Alexa শিকার ও পাচারের শীর্ষে ‘প্যাঙ্গোলিন’

ঢাকা, শুক্রবার   ২২ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৭ ১৪২৬,   ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

শিকার ও পাচারের শীর্ষে ‘প্যাঙ্গোলিন’

রুখসানা আক্তার হ্যাপি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০৭ ২৩ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১২:৩৩ ২৪ অক্টোবর ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

আমরা সবাই কম-বেশি বন্যপ্রাণীদের সর্ম্পকে জানি। তবে আপনি কি এমন কোনো বন্যপ্রাণী সর্ম্পকে জানেন, যেটি কেনার জন্য কালোবাজারে ক্রেতাদের গুনতে হয় কোটি টাকা।

যদি কখনো এমন প্রাণীর কথা না শুনে থাকেন তবে আপনি একা নন। প্রাণীটি প্যাঙ্গোলিন বা বনরই নামে বেশি পরিচিত। এই লাজুক প্রাণীটি আপনার বিড়াল বা কুকুরের মতোই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাচারকারী স্তন্যপায়ী প্রাণী।

জরিপে জানা যায়, গত দশকে দশ মিলিয়নেরও বেশি পাচার হয়েছে এ প্রাণী। কিন্তু বর্তমানে এ প্রাণীগুলো প্রায় বিলুপ্তের পথে। কিন্তু কেন এই প্রাণীর এতো চাহিদা? চলুন জেনে নেয়া যাক এর বিস্তারিত।

প্যাঙ্গোলিনাপাঙ্গোলিনের বৈশিষ্ট্য
সর্ম্পূণ পৃথিবী চেনে প্যাঙ্গোলিন হিসেবে, আমি তাকে বলি বনরুই। আঁশযুক্ত শরীর ও মৎসাকৃতি গঠনে বনজঙ্গলে চলাফেরা করার সময় রুই মাছের মতো লাগার কারণে এদেরকে বনরুই বলা হয়ে থাকে। এরা বিপদের আভাস পেলে নিজের শরীর গুটিয়ে নেয় বলে মালয় ভাষায় এদের "পেঙ্গুলিং" বলা হয়, যেখান থেকে এসেছে এদের নাম প্যাঙ্গোলিন। তবে পিঁপড়া ও পিঁপড়া জাতীয় প্রাণী খায় বলে এটি আঁশযুক্ত পিঁপড়াভুক নামেও পরিচিত।

এরা ফোলিডোটা বর্গের আঁশযুক্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী। মুখে দাঁত না থাকায় পূর্বে দাঁতহীন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা হতো। কিন্তু কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বর্তমানে এদের আলাদা একটি দল ফোলিডোটার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার একমাত্র সদস্য হলো বনরুই। এই আশঁযুক্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীটি বহু সময় ধরে মাসুষের ক্ষমাহীন লোভের শিকার হয়েছে।

প্যাঙ্গোলিনাকালোবাজারে কেন এই প্রাণীর এত চাহিদা?
আমরা সবাই জানি, বন্যপ্রাণীর চোরাচালান পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কালোবাজার। আর সেই বাজারে সব থেকে বেশি চাহিদা যে স্তন্যপায়ী প্রাণীর, তার নাম হল প্যাঙ্গোলিন। কিন্তু আমরা কি জানি কেন এই প্রাণীর এতো চাহিদা?

আসলে প্যাঙ্গোলিনের শরীর সর্ম্পূণ আঁশ দিয়ে আবৃত। আর কালোবাজারে এই প্রাণীর আঁশের চাহিদা বিপুল। কারণ চীনের প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতিতে অস্থি সন্ধির ব্যথা ও ক্যান্সার নিরাময়ে এ প্রাণীর আঁশ ও ফিটাস (ভ্রূণ) ব্যবহার করা হয়। যা বিক্রি করা হয় খুবেই চড়া দামে।

প্যাঙ্গোলিনাআত্মরক্ষার কৌশল
মাথা থেকে একেবারে লেজ পযর্ন্ত বড় বড় শক্ত, পুরু ও ধারালো আঁশ থাকলেও প্যাঙ্গোলিনের কোনো দাঁত নেই। র্দীঘ সরু লম্বা আঠালো জিভের সাহায্যে এরা খারার শিকার করে। পিপীলিকাভুক্ত প্রাণীটি মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। এই প্রাণীর আঁশগুলো সাধারণত কেরাটিন নির্মিত। বনজঙ্গলে হিংস্র প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচতে তারা নিজস্ব আত্মরক্ষার কৌশলও বানিয়েছে। বিপদের আভাস পেলেই তারা নিজেদের শরীরটাকে গুটিয়ে দলা পাকিয়ে নেয়। কুন্ডলী পাকানো দেহটার মধ্যে মাথাপাকে সযত্নে লুকিয়ে ফেলে। তার উপর দিয়ে লেজটাকে টেনে পিঠের উপর শক্ত করে আটকে দেয়। ফলে কোনো প্রাণীর পক্ষে সম্ভব হয় না ওই কুন্ডলী ভাঙার বা শক্ত করার। পরিস্থিতি বেগতিক হলে কুন্ডলী পাকানো অবস্থাতেই দ্রুত গড়িয়েও যেতে পারেন। কিন্তু সেই সুযোগে মানুষ-দৈত্য তাকে সহজেই পাকড়াও করে ফেলে। বন্দী প্যাঙ্গোলিনাদের শিকারীরা অনেক টাকাই হাত বদল করে পাচারকারীদের কাছে।

প্যাঙ্গোলিনাআপনা মাংসে হরিণা বৈরী, প্রবাদটি নিশ্চয় শুনেছেন। ঠিক তেমনি নিজের শরীরাবৃত আঁশই প্যাঙ্গোলিনার সর্বনাশের কারণ হয়ে উঠেছে। যদিও প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঙ্গোলিনের দেহাংশ দিয়ে ওষুধ তৈরির কোনো বিঞ্জানসম্মত ভিত্তি নেই। এগুলো সাধারণত অপচিকিৎসা ও অসচেতন মানুষকে বিভ্রান্ত করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কৌশল।

প্যাঙ্গোলিনের প্রজাতি
পৃথিবীতে প্যাঙ্গোলিনদের মোট আটটি প্রজাতি রয়েছে। যার মধ্যে চারটি এশিয়াতে আর বাকি চারটি আফ্রিকা মহাদেশে। ইন্টার ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সাল পযর্ন্ত কমপক্ষে ১০ লাখ প্যাঙ্গোলিনকে মেরা ফেলা হয়েছে। সিএনএন-এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্যাঙ্গোলিনের দু’টি প্রজাতি এরই মধ্যে বিলুপ্তপ্রায়। ফলে বিশ্বের বিপন্ন প্রাণীদের তালিকায় র্শীষে রয়েছে এই নিরীহ প্রাণী।

প্যাঙ্গোলিনা

কোন কোন দেশে এই প্রাণীর চাহিদা সর্বাধিক
প্রসঙ্গত, চীন ও ভিয়েতনামেই প্যাঙ্গোলিনের আঁশের চাহিদা সর্বাধিক। তাদের মাংসও বিক্রি হয়। তবে মূল চাহিদা আঁশেরই। প্রাচীন চীনা ঔষধিতে ওই আঁশ ব্যবহার হয়ে আসছে গত এক হাজার বছর ধরে। সেদেশের বহু প্রজাতির বিশ্বাস ওই আঁশের তৈরি ওষুধ খেলে নাকি মহিলাদের বুকের দুধের পরিমাণ বাড়ে।

প্যাঙ্গোলিনাপ্যাঙ্গোলিনা ধরার নিষ্ঠুর পদ্ধতি
প্যাঙ্গোলিনগুলোকে ধরার পড়ে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর পদ্ধতিতে তাদের হত্যা করা হয়। গরম পানিতে জ্যান্ত ফেলে দিয়ে তাদের মেরে ফেলা হয়। পরে তাদের শরীর থেকে রক্ত বের করে নেয়া হয়। নিরীহ প্রাণীগুলোর প্রতি এমন নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন পশুপ্রেমী ও সংবেদনশীল মানুষেরা।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারী মাসের তৃতীয় সপ্তাহে প্যাঙ্গোলিনা দিবস পালন করা হয়। সম্প্রতি বিখ্যাত অভিনেতা কুংফু মাষ্টার জ্যাকি চ্যান একটি ভিডিওতে এ ব্যাপারে সচেতন হতে অনুরোধ করেছেন। তবুও প্যাঙ্গোলিনা পাচ্ছে না ছাড়। বিশ্বে প্রতি পাঁচ মিনিটে একটি করে প্যাঙ্গোলিনা শিকার হচ্ছে। বিলুপ্তের সম্ভাবনা ছাড়া যেন তাদের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ/এসআর/জেএমএস