শীতার্তদের পাশে দাঁড়াতে ইসলামের আহ্বান

.ঢাকা, বুধবার   ২৪ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ১০ ১৪২৬,   ১৮ শা'বান ১৪৪০

শীতার্তদের পাশে দাঁড়াতে ইসলামের আহ্বান

মাওলানা ওমর ফারুক

 প্রকাশিত: ১৬:৫০ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৬:৫০ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

 

‘পৌষ গেল, মাঘ আইল-শীতে কাঁপে বুক/দুঃখীর না পোহায় রাতি হইল বড় দুঃখ’ গ্রাম বাংলার এ প্রবাদটিই তুলে ধরে আমাদের দেশের শীতকালীন দৃশ্য।

শীতের তীব্রতায় ও শৈত্যপ্রবাহে অভাবী মানুষের মৃত্যুরও প্রহর গুণতে হয়। ধীরে ধীরে এমন শীতের দিকেই এগুচ্ছে বাংলার ঋতু। পৌষ-মাঘের হাড় কাঁপানোর শীত ধেয়ে আসছে। গত কয়েকদিন সারাদেশে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিও শীতকে বয়ে এনেছে পীঠে করে। শহুরে জীবনে এখন সকাল-বিকাল শীতের পোশাক ছাড়া যেন বের হওয়াই কঠিন। তবে দেশের সবার ভাগ্যে জোটে না এ পোশাক। কিছু মানুষ তাকিয়ে আছেন ধনীদের সহায়তার দিকে। মানবতার দিকে। যাদের পেটে ক্ষুধার তাড়না তাদের শীতের পোশাক জোগাড় করা তো অলীক স্বপ্ন। হাড়কাঁপানো শীতে নাকাল হয়ে পড়েছে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ। পাচ্ছে না ঠিকমতো শীত নিবারণের পোশাক। দুঃখ কষ্টে কাটছে তাদের জীবন। ফলে এসব মানুষের শীতের দুর্ভোগ কমাতে ধনীদের সহায়তার হাত বাড়ানো ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। শীতার্তসহ বিপন্ন সব মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামেরও অনুপম আদর্শ।

শীত শুধু প্রাকৃতিক নিয়মই নয়। এর মাঝে লুকায়িত মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ এবং এর মধ্যেও মহান আল্লাহর আনুগত্যের আহ্বান ধ্বনিত হয়। কেননা তিনি ইরশাদ করেন, যেহেতু আসক্তি আছে কুরাইশদের/ গ্রীষ্ম ও শীতকালে দূরে সফরের/ তারা করুক তবে তাঁর ইবাদত/ কাবার প্রভুর দেওয়া নির্ধারিত পথ (কাব্যানুবাদ, কুরাইশ: ০১-০৩) এ শাশ্বত ঘোষণায় বোঝা যায় গ্রীষ্ম-শীত সবই মহান আল্লাহর হুকুম এবং সব অবস্থায় তাঁরই ইবাদত করা বান্দার কর্তব্য।

পৃথিবীর আহ্নিকগতির কারণে দিন-রাত্রি এবং বার্ষিকগতির প্রভাবে ঘটে ঋতুচক্রের পরিবর্তন। এর সবই কিন্তু হয় মহান আল্লাহর নির্দেশে। তিনিই রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে পরিবর্তন করেন, তিনি সূর্য ও চাঁদকে নিয়ন্ত্রণ করছেন; প্রত্যেকেই এক নির্দিষ্টকাল আবর্তণ করে। (সূরা ফাতির: ১৩) ফলে বছর ঘুরে আসে শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল।

শীত কেন আসে?

বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে এক নির্দিষ্ট দূরত্বে ঘুরছে অনবরত। যদি পৃথিবী ও সূর্যের কেন্দ্র সমান দূরত্বে ঘুরতে থাকে, তবে পৃথিবীর যে তলদেশটি বেশি চওড়া, সেটি সূর্যের খুব কাছাকাছি চলে যায়। আবার যে তলদেশটি কমলালেবুর মতো চাপা, সেটির দূরত্ব সূর্য থেকে অনেক দূরে চলে যায়। ফলে পৃথিবীর যে গোলার্ধ সূর্যের খুব কাছাকাছি থাকে, সেখানে তাপ বেশি অনুভূত হয়। অন্যদিকে যে এলাকাটি সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে, সেখানে চলে শীতকাল। এ জন্যই দেশে দেশে শীতকাল গণনার ক্ষেত্রে কিছুটা সময়গত পার্থক্য দেখা যায়।

যেসব দেশে যখন শীত:

কোনো কোনো সময় ব্রিটেনসহ পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের আমেরিকা, কানাডায় ডিসেম্বরের ২১-২২ তারিখ থেকে শীত শুরু হয়ে তা অব্যাহত থাকে মার্চের ১৯, ২০ ও ২১ পর্যন্ত। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়াবিদরা সে দেশের ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি তিন মাসকে বলেন শীতকাল। স্ক্যান্ডেনেভিয়ায় শীত শুরু হয় অক্টোবরের ১৪ এবং শেষ হয় ফেব্রুয়ারির শেষে। দক্ষিণ গোলার্ধের অনেক দেশে বিশেষত অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকায় শীত শুরু হয় জুনে। শেষ হয় আগস্ট মাসের শেষে। আয়ারল্যান্ড ও স্ক্যান্ডেনেভিয়ায় শীত শুরু হয় নভেম্বরে। চীন ও পূর্ব এশিয়ার দেশে শীতকাল গণনা শুরু হয় নভেম্বর থেকে। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে বছর ঘুরে আসে শীত-শৈত্যপ্রবাহ।  পৌষ-মাঘ দুই মাস শীতকাল।

তবে ইসলামে রয়েছে শীতকাল আসার ভিন্ন ব্যাখ্যা। একটি দীর্ঘ হাদিসের বর্ণনায় জানা যায় যে, ‘দোজখ যখন শ্বাস ছাড়ে তখন পৃথিবী উষ্ণ-উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আবার যখন প্রশ্বাস নেয় প্রবল শৈত্যে আচ্ছন্ন হয় শান্তির পৃথিবী’!

শীতের প্রভাব:

শীতের কারণে, বায়ুমন্ডলে তাপমাত্রা ও আদ্রতা ক্রমে ক্রমে হ্রাস পায়। আবার দিবাভাগে সূর্যের ক্ষীণতাপে বাষ্পীভূত জলীয় কণা কুয়াশায় রূপান্তরিত হয় এবং কখনো বা রাতের তাপমাত্রা বেশি কমে যাবার কারণে কোনো কোনো অঞ্চলে ঘটে তুষারপাত। এমন বিরূপতায় প্রকৃতি হয়ে ওঠে উষর-ধূষর রূক্ষ। এতে বয়স্ক ও শিশুসহ সব মানুষের সহনমাত্রা ছাড়িয়ে দেখা দেয় সর্দি-কাশি, জ্বর, হাপানি, পেটেরপীড়াসহ নানান জটিল রোগশোক। দৈনন্দিন কর্ম পরিবেশে ছন্দপতনের কারণে খেটে খাওয়া মানুষের কাজের সুযোগ ও সক্ষমতা কমে আসে। শীত নিবারণের সামান্য কাপড় ও দূর্যোগকালে খাবারের অভাবে কষ্ট পায় অসংখ্য ‘বনী-আদম’।

বস্ত্রহীনদের পাশে ইসলাম:

ইসলাম সদা সর্বদাই মানবতার পক্ষে। ঘোষণা হয়েছে দুঃখীদের সেবা, অভাবীদের খাদ্য দান, বস্ত্রহীনদের বস্ত্রদান, পিপাসার্তদের পিপাসা মিটানোতেই আল্লাহকে পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেন, তারা আল্লাহর প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে দরিদ্র, ইয়াতিম ও বন্দীদেরকে খাদ্য দান করে (সূরা দাহার:০৮)। 

অন্যদিকে আর্তমানবতার সেবায় উৎসাহ দিয়ে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, মানুষের মধ্যে সে-ই উত্তম যার দ্বারা মানবতার কল্যাণ সাধিত হয়। বিপন্ন মানবতার কল্যাণ বিশ্বনবী, মানবতার কান্ডারী, আমার প্রিয়নবীর (সা.) আদর্শ। আর মানব কল্যাণের মাধ্যমে জান্নাতি সুখ লাভ করা যায়। এজন্যই প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘যেকোনো মুসলমান কোনো মুসলমানকে বস্ত্রহীন অবস্থায় বস্ত্র দান করলে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে সবুজ বর্ণের পোশাক পরাবেন, খাদ্য দান করলে তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন, পানি পান করালে এর চেয়েও উত্তম বস্তু পান করাবেন।’ (আবু দাউদ)।
 
সুতরাং নামাজ ও রোজার সঙ্গে কল্যাণের তথা মানসিকতার ও নৈতিকতার গুণাবলি অর্জন করা অত্যাবশ্যক। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা এসেছে, ‘পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোর মধ্যে কোনো পুণ্য নেই; কিন্তু পুণ্য আছে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, কিতাবগুলো এবং নবীগণের প্রতি ইমান আনলে এবং আল্লাহর প্রেমে আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন, ভ্রমণকারী, সাহায্য প্রার্থীদের এবং দাস মুক্তির জন্য অর্থ প্রদান করলে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করলে ও জাকাত প্রদান করলে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূর্ণ করলে, অর্থ সংকটে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্যধারণ করলে। এরাই তারা যারা সত্যপরায়ণ এবং তারাই মুত্তাকি।’ (সূরা বাকারা: ১৭৭)

প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, ‘পুরো মুসলিম উম্মাহ একটি শরীরের মতো। শরীরের কোনো অঙ্গে আঘাত লাগলে যেমন সারা শরীরে ব্যথা অনুভব হয়, তেমনই বিশ্ব মুসলিমের কারো গায়ে আঘাত লাগলে সারা বিশ্বের মুসলমানদের গায়ে আঘাত লাগবে।’ বিশ্বের মুসলমানদের কেউ কোথাও কষ্ট পেলে, জুলুম-নির্যাতনের শিকার হলে, বিশ্বের অন্য মুসলমানদের ওই কষ্ট অনুভব করা, তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা ইমানি দায়িত্ব। কোনো মুসলমানের ব্যথায় কাতর না হওয়া, মনে কষ্ট অনুভব না করা দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই’। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। মুসলমান ভাইয়ের প্রতি ওই দায়িত্ব-কর্তব্য প্রতিপালনের বিষয়টিই রাসূলুল্লাহ (সা.) হাদিস শরিফে উল্লেখ করেছেন।

শুধু মুসলমান নয়, বন্যাকবলিত যেকোনো মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা, শীতার্ত মানুষের জন্য শীতের কাপড়ের ব্যবস্থা করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো সামর্থ্যবান মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। অন্যের কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করা, অন্যের দুঃখ-দুর্দশা মোচনে প্রতিবেশীর ঝাঁপিয়ে পড়াই ইসলামের শাশ্বত হুকুম এবং প্রিয়নবী (সা.) এর নির্দেশনা। মানবতার নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজে পেট পুরে খায়, অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার কষ্টে ভোগে ওই স্বচ্ছল ব্যক্তি আমার উম্মতভুক্ত নয়।’

আল্লাহ তায়ালা সূরা ‘আদ দোহায়’ স্পষ্টভাবে সাহায্যপ্রার্থী দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন, ‘তোমরা অভাবী দরিদ্র বিপদগ্রস্ত সাহায্যপ্রার্থী মানুষের বিপদে দুঃসময়ে ‘না’ বলো না’। একটি হাদিসে আছে, একদিন এক সাহাবি একটি পাখির বাসা থেকে পাখির ছানা পেড়েছিলেন এবং ছানাটি নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর দরবারে হাজির হয়েছিলেন। আর মা-পাখিটিও সাহাবির সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল এবং ডাকছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বুঝতে পেরেছিলেন এবং ছানা-পাখিটিকে নীড়ে রেখে আসতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। 

অন্য একটি হাদিসে তো এমনো আছে যে, একজন গুনাহগার নারী একটি কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে আল্লাহ তাকে মাফ করে দিয়েছিলেন আর একজন নেককার নারী শুধু একটি বিড়ালকে বিনা কারণে কষ্ট দেয়ায় তার জন্য আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম ওয়াজিব করে দিয়েছিলেন। এর দ্বারা বোঝা যায়, পশু-পাখির প্রতি ইসলামের এমন মায়া ও ভালোবাসা থাকলে, সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের প্রতি ইসলামের কেমন মায়া ও ভালোবাসা রয়েছে।

সুতরাং এ মূহূর্তে স্বচ্ছল মানুষের কর্তব্য হলো, দেশের বিভিন্ন স্থানের শীতার্ত বিপন্ন সব মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সামান্য কিছু শীতবস্ত্র, একটি কম দামী কম্বল, অল্প কিছু গরম খাবার অথবা প্রয়োজনীয় ওষুধ অসংখ্য ‘বনী-আদমে'’র জন্য হতে পারে জীবন রক্ষার উপায়। সৃষ্টির সেবা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

শীতার্ত মানুষের প্রতি সমাজের সামর্থ্যবান, বিত্তশালী ও বিভিন্ন এনজিও সংস্থার কর্মীদের সাহায্য ও সহানুভূতির হাত সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত পরিমাণে শীতবস্ত্র সরবরাহ করে সাধ্যমতো শীতার্তদের পাশে এসে দাঁড়ানো দরকার। বিত্তবানদের যৎসামান্য ভালোবাসা ও সহানুভূতিই পারে শীতার্ত মানুষকে একটু উষ্ণতার পরশ দিতে। নিঃস্বার্থভাবে বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্য ও সেবা করাই মানবধর্ম। এ মহৎ ও পুণ্যময় কাজ উত্তম ইবাদত। কারণ মানুষ মানুষের জন্য।

অসহায় ও দুস্থ মানুষের দুর্দিনে সাহায্য, সহানুভূতি ও সহমর্মিতার মন-মানসিকতা যাদের নেই, তাদের ইবাদত-বন্দেগি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না। মহান আল্লাহ শীতার্ত ও বিপন্ন মানুষের জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দিন। আল্লাহুম্মা আমীন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে