শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলা ও শিশু জায়ানের মৃত্যু

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলা ও শিশু জায়ানের মৃত্যু

 প্রকাশিত: ১৩:৫৭ ২৮ এপ্রিল ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

ইস্টার সানডে পালনকালে গত ২১ এপ্রিল সকালে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো ও তার পাশের তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে সিরিজ বোমা হামলা হয়েছে।

আক্রান্ত গির্জা তিনটি হচ্ছে কচিহিকাডে, নেগোম্বো ও বাটিকালোয়া। হোটেল তিনটি হলো কলম্বোর শাংগ্রিলা, সিনামন গ্র্যান্ড ও কিংসবারি । মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৩০০ ছাড়িয়েছে। আহত সংখ্যা ৫ শতাধিক। এ সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।  নিহতদের মধ্যে ৩৫ জন বিদেশি রয়েছেন। এ হামলায় আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ৮ বছর বয়সী নাতি জায়ান চৌধুরী মারা গেছে। আহত হয়েছেন জায়ানের পিতা। সোস্যাল মিডিয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোলে জায়ান চৌধুরীর ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। সম্পর্কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নাতি তিনি। বড় আদরের ধন। 

এই নৃশংস বোমা হামলার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে  পড়েছে। গির্জাটির ক্ষতিগ্রস্ত ছাদ, গির্জার ফ্লোর, বেঞ্চে রক্ত বয়ে যেতে দেখা গেছে, মেঝেতে ছড়ানো লাশের স্তূপ।   উদ্ধারকারীরা হতাহতদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। হতাহতদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকরাও রয়েছেন বলে দেশটির স্থানীয়  দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার মোট জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ।  এর মধ্যে ৭০ শতাংশ বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। হিন্দু ১২ দশমিক ৬ শতাংশ, ৯ দশমিক ৭ শতাংশ মুসলমান ও ৭ দশমিক ৬ শতাংশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রীলংকায় কেবল ছয় শতাংশ মানুষ ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী।

শ্রীলঙ্কার এই ঘটনায় আমরা গভীরভাবে বেদনাহত। একটি ধর্মীয় উৎসব পালনকালে এই হামলা ছিলো অচিন্তনীয়। কোনোরকম আত্মরক্ষার প্রস্তুতির সুযোগ উপস্থিত ব্যক্তিরা পাননি। তারা ধর্মীয় আচারাদি পালনে ব্যস্ত ছিলেন। জানা যায়, হামলার বিষয়ে ১০ দিন আগেই দেশব্যাপী সতর্কতা জারি করেছিলেন শ্রীলঙ্কার পুলিশ প্রধান পুজিত জয়াসুন্দরা। গত ১১ এপ্রিল তিনি  জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তাদের আত্মঘাতী বোমা হামলার হুমকির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।  সতর্কবার্তার পরও কেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হলো না, কেন গির্জাগুলিতে প্রার্থনায় এত মানুষ সমবেত হলেন, লোক সমাগমের উপর কেন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো না তা বোধহম্য নয়। আর একটু সতর্ক থাকলে হয়ত এতগুলো জীবনহানি হতো না। 

হামলার পর দেশটিতে ১২ ঘণ্টার (সন্ধ্যা ৬টা থেকে সোমবার ভোর ৬টা) কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দুইদিনের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে স্কুল। এছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট অপারেশন বন্ধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা নেয়া হয়েছে। গুজব এড়াতে সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সামাজিক মাধ্যমগুলো। 

যে কোনো ধর্মের, যে কোন বর্ণের মানুষের প্রতি মানুষ হিসেবে আমাদের শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত। মানুষকে নির্বিঘ্নে তার ধর্ম পালন করতে দেয়া উচিত। কিন্তু এক শ্রেণির মানুষ পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে পরিপূর্ণ এসব মানুষের অন্তর। আর এই শ্রেণির মানুষের কারণে বিশ্বব্যাপী মাঝে মাঝেই সংঘটিত হয় নানান সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতা। আর এ ধরনের অপতৎপরতা নতুন কিছুও নয়। এই তো মাত্র ১ মাস আগে ১৫ মার্চ ২০১৯ শুক্রবার, নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে আল নূর মসজিদ, লিনউড মসজিদে হামলা চালানো হয়। শুক্রবার নামাজ আদায়রত মুসলিমদের ওপর স্বয়ংক্রিয় বন্দুক নিয়ে হামলা চালায় এক হামলাকারী। হামলার ঘটনাটি ফেসবুকে লাইভও করে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী ওই শ্বেতাঙ্গ হামলাকারী। হামলায় নারী ও শিশুসহ ৫০ জন নিহত হন। এর মধ্যে দুজন বাংলাদেশি ছিলেন । গুরুতর আহত হন ২০ জন। নিউজিল্যান্ডের কোনো মসজিদে কোনো মুসলিমকে না যেতে নির্দেশ দিয়েছিল তখন পুলিশ। ওই সময় বাংলাদেশ বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা খেলা উপলক্ষে নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়েছিলেন। অল্পের  জন্য বেঁচে যান তারা।

উগ্র, ধর্মান্ধ, আততায়ী, জঙ্গী বা হামলাকারীরা যে শুধুমাত্র মসজিদ মন্দির গির্জা দেখে দেখে হত্যা করে এমনও নয়। ২০১৪ সালে তারা হামলা করেছিল পাকিস্তানের পেশোয়ারে একটা বাচ্চাদের স্কুলে। নিহত হয়েছিল দেড় শতাধিক শিশু। পাকিস্তানের সাথে আমাদের যতোই জাতিগত বিরোধ থাকুক না কেন, কোন দেশের কোন শিশুর সাথে আমাদের কোন বিরোধ নেই। তাছাড়া কোনো সহিংস আক্রমণকে আমরা কখনই সমর্থন করি না। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজেন  বেকারিতে হামলা করে জঙ্গিরা। জঙ্গিরা ওই রাতে ২০ জনকে হত্যা করে যাদের মধ্যে ৯ জন ইতিলিয়ান, ৭জন জাপানিজ, ৩ জন বাংলাদেশি ও ১ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। অন্ত:সত্তা ইতালীয় মহিলাকেও নির্মমভাবে হত্যা করে জঙ্গিরা ।  হামলায় মারা যান ২জন দায়িত্বশীল  পুলিশ কর্মকর্তাও। পরে কমান্ডো  অভিযানে ৫ জন হামলাকারী প্রাণ হারায়। 

কিন্তু দুঃখের বিষয় এটাই যে, ধর্মান্ধ কিছু মানুষ মসজিদ মন্দির গির্জায় এই ধরনের হামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। সোস্যাল মিডিয়ায় দেখছি,  কিছু মানুষ এ দেশীয় খ্রীষ্টানদের উস্কে দিতে চাচ্ছেন। তারা বলছেন, নিউজিল্যান্ড হামলার সময় এদেশীয় মুসলিমদের যতটা প্রতিক্রিয়া দেখা গেয়েছিল এখন নাকী তা দেখা যাচ্ছে না। অথচ তখন মারা গিয়েছিল ৫০ জন এখন ৩০০। আমার বক্তব্য এই, যে কোনো মৃত্যুই পীড়াদায়ক। সে একজনই হোক আর একশ জনই হোক। আর প্রতিক্রিয়া কাকে বলে? সারা দেশ শোকাতুর। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলায় হতাহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা এবং গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি নিহতদের আত্মার শান্তি এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। তিনি শ্রীলঙ্কা সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানোর পাশাপাশি  আর এক শ্রেণির মানুষ শিশু জায়ানের মিত্যুতে শোক প্রকাশ করার পরিবর্তে তার মৃত্যু নিয়ে উল্লাস করছেন, বিকৃত প্রতিহিংসামূলক কথা বার্তা বলছেন। তার পরিবার বা নানা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের রাজনৈতিক আদর্শের সাথে কারো মিল না-ই থাকতে পারে, কিন্তু জায়ানের সেখানে ভূমিকা কি। সেকী রাজনীতি করে, সেকী কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য? এমন কথাও ফেসবুকে দেখছি, সে গির্জায় গেছে কেন মুসলমান হয়ে? সেতো গির্জায় যায়নি। সে বাবা মায়ের সাথে বেড়াতে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। হোটেলে খেতে বসেছিল। ঘাতকরা তাকে খেতে  পর্যন্ত দেয়নি। 

এ ধরনের মানসিকতা মেটেও গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্ম করা ভাল কিন্তু ধর্মান্ধতা নয়।  আমাদের সবারই মনে রাখা ভাল যে, প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটা ধর্ম আছে। আর সেই ধর্মকে আশ্রয় করে সে চলে। যার যার ধর্ম তার বড় প্রিয় । কাজেই নিজের ধর্মকে যেমন সম্মান করা উচিত, একইভাবে সম্মান করা উচিত অন্যের ধর্মকে। আমাদের প্রত্যিকেরই সন্তান আছে। সন্তান প্রতিটি বাবা– মায়ের কাছে নিজের জীবনের চেয়ে প্রিয় । কাজেই কারো সন্তান চলে গেলে, পাশে দাঁড়াতে না পারেন, বাজে কথা অন্তত বলবেন না। কথা বলবেন নিজের সন্তানের দিকে তাকিয়ে। 

জায়ান, এই ধর্মান্ধ নিষ্ঠুর পৃথিবী তোমাকে বাঁচতে দিলো না। আমরা তোমাকে বাঁচাতে পারলাম না। আমরা দুঃখিত, লজ্জিত। ক্ষমা করে দিও জায়ান। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর