Alexa শ্রেষ্ঠ কাজ হয়তো এখনো করা হয়নি

ঢাকা, সোমবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৮ ১৪২৬,   ২৩ মুহররম ১৪৪১

Akash

শ্রেষ্ঠ কাজ হয়তো এখনো করা হয়নি

নাজমুল আহসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৩ ১৮ এপ্রিল ২০১৯   আপডেট: ১৮:০৪ ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ছিয়াত্তর পেরিয়ে সাতাত্তুর ছুঁই ছুঁই! এই বয়সেও তিনি নিজের অবস্থান জানান দেন অনবদ্য অভিনয়ের মাধ্যমে। ১৯৬৫ সালে অভিনয় শুরু, এখনো অভিনয় করে নিয়মিত দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন মঞ্চ,চলচ্চিত্র, নাটক ও বিজ্ঞাপনে। যা এখনো চলমান। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে শিল্পকলায় অবদানের জন্য পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক ও চলচ্চিত্রের অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। গুণী এই শিল্পী অন্য কেউ না, বলছি অভিনেত্রী দিলারা জামানের কথা। 

বয়সের ভার যেন স্পর্স করতে পারেনি তাকে। এখনো প্রতিনিয়ত লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনেই মগ্ন তিনি। সম্প্রতি এই গুনী অভিনেত্রী অভিনয় ও জীবনের নানা বিষয় নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন ডেইলি বাংলাদেশের। সেই আড্ডার চুম্বক অংশ তুলে ধরেছেন নাজমুল আহসান

আপনার বয়সে এসে অনেকেই অভিনয় থেকে দুরে সরে গেছেন। আবার দু-একজন যারা কাজ করছেন তাদের সচারাচর মা, দাদি চরিত্রে দেখা যায়। সেই জায়গা থেকে আপনি নিয়মিত ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে রূপদান করছেন, বিষয়টি কেমন উপভোগ করেন?

-একজন শিল্পীকে গল্পের চাহিদা অনুযায়ী সব চরিত্রে অভিনয় করতে হয়। এক ধরনের চরিত্রে অভিনয় করার মধ্যে একঘেয়ে ব্যাপার থাকে আর বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করার মাঝে একটু এক্সসাইটম্যান থাকে, আবার এক ধরনের আনন্দও থাকে। দর্শকরাও আমাকে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে দেখতে পছন্দ করেন। সেই জায়গা থেকে ভিবিন্ন চরিত্রে রূপদান করে বেশ সাড়া পাই। অন্যদিকে আমার বয়স অনুযায়ী যে চরিত্র গুলো যায় ভালোবেসে সে গুলোও করার চেষ্টা করি। 

গেল নারী দিবসে একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ কন্যা হয়েছিলেন, যেখানে আপনাকে ওয়েস্টার্ন লুক দেখা গেছে। যেটি নিয়ে সাধারণ দর্শক থেকে মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের মাঝে বেশ আলোচনা হয়েছে। এ সময়ে এসে মডেলিংয়ের অভিজ্ঞতা কেমন?

-ম্যাগাজিনটির পক্ষ থেকে জানানো হয় আমাকে গতানুগতিক ধারার বাহিরে গিয়ে আলাদা ভাবে উপস্থাপন করা হবে। যেখানে আপনি একজন কর্পোরেট হেট, আপনার পোশাকেও থাকবে বেশ আধুনিকতা। প্রথমদিকে একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। আমার মেয়েদের সঙ্গে কথা বললাম। আমার ছোট মেয়ে বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী সে ফটোশুটে অংশ নিতে বললো। এরপর সায় দিলাম, ফটোশুট করলাম, ম্যাগাজিনটি প্রকাশের পর দেখলাম সবাই বেশ পছন্দ করেছে। সবাই ভিন্ন কিছুই দেখতে চায় সেই জায়গা থেকে আমি সফলতা পেয়েছি। 

নাটক, সিনেমা, মঞ্চ, বিজ্ঞাপনে অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন আপনি। জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে কখনো কী মনে হয়েছে পছন্দের কোনো চরিত্রে কাজ করা এখনো বাকী?

-কাজের ক্ষেত্রে একজন শিল্পীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোনো তৃপ্তি নেই। শিল্পী যখন তৃপ্তি অনুভব করবে তখনই তার শিল্পীসত্বাটা মরে যাবে। মনে হয় আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজটি হয়তো এখনো করা হয়নি। এমন একটা চরিত্র যেটা সারা জীবন মানুষের মনে থাকবে, একটা অমর কিছু হয়ে থাকবে। জানি না এমন চরিত্রে কাজ করা হবে কি না। আবার ভাগ্যে থাকলে হতেও পারে।

একজন শিল্পীর বড় প্রাপ্তি মানুষের ভালোবাসা। অনবরত সেই ভালোবাসা পাচ্ছেন, এরপরেও জীবনে কোন অপ্রাপ্তি অনুভব করেন?

-ছোট ছোট বিষয়েও আমি আনন্দ পাই, আমাকে তৃপ্তি দেয়। সামন্য বিষয় যেমন, রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি তখন লক্ষ্য করলাম গাছের ভেতর নতুন গজানো দুটি পাতা, সেটি দেখেও আমি আনন্দ পাই, মনে একটা প্রশান্তি আসে। সেখানে বিরাট কিছুই প্রাপ্তিই যে আমাকে তৃপ্তি দেবে তা নয়। আমি খুব অল্পে তুষ্ঠ, খুব সাধারণ ভাবে জীবন-যাপন করি। বিলাসী জীবন নেই বললেই চলে। আমি একজন সাধারণ মানুষ, সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে থাকতে চাই। আজ কবির সেই কথাই বলতে চাই, ‘আমি তোমাদেরই লোক আর কিছু নয়, এই হোক শেষ পরিচয়’। 

প্রকৃতির নিয়মে বহমান নদীর স্রোতের মতো জীবন চলে যাচ্ছে। এই বয়সে নিজের ভেতর কোনো পরিবর্তন অনুভব করেন?

-বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের পরিবর্তন হয়। এখন ক্লান্তিটা অনেক বেশি, নানান রকম রোগ ব্যাধি, ওষুধের উপর নির্ভর করে ভালো থাকা। আমার দুটি মেয়ে দুজনেই বিদেশে। সেখানে থাকা, চিকিৎসা সবকিছুর সুযোগ সুবিধা বেশি ছিল। কিন্তু আমি সব ফেলে দেশের মানুষের কাছে চলে এসেছি। তারা যখন বেশ আদর যত্নের মধ্যে আমাকে রাখে। তারপরও সেখানে এক মুহূর্তও মন টিকেনি। আমার দেশের মানুষ আমার আপনজন, তাদের না দেখলে মনটা কাঁদে। তাই যতক্ষণ কাজের মধ্যে থাকা যায় ততক্ষণই সবার সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়, আড্ডা হয়, বেশ ভালো লাগে। সবার ভালোবাস নিয়েই আছি, আমার কাজের মধ্যে আছি,  এখানেই আমার আনন্দ। 

বিটিভির সময়ের নাটক আর এই সময়ের নাটকের মধ্যে কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করেন?

-অনেক পার্থক্য রয়েছে। তখন প্রযুক্তিগত এতো উন্নত ছিল না। অনেক সময় লাইভ টেলিকাস্ট করা হতো। ১৯৬৫ সালে শুরু করেছিলাম অভিনয়, তখন রেডিও, টেলিভিশনে সরাসরিই প্রচার হতো। আর এখন কত সুযোগ-সুবিধা। সুতরাং ছেলে মেয়েরা অনেক কিছু জেনে শিখে কাজ করতে আসছে। তারা অনেক ভালো কিছু দিতে পারছে। শেখারতো শেষ নেই। আমি এখনো নতুনদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করি, যেগুলো জানিনা। আর এখন মানুষের রুচি বদলে গেছে, চাওয়া-পাওয়ার পরিবর্তন হয়েছে। তখনকার নাটকের সঙ্গে এখনকার নাটকের তুলনা করলে ভুল করা হবে। জীবন খুব দ্রুত হয়ে গেছে। এখন ধীর লয়ের নাটক নিয়ে চিন্তা করার সময় কারো নেই।

এই দ্রুততার মাঝে একটা চরিত্র নিয়ে কতটুকু ভাবার সময় পান?

-আমাদের সময়তো অভিনয়কে কেউ সেভাবে পেশা হিসেবে নিতে পারেনি। এখন অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিচ্ছেন। সেভাবেই কাজ করছে। শিল্প মাধ্যমটাকে পেশা হিসেবে নিতে গিয়ে চরিত্রের পেছনে সময় দিতে পারে না। সময়ের অভাবে এখন আমরাও একটা চরিত্র নিয়ে তেমন ভাবার সময় পাই না। এটাই বাস্তবতা। তবে সবাই চেষ্টা করছে ভালো কিছু দেয়ার জন্য। 

ভালো গল্প বা স্ক্রিপ্টের অভাববোধ করেন?

-অবশ্যই, এখন ভালো গল্প, স্ক্রিপ্টের অভাব রয়েছে। আর এই সমস্যার সমাধান করা যাবে বলে আমার মনে হয় না। তখন সবকিছুই ছিল সাহিত্য নির্ভর। এখন হয়েছে জীবনের প্রতি মুহূর্তের গল্পের ভিত্তিতে নাটক। আমাদের আউটলুকও চেন্স হয়েছে। আমরা এখন সারা পৃথিবীর জানালা খুলে দিয়েছি। রুমে বসেই হাতের মুঠোয় পৃথিবীটাকে দেখতে পাই। তাই দর্শকরা আগের মতো আমাদের কাজ নিয়ে তৃপ্ত নয়। এ জন্য গল্প নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

সংস্কৃতির বিশ্বায়নটা দেখছেন কিভাবে?

-এখন বিশ্বায়নেরই যুগ। এটাকে আমরা ছোট গণ্ডির মধ্যে আনতে পারবো না। আমাদের বাহিরের ভালো জিনিসটা নিতে হবে। পৃথিবীতে ভালো কাজ উপহার দিতে হবে। সব মিলে মিশে এখন চলতে হবে। তা না হলে ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকবো এবং একচোখা হয়ে থাকতে হবে। 

একটা অভিযোগ শোনা যায়, আজকাল অভিনয়ের ক্ষেত্রে সিনিয়রদের সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না!

-আসলে যে ধরনের কাজ হয় বর্তমানে সেখানে সেভাবে সিনিয়রদের নেয়া হয় না। দেখা যায় উৎসবের সময় এলেই আসাদের ডাকা হয় বেশি। আর এখানে বাজেটের একটা বিশাল সমস্যা রয়েছে। সিনিয়রদের নিলেও তেমন ভাবে উপস্থাপন করা হয় না। নামে মাত্র রাখা হয়, তা না হলে বাজেট মিলাতে পারে না। এখানে প্রযোজক, পরিচালক সবারই দৃষ্টি দেয়া উচিৎ। সিনিয়র শিল্পীদের সঠিক ভাবে উপস্থাপন করলে আমার মনে হয় নাটকের মান কয়েক গুন বেড়ে যাবে। 

রাহাত মাহমুদের নির্দেশনায় আসছে ঈদে প্রচারের জন্য ‘সুইট সিক্সটিন’ শিরোনামের নাটকে অভিনয় করলেন। এই নাটকে আপনার চরিত্রটা কেমন?

-এখানে আমার চরিত্রটা একেবারেই ভিন্ন ধাঁচের। মূলত দর্শকদের আনন্দ দেয়ার জন্যই নাটকটি। এই নাটকের ভেতর ভিন্নতা খুঁজে পাবে দর্শকরা। ম্যাগাজিনের ফটোশুটের মতো দর্শকরা এই নাটকেও নতুন এক দিলারা জামানকে আবিষ্কার করবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এনএ/এমআরকে