শিক্ষা নিয়ে ব্যাপক পরিকল্পনা জরুরি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৯ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৫ ১৪২৭,   ১৭ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

শিক্ষা নিয়ে ব্যাপক পরিকল্পনা জরুরি

 প্রকাশিত: ১৬:৩৮ ২৫ জুন ২০২০   আপডেট: ১৬:৩৯ ২৫ জুন ২০২০

বীরেন মুখার্জী

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

করোনাকালে মানুষের দিন কাটছে উদ্বেগ-আতঙ্কে। দিন গড়িয়ে গেলেও দেশে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে গভীর মনস্তত্ত্ব সংকট পড়েছে আমাদের কোমলমতি শিশুরা। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ভিশন এ সংক্রান্ত একটি জরিপ পরিচালনা করে। ‘চিলড্রেন ভয়েসেস ইন দ্য টাইম অব কোভিড-১৯’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই জরিপে শিশু-কিশোরদের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, মহামারির সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ছন্দপতনের জন্য সরাসরি তিনটি কারণ উল্লেখ করেছে তারা। এগুলো হলো- শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, সামাজিক দূরত্বের কারণে মানসিক চাপ তৈরি এবং পরিবারে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া। শতকরা ৭১ ভাগ শিশু ও তরুণ বলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে তারা নিজেদের শিক্ষাজীবন নিয়ে চিন্তিত। তারা বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ অনুভব করছে। সংস্থাটি ১৩টি উন্নয়নশীল দেশে এই জরিপ চালিয়েছে। দীর্ঘদিন এমন থাকলে শিশু-কিশোরদের দ্বিধা, ভয় ও হতাশা আরও বাড়বে বলে মনে করেন সংস্থার বিশ্লেষকরা। বিষয়টি নিঃসন্দেহে চিন্তা জাগানিয়া। 

স্বীকার করতে হবে যে, শিক্ষা সর্বাধিক উন্নয়নের প্রধানতম মাধ্যম। সারা বিশ্বেই এটি স্বীকৃত। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যেদেশ শিক্ষায় যত উন্নত সেদেশ অর্থনৈতিকভাবেও এগিয়ে। দেশে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার না ঘটিয়ে বা জনগণকে অশিক্ষিত করে রেখে বিশ্বের কোনো দেশই নিজেদের উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ, ‘উপযুক্ত প্রশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার টেকনিশিয়ানের অভাবহেতু বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রার বিনিময়ে বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিতে হয়েছে আমাদের রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প ও পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য। নিজ দেশে ওই জাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম প্রকৌশলী ইত্যাদি থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি মুদ্রার সাশ্রয় হতো।’ আমরা সবাই জানি যে, শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের বেকারত্বও ঘোচানো সম্ভব। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে গিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করতে পারছেন একমাত্র দেশ-বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন বলে। এ ব্যাপারে দেশের নীতিনির্ধারণীমহল ওয়াকিবহাল, তা আমাদের অজানা নয়। যে কারণে, সবকিছু বিবেচনা করে ২০২০-২০২১ সালের বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনার ভয়ে আজ বিশ্ববাসী প্রকারান্তরে অবরুদ্ধ। করোনার বিস্তার রোধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত এবং প্রায় সব শিক্ষা কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয়েছে বেশির ভাগ দেশে। 

যেসব দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব একটু কম, সেসব দেশে স্বল্প পরিসরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। কার্যত সারা পৃথিবীর শিক্ষাব্যবস্থাই এখন অনিশ্চয়তায় মুখে। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিবিষয়ক নানা পরিকল্পনার কথা আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারছি। কিন্তু করোনাকালীন সময়ে শিক্ষা নিয়ে তেমন কোনো পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে না। অনেকেই ভাবতে পারেন, জীবন বাঁচানোর কার্যক্রম যেখানে অপর্যাপ্ত, সেখানে শিক্ষা নিয়ে কথা বলার সময় এখনো আসেনি। অথচ, আসল ব্যাপার হলো শিক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে জীবন বাঁচানোর তাগিদেই। শিক্ষাকে অবহেলা করে আমরা আগামীর করোনামুক্ত পৃথিবীতে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পাব না- এমনটি শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সুতরাং শিক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা সুষ্ঠু ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন বলেই বিশ্বাস করতে চাই। 

করোনাকালীন এই অবরুদ্ধ সময়ে আমাদের দেশে আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটির ঘোষণা রয়েছে। বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করছে। শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সংসদ টেলিভিশনে সীমিত আকারে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠদান চলছে। কিন্তু এটিতে কি ক্ষতি কাটবে? অনেকেই টিভিতে ক্লাসের এই ব্যবস্থাকে স্বাগত জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, যাদের টিভি নেই বা টিভি থাকলেও ডিশলাইন নেই, তারা কীভাবে ক্লাস দেখবে? আবার ডিশলাইন থাকলেও অনেক এলাকায় সংসদ টিভি দেখা যায় না। ফলে বিটিভির মাধ্যমে যদি ক্লাসগুলো দেখানো যেত, তাহলে আরো বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করতে পারত বলে অনেকে মনে করেন। ফেসবুক ও ইউটিউবে পাঠগুলো পাওয়া গেলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রত্যন্ত এলাকায় নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে অনেকে তা চাইলেও দেখতে পারে না। বড় কথা হলো আমাদের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পরিবার দরিদ্র। কার্যত এসব ব্যবস্থা তাদের তেমন কাজে আসছে না। কেননা, দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশই টিভি, ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের মাধ্যমে পাঠদানের সুবিধা নিতে পারছে না। আবার এসব ক্লাস একজন শিক্ষার্থীর জীবনে কতটুকু ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে সেটিও মূল্যায়ন করা জরুরি। এসব ক্লাসে ‘বাড়ির কাজ’ হিসেবে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে টেনে রাখার পরিকল্পনা ভালো হলেও দরিদ্র শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কীভাবে ক্লাস দেখবে, সেটিও সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে। 

বস্তুত করোনার কারণে দেশের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে দূরেই থেকে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই। সে ক্ষেত্রে সিলেবাস সীমিত করে তাদের অল্প দিন পাঠদানের পর পরীক্ষা আয়োজন করা যেতে পারে। করোনা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটলে ডিসেম্বরে একটি মাত্র মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরের শ্রেণিতে উন্নীত করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যেহেতু দেশের করোনা পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। ফলে এ ভাবনা থেকেও সরে আসতে হয়। করোনা যদি আরও সময় ধরে থাকে, তাহলে কী হবে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম? সেই পরিকল্পনা নিয়ে শিক্ষার নীতিনির্ধারকেরা কিছু কি ভাবছেন? কারণ, করোনা নামের এই ভাইরাস দীর্ঘদিন পৃথিবীতে থাকতে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

কেউ কেউ তো ইতিমধ্যে মন্তব্য করেছেন যে, করোনা পরিস্থিতি ২০২১ সালের এপ্রিল কিংবা আরও বেশিদিন পর্যন্ত গড়াতে পারে। তাহলে কী হবে আমাদের দেশের শিক্ষার অবস্থা! কিছুদিন আগে মার্কিন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের পরিচালক রবার্ট রেডফিল্ড ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’কে বলেছিলেন, আগামী শীত মৌসুমে ভাইরাসটির আক্রমণ আরও বেশি কঠিন হয়ে ওঠার আশঙ্কা আছে। তার মানে এটি লম্বা সময় ধরে থাকার এবং পরবর্তী ধাপে পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাপঞ্জিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। 

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দেশের অন্তত চারটি পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এর মধ্যে স্থগিত রাখা হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা। আবার আগামী নভেম্বরে নির্ধারিত পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির দুটি সমাপনী পরীক্ষার কী হবে, তাও জানি না। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির দুই সমাপনী পরীক্ষা সময়মতো নিতে হলে কাটছাঁট করতে হবে সিলেবাস। নইলে শিক্ষার্থীরা চাপে পড়বে। সেই সীমিত সিলেবাসের আকার কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে। পত্রিকার খবর বিশ্লেষণ করে বলা যায়, আগামী জেএসসি ও প্রাথমিক সমাপনী, ২০২১ সালের ফেব্রæয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি ও স্থগিত রাখা এইচএসসি পরীক্ষার কী হবে, তা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলো এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না। অবশ্য তা পারার কথাও নয়। কেননা পাঠদান ও অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন যদি বন্ধ থাকে, তাহলে পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ফলে শিক্ষার পুরো সিলেবাস, ক্লাস, পরীক্ষা এবং সব ধরনের মূল্যায়ন কার্যক্রম কীভাবে হতে পারে, তা নিয়ে এখন থেকেই চিন্তা করতে হবে। পাশাপাশি বিষয়গুলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার করে জানাতে ও বুঝাতে দ্রæত উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর