Alexa শুভ জন্মদিন কবি মেহেরুন্নেসা

ঢাকা, শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৫ ১৪২৬,   ২০ মুহররম ১৪৪১

Akash

শুভ জন্মদিন কবি মেহেরুন্নেসা

সাইয়িদ হাসান টিপু (অবসকিওর) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৭ ২০ আগস্ট ২০১৯  

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ষাটের দশকে কবিদের ভিড়ে, বাংলা এ্কাডেমির পাঠের আসরে, সদা উপস্থিত - প্রাণবন্ত- হাস্যজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিপছিপে এক তরুণী কবির দেখা মিলতো। একাত্তরের উত্তাল মার্চে বাংলাদেশের মুক্তির স্বপ্ন চোখে নিয়ে যিনি রাজপথে, মিছিলের সন্মুখে সাহসের সাথে হেঁটে গেছেন, স্লোগানে স্লোগানে অগ্নি ঝড়িয়েছেন।

বাবা ক্যান্সারে মারা গেলে পরিবারের অন্ন যোগাতে পত্রিকায় কপি লেখা আর প্রুফ দেখার কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। সেসময়ের প্রায় সব পত্রিকাতেই তার কবিতা ছাপা হতো। কিন্তু সংসারের অন্ন যোগাতে গিয়ে এক সময় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে চিরচেনা মুখটির অনুপস্থিতি চলতে থাকে। কিন্তু ছোটদুটি ভাইকে তো মানুষ করতে হবে। তাই নিজের সম্ভাবনা ভুলে পরিশ্রম করে গেলেন দিনরাত। এরই মাঝে “সাত কোটি জয় বাংলার বীর! ভয় করি নাকো কোন/ বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে- চির বিজয়ের পতাকাকে দেবো, সপ্ত আকাশে মেলে/ আনো দেখি আনো সাত কোটি এই দাবীর মৃত্যু তুমি/ চির বিজয়ের অটল শপথ/ জয় এ বাংলায় তুমি....” এই কবিতাটি জানান দেয় বিপ্লবের কথা। পাকি শাসক গোষ্ঠীর প্রতি ছুঁড়ে দেয়া এই চ্যালেঞ্জে ক্ষমতার ভীত কেঁপে ওঠে।

পাক-হানাদার, রাজাকার ও বিহারীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে নিজ বাড়ির ছাদে উড়িয়েছিলেন লাল-সবুজের পতাকা। অবাঙালি ও বিহারীদের হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত মিরপুরের বাঙ্গালিদের রক্ষার জন্য যিনি প্রিয় বান্ধবী কাজী রোজীকে সঙ্গে নিয়ে গঠন করেছিলেন - “অ্যাকশন কমিটি”।

জাতির বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়া যাওয়া সেই দুঃসাহসী কবির নাম মেহেরুন্নেসা। ঘাতকদের নির্মম হত্যাকাণ্ডে আমরা তাকে একাত্তরে হারিয়েছি।

৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পর কবি মেহেরুন্নেসা ঠিক করে্ন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবেন। ২৩ মার্চ পাকিস্তানের “প্রজাতন্ত্র দিবস” হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের পতাকা না উড়িয়ে বাড়ির ছাদে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন অদম্য সাহসী এই মানুষটি। এতে ক্ষিপ্ত হয় ওই এলাকার রাজাকার ও বিহারীরা,  কিন্তু তাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেন মেহেরুন নেসা। অবাঙালি ও বিহারীদের হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হতো মিরপুরের বাঙালিরা। এই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য গঠিত হয় “অ্যাকশন কমিটি” যেখানে প্রেসিডেন্ট হন মেহেরুন্নেসার খুব কাছের বান্ধবী কাজী রোজি ও তিনি হন সদস্য। ২৫ তারিখেও কমিটির মিটিং শেষে দুই বান্ধবী গল্প করেন দেশের অবস্থা নিয়ে, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে অনুমান করে্ন তারা।

এর ঠিক দুদিনের মাথায় ঘটে যায় এই নির্মম হত্যাকাণ্ড। ২৭ মার্চ, বেলা ১১ টার দিকে কাদের মোল্লার নেতৃত্বে মাথায় লাল ও সাদা পট্টি পরে মেহেরুন নেসার মিরপুরের বাসায় আসে কাদের মোল্লা, হাসিব হাশমি, আব্বাস চেয়ারম্যান, আখতার গুণ্ডা, নেহাল ও আরো অনেকে। মেহেরুন নেসা বুঝতে পেরে কুরআন শরীফ বুকে নিয়ে সকলের প্রাণ ভিক্ষা চায়, কিন্তু পিশাচেরা সেই আকুতি শোনেনি। একে একে সবাইকে জবাই করে হত্যা করে তারা, তারপর মেতে ওঠে নারকীয় উল্লাসে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার পর দুইজন অবাঙালি বিহারীর মুখে শোনা যায় সেই নারকীয় উল্লাসের নির্মম ইতিহাস।

২৭ মার্চে নির্মমভাবে জবাই করে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয় কবি মেহেরুন্নেসা, তার মা ও দুই ভাইকে। মেহেরুন্নেসার দুই ভাইয়ের মাথা নিয়ে ফুটবলের মতো খেলেছিল সেদিন ঘাতকেরা। মেহেরুন্নেসার কাটা মাথা তারই লম্বা চুল দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে বেধে ঘুরানো হয়, আর নিচে পড়ে থাকে জবাই করা মুরগীর মতো রক্তাক্ত মেহেরুন্নেসার দেহটা। মিরপুরের কসাই কাদের মোল্লার নেতৃত্বে, তার দোসরদের সাথে পরিচালিত এই হত্যাকাণ্ড ছিল মানবতার ইতিহাসে অন্যতম এক কালো অধ্যায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীর ওপর যে নিষ্ঠুরতম ও নারকীয় হত্যাযজ্ঞ হয় তারই শিকার হয়ে যিনি প্রথম শহীদ মহিলা কবি হিসেবে অভিহিত হন—তিনি মেহেরুন্নেসা। তার জন্ম ১৯৪০ সালের ২০অগাস্ট পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। ক্লাব অবসকিওর এর পক্ষ থেকে তার জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে তাকে স্মরণ করি।
কবি মেহেরুন্নেসার দুটি কবিতা -

নয়া সফরের তাগিদ এসেছে

নয়ালী দিনের নয়ালী নকীব! নয়ালী নওজোয়ান
দিলের কাবায় আবার সুবে-সাদিকে দিল আজান
ঘুম ভেঙে গেছে জাগার কালেমা শুনে,
খোশ তাকদের জোশ আসেপুন কালিজার
                      ম্লান ঘুনে।

দুই মৃত্যুর মুখোমুখি সব দাঁড়ায়েছি ঘরে এসে,
রসুললেকরীম! হেরি পশ্চাতে কারুনের বেষ্টনী
হাসে ফেরাউন নির্ভীক সম্মুখে।

বিশ্বাস হায় হারিয়ে গিয়েছে অবিশ্বাসের মাঝে,
লোভী মানুষের হীন প্রবৃত্তি বুকে ব্যথা হয়ে বাজে,
তারি মাঝে আজ আসিছে খালিদ,
         আসিছে তারিক মূসা,
তারি পশ্চাতে আসিছে আবার
         নওল হাসিন ঊষা,
তাহলে সাদিক! নতুন সাহসে আবার
          ছোটাও তাজি,
দিলের দুয়ারে নয়া সফরের তাগিদ
          এসেছে আজি।

***

জনতা জেগেছে

 

মুক্তি শপথে দীপ্ত আমরা দুরন্ত দুর্বার,
সাত কোটি বীর জনতা জেগেছি, এই জয় বাঙলার।

পাহাড় সাগর, নদী প্রান্তর জুড়ে-
আমরা জেগেছি, নবচেতনার ন্যায্য নবাঙ্কুরে।
বাঁচবার আর বাঁচাবার দাবী দীপ্ত শপথে জ্বলি,
আমরা দিয়েছি সব ভীরুতাকে পূর্ণ জলাঞ্জলি।
কায়েমী স্বার্থবাদীর চেতনা আমরা দিয়েছি নাড়া,
জয় বাঙলার সাত কোটি বীর, মুক্তি সড়কে খাড়া।

গণতন্ত্রের দীপ্ত শপথে কণ্ঠে কণ্ঠে সাধা-
আমরা ভেঙ্গেছি, জয় বাঙলার যত বিজয়ের বাধা।
কায়েমী স্বার্থবাদী হে মহল! কান পেতে শুধু শোনো-
সাতকোটি জয় বাঙলার বীর! ভয় করিনাকো কোনো।

বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে-
চিরবিজয়ের পতাকাকে দেবো, সপ্ত আকাশে মেলে।
আনো দেখি সাত কোটি এই দাবীর মৃত্যু তুমি,
চিরবিজয়ের অটল শপথ, এ জয় বাঙলা ভূমি।

(এই কবিতাটি তার লেখা শেষ কবিতা । এটি প্রকাশিত হয়েছিল “সাপ্তাহিক বেগম” পত্রিকায় তার মৃত্যুর ঠিক ৪ দিন আগে, ২৩ মার্চ, ১৯৭১-এ) 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর