শেষ যুগে ফেতনার বাহাত্তরটি আলামত (পর্ব-১) 

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০২ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২০ ১৪২৬,   ০৯ শা'বান ১৪৪১

Akash

শেষ যুগে ফেতনার বাহাত্তরটি আলামত (পর্ব-১) 

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৪৫ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

পবিত্র মক্কা নগরী- ফাইল ফটো

পবিত্র মক্কা নগরী- ফাইল ফটো

এ লেখায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা সম্পর্কিত এমন একটি বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা রাখব, বর্তমান সময়ে যার প্রয়োজন আছে এবং সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার এ দিকটি সম্পর্কে আলোচনাও কম হয়।

আল্লাহ তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়ায় শেষ নবী রূপে প্রেরণ করেছেন। তাঁর ওপর নবুওয়াতের ধারাবাহিকতার সমাপ্তি ঘটেছে। পূর্ববর্তী নবীদের ওপর তাঁর বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব হলো, পূর্ববর্তী নবীদেরকে বিশেষ সম্প্রদায় কিংবা বিশেষ এলাকার জন্য এবং নির্ধারিত সময়ের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। তাঁদের শিক্ষা ও দাওয়াত একটি নির্ধারিত সময়কাল পর্যন্ত এবং একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল।

যেমন: হজরত মুসা (আ.)-কে মিসর অঞ্চলে বনি ইসরাইল সম্প্রদায়ের নবীরূপে পাঠানো হয়েছে। বনী ইসরাইল সম্প্রদায় এবং মিসর অঞ্চলে তার নবুওয়াত এবং রিসালাত সীমাবদ্ধ ছিল। পক্ষান্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ কোনো সম্প্রদায়, জাতি কিংবা বিশেষ কোনো অঞ্চলের জন্য এবং নির্ধারিত সময়ের জন্য নবীরূপে প্রেরণ করেননি। বরং পুরো পৃথিবীর জন্য, সব মানুষ ও জিনের জন্য এবং কেয়ামত পর্যন্ত নবী বানিয়েছেন। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا

‘হে নবী, আমি আপনাকে সব মানুষের জন্য সুসংবাদদাতা এবং সর্তককারীরূপে প্রেরণ করেছি।’ (সাবা : ২৮)।

এ থেকে বুঝা যায়, তাঁর রিসালাত ও নবুওয়াত আরবভূমিতে সীমাবদ্ধ নয় এবং বিশেষ কোনো যুগের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয় বরং কেয়ামত পর্যন্ত আগত সব যুগের জন্য তাঁকে রাসূল বানানো হয়েছে।

ভবিষ্যতে সঙ্ঘটিত অবস্থাসমূহের বর্ণনা:

অতএব, তাঁর শিক্ষা ও তাঁর বর্ণিত বিধি-বিধান কেয়ামত পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। কোনো যুগের সঙ্গে তাঁর শিক্ষা সীমাবদ্ধ নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যে শিক্ষা দান করেছেন তা জীবনের সব শাখায় পরিব্যাপ্ত। তাঁর শিক্ষার দু’টি দিক আছে। একটি হলো, শরীয়তের বিধি-বিধানের বর্ণনা। যেমন, অমুক জিনিস হালাল এবং অমুক জিনিস হারাম, এ কাজ জায়েজ এবং ওই কাজটি নাজায়েজ, অমুক আমলটি ওয়াজিব, অমুক আমলটি সুন্নত এবং অমুক আমলটি মুসতাহাব। অন্যটি হলো, মুসলিম উম্মাহ ভবিষ্যতে কী ধরনের অবস্থার মুখোমুখি হবে এবং তাদের ওপরে কী কী বিপর্যয় আসবে এবং সে অবস্থায় করণীয় কী, তার বর্ণনা।

এ দ্বিতীয় দিকটি রাসূল (সা.) এর শিক্ষার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি ভবিষ্যতে সঙ্ঘটিত ঘটনাবলী সম্পর্কে আল্লাহর পক্ষ থেকে জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার পর উম্মতকে জানিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে এই এই ঘটনা ঘটবে এবং সে অবস্থায় উম্মতের করণীয় কী তাও বাতলে দিয়েছেন। আজকে এ বিষয় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা রাখব।

উম্মতের নাজাতের ফিকির: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের নাজাতের চিন্তায় সর্বদা ব্যাকুল থাকতেন। এক হাদিসে আছে,

كان رسول الله صلي الله عليه وسلم دائم الفكرة متواصل الاحزان

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা চিন্তান্বিত এবং দুঃখ-ভারাক্রান্ত থাকতেন। মনে হত সর্বদাই তাঁর ওপর কোনো দুঃখ ছেয়ে আছে। এটা কিসের দুঃখ? যে সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছে তাদেরকে কীভাবে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো যায়, কীভাবে তাদেরকে ভ্রান্ত পথ থেকে সত্য-সুন্দর পথে নিয়ে আসা যায়, এটাই ছিল তাঁর চিন্তা ও দুঃখের একমাত্র কারণ। কোরআনুল কারিমে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেই ইরশাদ হয়েছে,

لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ

‘লোকেরা ঈমান আনছে না বলে আপনি কি দুঃখে আত্মবিনাশী হয়ে পড়বেন? (শুয়ারা : ৩)।

এক হাদিসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমার উম্মত হলো এক ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন প্রজ্বলিত করল এবং তা দেখে পতঙ্গসমূহ উড়ে এসে আগুনে পড়তে লাগল। লোকটি পতঙ্গগুলোকে দূরে রাখার চেষ্টা করে কিন্তু তারপরও সেগুলো আগুনে ঝাপ দেয়। এমনিভাবে আমিও তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি, তোমাদের কোমর ধরে ধরে বাঁধা দিচ্ছি কিন্তু এরপরও তোমরা জাহান্নামের আগুনে পড়ে যাচ্ছ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু তাঁর যুগের লোকদের জন্য ফিকির ছিল তাই নয় বরং কেয়ামত পর্যন্ত আগত সব উম্মতের জন্য সমান ফিকির ছিল।

ভবিষ্যতে কি কি ফেতনা দেখা দেবে: 

তাই রাসূল সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম আগত লোকদেরকে সমকালীন অবস্থা সম্পর্কে সর্তক করেছেন। এ সম্পর্কিত হাদিসগুলো হাদিসের প্রায় সব গ্রন্থেই ‘কিতাবুল ফিতান’ নামে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ে সন্নিবেশিত হয়েছে। এক হাদিসে রাসূল সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম ইরশাদ করেন,

تقع الفتن في بيوتكم كوقع المطر

‘ভবিষ্যতে তোমাদের গৃহে বৃষ্টির ফোঁটার ন্যায় ক্রমাগত ফেতনা দেখা দেবে। বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে আগত ফেতনাকে তুলনা করে দুইটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এক. বৃষ্টিতে পানির পরিমাণ যেরূপ অনেক থাকে তদ্রুপ ভবিষ্যতে ফেতনার পরিমাণও হবে অনেক। দুই. বৃষ্টির ফোঁটা যেরূপ ক্রমাগত ও বিরামহীন পড়ে, ফেতনাও তদ্রুপ ক্রমাগত ও বিরামহীন আসবে। একটি ফেতনা শেষ না হতেই আরেকটি ফেতনা দেখা দেবে। দ্বিতীয়টি শেষ না হতেই তৃতীয়টি দেখা দেবে এবং এ ফেতনাগুলোর প্রভাব তোমাদের ঘরে এসে পড়বে। অন্য এক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন,

ستكون فتن كقطع الليل المظلم

‘অচিরেই আঁধার রাতের অন্ধকারচ্ছন্নতার মতো ফেতনা দেখা দেবে। অর্থাৎ অন্ধকার রাতে যেরূপ মানুষ রাস্তা খুঁজে পায় না, তদ্রুপ ফেতনার যুগে মানুষ কী করবে তা বুঝে উঠতে পারবে না। ফেতনা তোমাদের পুরো সমাজ ও পরিবেশকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ তোমাদের দৃষ্টিগোচর হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ ফেতনা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়ার দোয়া শিখিয়েছেন,

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ  مِنَ الْفِتَنِ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল ফিতানি মা জহারা মিন্না ওয়ামা বাতানা।’

অর্থ : হে আল্লাহ! আমরা আগত ফেতনাসমূহ থেকে আপনার কাছে পানাহ চাই। যাহেরি ফেতনা থেকেও পানাহ চাই এবং বাতেনি ফেতনা থেকেও পানাহ চাই।’

এ দোয়াটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়মিত দোয়াসমূহের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ফেতনা কি?

ফেতনা কি জিনিস? ফেতনা কাকে বলে? ফেতনার যুগে আমাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা কি? ফেতনা শব্দটি কোরআনুল কারিমে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখিত হয়েছে। সূরা বাকারায় ইরশাদ হয়েছে,

وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ

‘আল্লাহর কাছে ফেতনা হত্যা অপেক্ষা মারাত্মক।’

ফেতনার অর্থ ও মর্ম:

ফেতনা আরবি শব্দ। অভিধানে এর অর্থ হলো, আগুনে গলিয়ে স্বর্ণ বা রূপার খাঁদ পরখ করা। পরবর্তীতে শব্দটিকে পরখ করা, যাচাই করা, পরীক্ষা করা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং ফেতনার অন্য অর্থ হলো, পরখ করা ও পরীক্ষা করা। যখন মানুষ বিপদ-মসিবতে আক্রান্ত হয় কিংবা দুঃখ-বেদনার শিকার হয় তখন তার ভেতরগত অবস্থার একটি পরীক্ষা হয় যে, এরূপ অবস্থায় সে কী কর্মপন্থা অবলম্বন করে? সে কি ধৈর্য ধারণ করে, না ধৈর্যহারা হয়ে পড়ে? আল্লাহ তায়ালার অনুগত থাকে, না অবাধ্য হয়ে পড়ে? এ পরীক্ষাকেও ফেতনা বলা হয়।

হাদিস শরিফে ফেতনা শব্দের ব্যবহার:

হাদিস শরিফে শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা হলো, যখন এরূপ পরিস্থিতি দেখা দেয় যে, সত্যকে চেনা যায় না, হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করা মুশকিল হয়, সঠিক এবং ভুলের মাঝে পার্থক্য বাকি থাকে না, সত্য কোনটি এবং মিথ্যা কোনটি তা বুঝা যায় না, এরূপ পরিস্থিতিতে বলা এটি ফেতনার যুগ। এমনিভাবে যখন সমাজে পাপাচার, গুনাহ ও অশ্লীলতা ব্যাপকরূপ লাভ করে একেও ফেতনা বলা হয়। এমনিভাবে না হককে, হক মনে করা এবং প্রমাণহীন জিনিসকে প্রমাণিত মনে করা একটি ফেতনা। যেমন, বর্তমান যুগে দেখা যায়, কাউকে কোনো দ্বীনি বিষয়ে বলা হল যে, এ কাজটি গুনাহ, নাজায়েজ বা বেদআত। উত্তরে সে বলে, আরে, এ কাজ তো সবাই করছে, যদি এটা গুনাহ বা নাজায়েজ হয় তা হলে সারা দুনিয়ার লোক এটা কেন করছে? এ কাজ তো সৌদি আরবেও হচ্ছে...। আজকের যুগে এটি একটি নতুন দলিল আবিষ্কৃত হয়েছে যে, আমরা সৌদি আরবে এ কাজ করতে দেখেছি। এর দ্বারা বুঝা যায়, সৌদি আরবে যেই কাজ হয় তা নিঃসন্দেহে সঠিক এবং বৈধ। অতএব, যে জিনিস দলিল ছিল না তাকে দলিল মনে করাও একটি ফেতনা।

দুই দলের লড়াই একটি ফেতনা:

এমনিভাবে যখন দু’জন মুসলমান কিংবা মুসলমানদের দ ‘টি দল পরস্পর লড়াই করে এবং একে অন্যকে হত্যা করতে উদ্যত হয় এবং জানা যায় না, কে ন্যায়ের ওপর এবং কে অন্যায়ের ওপর আছে, তা হলে এটিও একটি ফেতনা। এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِذَا التَقَى المُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا فَالقَاتِلُ وَالمَقْتُولُ فِي النَّارِগ্ধ

‘যদি দুজন মুসলমান তরবারি নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করে তা হলে হত্যাকারী এবং নিহতব্যক্তি উভয়ই জাহান্নামে যাবে। এক সাহাবি জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসূল, হত্যাকারী জাহান্নামে যাবে, এটা তো ঠিক আছে; সে একজন মুসলমানকে হত্যা করেছে কিন্তু নিহতব্যক্তি কেন জাহান্নামে যাবে? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কারণ সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করার জন্য তরবারি উত্তোলন করেছিল। যদি কৌশলে সে পরাজিত না হত তা হলে সেই তার সঙ্গীকে হত্যা করত। কিন্তু সে কৌশলে পরাস্ত হওয়ায় প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়। এদের কেউই আল্লাহর জন্য লড়াই করেনি বরং দুনিয়ার জন্য, ধন-সম্পদের জন্য কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে লড়াই করছিল এবং একে অপরের রক্তপিপাসু ছিল। অতএব দুজনেই জাহান্নামে যাবে।

গুম, হত্যা ও লুটতরাজ একটি ফেতনা:

অন্য এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِنَّ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ أَيَّامًا، يُرْفَعُ فِيهَا العِلْمُ، وَيَنْزِلُ فِيهَا الجَهْلُ، وَيَكْثُرُ فِيهَا الهَرْجُগ্ধ وَالهَرْجُ, القَتْلُ

‘তোমাদের পরে এমন একটি যুগ আসবে যখন ইলম তুলে নেয়া হবে এবং হারায’র সংখ্যা অনেক বেশি হবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হারায কী জিনিস? রাসূল সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম বলেন, হত্যা ও লুটতরাজ। অর্থাৎ সেই যুগে গুম, হত্যা ও লুটতরাজ এত বেশি হবে যে, মানুষের জীবন মশা-মাছির চেয়েও মূল্যহীন হবে। (বুখারি)।

অন্য এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

يَأْتِيَ عَلَى النَّاسِ يَوْمٌ لَا يَدْرِي الْقَاتِلُ فِيمَ قَتَلَ، وَلَا الْمَقْتُولُ فِيمَ قُتِلَ " فَقِيلَ, كَيْفَ يَكُونُ ذَلِكَ؟ قَالَ, ্রالْهَرْجُ، الْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِগ্ধ

‘একটি যুগ এরূপ আসবে, যখন হত্যাকারী জানবে না কেন সে হত্যা করেছে এবং নিহত ব্যক্তি জানবে না কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে। (মুসলিম)।

বর্তমান যুগের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করলে মনে হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ যুগের অবস্থা দেখে উপরিউক্ত কথাটি বলেছেন। আগের যুগে যেটা হত, হত্যাকারী কে, এটা জানা না গেলেও কেন হত্যা করা হয়েছে তা জানা যেত। উদাহরণত, শত্রুতার জেরে হত্যা করা হয়েছে কিংবা ডাকাতরা হত্যা করেছে কিংবা ধন-সম্পদ রক্ষা করতে যেয়ে নিহত হয়েছে; নিহত হওয়ার কারণ প্রকাশ হয়ে পড়ত। কিন্তু বর্তমান অবস্থা হলো, এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে; তার সঙ্গে কারো লেনদেন নেই, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই, কারো সঙ্গে বিবাদ নেই, ব্যস, শুধু শুধু মারা পড়ল।

মক্কা শরিফ সম্পর্কে একটি হাদিস:

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদি. থেকে বর্ণিত, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন মক্কা শরিফের উদর বিদীর্ণ করা হবে এবং তার মধ্য দিয়ে নদীর মতো প্রশস্ত রাস্তা তৈরি হবে আর নির্মিত ভবনগুলো মক্কা শহরের পাহাড়গুলোর চেয়ে উঁচু হবে তখন মনে কর ফেতনার সময় সন্নিকটে।আজ থেকে কয়েক বছর আগে পর্যন্ত এ হাদিসের সঠিক অর্থ মানুষের বুঝে আসেনি, এখন সবাই বুঝেছে। মক্কা শরিফের ভূমি বিদীর্ণ হওয়া আলোচ্য হাদিসটি চৌদ্দশ বছর যাবত হাদিসের কিতাবে সংকলিত হয়ে আসছে। হাদিসটির ব্যাখ্যা দানের সময় হাদিসের ব্যাখ্যাকারা বিস্মিত হতেন যে, মক্কা শহরের উদর কীভাবে বিদীর্ণ হবে? এবং নদীর মতো রাস্তা হওয়ার অর্থ কি? কিন্তু আজকের মক্কা শহরকে দেখলে মনে হবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজকের মক্কা শহরকে দেখে উপরিউক্ত কথা বলেছেন। আজকে মক্কা শরিফের ভূমি বিদীর্ণ করে অসংখ্য সুরঙ্গ-পথ নির্মাণ করা হয়েছে। পূর্বেকার হাদিসের ব্যাখ্যাকারেরা আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যা দানকালে বলতেন, এখন তো মক্কা শরিফ পাথুরে ভূমি এবং পাহাড়ি এলাকা তবে ভবিষ্যতে কোনো কালে আল্লাহ তায়ালা এ শহরে নদী এবং খাল-বিল সৃষ্টি করবেন কিন্তু আজকের সুরঙ্গ-পথগুলো দেখে বুঝা যাচ্ছে যে, কীভাবে মক্কা শরিফের ভূমি বিদীর্ণ করা হয়েছে।

বিল্ডিংসমূহ পাহাড়ের চেয়ে উঁচু হওয়া:

আলোচ্য হাদিসের দ্বিতীয়াংশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন মক্কা শরিফের ভবনগুলো এর পাহাড়গুলোর চেয়ে উঁচু হবে...। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও কেউ ভাবতেই পারেনি যে, মক্কা শরিফে পাহাড়ের চেয়েও উঁচু কোনো ভবন নির্মিত হবে। কারণ পুরা মক্কা শরিফ পাহাড়ী এলাকার মাঝে অবস্থিত। কিন্তু আজকে গিয়ে দেখুন, পাহাড়ের চেয়ে উঁচু উঁচু কত ভবন নির্মিত হয়েছে।

উপরিউক্ত হাদিসগুলো থেকে বুঝা যায় যে, চৌদ্দশত বছর আগেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজকের অবস্থা স্বচক্ষে দেখে তা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহপ্রদত্ত ওহি ও ইলমের মাধ্যমে এ সব অবস্থা দিবালোকের ন্যায় তাঁর কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং তিনি প্রতিটি বিষয়ে খুলে খুলে আগত উম্মতের জন্য বলে গেছেন। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে