Alexa শীতে ঘোরার সেরা জায়গা: সোনাদিয়া দ্বীপ

ঢাকা, রোববার   ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯,   পৌষ ১ ১৪২৬,   ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

শীতে ঘোরার সেরা জায়গা: সোনাদিয়া দ্বীপ

সিদরাতুল সাফায়েত ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৮:৫৮ ১১ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৪:২৭ ১১ নভেম্বর ২০১৯

সোনাদিয়া দ্বীপ

সোনাদিয়া দ্বীপ

দিগন্তজুড়ে নীল আকাশ, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ ঘন ঝাউবন, সবুজ তৃণভূমি বুকে জেগে থাকা সোনাঝরা বালুকাবেলা, ঝিনুক বাধানো সৈকত—সব মিলিয়েই সোনাদিয়া দ্বীপ। কক্সবাজারে দু-তিন দিন সময় নিয়ে এসে এই দ্বীপ না দেখে ফিরে গেলে তো ভ্রমণটাই ‘বৃথা’। আর যদি ক্যাম্পিং-এর পরিকল্পনা নিয়ে আসেন, তাহলে তো কথাই নেই! এই দ্বীপে কনকনে হাওয়ার পূর্ণিমা রাতে তাবুবাস যেন স্বপ্নের মতো।

ম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় বনের সমন্বয়ে গঠিত সোনাদিয়া দ্বীপ। কক্সবাজার থেকে উত্তর-পশ্চিমে এবং মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণে এই দ্বীপের অবস্থান। মাঝখান দিয়ে একটি খাল বয়ে যাওয়ায় এটি মহেশখালি দ্বীপ থেকে বিছিন্ন হয়েছে। এখানে খুব বেশি মানুষের বসতি নেই। তবে মানুষের সরব আনাগোনা সবসময়ই থাকে। আর পর্যটকদের ভিড়ও কম হয় না এই দ্বীপে। এখানে দেখার মতো যা আছে, একজন পর্যটকের মন ভরাতে তা যথেষ্ট। টইটুম্বর বললেও ভুল হবে না। সাগরের গাঢ় নীল জল, লাল কাঁকড়া, কেয়াবন, সামুদ্রিক পাখি সবমিলিয়ে এক ধরনের রোমাঞ্চকর পরিবেশ সবসময় এই দ্বীপে বিরাজ করে।

শুধু দ্বীপটিই সুন্দর, তা কিন্তু নয়। মহেশখালী থেকে সোনাদিয়া দ্বীপ যেতে পথের সবকিছুই মনে হবে শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো এক অকৃত্রিম ছবি চোখের সামনে ভাসছে। ভ্রমণ শেষে মনে থাকবে এসব দৃশ্য, যে কোনো গল্পের আসরে সে পথের আলোচনা করতে ভুলবেন না মোটেও! এখানকার খালের পানি এতটাই স্বচ্ছ ও টলটলে, দেখে মনে হবে যেন কোনো কাঁচের ওপর দিয়ে স্পিড বোট বা ট্রলার এগিয়ে চলেছে। যা দেখলে দুঃখ-কষ্ট নিমেষেই মুছে যেতে বাধ্য যে কেউ। সমুদ্র থেকে সৃষ্টি হয়ে ভেতরের দিকে গিয়ে খালটি কয়েকটি শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে। খালের দু-পাশে সবুজ বন। এসব বনে রয়েছে কেওড়া, হারগোজা, উড়িঘাস এবং কালো ও সাদা বাইন বৃক্ষ।

আমরা সবাই ভীতি নিয়ে স্পিড বোটে বসে বসে সেসব দৃশ্য দেখেছি। দেখেছি নীল আকাশ, নীল সমুদ্র। সাগরের কোনো কূল-কিনারা নেই; নীল আর নীল। মাঝে মাঝে কিছু মাছ ধরার ট্রলার ভেসে যাচ্ছে, তার ফাঁকে ফাঁকে উড়ছে সাদা গাঙচিল। আকাশের দিকে তাকালেও একই রঙ। অদ্ভুত মোহনীয় দৃশ্য! খোলা সাগরে দুটি স্পিড বোট চেপে আমরা এক ডজন পর্যটক যাচ্ছি সোনাদিয়া দ্বীপে।

সোনাদিয়া দ্বীপ

কক্সবাজার নয়, শুধুই সোনাদিয়া দ্বীপ ঘুরতেই আমাদের এবারের যাত্রা। আগের রাতে ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী বাসে উঠে রওনা দিয়েছিলাম। ভোরেই পৌঁছে গেলাম কক্সবাজার। নাস্তা সেরে কলাতলী সৈকতে গিয়ে সমুদ্র দেখে নিলাম। সমুদ্রের সৌন্দর্য বরাবরই অমলিন, যতবারই তাকে দেখি সেই একই ভালো লাগা কাজ করে। বিশাল বিশাল ঢেউ গর্জে এসে পড়ছে সমুদ্র তীরে। আকাশের নীল আর সমুদ্রের নীলেরা মিলে মিশে একাকার। দূর সীমানায় আকাশ আর সাগর এক হয়ে গিয়েছে। সমুদ্রের বিশালতায় নিজেকে সমর্পণ করে বসে রই অনেকক্ষণ। বাকিরা সমুদ্রের কাছে এসে যেন দুরন্ত শৈশব ফিরে পেয়েছে।

এরপর চলে যাই কস্তূরী জেটি ঘাট বা ৬নং জেটি ঘাটে। ঘাটে ছোট বড় বিভিন্ন সাইজের মাছ ধরার ট্রলার আছে। প্রত্যেকটি ট্রলারে বাংলাদেশের পতাকা লাগানো। সমুদ্র সীমানায় ট্রলার চিহ্নিত করার জন্য মূলত এই ব্যবস্থা। ঘাটে আগে থেকে রিজার্ভ করা ছিল স্পিড বোট। সেগুলোতেই রওনা হই সোনাদিয়া দ্বীপের দিকে। পঞ্চাশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম সোনাদিয়া দ্বীপে। দ্বীপের সীমানায় পা দিতে দিতে প্রায় মধ্যদুপুর। একদম মাথার ওপরেই সূর্য। প্রচণ্ড তাপ, হালকা বাতাসে ভালোই লাগছিল। খালের পানি কমে যাওয়ায়, ট্রলার নোঙর করেছে কিছুটা কম পানির মধ্যে, পানি পেরিয়ে কাদা মাঠ। কাদা জুড়ে ছোট ছোট শামুক। একে একে সবাই ট্রলার থেকে নেমে কাদা পেরেতো লাগল। চোরাবালির মতো কাদাতে তলিয়ে যাচ্ছে পা। এক পা দিয়ে, অন্য পা কাদা থেকে তুলতে হয়। নরম কাদায় হাঁটার অভ্যাসটা আমাদের মধ্যে অনেকেরই প্রথমবার।

কাদা পেরিয়ে, সোনাদিয়ার সবুজ তৃণভূমি। দূর থেকে চোখে পড়ে ঝাউগাছের বিশাল বন। দেখে মুগ্ধ হবে যে কোনো পথিক! সবুজ মাঠ পেরিয়ে ঝাউবনে ঢুকতেই মনে হয় এই যেন সবুজের দুয়ার। সমুদ্রের বুকে জেগে ওঠা এই সবুজ মায়াবি দ্বীপ রক্ষা করে যাচ্ছে ঝাউবন। এই স্থানটিতে কোনো জনবসতি নেই। সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়ানো খোলামাঠ, নির্জনতা ও অফুরন্ত বাতাস সব মিলিয়ে মন প্রশান্তিতে ভরে যায়। এখানে বসলে মনে হবে যেন অজানা-অচেনা কোনো দ্বীপে আপনি একা। আপনার পাশে কেউ বসে থাকলেও মনে হবে আপনি একা।

অন্যকিছু না ভেবে শুরু করলাম কাজ। প্রচণ্ড রোদ, হালকা বাতাসের মধ্যেই ধূ ধূ বালুচরে খাটালাম তাবু। মানুষ ১২ জন, তাবু ৭টি। পাশেই ঝাউবন। ঝাউবনের শীতল ছায়ার আবেশে ঘুম জড়িয়ে আসে চোখে। কিন্তু এখন ঘুমোলে তো হবে না, আগে পেটপূজো করা চাই! খবর এল, রান্না হয়েছে। এই দ্বীপে টিউবওয়েল আছে, আছে মাটির নীচে মিঠা পানি। খাবার খাওয়ার সময় মনে হলো অমৃত খাচ্ছি! সাধারণ আলু ভর্তা আর মুরগীর ঝোলে যে এত স্বাদ থাকতে পারে জানতাম না! খাওয়ার পর দ্বীপের পেছন দিকটা একটু ঘুরে দেখলাম। বেশ নিরিবিলি জায়গাটা, সামনে অনেকটা জায়গায় ঘের দিয়ে লবণ বানানো হচ্ছে। সেন্টমার্টিনের মতো এত বেশি নারিকেল গাছ নেই অবশ্য, তবে যা আছে তাও কম না। এখানে নাম না জানা অনেক গাছপালা আছে। একদম ছবির মতো ছোট্ট সুন্দর দ্বীপ।

সোনাদিয়া দ্বীপের পাখির অভয়ারণ্য

সোনাদিয়া দ্বীপ খুবই নির্জন। কয়েকজন জেলে ও চাষী ছাড়া কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন তাঁবুতে, আর কেউ অতি উচ্ছ্বাসে ঝাঁপাঝাপি করছে পানিতে। মনের সাধ মিটিয়ে নোনাজলে গোসল করে তারাও তাঁবুতে ফিরে এল কিছুক্ষণ পর। এরপর সবাই মিলে গল্পগুজব করতে করতে তখন পড়ন্ত বিকেল। সূর্য তখন তীর্যকভাবে তার উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সূর্যের তীর্যক আলোয় সমুদ্রের নীলাভ পানি চিকচিক করছে। একপাল মহিষ সারাদিনের বিচরণ শেষে পূর্ব পাড়ার সমুদ্র তট ধরে পশ্চিম পাড়ার দিকে এগিয়ে যায়। ঝিনুক বাঁধানো তটে নীল জলের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। সবুজ ঝাউ বনে ঘেরা সমুদ্র তটে লাল টুকটুকে সূর্য সমুদ্রের জল রাশির মধ্যে টুপ করে হারিয়ে যায়।

দ্বীপের সূর্যাস্তও অসাধারণ। সন্ধ্যায় সাদা পালক দুলিয়ে সারি সারি বক উড়ে যায় আপন ঠিকানায়। নীল আকাশের কপালে কে যেন দেয় লাল টিপ। আস্তে আস্তে যখন সূর্য হারিয়ে যায় সাগরের বুকে, তৈরি হয় এক মোহনীয় পরিবেশ। এই সময়ে একা কিংবা প্রিয় কোনো মানুষকে নিয়ে যদি সমুদ্রে ধারে গিয়ে বসেন, মনে হবে এর চেয়ে সুখের সময় আর হতেই পারে না! খুব করে চাইবেন, যেন সময়টা শেষ না হয়। কিন্তু প্রকৃতি চলে তার নিয়মে, ঘনিয়ে আসবে ঘন অন্ধকার!

অন্ধকারও যে এটা অপরূপ হতে পারে তা জানা ছিল না। ঝাউগাছের ফাঁক গলে নেমে অপরূপ জোছনার আলো। যেন চাঁদ থেকে মোমের মতো গলে নামছে আলোর ছটা! এই যেন অন্য সোনাদিয়া। ক্যাম্প ফায়ারের আলোকরশ্মিতে পুরো ঝাউবন, ক্যাম্পগ্রাউন্ড লালচে আলোয় ভরপুর। আর সমুদ্র থেকে ক্রমাগত ভেসে আসছে আছড়ে পড়া টেউয়ের গর্জন।

গান, নাচ, ক্যাম্পায়ার, বার্বি কিউসহ অনেক কিছু নিয়েই রাতের আয়োজন! ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডের পাশে চু্লা জ্বালানো হয়েছে। এখানেই রান্নার আয়োজন। ঝাউবন পেরিয়ে এখানে সৈকতের সীমানা। ঘন ঝাউবন পেরিয়ে বালুকাবেলার দুপাশে চোখ ধাঁধানো চিত্রপট। গভীর সমুদ্রে তাকালে মিটমিটিয়ে জ্বলা কয়েকটি বাতি দেখা যায়। জেলেদের নৌকাতেই জ্বলজ্বল করছে। সবকিছু শেষে আরেকজনকে নিয়ে হাঁটতে বেরোলাম। সুশীতল বাতাসে মুগ্ধতার গল্প, সত্যিই অসাধারণ।

সৈকতজুড়ে লাল কাকড়া

রাত যত গভীর হয় ততোই বাড়তে থাকে সমুদ্রের গর্জন। এবার ঘুমাতে যাওয়ার পালা। একঘেয়েমি আর যান্ত্রিকতার শহরে আবার ফিরতে হবে। তবে সকালটা কেমন হবে সে চিন্তাই বেশি করছিলাম তখন। তাঁবুতে গিয়ে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকতেই চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এলো। সমুদ্রের গর্জন আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিও হারিয়ে গেলাম ঘুমের অতল গহ্বরে।

যখন ভোর হলো, সমুদ্র শান্ত। চোখ মেলেই দেখতে থাকলাম ঝিনুকে বাঁধানো সৈকত, যতটুকু চোখ যায় কেবল নীল জলের ধারা। সমুদ্রের বুক থেকে ঢেউ এসে একের পর এক আছড়ে পড়ছে সৈকতে। জনশূন্য এই সৈকত যেন একান্তই নিজস্ব। ঝাউবনে ঘেরা সৈকতজুড়ে- ঝিনুক, নুড়ি পাথর আর লাল কাকড়া। লাল কাকড়া সোনাদিয়ায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। তা দেখে মুগ্ধ না হওয়ার উপায় আছে কী?

কীভাবে যাবেন

প্রথমে কক্সবাজার আসতে হবে। এরপর কক্সবাজার ৬ নম্বর জেটি ঘাট থেকে জনপ্রতি ৮০ টাকা ভাড়ায় স্পিডবোট করে মহেশখালী যাওয়ার জন্যে স্পীড বোট পাবেন, সময় লাগবে ২০-২৫ মিনিট। মহেশখালী ঘাট থেকে ২৫ টাকা ভাড়ায় রিকশায় গোরকঘাটা বাজারে যেতে হবে আর সেখান থেকে যেতে হবে ঘটিভাঙ্গায়। গোরকঘাটা থেকে সিএনজিতে ২৪ কিলোমিটার দূরত্বের ঘটিভাঙায় যেতে ভাড়া লাগবে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা।

ঘটিভাঙ্গা থেকে সোনাদ্বিয়া দ্বীপে যেতে হয় ইঞ্জিনচালিত নৌকায়। ঘটিভাঙা থেকে খেয়া নৌকায় সোনাদিয়া চ্যানেল পার হলেই সোনাদিয়া দ্বীপ। প্রতিদিন জোয়ারের সময় পশ্চিম সোনাদিয়া থেকে ঘটিভাঙা পর্যন্ত মাত্র একবার একটি ট্রলার ছেড়ে আসে। আর এই ট্রলারটিই কিছুক্ষণের মধ্যে যাত্রীদের তুলে নিয়ে আবার ফিরতি যাত্রা করে, প্রতিজন ভাড়া লাগে ২৫ টাকা। বিশেষ ভাবে মনে রাখবেন ঘটিভাঙ্গা থেকে সোনাদিয়া পশ্চিম পাড়ার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন শুধু একটি মাত্র বোট যায়। সেটাও জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে চলাচল করে। তবে এই সময় সকাল দশটা বা এর আশেপাশেই হয়।

শুটকি পল্লী

থাকা, খাওয়া ও অন্যান্য

পর্যটকদের থাকা খাওয়ার জন্য সোনাদিয়া দ্বীপে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এই দ্বীপে থাকা খাওয়ার জন্য তাই স্থানীয়দের উপর ভরসা করতে হয়। টাকার বিনিময়ে স্থানীয়রা থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। চাইলে সেখানকার বন বিভাগের অফিসে রাত্রি যাপন করতে পারেন, সেজন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে।

দ্বীপে নিরাপত্তার ব্যবস্থা আপনাকেই করতে হবে। স্থানীয় গাইড/স্থানীয় কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। রান্নার প্রয়োজনীয় উপাদান কক্সবাজার থেকে কিনে নিয়ে যেতে হবে। ভালো মানের টর্চ লাইট সঙ্গে নিতে ভুলবেন না। সমুদ্রে নামার সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরতে হবে। সঙ্গে নেয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে