে মেয়ে মানুষ না হয়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ব্যারিস্টার হলে লাভ কী?
বাবা-মায়েরা একটু মাথা ঠান্ডা করে ভাবুন। র‌্যাশনাল হয়ে ভাবুন। সন্তানের প্রতি মানবিক হোন! সন্তানের জীবনের চেয়ে লেখাপড়া কখনই বড় নয়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর