Alexa শিশু-কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২০ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৫ ১৪২৬,   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

শিশু-কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা

আফরোজা পারভীন

 প্রকাশিত: ১৪:১৯ ২৯ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৭:৪২ ৩১ জানুয়ারি ২০১৯

আফরোজা পারভীন
আফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। 'অবিনাশী সাঈফ মীজান' প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য 'ডিসিসড' চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

দেশে ক্রমাগত অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। এমন দিন নেই যে দু’চারটি অপরাধ সংঘটনের খবর আমরা পাই না। অপরাধ করছে যুবা বৃদ্ধ কিশোর কিশোরী শিশু। সে অপরাধ  মারামারি জখম রাহাজানি অপহরণ থেকে শুরু করে খুন এমনকি ধর্ষণ পর্যন্ত।  এমর্ধমান হারে বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা।

ছোট ছোট শিশু বা কিশোর কিশোরী যখন অপরাধ করে তখন আমাদের বোধের জায়গাটা প্রবলভাবে নাড়া খায়। ওদের তো থাকা খাওয়া ভাত কাপড় সংসার চালানোর কোনো চিন্তা নেই। তবে কেন ওরা এসব অপরাধ করে?  বাবা মায়ের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে ওরা বেড়ে উঠছে, যা প্রয়োজন বাবা-মাকে বলছে , বাবা মা জুগিয়ে যাচ্ছে। তাহলে কেন ওরা অপরাধ জগৎ-এর দিকে পা বাড়াচ্ছে!

‘বাবা-মায়ের প্রশ্রয়ে’র বিষয়টি বড়ই  তাৎপর্যপূর্ণ। আদর দেয়া ভালো, কিন্তু আদর দিয়ে বাঁদর বানিয়ে ফেলা ভালো না। ছেলে মেয়েরা কিছু চাইলেই তাকে সেটা দিতে হবে কেন?  দিতে হবে বিচার বিবেচনা করে। কিন্তু আজকালের অধিকাংশ বাবা মা তা করেন না। চাওয়ামাত্র দিয়ে থাকেন প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে, নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়ে । ক্লাসের ওমুক বন্ধুর বিদেশি টিফিনবক্স আছে কাজেই নিজের সন্তান চাইলেই তাকে সেটা দিতে হবে। অথচ যে টিফিনবক্স অছে সেটা দিব্বি ভালো, তাতেই বেশ চলে যাচ্ছে সন্তানের। বন্ধু একটা নতুন স্কুলব্যাগ কিনেছে কাজেই তাকেও একটা কিনে দিতে হবে। সন্তান চাইছে, বাবা-মা দিচ্ছেন। এ যেন বাবা মায়েদের মধ্যেও একরকম প্রতিযোগিতা। সে প্রতিযোগিতা শুধু লেখাপড়াতে নয়, জিনিসপত্রে, পোশাকে পরিচ্ছদে, যানবাহনে।

আগের দিনে ছেলে-মেয়েদের চাহিদা ছিল সীমিত। একটা ফাউন্টেন পেন পাওয়াই ছিল তাদের কাছে  বিশাল পাওয়া ।  এখনকার ছেলে মেয়েরা এত বেশি পায় যে, জিনিসের প্রতি তাদের মায়া জন্মে না।  আর আরো বেশি আরো দামি জিনিস পাবার ইচ্ছে জাগে সে যে কোন উপায়ে।

একজন সন্তানের প্রথম শিক্ষালয় পরিবার । সন্তান পিস্তল বন্দুক কিনতে চাইলেই সেটা কেন কিনে দিতে হবে! বুঝতে হবে সে  কেন চাইছে অন্য  কোন খেলনা না চেয়ে এই পিস্তল বন্দুক কিনতে। এরোপ্লেন চাইতে পারত, গাড়ি চাইতে পারত, গ্লোব চাইতে পারত তা না চেয়ে কেন এই পিস্তল বন্দুকের চাহিদা! ওদের হাতে এটা ধরিয়ে দেয়া মানে ওদের হাতে ক্ষমতা দেয়া। ওরা বুঝল এই পিস্তল দিয়ে গুলি করে মানুষ মারা যায়। যদি দিতেই হয় তাহলে বুঝিয়ে দেয়া দরকার পিস্তল কাজে লাগাতে হয়, ‘দুষ্টের দমনে আর শিষ্টের পালনে’ । এ কথা যে কোন অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

আজকাল চ্যানেলগুলোতে নানারকম অপরাধ সিরিজ দেখানো হয়। সে সিরিজগুলোতে থাকে কীভাবে অপরাধ  করলো তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা। হ্যাঁ পরে অপরাধী ধরার ব্যাপারটাও দেখানো হয়। কিন্তু শিশু মন গভীর অভিনিবেশের  সাথে দেখে অপরাধ সংঘঠনের প্রতিটি পদক্ষেপ। মনের মাঝে এক ধরনের থ্রিল অনুভব করে তারা। নিজেদের নায়ক নায়ক ভাবে।

আজকাল অধিকাংশ শিশু বাড়িতে একা একা মানুষ হয়। কর্মজীবী বাবা মায়ের সন্তানদের অনেক সময়ই একা বাড়িতে কাটাতে হয়। আগের মতো যৌথ পরিবার ব্যবস্থা এখন আর নেই যে দাদা দাদি, চাচা ফুফু থাকবে । তারা বাচ্চাদের সময় দেবে, আদর দেবে। নানা রকম রূপকথার গল্প শুনাবে বা নৈতিক শিক্ষা দেবে। স্কুল ফেরত সন্তানেরা বাড়িতে একা থাকে । তখন তাদের বিনোদন হয় ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার না হয় টেলিভিশন। একা বসে টিভিতে এই ধরনের অপরাধ সিরিজগুলি দেখতেই তারা ভালবাসে। আর এখন তো চ্যানেলের ছড়াছড়ি। যে কোন বিষয় তারা পাল্লা দিয়ে বানায়। তাছাড়া বিদেশি চ্যানেলগুলোতো রয়েছেই।

অপরাধের পরিধি এতোটাই বিস্তৃত হয়েছে যে ছোট খাট বিষয়ে খুন হয়ে যাচ্ছে। সামান্য একটা  মোবাইলের জন্য এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে হত্যা করছে । রাতারাতি বড়লোক হবার জন্য বন্ধুকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করছে,  মেরে ফেলছে । এসব ঘটাচ্ছে শিশু কিশোররা অহরহ। কিশোর গ্যাং-এর কথাও শোনা যাচ্ছে আজকাল।

বিষয়টি নিয়ে অনেক লেখালিখি, অনেক আলোচনা হয়েছে । কিন্তু ইতিবাচক ফল তেমন কিছুই হয়নি । আমরা ডিজিটাল হয়েছি এই আনন্দে বিভোর থাকছি কিন্তু পাশাপাশি যে ডিজিটালের খারাপ জিনিসগুলিই সন্তানেরা নিচ্ছে সেটা আমরা খেয়াল করতে পারছি না। বা পারছি সর্বনাশ ঘটে যাবার পর।

 সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের এদিকে গভীর দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। টেলিভিশন চ্যানেলগুলিতে যাতে আকর্ষণীয় শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানাদি প্রচার করা হয় সেটা দেখা দরকার। সিসিমপুর বা মিনা কার্টুনের মতো অনুষ্ঠান হলে শিশুরা অপরাধ সিরিজ খুঁজে বেড়াবে না। অনুষ্ঠানে  বৈচিত্র  আনা প্রয়োজন। শুধু শিশুদের জন্যই নির্মাণ করা দরকার কিছু অনুষ্ঠান যা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য উপযোগী কিন্তু আকর্ষণীয় হবে। অপরাধ সিরিজগুলির দিকেও বিশেষভাবে নজর দেয়া প্রয়োজন। অপরাধ সংঘটনের ঘটনা দেখাতে হলে এমনভাবে দেখানো দরকার যা দেখে শিশু মনে থ্রিল না জন্মে  বিতৃষা জন্ম  নেয়। যেন কাহিনি এমনভাবে সাজানো হয় যাতে সিরিজ দেখতে দেখতে শিশুরা অপরাধীকে ঘৃণা করতে শুরু করে। ফেসবুকে ইচ্ছেমতো হত্যা রাহাজানি খুন জখমের ছবি সম্বলিত যে নিউজগুলি পোস্ট করা হয় সে বিষয়েও নিযন্ত্রণ আনা দরকার সরকারের। সরকারের ফিল্ম সেন্সর বোর্ডেরও ফিল্ম রিলিজে আরো সতর্কতা প্রয়োজন।  হত্যা জ্বালাও  পোড়াও ধর্ষণ দৃশ্যগুলি দীর্ঘ সময় দেখিয়ে পাবলিক টানার যে ব্যবস্থা সেটা নিযন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

আজকাল যান্ত্রিকতার ক্রমপ্রসারের কারণে বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের বিনোদনের সুযোগ সীমিত। আগে পরিবারের সবাই মিলে একসাথে সিনেমা দেখত । এটা ছিল সন্তানদের জন্য খুবই আনন্দের। কিন্তু এখন ছবিগুলিতে এমন অশ্লীলতা আর ধর্ষণ দৃশ্য, এমনই দৃষ্টিকটু পোশাক নাচ-গান দেখানো হয়  যা সন্তানদের সাথে নিয়ে দেখার পরিবেশ নেই। এদিকটাতেও নজর দেয়া দরকার।  যেন এমন ছবি নির্মিত হয় যাতে বাবা মা সন্তানরা একসাথে দেখতে পারে।

সুস্থ বিনোদন এখন আর নেই। নেই খেলার মাঠ, অবারিত আকাশ, নদীতে সাঁতার।  নেই বন্ধুত্বের অটল বন্ধন। বন্ধুদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া। শীত গ্রীষ্মে নানাবাড়িতে বেড়াতে যাবার জন্য সারাবছরের অপেক্ষা।  মেলার নামে যেসব আজকার হয় সেখানে চলে অবাধ বাণিজ্য। প্রাণের স্পর্শ নেই। শিশুদের বিনোদন তাই এখন পুরোটাই ঘরবন্দি। এই ঘরবন্দি বিনোদনে ইউটিউবে মারামারি কাটাকাটি টিভিতে অপরাধচিত্র  একদিকে  শিশু মনকে বিকৃত করে তোলে ।  অন্যদিকে ভালো স্কুল, ভালো টিউটরের কাছে পড়া, ভালো রেজাল্ট করার সম অসম প্রতিযোগিতায় কখন যেন তারা নিজেরাও বাবা মায়ের সঙ্গে শরিক হয়ে যায়। আর একসময় সে শরিকত্ব অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন তার মাঝে জাগে অন্যকে ডিঙিয়ে ওপরে ওঠার প্রবণতা। অল্পে বড়লোক হবার প্রবণতা। আর এই প্রবণতাই তাদের ঠেলে দেয় অপরাধজগতে।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর

Best Electronics
Best Electronics