শুরুতেই ধাক্কা খেল নাটোরের দুই চিনিকল

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৩ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ৯ ১৪২৬,   ১৮ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

শুরুতেই ধাক্কা খেল নাটোরের দুই চিনিকল

নাটোর প্রতিনিধি

 প্রকাশিত: ১৩:৫৪ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৩:৫৪ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মৌসুমের শুরুতে উৎপাদনে গিয়েই কারিগরি ত্রুটি, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ধাক্কা খেল নাটোরের দুই চিনিকল। ফলে সদর উপজেলার নাটোর সুগার মিল ও লালপুরের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২৭ হাজার ২২৫ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। 

২০১৮-১৯ মৌসুমের ১৭ নভেম্বর  প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে আখ মাড়াই কার্যক্রম শুরু হয় নাটোর চিনিকলে।  উৎপাদন শুরুর ১১ ঘন্টা পরই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায় চিনিকলটি। পরে ৮ ঘন্টা পর উৎপাদন চালু হলেও ২৯শে নভেম্বর রাতে চিনিকলটির বয়েলিং সেকশনের চারটি তরল গুড়ের ট্যাংক ধসে পড়লে সেই থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে চিনি উৎপাদন। তিন দশকেরও বেশি সময় চিনিকলটিতে নতুন যন্ত্রাংশ সংযোজন বা প্রতিস্থাপন না করায় কারিগরি ত্রুটির কবলে পড়ে চিনিকলটি। চিনি উৎপাদনে অপরিহার্য সালফার সংরক্ষণাগার চিনিকলের ভেতরে স্থাপন করায় গ্যাসের প্রভাবে এবার ধকল সইতে পারেনি মরিচা ধরা ট্যাংক ও যন্ত্রাংশগুলো, দাবি ছিল কর্তৃপক্ষের। 
  
চলতি মৌসুমে ১২ হাজার ২২৫ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নাটোর চিনিকল। কিন্তু কবে নাগাদ মিলটি চালু করা যাবে, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষই সংশয়ে রয়েছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে চিনিকলটির উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় সদর, নলডাঙ্গা ও পাশ্ববর্তী কয়েকটি উপজেলার কয়েক হাজার আখচাষি আখ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।  সদর ও নলডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন আখ ক্রয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, দুই তিনটি আখ বহনের লরিতে আখ ভরা আছে। শত শত মণ আখ মাঠে পড়ে আছে। চাষিরা আখ ক্রয় কেন্দ্রে ভিড় করছে। 

নলডাঙ্গা উপজেলার আখচষি আমিনুল ইসলাম বলেন,গতবছর থেকে চিনিকল কৃর্তপক্ষ পাওয়ার ক্রাশারে আখ মাড়াই করে গুড় উৎপাদন বন্ধ করে দেয়ায় অনেক চাষি পাওয়ার ক্রাশারে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন ক্রাশারে দিয়েও আখ মাড়াই সম্ভব না আবার মিলও বন্ধ। আমরা কোন উপায় দেখছি না। বাজারে বর্তমানে গুড়ের যে দাম তাতে গুড় উৎপাদন করা মানেই লোকসান। তার উপর মিল বন্ধ হওয়ায় আমরা হতাশ।  

নাটোর সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ শহীদুল্লা বলেন,ট্যাংক ধসের পর পরই ঢাকা থেকে ৫ জন টেকনিশিয়ান এসে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের ৩ জনের সার্বিক তত্বাবধানে দ্রুতগতিতে তরল গুড়ের ট্যাংক মেরামতের কাজ চলছে। এরইপূর্বে কাটা আখ জেলার নর্থবেঙ্গল সুগার মিল ও রাজশাহী সুগার মিলে সরবরাহ করা হচ্ছে। শিগগিরই চিনিকলে উৎপাদন শুরু হবে। আখ নিয়ে কৃষকের দুশ্চিন্তা থাকবে না। 

অপরদিকে, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে লালপুরের নর্থ বেঙ্গল চিনিকলে। এ চিনিকলের আটটি কৃষি খামারের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধিসহ ৭ দফা দাবি করে আসছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। ২২ নভেম্বর দাবির মুখে দুইটি গ্রেডে চলতি মজুরি ৫০ টাকা বৃদ্ধি করে নির্ধারণ করা হলেও নতুনভাবে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।  অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মজুরির তুলনায় মজুরি অনেক কম- এমন দাবি করে পুনরায় মজুরি বৃদ্ধিসহ পুননির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিকেরা।  সম্প্রতি ওই ৮টি কৃষি খামারের দৈনিক শ্রমিক ঐক্য কমিটির পক্ষ থেকে চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর ১৫ দিনের আলটিমেটামও দিয়েছে তারা। 

সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান মজুরি বৃদ্ধির একটি সুপারিশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনে পাঠিয়েছেন। লোকমাপুর কৃষ্ণা, নন্দা, বড়াল, ভবানীপুর, মুলাডুলি, নরেন্দ্রপুর, গোবিন্দপুর ও বীজ বর্ধন কৃষি খামারের শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ সুপারিশ পাঠান।  

চলতি বছরের ২২ নভেম্বর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন খামার শ্রমিকদের মজুরি পুননির্ধারণ সংক্রান্ত বোর্ড দৈনিক হাজিরা পুননির্ধারণ করে। এতে সাধারণ (হালকা) কাজের জন্য প্রতিদিন ২০০ টাকার পরিবর্তে ২৫০ টাকা এবং ওবারহেড (ভারী) কাজের জন্য ২১০ টাকার পরিবর্তে ২৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত পরিমাণ মজুরি বৃদ্ধিতেও শ্রমিকরা সন্তুষ্ট হয়নি। 

চিনিকলের শ্রমিক ঐক্য কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম বিপ্লব বলেন,আমরা ওভারহেড সেকশনের ভারী কাজের জন্য ৫০০ টাকা ও সাধারণ সেকশনের হালকা কাজের জন্য ৪৫০ টাকা মজুরির দাবি করেছি। অথচ কায়িক শ্রমের এ দুইটি সেকশনের জন্য মজুরি বাড়ানো হয়েছে মাত্র ৫০ টাকা যা রীতিমত উপহাস সাড়ে ৫ হাজার শ্রমিকের সঙ্গে। দাবি মানা না হলে ৮ টি খামারের শ্রমিকরা লাগাতার কর্মবিরতিতে যাবে।
 
নর্থ বেঙ্গল চিনিকলের জিএম (খামার) ইমতিয়াজ হোসেন বলেন,আর্থিক সঙ্কটে থাকা কর্পোরেশন শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় নিলে একবার মজুরি বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্ত শ্রমিকরা সেটি মানছেন না। তারা আল্টিমেটাম দিয়ে কাজ বন্ধ করলে ফার্মগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, চিনিকল না।। বছরখানেক পরে আবারো তাদের মজুরি বৃদ্ধির আশ্বাস দেয়া হয়েছে চিনিকলের পক্ষ থেকে।  

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম

Best Electronics