Alexa শিখায় আলো দেখছে প্রতিবন্ধী দুই ভাই

ঢাকা, বুধবার   ১১ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২৬ ১৪২৬,   ১৩ রবিউস সানি ১৪৪১

শিখায় আলো দেখছে প্রতিবন্ধী দুই ভাই

সাবজাল হোসেন, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:১১ ১৭ নভেম্বর ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

শ্বশুরবাড়িতে থেকে স্বামীর সংসার সামলানোর কথা তার। কিন্তু সব ছেড়ে ভিড়লেন বাবার ভিটায়। দুই প্রতিবন্ধী ভাইকে লালনপালন করতে শ্বশুরবাড়ি ছাড়তে কোনো দ্বিধাবোধ করেননি। ভাইয়ের প্রতি বোনের এমন ভালোবাসা এখনকার সমাজে অনেকটাই বিরল। ২২ বছর আগে বাবা হারানো শিখা প্রতিবন্ধী দুই ভাইয়ের দায়িত্ব নিতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন।

এখন বাবার ভিটেতেই ঝুপড়ি ঘর বেঁধে স্বামী-সন্তান সামলিয়েও অসহায় ভাইদের ঘিরে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। আর প্রতিবন্ধী দুই ভাই হারান আর মনোজিতের কর্মক্ষমহীন অন্ধকার জীবনকে আলোর পথে এনেছেন তিনি। 

ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের বলরামপুর গ্রামে শিখার বাড়িতে গেলে দেখা যায়, মাটির উপর টিনের বেড়া আর ছাউনির ঝুপড়ি ঘরে বসবাস শিখার। পাশেই রয়েছে প্রতিবন্ধী ভাইদের সরকারি আবাসনের ঘর। এরই সামনে শিখার ছাগলের ঘর। এ ঘরেই পালন করা ছাগল দিয়ে চালিয়ে থাকেন তার সংসার। 

শিখা মণ্ডল জানান, অন্য মেয়েদের মতো তিনিও শ্বশুরবাড়িতে স্বামী সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। বাবার মৃত্যুর পর প্রতিবন্ধী দুই ভাই আর বৃদ্ধা মাকে দেখার কেউ না থাকায় রক্তের টানে বাবার ভিটেই চলে আসেন তিনি। তিনি জানান, বড় ভাই হারান মণ্ডলের দুই হাত ও এক পা সরু। তাই তার কোনো কর্মক্ষমতা নেই। আর ছোট ভাই মনোজিতের ছোটবেলা থেকেই এক পা অচল। সেও কোন কাজ করতে পারে না। ক্রাসে ভর করে তাকে পথ চলতে হয়। মা সুন্দরী মণ্ডলের বয়স ৮২ বছর। শারীরিক অসুস্থতা আর বয়সের ভারে তিনিও চলতে পারেন না। 

তিনি আরো জানান, বসত ভিটের অল্প কিছু জায়গা ছাড়া মাঠে তাদের কোন চাষের জমি নেই। ফলে সংসারের অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী। তার স্বামী মনি কুমার কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। একমাত্র মেয়ে রিপাকে বিয়ে দিয়েছেন।  স্বামীর সব সময় কাজ থাকে না। তিনি যা রোজগার করেন তা দিয়ে ঠিকমত নিজের সংসারই চলে না। এরপরও মা আর প্রতিবন্ধী দুই ভাইয়ের খাবারসহ সবদিক সামলানো লাগে। 

শিখা আরো জানান, তিন ভাই বোনের মধ্যে হারান বড় মেজো শিখা আর সবার ছোট মনোজিৎ।  নিজের রক্তের ভাই দুটিই অসহায়। তাদের মুখের দিকে তাকালে অত্যন্ত  খারাপ লাগে। তাদের দু’বেলা দু’মুঠো খাবার তুলে দিতে নিজেকে আয়ের পথ বের করতে হয়েছে। অনেক আগে থেকেই বাড়িতে ছাগল পালন করেন। সংসারের কাজ শেষ করে মাঠে মাঠে ছাগল চড়িয়ে বেড়ান। কিছুদিন পর পর একটি করে ছাগল বিক্রি করে সংসারের কাজে লাগান। আবার ছোটগুলো পালন করতে থাকেন। এভাবে চলছে কমপক্ষে ১৩ বছর। তার দাবি স্বল্প সুদে ঋণ পেলে আরও বেশি ছাগল পালনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ভাই ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে একটু ভালোভাবে চলতে পারতেন। 

ছোট ভাই মনোজিৎ মণ্ডল জানান, তাদের অনেক কষ্টের জীবন। প্রতিবন্ধী দুইভাই আর বৃদ্ধা মায়ের আপন বলতে একমাত্র বোনটাই আছে। তাদের অসহায়ত্বের কারণে এলাকার মানুষসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাদেরকে ভালো জানেন। এরইমধ্যে  দুই ভাইকে প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দিয়েছেন। কিন্ত ভাতাবাবদ যা পান তা দিয়ে ওষুধ কিনতেই শেষ হয়ে যায়। তাদের খাবারসহ সব ব্যয়ের জন্য বোন শিখাকে বাড়তি কষ্ট করতে হয়। তাদের জন্য বোন শিখা এতো কষ্ট করে কিন্ত কোনো সময় অবহেলা বা বিরক্তি দেখায় না। সে সব সময়ে মায়ের মত করে আগলিয়ে রাখার চেষ্টা করে। 

নিয়ামতপুর ইউপি চেয়ারম্যান রাজু আহম্মেদ রনি লস্কর জানান, প্রতিবন্ধী দুই ভাই হারান ও মনোজিৎ মণ্ডলের অসহায় জীবন যাপন অত্যন্ত কষ্টকর। এলাকার মানুষও তাদের খুব ভালোবাসে। তাদের জন্য এরইমধ্যে একটি সরকারি ঘর ও প্রতিবন্ধী কার্ড করে দেয়া হয়েছে। তারপরও অসহায় ভাই দুটির জন্য বোন হয়ে শিখা যে কষ্ট করেন সে জন্য তাকে ধন্যবাদ দিতে হয়। 
 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস