শিল্পীই আমার বড় পরিচয় : ঊর্মিলা

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

শিল্পীই আমার বড় পরিচয় : ঊর্মিলা

নাজমুল আহসান

 প্রকাশিত: ২০:২১ ২৬ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৭:২৫ ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ঊর্মিলা শ্রাবন্তী কর

ঊর্মিলা শ্রাবন্তী কর

তার অবাক করা চাহনিতে মুগ্ধ হবেন যে কেউ। রূপে-গুণে তিনি অনন্য। শুধু সৌন্দর্য নয়, অভিনয় দিয়েও দর্শক হৃদয় জয় করেছেন এই স্বপ্নকন্যা। বলছি ঊর্মিলা শ্রাবন্তী করের কথা। ছোটবেলা থেকেই মনে স্বপ্ন বুনতেন, একদিন মিডিয়ায় কাজ করবেন, বিখ্যাত হবেন। 

সেই ভাবনা থেকে ২০০৯ সালে নাম লেখান চ্যানেল আই-লাক্স সুপারস্টারের সুন্দরী প্রতিযোগিতায়। আর এর মাধ্যমে রঙিন ভুবনে যাত্রা শুরু করেন তিনি। এরপর থেকে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে নিজের জাত চিনিয়েছেন হালের এই পর্দাকন্যা। 

বর্তমানে সিঙ্গেল ও ধারাবাহিকের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। সম্প্রতি এ অভিনেত্রী মুখোমুখি হন ডেইলি বাংলাদেশের। কথা বলেন দেশীয় নাটক, নিজের বর্তমান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানান বিষয় নিয়ে। 

নতুন বছরের প্রথম মাস চলছে। তাই নতুন বছরের কাজের শুরুটা কিভাবে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে উর্মিলা জানান, বছর শুরু হতেই ভালোবাসা দিবসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে। কাজী সাইফের নির্দেশণায় 'ভালোবাসার তিন রঙ', 'এ্যাপস-২০১৫' সহ কয়েকটি নাটকের কাজ শেষ করেছি। এরই মধ্যে বেশ কিছু নাটকে কাজ চূড়ান্ত হয়েছে। সামনে আরো কিছু কাজের কথা হচ্ছে। ভালো গল্প হলেই কাজগুলো করবো। 

বর্তমান সময়ে তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা একক নাটকের দিকেই বেশি ধাবিত হচ্ছেন। সেই জায়গা থেকে ঊর্মিলাকে স্রোতের বিপরীতের একজন মাঝি বললে নেহাতই ভুল বলা হবে না। কারণ বর্তমানে এ অভিনেত্রীর প্রায় দশটি ধারাবাহিক নাটক বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার চলিত। যদিও ঊর্মিলার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে সিঙ্গেল নাটকেই বেশি দেখা গেছে। এরপর সেই ধারা থেকে বেরিয়ে ধারাবাহিকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। 

এখন এ অভিনেত্রী সিঙ্গেল ও ধারাবাহিক নাটকে সমানতালে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। যেখানে যে চরিত্রই হোক না কেন গল্পের প্রয়োজনে নিজেকে সেভাবেই তুলে ধরেন। তরুণ বা তার সমসাময়িক তারকারাদের কেন ধারাবাহিকের প্রতি অনীহা? এমন প্রশ্নের জবাবে এই অভিনেত্রী জানান, ধারাবাহিক নাটকের ক্ষেত্রে যেটা হয়, লম্বা সময় ধরে এখানে অনেক আর্টিস্টদের সমাগম থাকে। ব্যস্ততার কারণে সবার সিডিউল অনেক সময় একসঙ্গে মেলে না। একটা চরিত্রের উপর বেস করে গল্পটা এগিয়ে নেয়া যায় না। ভালো স্ক্রীপ্ট পাওয়ার ক্ষেত্রেও একটু সমস্যা হয়। আর সিঙ্গেল নাটকে অল্প সময়ের মধ্যে একটা ক্যারেক্টার ডেভলাপ করা যায়, যার ধারা একটা পজিশনে যায় কাজটি। ধারাবাহিকে লম্বা সময় কাজ করায় অনেক সময় ক্যারেক্টার ফল্ট করে। যে কারণে ধারাবাহিকটা অনেকেই কম করে। এটা আমার রিজন। যে কারণে আমিও ধারাবাহিক কমিয়ে সিঙ্গেল নাটক বেশি কাজ করতে চাই।

বর্তমানে আমরা সারা বছর জুড়েই একক নাটক নির্মাণের তোড়জোড় দেখতে পাই। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেমনি হচ্ছে ভালো গল্পের নাটক, আবার মানহীন নাটকও নির্মাণ হচ্ছে। ভালো নাটকগুলোই দর্শক মহলে সাড়া ফেলতে সক্ষম হচ্ছে আর মন্দটা পলকেই হারিয়ে যাচ্ছে গভীর অতলে। বর্তমান সিঙ্গেল নাটকের মান সম্পর্কে এই পর্দা কন্যার মন্তব্য এমন- ভালো-মন্দ মিলিয়েই কাজ হচ্ছে। অনেক কম বাজেটের কাজ হচ্ছে, আবার একদিনেও একটি নাটকের শুটিং শেষ করার মতো নজিরও আছে। আবার দুজন আর্টিস্টেই নাটক শেষ, স্ক্রিপ্টও মানসম্মত নয়। এটা যেমন আছে, একইভাবে অনেক ভালো কাজও হচ্ছে। দুটোই একসঙ্গে চলছে। 

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একে একে বেড়ে চলছে টেলিভিশন চ্যানেল। আর এই পরিমাণের টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য অনুষ্ঠানের জোগান দিতে নির্মাতারা ব্যস্ত তাদের অনুষ্ঠান নিয়ে। টিভি অনুষ্ঠানের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে নাটক। কিন্তু নির্মাতাদের অভিযোগ, বর্তমানে তারা ভুগছে বাজেট সংকটে। বর্তমানে প্রায় ২০টির বেশি টিভি চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে অগুনতি ধারাবাহিক ও একক নাটক। দেশীয় স্যাটেলাইট টিভির সংখ্যা বৃদ্ধির দিকে এগুলেও দর্শকপ্রিয়তা কিংবা মানের বিচারে যেমন বাড়ছে দৈন্যতা। তেমনি নির্মাতাদের অভিযোগ, সময় ও বাজেটের কারণে তারা ভালো নাটক নির্মাণ করতে পারছেন না। 

বর্তমানে আমাদের নির্মাতারা একটি সিঙ্গেল নাটক নির্মাণ করতে যে পরিমাণ সময় ও বাজেট পাচ্ছে, তা যথেষ্ট কিনা? জবাবে এ নাট্যাভিনেত্রী জানান, ‘না। সব সময় সব নাটকের জন্য সময় এবং বাজেট যথেষ্ট নয়।’ এই প্রক্রিয়া উত্তোরণ করা যায় কিভাবে? ঊমিলা বলেন, নাটকের এই বিষয়টি লম্বা একটি চেইনের মধ্যে দিয়ে চলে। নাটকের প্রযোজক আছে, ডিরেক্টর অ্যাসোসিয়েশন আছে, অভিনয় শিল্পী সংঘ আছে, আবার চ্যানেল গুলোর বাজেটও বুঝতে হবে। এখানে একজন-দুজনের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। আমার মনে হয় নাট‌্যাঙ্গনের সবগুলো সংগঠন একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করলে এই সমস্যা ছাড়াও দেশীয় নাটকের মান উন্নয়নে পথে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। 

গেল কয়েক বছর ধরেই ওয়েব সিরিজ বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে অমিতাভ রেজার তত্ত্বাবধানে ‘আয়নাবাজি অরিজিনাল সিরিজ’, ফারুকীর তত্ত্বাবধানে ‘ছবিয়াল’ টিমের কয়েকটি সিরিজ রীতিমতো অনলাইন দুনিয়ায় ঝড় তুলেছিল। বিষয়টিকে অনেকেই ইতিবাচক বলে মনে করছে। যার দরুণ গেল কয়েক বছরে চোখে পড়ার মতো বেশ কিছু ওয়েব সিরিজ নির্মিত হয়েছে। এরই মধ্যে দেশের টিভি নাটকের অনেক গুণী নির্মাতা ওয়েব সিরিজ নির্মাণের দিকে ঝুঁকেছেন। তেমনি ছোট পর্দা ও বড় পর্দার তারকারও ওয়েব সিরিজে অভিনয়ের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করছেন। ওয়েব সিরিজের প্রসঙ্গ উঠতেই ঊমিলা শ্রাবন্তি কর বলেন, ওয়েব সিরিজে অভিনয় করেছি। কিন্তু আর করতে চাই না। 

এর কারণ হিসেবে এই গ্ল্যামার কন্যা বলেন, আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, আমরা যারা রেগুলার স্ক্রিনে কাজ করি, আমি চাই নাটকই মানুষ বেশি দেখুক। ওয়েব সিরিজ নাটক বা মিউজিক ভিডিও এর মাঝামাঝি কিছু একটা হয়। যেটা আমার কাছে পরিপূর্ণ কোনো প্রোডাক্ট মনে হয় না। আর ওয়েব সিরিজের কারণে টিভি নাটকের দর্শকও মনে হয় কমে যাচ্ছে। তাই এটাকে এতো গুরুত্বপূর্ণ না ভাবাই ভালো। 

অনলাইন মাধ্যমের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই সময়ে এসে টেলিভিশন বা প্রেক্ষাগৃহের বাইরে ভার্চুয়াল জগতে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে মানুষের প্রথম পছন্দ ইউটিউব। এর পাশাপাশি বর্তমান সময়ে দর্শক বাড়ছে আইফ্লিক্স, বায়োস্কোপ, বঙ্গ বা থার্ডবেলের মতো ইন্টারনেট ও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক বিনোদন প্ল্যাটফর্মে। দিন দিন দর্শকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধু এসব প্ল্যাটফর্মের জন্য বর্তমানে নির্মিত হচ্ছে বিশেষ নাটক, টেলিফিল্ম কিংবা চলচ্চিত্র। কিন্তু বিনোদনের নতুন এই মাধ্যম কতটা ইতিবাচক আর কতটাই বা নেতিবাচক তা নিয়ে আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

এই অনলাইন মাধ‌্যমের কারণে টিভি নাটক হুমকির দ্বারপ্রান্তে কি না? জবাবে অভিনেত্রী বলেন, পুরোপুরিভাবে এখনো টিভি নাটক হুমকির দ্বারপ্রান্তে নয়। এরপরও টিভিতে ভালো মানের যে প্রোডাকশন যাচ্ছে, তা মানুষ দেখছে। যদি মানুষ টিভিতে নাটক না দেখতো তাহলে আমরাও থাকতাম না, ডিরেক্টরও থাকতো না, মোটকথা টিভি নাটকই থাকতো না। তবে এগুলো কন্ট্রোলে না আনতে পারলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।

অভিনেত্রী হিসেবে শোবিজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ঊর্মিলা। কিন্তু এর পাশাপাশি তিনি ভালো গানও করেন। ঊর্মিলা রবীন্দ্রসংগীতের ওপর ছায়ানট থেকে ডিপ্লোমা করেছেন। অভিনয়ে তো নিজেকে বেশ ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ভবিষ্যতে সংগীতেও নিজেকে মেলে ধরার ইচ্ছা আছে কিনা? সোজসাপ্টা উত্তরে বলেন, গানটা মূলত পরিবারের জন্য, বন্ধুবান্ধব আর নিজের জন্য করা হয়। লাস্ট পাঁচ-ছয় বছর টানা কাজ করি। মাসে হয়তো দু-একদিন ফ্রি থাকি, নিজের জন্যই সেভাবে সময় থাকে না। গানের প্রতি আর তেমন বিচারটা করতে পারি নাই। ফ্যামিলির জন্যই স্পেশালি একটা গানের অ্যালবামের প্ল্যান আছে। সেটা আজ থেকে যতদিন পরেই হোক, যদি সুস্থ থাকি, তাহলে করবোই। 

পর্দার মানুষদের একেক সময় একক চরিত্রে অভিনয় করতে হয়। গল্পের প্রয়োজনে নিজেকে ভাঙতে হয়, আবার গড়তে হয়। এসবই তার অভিনয়ে দেখিয়েছেন এই লাক্স সুন্দরী। নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করলেও নিজের স্বাছন্দবোধের জায়গাটা কি ধরনের চরিত্রে? এই প্রশ্নে তিনি বলেন, এতোদিন কাজ করার পর মোটামুটি সব ধরনের চরিত্রেই অভিনয় করা হয়েছে। যদি স্ক্রিপ্ট ভালো হয়, তাহলে যে কোন ধরনের চরিত্রই নিজের ভেতর লালন করে ক‌্যামেরার সামনে ফুটিয়ে তুলতে আরাম লাগে। 

এদিকে নাটক, বিজ্ঞাপন ও মিউজিক ভিডিওতে পদচারণা থাকলেও ঊমিলা শ্রাবন্তী করকে কখনো বড় পর্দায় দেখা যায়নি। এর কারণ জানালেন দর্শকপ্রিয় এ অভিনেত্রী। তিনি বলেন, ক্যারিয়ার শুরুর দিকে সিনেমার অফারই আমার বেশি ছিল। অনেক ভালো কিছু সিনোমারও অফার ছিল। কিন্তু এর মাঝে আমার মনের মতো কিছু পাইনি। হয়তো এ বছর একটা সিনেমায় কাজের ব্যাপারে প্ল্যান করতে পারি। বছর শুরু হয়েছে সবে, দেখা যাক। যদি এ বছর আপনাকে ছবিতে দেখা যায়, সেক্ষেতে কমার্শিয়াল ছবি না আর্ট ফিল্মে দেখা যাবে? ঊমিলা বলেন, সেটা নির্ভর করবে গল্প আর চরিত্রে উপর। এটা কমার্শিয়াল সিনেমা হতে পারে, আবার আর্ট ফিল্মও হতে পারে। 

গেল বছর নারীর প্রতি যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে দুনিয়াজুড়ে ‘মিটু’ আন্দোলনের ছোঁয়া এসে লাগে বাংলাদেশেও। সে সময় বেশ কয়েকজন নারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মিটু হ্যাশট্যাগ দিয়ে নিজের যৌন হয়রানির কথা উল্লেখ করে পোস্ট দিয়েছেন। এ নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার থেকে শুরু করে মিডিয়া ব্যক্তিত্বসহ অনেকের বিরুদ্ধেও উঠে আসে যৌন হয়রানির অভিযোগ। 

এবার সেই আলোচনার পালে নতুন করে হাওয়া লাগালেন লাস্যময়ী এ অভিনেত্রী। তিনি বলেন, আমি একজন শিল্পী সেটাই আমার বড় পরিচয়। কিন্তু এর বাহিরে আমি একজন মানুষ। সমাজের আট-দশটা নারীর যে সমস্যায় পড়তে হয়, আমিও তার বাইরে নই। তাদের মতো আমাকেও সব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু সবার প্রকাশের ধরন এক নয়। আমিও এ ধরনের পরিস্থিতিতে পরেছি। কিন্তু আমি আমার মতো করে প্রতিবাদ করেছি বা সামলে নিয়েছি। যারা এই আন্দোলনে কথা বলতে দ্বিধা করেনি, তাদের মতো সবার বিষয়টিতে স্ব স্ব অবস্থান থেকে প্রতিবাদ গড়ে তোলা দরকার।  

এই অভিনেত্রী আরো বলেন, একজন অভিনেত্রী হিসেবে সব সময় নিজের দায়বদ্ধতার জায়গায় নজর রাখতে হবে। এমন কোন কাজ করতে চাই না যেটা দেখে মানুষ নেগেটিভ কাজে আগ্রহী হবে। প্রত্যেক অভিনেতা-অভিনেত্রীর এই জায়গাটা খেয়াল করা দরকার।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনএ/জেডআর