শুধু শোক নয়, সতর্কতাও জরুরি

ঢাকা, বুধবার   ২৬ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১২ ১৪২৬,   ২১ শাওয়াল ১৪৪০

শুধু শোক নয়, সতর্কতাও জরুরি

 প্রকাশিত: ১৬:৫৫ ২৬ এপ্রিল ২০১৯  

অজয় দাশগুপ্ত সিডনি প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও ছড়াকার। জনপ্রিয় কলাম লেখক অজয় দাশ গুপ্তের জন্ম চট্রগ্রামে। দীর্ঘকাল প্রবাসে বসবাসের পরও তিনি দেশের একজন নিয়মিত কলাম লেখক। সম-সাময়িক বিষয়ের পাশাপাশি তির্যক মন্তব্য আর প্রেরণা মুলক লেখায় তিনি স্বীয় আসন নিশ্চিত করেছেন।

প্রতিটি ঘটনাই আমাদের কোনো না কোনো শিক্ষা দিয়ে যায়। তো শৃলঙ্কার ঘটনা কী বার্তা দিয়ে গেলো? 

শুধু শোক আর সান্তনাই কি আমাদের ঘিরে থাকবে? নাকি করণীয় আরো কিছু আছে? আজ দুনিয়া এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে চোখ বন্ধ করে সমস্যা এড়ানো যাবে না। ঘাড়ের ওপর দৈত্য রেখে আপনি কিভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন? দেখুন চোখ মেলে। চাইলেও এড়াতে পারবেন না বিপদ। কোথায় বাংলাদেশ আর কোথায় শ্রীলঙ্কা। তারপরও বেড়াতে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিলো আমাদের ছোট বাচ্চাটি। কী নিদারুণ কী বীভৎস এই ঘটনা। জায়ানের জন্য আমাদের বুক ভরা ভালোবাসা আর শোকের পাশাপাশি ঘটনার ভেতরে না গেলে বিশ্লেষন না করলে মুক্তি মিলবে কিভাবে?

সম্প্রতি তথ্য মিলেছে এই হামলার পেছনে যেসব আততায়ী তারা কেউ গরীব বা দরিদ্র ছিলো না। তারা সবাই স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। তাদের টাকা পয়সার অভাব ছিলো না। বরং বলা হচ্ছে টাকাই তাদের ভরসা দিয়েছে। খবরে দেখলাম কথিত আইএস এর দায় স্বীকার করেছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকার সরাসরি তাদের দায় নাকচ করে দিয়ে বলছে তারা হয়তো আদর্শিক ও অর্থ সহযোগী। কিন্তু দেশের ভেতরেই আছে মূল হামলাকারীরা। মনে রাখা দরকার শ্রীলঙ্কা এ জাতীয় ঘটনা মোকাবেলায় যথেষ্ট পারদর্শী। তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রচুর। দেশটি দীর্ঘকাল ধরে গৃহযুদ্ধের ভেতর দিয়ে যাওয়া একটি দেশ। তাদের  জাতিগত সহিংসতা চলেছিল অনেককাল। লাখো মানুষের মৃত্যু আর প্রচুর সর্বনাশের ভেতর দিয়ে যাওয়া দশকের পর দশক এই জাতিকে কঠিন করে তুলেছে। যেভাবে তারা তামিল হিন্দু জনগোষ্ঠীকে দমন করেছিল সেটাও  প্রশ্নবোধক। তামিলরা এখন কোণঠাসা। তাদের বেঁচে থাকা তাগড়া জোয়ানের সংখ্যা হাতে গোণা। শুধু তাই না এদেশে মাঝে মাঝে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ওপর  ও হামলা হয়। তা বলে একথা বলা যাবেনা এমন প্রতিশোধ কাম্য বা এমন কোন ঘটনা সমর্থনযোগ্য। বরং এতে যা স্পষ্ট তা একদিকে যেমন বেদনার আরেকদিকে এতে সভ্যতা পড়েছে হুমকির মুখে।

ধর্ম মানুষকে ভরসা আর জীবন জয়ের জন্য দুনিয়ায় এসেছিল সে ধর্ম আজ সবচাইতে বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। অথবা ধর্মের নামে যেসব কাজ হচ্ছে সেগুলো কবর রচনা করছে সভ্যতার। এভাবে চললে মানুষ সভ্যতার ওপর আস্হা রাখতে পারবে কিভাবে? কিভাবে আমরা জানবো যে ঈশ্বর মানুষকে বাঁচান? সে প্রশ্ন যারা উস্কে দিচ্ছে তারা নাকি ধার্মিক। তাদের এই উগ্রতা যারা সমর্থন করেন বা প্রকারন্তরে সমধারণা পোষণ করেন তারাও মূলত মানুষ বিরোধী। ফলে আমরা এখন কঠিন মোকাবেলাই সমর্থন করতে বাধ্য হবো। আর যেটা বলছিলাম শ্রীলঙ্কা যেহেতু এসব বিষয় জানে আর তারা এগুলো মোকাবেলায় অভিজ্ঞ তারা শোধ তুলবেই। এরইমধ্যে নীরিহ সংখ্যালঘুদের ভয়ার্ত চেহারা দেখেছি টিভিতে। এই শোধ প্রতিশোধ যতদিন শেষ না হবে জায়ানের মত শিশুরাও ভালো থাকবেনা। বাঁচতে পারবে না। আজ নারী শিশু কেউ আর নিরাপদ না। এই সভ্যতা কি ধর্মকে অপসৃত করে বাঁচবে না নতুনভাবে কোন পথে ধর্মকে বাঁচাবে? মনে রাখা ভালো যেকোনো আদর্শ বা যে কোন বিষয় দুনিয়ায় আসার পর একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর তার জৌলুস হারিয়েছে। কিছু কিছু বিষয় তার প্রাসঙ্গকিতাও হারিয়ে ফেলেছে। ধর্ম হয়তো ততটা যাবে না। কিন্তু সাবধান না হলে ধার্মিকরা-ই পড়বেন বিপদে। এখন নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে ধর্ম। যা একসময় ভাবাও যায়নি। যার মানে মানুষ মুখ খুলছে। অধার্মিকরা এসব করছে বলে বা তাদের জানের ভয় দেখিয়ে খুব বেশি স্তব্দ রাখা যাবেনা। একতা সময় তারা বলবেই। যাদের জীবন থেকে স্বজন প্রিয়জনেরা ঝরে যাচ্ছে তারা কি ভাষায় বলবেন বা কি করবেন সেটাই এখন ভাবার। আমাদের দেশ বা সমাজ এখন ভালো নাই। মুখে আমরা যত বলি সমাজ পৌঁছে গেছে এক ভয়াবহ স্তরে। সেখানে এখন ধর্ম পোশাক কথা খাবার বন্দী কোনো বিষয়। তার অন্তর্গত সৌন্দর্য বা তার ভেতরের রূপ প্রায় উধাও। এভাবে চলতে থাকলে কতগুলো হলি আর্টিজান হতে পারে তা আমাদের অজানা না। সে বিষয় মোকাবেলায় একবার দেশ সার্থকতার প্রমাণ দিলেও বারবার যে তা পারবে তার কি গ্যারান্টি আছে? আর সে সময় ও আমরা হারিয়েছি। হারিয়েছি দেশ বিদেশের মানুষদের।

দেশে আসা বিদেশি মানুষরা জান হারালে কী প্রমাণ হয়? তখন কি মুখ দেখানোর পথ খোলা থাকে?  আমাদের সমাজ আজ বন্ধ্যা। এখানে কবিতা গান ভালোবাসা হয় বটে কিন্তু আগের মতো ফুল ফোটে না। বাতাস বয় না। শিশু থেকে বুড়ো সবাই এমন ব্যস্ত এমন এক ঘোরে যে তাদের ইহকাল যেন যেন তেন প্রকারে কাটালেই চলে। এই অন্ধকার-ই আজ দুনিয়ার মূল শত্রু। এর মোকাবেলা কিভাবে করতে হবে সে দিক নির্দেশনা যারা দিতে পারেন তারা ও আজ চুপ। কেউ ঝুঁকি নিতে নারাজ। নেবেন কিভাবে? মত বিরোধিতা মানে যদি অপমৃত্যু আর জীবন খোয়ানো কে যাবে তা করতে? তাই সমাজ বলতে গেলে পাহরাহীন। নাই অভিভাবক নাই নেতা। সেখানে টিমটিম করে জ্বলছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। তার ও কি বিপদ কম? কত আপস কত সমঝোতা করে চলতে হয়। কে যে কোথায় ওৎ পেতে আছে কে বলতে পারে? তবু তিনি দু’কুল তিন কুল সামলে দেশকে এই জায়গায় রেখেছেন। আগুন বোমা হরতাল সন্ত্রাস এসবের সমাজে এই শান্তি বিরল হলেও কিছু তো আছে। কিন্তু এখন সমস্যা আরো গভীর। শ্রীলঙ্কার এই ঘটনা মূলত বলে দিচ্ছে মানুষ বাঁচতে হলে বাঁচাতে হলে নিজেরা জাগতে হবে। নিজেরা নিজেদের সমাজকে আগলে না রাখলে কেউ আমাদের বাঁচাতে পারবে না। কোন বাহিনী কোন নিরাপত্তা বেষ্টনি কিছুই কিছু না যদি আমরা ঠিক না থাকি। তাই দোদুল্যমান মধ্যবিত্ত আর সন্দেহপ্রবণ মানুষদের-ই নিজেদের সংশোধন করতে হবে।  এর কোন বিকল্প নেই। এ কাজ না হলে আমাদের দেস ও নিরাপদ থাকবে বলে মনে হয় না। 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময় সত্য বলেন । সেটা কারো পছন্দ হলেও তিনি বলেন না হলেও বলেন। এবার ও বলতে ভোলেননি। তিনি যে সবাইকে সাবধান করলেন আর তেমন কিছু দেখলেই জানাতে বললেন এটা যে কতবড় ঈঙ্গিত আর সাবধানতা সেটা আমরা এসব দেশে আগে থেকেই দেখে আসছি। এখানে ওয়ান ইলেভেনের পর থেকেই  বলা হচ্ছে If you see something say something. নীরবতা এখানে অপরাধ।

শিশু জায়ানের পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় এখানে মূখ্য না। মনে রাখা দরকার বাংলাদেশের এক শিশু বাচ্চাও আজ অনিরাপদ। এই নিরাপত্তা হীনতা মানুষকে আরো বেশি জঙ্গী ও আরো বেশি উগ্র করে তুলবে। কারণ একসময় মানুষ আর নিতে পারবেনা। তখন তার ঘুরে দাঁড়ানোর চেহারা কেমন হবে কে জানে? জায়ান কি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে? আমরা কি বুঝতে পারছি কারা দেশ ও জাতির মূল দুশমন? কারা এই পৃথিবীর ধ্বংস চায়? না বুঝলে সভ্যতা টিকবে না। এটাই মূল কথা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর