Alexa সংস্কৃত ভাষায় কথা বলে যে গ্রামের লোকজন 

ঢাকা, রোববার   ২০ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৪ ১৪২৬,   ২০ সফর ১৪৪১

Akash

সংস্কৃত ভাষায় কথা বলে যে গ্রামের লোকজন 

সাহিদা আফরিন মিথিলা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:১৩ ৯ অক্টোবর ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীতে এমন অনেক ভাষা আছে যা সময়ের স্রোতে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন সংস্কৃত ভাষা তার মধ্যে একটি। 

বাংলা ভাষার ইতিহাস অধ্যয়নকালে বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে সংস্কৃত শব্দটি আমরা প্রায় সবাই পেয়েছি। সংস্কৃত বাংলার একটি প্রভাবশালী ভাষা। সংস্কৃতকে হিন্দু ধর্মের প্রাচীন ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

সংস্কৃত ভাষাটি স্বর্গীয় দেব-দেবীর এবং তারপরে ইন্দো-আর্যদের যোগাযোগ ও কথোপকথনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হত। জৈন ধর্ম,বৌদ্ধ ধর্ম ও শিখ ধর্মেও এই ভাষার ব্যাপক ব্যবহার ছিল। একসময় এই ভাষাটি সাহিত্য, শিক্ষাঙ্গন এমনকি সরকারী কাজেও ব্যবহৃত হত।

আপনি কি ভাবতে পারেন,পৃথিবীতে এখনও এমন একটি জায়গা আছে যেখানে দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তা ও যোগাযোগে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার রয়েছে। 

ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য কর্ণাটকের শিমোগা জেলার প্রাচীন নদী টুঙ্গা, এর তীরেই অবস্থিত ছোট একটি গ্রামের নাম মাত্তুর। গ্রামটির যেকোনো বাড়িতে গেলে দেখবেন তারা আপনাকে ভাভাথ নাম কিম (আপনার নাম কি), কাথাম আসতি (কেমন আছেন), কফি ভা চায়াম কিম ইচ্ছাথি ভাবন (চা খাবেন নাকি কফি খাবেন) এই ধরণের সুস্পষ্ট এবং কাব্যিক সংস্কৃত ভাষায় অভ্যর্থনা জানাবে। মাতুর পৃথিবীর একমাত্র গ্রাম যেখানের বাসিন্দারা এখনও সংস্কৃতের শাস্ত্রীয় ভাষায় কথোপকথন করে। 

মাত্তুর একটি অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ গ্রাম। এখানে একটি কেন্দ্রীয় মন্দির ও একটি পাঠশালা রয়েছে। পাঠশালাতে প্রচলিত উপায়ে বেদ ভজন করা হয়। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে তাদের প্রবীণদের কাছ থেকে নির্ভুলভাবে এগুলো শিখে। তাদের পড়াশোনার ধরণ দেখে আপনার মনে হতে পারে যে সময় হয়ত আপনাকে শত বছর পেছনে নিয়ে গিয়েছে।
 
শিক্ষকদের মতে, সংস্কৃত শিক্ষার্থীদের গনিত এবং যুক্তির প্রতি প্রবণতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। গত কয়েক বছর ধরে অনেক বিদেশী শিক্ষার্থীও সংস্কৃত ভাষার বিভিন্ন কোর্স করতে এখানে আসছে। 

তবে সংস্কৃত ভাষা শিখে এখানকার বাসিন্দারা  আগের যুগে পড়ে নেই। মাত্তুর গ্রামের শিক্ষার্থীদের জেলায় বিভিন্ন একাডেমিক রেকর্ড আছে। মাত্তুরের অনেকে  বিভিন্ন উচ্চ ডিগ্রী নিতে বিদেশেও যায়। মাত্তুর থেকে প্রায় ৩০ জন সংস্কৃত অধ্যাপক কুভেম্পু,বেঙ্গালুরু,মাইশুরি এবং ম্যাংলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। 

মাত্তুরের বাসিন্দা

প্রায় ছয়শত বছর আগে প্রাচীন এক ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় কেরালা থেকে মাত্তুরে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন। বর্তমানে এখানে  প্রায় ৫ হাজার মানুষ বাস করে। এখানের বাসিন্দারা মূলত কৃষক যারা কাঁচা বাদাম ও ধানের চাষ করে। মাত্তুরে সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে পুরোহিত পর্যন্ত সংস্কৃত বোঝে। বেশিরভাগ মানুষই শুদ্ধ সাবলীলভাবে সংস্কৃত ভাষায় কথা বলে।

সংস্কৃত ভাষা চর্চার শুরু 

আপনি হয়ত ভাবছেন এখানকার বাসিন্দারা বহুকাল ধরে এই ভাষার অনুশীলন করছে। কিন্তু না, আসলে এর শিকড় বেশি আগের নয়। ১৯৮১ সালে সংস্কৃত ভারতী নামক একটি সংগঠন মাত্তুরে ১০দিনের একটি সংস্কৃত কর্মশালা করে যেখানে তারা প্রাচীন ভাষার প্রচার করে। 

সংস্কৃত সংরক্ষণের এই অনন্য পরীক্ষায় গ্রামের সবাইকে আগ্রহী হতে দেখে এক দর্শক উজ্জীবিত হয়ে বলেন, এটা এমন এক জায়গা যেখানে প্রত্যেকে সংস্কৃত বলে, পুরো বাড়ির লোক সংস্কৃত বলে, তাহলে কি সংস্কৃত গ্রাম হবে এটি? কথাটি স্থানীয় বাসিন্দারা মনে রাখে এবং এভাবেই সংস্কৃত ভাষাটি গ্রামের প্রাথমিক ভাষায় পরিণত হয়।

সংস্কৃত ভাষাটি আধুনিক যুগের মানুষজনেরা রাস্তায় চলাফেরার সময় ব্যবহার করে ফলে মাত্তুর আধুনিক যুগে প্রাচীন ভারতের এক অতুলনীয় রূপক হয়ে উঠেছে। 

কালের স্রোতে অনেক  শব্দই অভিধানে যুক্ত হচ্ছে এবং অনেক শব্দ সেখান থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। মূলত অনুশীলন না থাকার কারণে বিভিন্ন ভাষা তাদের অস্তিত্ব হারাচ্ছে। এরকম একটি সময়ে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে এই ভাষাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রসংশনীয়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/মাহাদী