শিমুল বাগান এখন সবুজ অরণ্য

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

শিমুল বাগান এখন সবুজ অরণ্য

সিদরাতুল সাফায়াত ড্যানিয়েল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৪৪ ১৯ মে ২০১৯  

এই সময়ে শিমুল বাগান

এই সময়ে শিমুল বাগান

ফাগুনের আগুনে একবার এসেছিলাম শিমুল বনে। তখন পুরো শিমুল বাগান ছিল লাল ফুলের রাজ্য। গাছে গাছে শিমুল ফুল, মাটিতেও তাই! বসন্ত গেল, নতুন বছর এল। পাল্টে গেল শিমুল বাগানও। লাল শিমুল ফুলের রাজ্যে হানা দিয়েছে সবুজ পাতা। আগের চেয়ে আরো বেশি সুন্দরই মনে হচ্ছে আমার কাছে। অসময়ে এখানে আসাটা অনেকটাই স্বার্থক।

ঝড়-বৃষ্টির দিনে এখানে আসার পরিকল্পনা একদমই হুট করে। ১০ মে সেখানে যাওয়ার বিষয়ে মনস্থির করলাম। সঙ্গে দুই বন্ধুকেও রাজি করালাম। পরিকল্পনা মতো বাসেই পৌঁছে গেলাম সুনামগঞ্জ। সেখানে যোগ দিলেন আরো একবন্ধু। চারজন মিলে অটোরিকশায় করে এলাম তাহিরপুরে। কয়েক বছর আগেও তাহিরপুরে থাকার হোটেল ছিল না। অটোচালক সাজিদ মিয়া জানালেন, মোটামুটি মানের একটি হোটেল হয়েছে তাহিরপুরে। ভাড়াও কম, দুই বিছানার কক্ষ মাত্র ৬০০ টাকা। পর্যটক খরা থাকলে ৫০০ টাকায়ও ভাড়া নেয়া যায় দরদাম করে। হোটেলটার নাম ‘হোটেল টাঙ্গুয়া ইন’। আর দেরি কেন! হোটেলে ডুকেই ফ্রেশ হলাম। ক্যামেরা, ফোন রেখে বের হলাম শিমুল বাগানের উদ্দেশ্যে।

যাতায়াতে মোটরসাইকেলই ভরসা। পথে ভাঙা রাস্তা, ধুলা মারিয়ে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে চলে এলাম বাগানে। এসেই চোখ চনাবড়া। এত সবুজ সারি সারি ভাবে কখনো দেখিনি। বাগানটির বৈশিষ্ট্য হলো-এটি যেমন বর্গাকার তেমনি গাছগুলোকেও লাগানো হয়েছে বর্গাকার ভাবে। এই স্কয়ার আকৃতির বাগানটির বিশেষত্ব হলো আপনি ডানে-বাঁয়ে, সামনে-পেছনে এমন কি কোনাকোনি, যেভাবেই তাকাবেন সমান্তরাল গাছের সারি দেখতে পাবেন। বাগানে শিমুল গাছের মাঝে ঝোঁপ আকৃতির লেবুর গাছ ও রয়েছে!

বসন্তে শিমুল বাগান

বাগানের মাটি এখন পরিস্কার। অথচ দুমাস আগের ছবিগুলো দেখলেও বুঝা যায়, এই বুঝি কেউ লাল গালিচা বিছিয়ে রেখেছে! শিমুল বাগানে ফুল আসার সময়ে পাশেই বহমান যাদু কাটা নদীতে পানির পরিমান সামান্য থাকে! তখন মরুভূমি সাদৃশ্য যাদুকাটা নদীর পাশে অবস্থিত রঙিন ক্যানভাসে প্রস্ফুটিত শিমুল বাগানটিকে মনে হয় এক চিলতে রক্তিম স্বপ্নভূমি! আর এখন সবুজের অরণ্য, ভাবতেই অবাক লাগে!

বিশাল শিমুলবাগানের এক প্রান্তে দাঁড়ালে অন্যপ্রান্তে দেখা যায় না। সারিবদ্ধভাবে এত পরিকল্পনা করে বাগানটি তৈরি করা না দেখলে এর সৌন্দর্য আঁচ করা কষ্টকর। এই সময়েও ডালে ডালে বসে আছে বুলবুলি, কাঠশালিকসহ নানা জাতের পাখি। পাখির কিচিরমিচির ডাক ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বাগানে। বাতাসে পাতাগুলো নড়ছে, শো শো করে শব্দ হচ্ছে। ওপারে ভারতের মেঘালয় পাহাড়, মাঝে যাদুকাটা নদী। সব মিলে মিশে গড়ে তুলেছে প্রকৃতির এক অনবদ্য কাব্য।

এই বাগান জয়নাল আবেদীনের শিমুলবাগান নামেই পরিচিত। তিনি মারা গেছেন। তার বড় ছেলে সাবেক চেয়ারম্যান মো. রাখাব উদ্দিন বললেন ১৭ বছর আগের কথা- আমার বাবা বাদাঘাট (উত্তর) ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন নিজের প্রায় ২ হাজার ৪০০ শতক জমি বেছে নিলেন শিমুলগাছ লাগাবেন বলে। সে জমিতে তিনি প্রায় তিন হাজার শিমুলগাছ লাগালেন। দিনে দিনে বেড়ে ওঠা শিমুলগাছগুলো এখন হয়েছে শিমুলবাগান। মূলত তার মাথায় ছিল এমন আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলবেন, যা হবে দেশের অনন্য বেড়ানোর জায়গা।

পাশেই নীলাদ্রি লেক, একইদিনে ঘুরে আসতে পারেন

তাহিরপুরের এই শিমুল বাগান ছাড়া বারিক টিলা, নীলাদ্রি লেক, টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমনের জন্য দারুন গন্তব্য! তবে একদিনের ভ্রমণে গেলে শুধু নীলাদ্রি লেক ঘুরে আসতে পারবেন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের এই লেকটি গত ৪ বছরে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। লেকটি পড়েছে বাংলাদেশে আর লেক পাড়ের পাহাড় পড়েছে ভারতে। লেকের আশপাশে অসংখ্য ছোট ছোট টিলা। আরেকটু এপাশে এলেই বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওড়। ঘাসে ঢাকা সবুজ টিলা, লেকের টলটলে পানি, ওপারে নীলচে পাহাড় সব মিলিয়ে এক নজরেই মন বলে ওঠে 'অসাধারণ'! স্বর্গীয় শান্তির বাস এই লেকে। ভ্রমণকারীরা ছবি দেখে হন্যে হয়ে ছুটে আসেন এখানে, ক্যাম্পিং করেন কখনো জ্যোৎস্না রাতে, কখনো বা তারা ভরা আকাশের নিচে।

নির্দেশনা

ঢাকা থেকে সিলেট কিছুক্ষণ পরপরই বাস রয়েছে। সিলেট আসার পর কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে আসতে হবে সুনামগঞ্জ। তাছাড়া সরাসরি সুনামগঞ্জেও আসতে পারেন। বাস থেকে নেমে আব্দুস জহুর সেতু থেকে বাইকে ভাড়া করতে হবে, চালক আপনাকে শিমুল বাগান পৌঁছে দিবে। ৩০ কিলোমিটার পথের শেষ অংশে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় বাইকসহ যাত্রী পারাপার হতে হবে। তবে লাউয়ের গড় নৌকা ঘাটে পারাপার হওয়া সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। কারণ এই ঘাটটি শিমুল বাগানের ঠিক বিপরীতে! এক্ষেত্রে নৌকা পার হয়ে সামান্য হাঁটা পথ গেলেই বাগান! বাইক ভাড়া নিবে ২০০টাকা। বসতে পারবেন দুইজন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে