Alexa সংবাদপত্র বিক্রেতা আজ শীর্ষ ধনী

ঢাকা, শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৫ ১৪২৬,   ২০ মুহররম ১৪৪১

Akash

সংবাদপত্র বিক্রেতা আজ শীর্ষ ধনী

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩৮ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর শীর্ষ বিলিয়নারদের মধ্যে তিনি একজন। ওয়ারেন বাফেট! নামটি হয়তোবা শুনে থাকবেন! ব্যবসা ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। ছোটবেলা থেকেই মাথায় ঘুরত কীভাবে টাকা কামানো আর সঞ্চয় করা যায়। পারিবারিক অবস্থা অবশ্য খুব বেশি খারাপ ছিল না। অভিজাত পরিবারের সন্তান হয়েও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা বাসনা ছোটবেলা থেকেই ছিল তার। 

তিনি একজন মার্কিন শিল্পপতি, বিনিয়োগকারী এবং সমাজসেবক। তাকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিচক্ষণ ও সফল বিনিয়োগকারী বিবেচনা করা হয়। তার পুরো নাম ওয়ারেন এডওয়ার্ড বাফেট। তিনি তার তিন ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। ওয়ারেন বাফেট নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের ওমাহাতে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হাওয়ার্ড বাফেট ও মায়ের নাম লিলা বাফেট।

শৈশব এবং পড়াশোনা

রোজ হিল এলিমেন্টারি স্কুলে বাফেট পড়ালেখা শুরু করেন। ১৯৪২ সালে বাফেটের বাবা কংগ্রেসে নির্বাচিত হন এবং সপরিবারে ওয়াশিংটন ডিসিতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে বাফেট অ্যালিস ডিল জুনিয়র হাই স্কুলে ভর্তি হন এবং উড্রো উইলসন হাই স্কুল থেকে পাস করেন।

১৯৪৭ সালে বাফেট ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়াতে ভর্তি হন। সেখানে তিনি প্রায় দুই বছর পড়ালেখা করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কা-লিঙ্কন থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক পাশ করেন। এরপর তিনি কলাম্বিয়া বিজনেজ স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকত্তোর ডিগ্রি নেন।

ব্যবসায়ী মনোভাবের বিকাশ

ছোট থেকেই বাফেট অর্থ উপার্জন ও সংগ্রহের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। তিনি অল্প কিছুকাল তার দাদার মুদি দোকানে কাজ করেছিলেন। ছাত্রাবস্থায় বাফেট স্কুলে পত্রিকা, কোকাকোলা ইত্যাদি বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেন। ছোটকালেই বাফেটের শেয়ার বাজার ও বিনিয়োগের ওপর আগ্রহ জন্মায়। ছয় বছর বয়সে ওয়ারেন বাফেট বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে জুসি ফ্রুট চুইংগাম এবং কোকা-কোলা বিক্রি করতো।

সে সবসময়ই পুরো প্যাকেট একসঙ্গে বিক্রি করতো। এতে তার প্রতিটি প্যাকেটে দুই সেন্ট করে লাভ হতো। বাফেট তার দাদার দোকান থেকে প্যাকেট প্রতি ২৫ সেন্ট মূল্যের কোকা-কোলা কিনে তা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৩০ সেন্টে বিক্রি করতো। দশ বছর বয়সে বাফেট নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ দেখতে নিউ ইয়র্ক শহরে আসেন। ১১ বছর বয়সে তিনি তিনটা শেয়ার ক্রয় করেন। 

হাই স্কুলে থাকাকালীন তিনি তার বাবার কিছু সম্পত্তি বিনিয়োগ করেন এবং একটা খামার ক্রয় করেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তিনি আয়কর রিটার্ন জমা দেন। সেখানে তিনি নিজেকে সংবাদপত্র বিলিকারী হিসেবে পরিচয় দেন। ১৯৪৫ সালের কথা। বাফেটের বয়স তখন মাত্র ১৫, হাইস্কুলের ছাত্র। ওই সময়ই তার এক বন্ধুর সঙ্গে ব্যবহার করা একটি পিনবল মেশিন কেনেন মাত্র ২৫ ডলারে। মেশিনটি বসানোর মতো জায়গা ছিল না তাদের। তারা এক নাপিতের দোকানের ভিতরে তা বসিয়ে দিলেন। 

এর মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তারা একই রকম তিনটি মেশিন বসান বিভিন্ন স্থানে। এভাবেই কৈশোর বয়স থেকেই ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়েন বাফেট। ওয়ারেন বাফেট ১৯৫০ সালে নেবাস্ক্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। বেঞ্জামিন গ্রাহামের ‘ইনটিলিজেন্ট বিনিয়োগকারী’ বইটি পড়ার পর তিনি গ্রাহামের নিকটে এই বিষয়ে অধ্যয়ন করতে চেয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি গ্রাহামের অধীনে থেকেই ১৯৫১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর তিনি ওমাহা ফিরে আসেন এবং বাফেট-ফাল্ক অ্যান্ড নামক একটি বিনিয়োগ ফার্ম গঠন করেন।

সেখানে তিনি ১৯৫১ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। আর এ সময়ের মধ্যে বাফেটের সঙ্গে গ্রাহামের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যে কিনা তার সময় এবং চিন্তার বিষয়ে উদার ছিলেন। সাবেক অধ্যাপক ও ছাত্রের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে কারণেই অবশেষে বাফেটকে গ্রাহাম নিউ ইয়র্কের গ্রাহাম-নিউম্যান কর্পোরেশন কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ দান করা হয়।

যেখানে তিনি একটি নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই দুই বছর গ্রাহামের সঙ্গে থেকেও শত শত বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষামূলক কোম্পানি নিয়ে কাজ করায় স্টক বিনিয়োগ করতে বাফেট আগ্রহী হয়ে ওঠে। যা কিনা বাফেটকে একজন সফল বিনিয়োগকারী হওয়ার পথে পৌঁছে দেয়ার পথ সুগম করে।

স্বাধীনভাবে কাজ করার লক্ষ্যে ২৫ বছর বয়সেই বাফেট ওমাহায় নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পারিবারিকভাবেই ১০ ডলার নিয়ে মূলধন ভিত্তিক ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যেই বাফেটের অংশীদারিত্ব বিলুপ্ত হয়। প্রতি শেয়ারেই ৩০ ধাপ পর্যন্ত লাভ করতে সক্ষম হওয়ায় বাফেট পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগকারী হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেন।

অংশীদারিত্ব থেকে বাফেট বের হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন কারণ, বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে টেক্সটাইলের নিউ বেডফোর্ড, ম্যাসাচুসেটস, শেয়ারে লাভবান হতে পারেননি। কিন্তু ১৯৬৫ সালে বার্কশায়ার কোম্পানির আর্থিক কাঠামো পরিবর্তন করায় বাফেটের ও ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়।

১৯৫১ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত বাফেট ‘ফক অ্যান্ড’ কোম্পানিতে ইনভেস্টম্যান সেলসম্যান হিসেবে চাকরি করেন। নিউইয়র্কে গ্রাহাম-নিউম্যান করপোরেশনে সিকিউরিটি এনালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত। এ ছাড়া তিনি বাফেট পার্টনারশিপ লি. বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে ইনস্যুরেন্সসহ বিভিন্ন সংস্থায় চাকরি করেছেন।

এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই এখন তার নিজের মালিকানাধীন। নিজের চেষ্টা আর অধ্যবসায়ের ফলস্বরূপ ১৯৬২ সালে বাফেট মিলিয়নিয়ারে পরিণত হন। বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে নামের একটি টেক্সটাইল কারখানার প্রতিটি শেয়ার তিনি ৭ দশমিক ৬০ ডলারে জনগণের মাঝে ছেড়ে দেন।

একপর্যায়ে ১৯৬৫ সালে প্রতি শেয়ারের বিপরীতে কোম্পানি ১৪ দশমিক ৮৬ ডলার দেয়। এর মধ্যে ফ্যাক্টরি এবং সরঞ্জাম দেখানো হয়নি। এরপর তিনি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেন চেসের নাম ঘোষণা করেন। ১৯৭০ সালে তিনি শেয়ারহোল্ডারদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত চিঠি লেখা শুরু করেন। শেয়ারহোল্ডারদের কাছে এ চিঠি ভীষণ জনপ্রিয়তা পায়। এসময় বেতন হিসেবে তিনি বছরে ৫০ হাজার ডলার পেতেন।

১৯৭৯ সালে তার বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে প্রতি শেয়ারের জন্য ৭৭৫ ডলার দিয়ে ব্যবসা করতে থাকে। এই শেয়ারের দাম এক হাজার ৩১০ ডলার পর্যন্ত ওঠে। এ সময়ে তার নিট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬২ কোটি ডলার। এর ফলে ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রথমবারের জন্য তিনি ফোর্বস ৪০০-তে স্থান পান।

তার কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে এখন ৬৩টি কোম্পানির মালিক। ২০০৮ সালে বাফেট বিশ্বজুড়ে চমক হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি মাইক্রোসফট গুরু বিল গেটসকে হটিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষে পরিণত হন। ফোর্বসের মতে তখন তার সম্পদের পরিমাণ ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলার। তবে ইয়াহুর মতে, তার তখনকার সম্পদের পরিমাণ ৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। 

ব্যক্তিগত জীবনে বাফেট অত্যন্ত সাধারণ মানের জীবনযাপন করেন। তার মতে, জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য নিজেকে আগে স্থির করতে হয় তার লক্ষ্য। তিনি এমনই এক লক্ষ্য নিয়ে মাত্র ১১ বছর বয়সে প্রথম শেয়ার কিনেছিলেন। তারপরও তিনি মনে করেন এ ব্যবসায় আসতে তার অনেক দেরি হয়ে গেছে। আরও আগে ব্যবসা শুরু করা উচিত ছিল।

তাই তার পরামর্শ আপনার সন্তানকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করুন। সংবাদপত্র বিক্রি করা অর্থ দিয়ে তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে ছোট্ট একটি ফার্ম কেনেন। তার মতে, অল্প অল্প করে জমানো অর্থ দিয়ে যে কেউ কিনতে পারেন অনেক কিছু। সে জন্য সন্তানদের তিনি কোনো না কোনো ব্যবসায় নিয়োজিত করার পরামর্শ দেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস