Alexa সংশোধনে বাজেটের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হয়: জিএম কাদের

ঢাকা, শুক্রবার   ১৯ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৪ ১৪২৬,   ১৫ জ্বিলকদ ১৪৪০

সংশোধনে বাজেটের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হয়: জিএম কাদের

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৪ ১৫ জুন ২০১৯   আপডেট: ১৭:১৮ ১৫ জুন ২০১৯

ডেইলি বাংলাদেশ

ডেইলি বাংলাদেশ

যতবেশি ঘাটতি ততবেশি সংশোধন, ফলে বাজেটের মূল চরিত্র রক্ষা করা কঠিন হয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের।তিনি বলেন, এতে করে উদ্দেশ্য ও অনুমোদিত রূপরেখার ব্যাপক পরিবর্তনের আশংকা থাকে।

শনিবার বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে বাজেটোত্তর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

জিএম কাদের বলেন, সংসদে অনেক তর্ক-বিতর্কের পর দেশজুড়ে আলাপ-আলোচনা ও মতামতের মাধ্যমে যে বাজেট গৃহীত হয় বাস্তবায়নকালীন সংশোধনের ধাক্কায় ব্যাপক পরিবর্তনের আশঙ্কা থাকে।

অর্থমন্ত্রী অসুস্থতায় কারণে বাজেটের বাকি অংশ উপস্থাপনে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান জিএম কাদের। তাৎক্ষণিক বাজেট পাঠ প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রমাণ। 

তিনি বলেন, ঘাটতি মোকাবিলায় কখনো কখনো ‘এসআরও’ জারির মাধ্যমে ট্যাক্স বাড়ানো হয়। এতে পরোক্ষ কর বেড়ে যায়, সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাপা চায় নিম্নবিত্তের ওপর বোঝা কম পড়ুক। প্রত্যক্ষ কর বেশি বাড়লে সাধারণ ধনিক শ্রেণির ওপর প্রভাব পড়ে তারা এটা সামলে উঠতে পারেন বলে মন্তব্য করেন জিএম কাদের।

জিএম কাদের বলেন, এরইমধ্যে অনেকেই বাজেটের প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। বাজেটে কৃষি যন্ত্রপাতি, ক্যান্সারের ঔষধ, রুটি-বিস্কিট যেসব পণ্যের দাম কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, তা স্বাগত জানায় জাপা। অন্যদিকে নতুন কর আরোপ করে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য- চিনি, ভোজ্য তেল, গুড়ো দুধ, তৈয্যষপত্রের দাম না বাড়ানোর প্রস্তাব করছি। আমরা মনে করি- কৃষক এদেশের প্রাণ। তাদেরকে বাঁচানোর জন্য ধান ক্রয়ে প্রণোদনা থাকা দরকার। মোবাইল ফোন এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়। এটা এখন যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। তাই মোবাইল ফোনে কথা বলার উপর আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহার করা বাঞ্ছনীয়। আইসিটি সেক্টরে ব্যবহৃত আইটেম সমূহের কর বৃদ্ধির পুনর্বিবেচনার দাবি জানান জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, তারুণ্যের শক্তি বাংলাদেশের সমৃদ্ধি, এ স্লোগানকে সামনে রেখে যে উদ্যোগ সমূহ বাজেট উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, যেমন বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সারাদেশে ১১১টি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং উপজেলা পর্যায়ে ৪৯৮টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ; বলা হচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চল সমূহে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি; যুবকদের মধ্যে সব ধরনের ব্যবসা ও উদ্যোগ সৃষ্টির জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহের দ্রুত বাস্তবায়ন আশা করছি। এ খাতে বরাদ্দ আরো বাড়িয়ে কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ ও ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান করছি।

জাপা বিশ্বাস করে গণমানুষের জন্যই বাজেট প্রণয়ন করা হয়। ২০১৯-২০২০ সালের প্রস্তাবিত ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকার বাজেট এ যাবত কালের সর্ববৃহত বাজেট। আকৃতি বেশ বড়। বড় অংকের অর্থ রাজস্ব খাতে আয় করতে হবে। আবার নির্ধারিত খাতে বড় ধরনের ব্যয়ও করতে হবে। দুটিই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। 

তিনি বলেন, আয়ের প্রশ্নে আমরা চাই, অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন থেকে বেশি হারে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা ও স্বল্প আয়ের মানুষের ঘাড়ে কম দায় চাপানো হোক। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ কর যেমন আয়কর থেকে যতদুর সম্ভব রাজস্ব আদায় হোক ও পরোক্ষ কর (যেমন আমদানী শুল্ক ইত্যাদি) থেকে কম অংশ আয়ের ব্যবস্থা করা হোক। 

জিএম কাদের বলেন, বাজেট প্রস্তাবে তেমনটি দেখানো হয়েছে। মোট রাজস্ব আয়ে (৩,২৫,৬০০ কোটি)র মধ্যে আয়কর ৩৫% + মূল্য সংযোজন কর ৩৭.৮% (এটাকেও প্রত্যক্ষ করা বলা যায়) + আমদানী শুল্ক ২৭.২% প্রস্তাব করা হয়েছে। 

তবে এ নিয়ে সংশয় আছে। জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বিশেষজ্ঞের মতে আয়কর থেকে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে এবং যে পদ্ধতির মাধ্যমে করা হবে বলা হয়েছে, তা বর্তমান আয়কর বিভাগের অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও লোকবলে প্রায় অসম্ভব। ফলে, আয়কর থেকে মোট আদায়ে যা আশা করা হচ্ছে, তা অনেক কম হওয়ার অশংঙ্কা রয়েছে। একই কথা মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

জিএম কাদের বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, তা হল আমদানী শুল্কের মাধ্যমে যতটা সম্ভব ঘাটতি পূরনের উদ্যোগ নিতে হবে। সে জন্য এসআরও জারি করে নতুন হার নির্ধারন ও নতুন পন্যের উপর আমদানী শুল্ক আরোপ করতে হবে। সেক্ষেত্রে, শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের সিংহ ভাগ নিন্মবৃত্ত ও উচ্চবৃত্তরা একই ধরনের যোগান দিবেন বা ধনীরা বেশি ও গরীবরা কম দিবেন না, সমানভাবে করের বোঝা বহন করতে হবে, যা কাম্য নয়। 

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে একটি বিশাল ফারাক রযেছে। যা বাজেট ঘাটতি ও যার আকার অংকে ১,৪৫,৩৮০ কোটি টাকা। এ ঘাটতি মেটানোর জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে, ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহন (৪৭,৩৬৪ কোটি) + বিদেশী ঋণ ও সাহায্য (৬৩,৮৪৮ কোটি) + ব্যাংকের বাইরে (সঞ্চয় পত্র ইত্যাদি) থেকে নেয়া ঋণ (৩০,০০০ কোটি) টাকা। 

জিএম কাদের বলেন, বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংক গুলোতে তারল্য সংকট চলছে। কারন হিসেবে বলা হচ্ছে, অধিক হারে ঋণ গ্রহণ। ফলে, বেসরকারি খাতে নতুন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা দরকার মত যথেষ্ট ঋণ পাচ্ছেন না। বিনিয়োগ ও ব্যবসা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সমস্যা হচ্ছে। 

জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, এবারকার ঘাটতি মেটাতে সরকার যখন ফের ব্যাংক ঋণের সাহায্য নেবেন, তা বিরাজমান সংকটকে আরো ঘনিভূত করতে পারে। তিনি বলেন, দেশে এ মুহুর্তে সবচেয়ে বড় সংকট বেকার সমস্যা। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে বাধা হোক এ ধরনের পদক্ষেপ, যে কোনভাবেই পরিহার করতে হবে। 

জিএম কাদের বলেন, প্রায় সময়ই কঠিন শর্তসহ বিদেশি ঋণ দেয়া হয়। ফলে, এ ধরনের ঋণের বোঝা বেশ ভারি হয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঋণ দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ জন্য সরকারকে সর্তক হতে হবে। 

তিনি বলেন, ব্যাংকের বাইরে থেকে নেয়া ঋণ বা অর্থ, সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে নেয়া। এ ধরনের ঋণের খরচ অধিক ও প্রভাব সুদুর প্রসারী। এ ধরনের ঋণ গ্রহণের আগে ভালোমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। তাছাড়া, মোট ঘাটতি অধিক হওয়ার আশঙ্কা আছে। রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা প্রস্তাব করা হয়েছে অর্থাৎ ৩,২৫,৬০০ কোটি টাকা তা পূর্ববর্তী অর্থ বছরের (২০১৮-১৯) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্থাৎ ২,৮০,০০০ কোটি টাকার চেয়ে প্রায় শতকরা ১৬ ভাগ অধিক। এ লক্ষ্যমাত্রা হয়তো অর্জন সম্ভব, তবে না হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। 

ফলে সেক্টরওয়ারি বরাদ্দ যা সংসদে গৃহিত হবে তার মধ্যে জনকল্যাণমূলক খাতসমূহ যাতে বরাদ্দ ছাটাইয়ের আওতায় না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য লাখতে হবে। রাজস্ব ও উন্নয়ন উভয় বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থের পুনর্বন্ঠনে বিষয়টি প্রযোজ্য।

জিএম কাদের বলেন, এসআরও এর মাধ্যমে নতুন করারোপের ক্ষেত্রেও বাজেট যে উদ্দেশ্যে কর আরোপিত হয়েছে, তার মূল ধারণা যাতে ব্যতয় না ঘটে সে বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক। যদি অর্থমন্ত্রী এসআরও-এর মাধ্যমে কর কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনবেন না বলেছেন। এ বিষয়ে অর্থ বিলে সু-স্পষ্ট ব্যবস্থা থাকলে ভালো হয়। 

তিনি বলেন, খাতওয়ারি বরাদ্দের মধ্যে স্বাস্থ্য ২৫, ৭৩২(৪.৯), সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ খাতে ২৯, ৭৬৯ (৫.৬%) যথেষ্ট নয়।। 

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, চেয়ারম্যানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর অবসরপ্রাপ্ত আশরাফ-উদ-দৌলা, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, জহিরুল ইসলাম জহির প্রমুখ।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস.আর/এলকে