Alexa শিশুরা মাথা ঠুকলে সাবধান!

ঢাকা, বুধবার   ১৩ নভেম্বর ২০১৯,   কার্তিক ২৮ ১৪২৬,   ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

শিশুরা মাথা ঠুকলে সাবধান!

 প্রকাশিত: ১৪:১৮ ১২ মে ২০১৭  

জেসমিন সুলতানা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। স্বামীও একই ধাঁচের একটি প্রতিষ্ঠানে আছেন। রোজ সকাল-সন্ধ্যা কর্মক্ষেত্রে থাকেন দুজন। জেসমিন সুলতানাকে বাসায় গিয়েও সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। আড়াই বছরের শিশুকন্যা সারা দিন নানির কাছে থাকে। বেশির ভাগ সময় সে টেলিভিশনে কার্টুন দেখে। ইউটিউবে ইংরেজি রাইম শোনে। মেয়ের প্রতিভা দেখে মুগ্ধ মা-বাবা। এত্তটুকুন মেয়ে সব ধরনের রঙের নাম ইংরেজিতে বলতে পারে। ইংরেজি অক্ষর ও নম্বর চেনে এবং উচ্চারণ করে একদম পশ্চিমা ঢঙে। তবে আফসোস, বাংলা শব্দ দু-একটা বললেও বাক্য বলে না একদমই। ভাবলেন, অনেক শিশুই দেরিতে কথা বলে। এটা এমন কোনো বিষয় নয়। তবে চার-পাঁচ মাস আগে হঠাৎ খেয়াল করলেন, মেয়ে সামান্য বিষয়েই রেগে যায় এবং দেয়াল, মেঝে, কাঠের আসবাব বা দরজায় মাথা ঠোকে। প্রথমে তেমন গুরুত্ব না দিলেও পরে দেখলেন—মেয়ের এই প্রবণতা ক্রমে বাড়ছে। এবার স্বামী-স্ত্রী দুজনই উদ্বিগ্ন। ছুটলেন শিশু চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক সব বুঝেশুনে মাথা ঠোকার কারণ নির্ণয়ে জেসমিন সুলতানাকে পাঠালেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে। সেখানে আরও দুজন চিকিৎসক শিশুটিকে পরীক্ষা করে যা বললেন, চমকে উঠলেন জেসমিন। মানসিক দ্বন্দ্ব, একাকিত্ব, বাবা-মায়ের পর্যাপ্ত সঙ্গ না পাওয়া এবং টেলিভিশন, ট্যাব, মুঠোফোনসহ প্রযুক্তিতে শিশুকে আসক্ত করে ফেলার কারণে শিশু মাথা ঠুকতে পারে। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘হেড ব্যাংগিং’। এ ছাড়া প্রযুক্তি আসক্তির কারণে তাঁর মেয়ের ভাষা শিখতেও দেরি হচ্ছে। একদিকে ইংরেজি ভাষা, অন্যদিকে বাবা-মায়ের মুখে বাংলা ভাষা শুনে ভাষা নিয়ে তার মধ্যে একধরনের সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সন্তানসম্ভবা নারী ও শিশুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রানসিসকো-ভিত্তিক অনলাইন মিডিয়া কোম্পানি বেবি সেন্টারের তথ্য অনুসারে, ১৫ শতাংশের বেশি শিশু নানা কারণে দেয়াল, মেঝে বা শক্ত কিছুতে তাদের মাথা ঠুকে থাকে। মেয়েশিশুদের তুলনায় ছেলে শিশুদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। সাধারণত ছয় মাস বয়স থেকে শিশুরা এটা করে। কখনো এটা কয়েক মাস, এমনকি বছরের পর পর থেকে যায়। তবে বেশির ভাগ শিশুর তিন থেকে চার বছর বয়সে এ প্রবণতা চলে যায়। এ ব্যাপারে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের শিশু বিভাগের পরামর্শক কামরুল আহসান বলেন, শিশুর মাথা ঠোকা একটি সমস্যা। কোনো শিশু যদি কোনো কারণে অনবরত মাথা ঠোকে, তবে বুঝতে হবে যে সে মানসিক দ্বন্দ্ব ও চাপ থেকে এটা করছে। আর মাথা ঠোকার সঙ্গে অন্য কোনো সমস্যা থাকলে কোনো অসুস্থতা আছে কি না, তা যাচাই করে নিতে হবে। তিনি বলেন, শহরে একক পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি দেখা দেয়। বিশেষ করে মা-বাবা দুজনই যদি কর্মজীবী হন, তাহলে একাকিত্ব থেকেও শিশুরা এমন করে থাকে। অভিভাবকদের প্রথমেই বুঝতে হবে শিশুটি কেন মাথা ঠুকছে, এর কারণ কী। কারণ নির্ণয় করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্য কোনো উপসর্গ না থাকলে বুঝতে হবে শিশুটির মধ্যে মানসিক চাপ থেকে মানসিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে শিশুর অভিভাবককে অবশ্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিদের শরণাপন্ন হতে হবে। একই সঙ্গে এমন শিশুদের চিপস, চকলেটের মতো প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে বিরত রাখতে হবে। কারণ, এ ধরনের খাবার শিশুকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। শিশুদের মাথা ঠোকার সমস্যা নিয়ে অনেকে হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে আসেন বলে জানালেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইফ্ফাত আরা শামসাদ। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাবা-মা শিশুকে ব্যস্ত রাখতে টেলিভিশন ছেড়ে দেন, ট্যাব বা মুঠোফোনে গেমে বসিয়ে দেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিশুরা এতে সম্পৃক্ত থাকলে তাদের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। তারা অতিরিক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। রাতে সময়মতো ঘুমায় না। বাবা-মায়ের কথা শুনতে চায় না। অল্পতেই রেগে যায়। আর রাগ প্রকাশ করে দেয়াল বা মেঝেতে মাথা ঠুকে। তারা বাবা-মা, বিশেষ করে মায়ের মনোযোগ পেতে চায়। সেটা না পেলেই মাথা ঠোকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিশুকে কখনো রাগানো যাবে না। এমনকি সে মাথা ঠোকা শুরু করলে চেঁচামেচি করা যাবে না। এতে শিশুটি এ কাজ আরও বেশি করবে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রোকেয়া খানম বলেন, ‘এ সমস্যা দেখা মাত্র আমরা অভিভাবকদের প্রথমেই পরামর্শ দিই টেলিভিশন দেখা বন্ধ করে দিতে বা প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতে। একটি শিশুকে এক ঘণ্টার বেশি টেলিভিশন দেখতে দেওয়া উচিত নয়। তা-ও একবারে ১৫ মিনিটের বেশি দেখতে দেওয়া যাবে না। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা অফিস থেকে ফিরে সংসারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শিশুটি বাবা-মায়ের সঙ্গ পেতে ঘুরঘুর করে। সংসারে কাজে ব্যস্ত হতে গিয়ে মা সন্তানকেই টেলিভিশন বা ট্যাবের সামনে বসিয়ে ব্যস্ত করে দেন। আর এভাবে ধীরে ধীরে একটি শিশুর মানসিক সুস্থিরতা নষ্ট করা হয়। একেক শিশু একেকভাবে এর প্রকাশ ঘটায়। তাই শিশু কান্না করলে বা মাথা ঠোকা শুরু করলে একগাদা খেলনা বা চকলেট দিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করা যাবে না। আগে বুঝতে হবে সে কেন রাগ করেছে, কী চায় এবং সে অনুসারে ধৈর্য ধরে তার রাগ কমানোর চেষ্টা করতে হবে।